অতিরিক্ত খরচ বাঁচাতে

– মামা, আপনের কিন্তু ম্যালা টাকা বাকি পড়ে গেলো!

– দিয়ে দিবো মামা

চায়ের দোকান থেকে বের হয়ে ফটোকপির দোকানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মুখ খাতা দিয়ে ঢেকে যাচ্ছিলো তপন। চায়ের দোকানের মতো এখানেও টাকা পায়। কবে বাড়ি থেকে টাকা আসবে, কবে সব ধার শোধ হবে ঠিক নাই। প্রতি মাসের শেষে এইরকম বিব্রতকর সময় যায়। তপন ভেবে পায় না, তারই এমন হয় নাকি সবারই এরকম অবস্থা!

টাকা জিনিসটা খুবই ইন্টারেস্টিং লাগে তার। বাড়ি থেকে আসা টাকা, টিউশনি থেকে পাওয়া টাকা- কোন কিছু দিয়েই খরচ সামলানো যায় না। প্রতি মাসে টাকা হাতে পেয়েই প্রথমে পুরোনো লোন শোধ করতে হয়। তারপর বাকি টাকা কখন কোথা থেকে যে খরচ হয় কিছুই বোঝা যায় না।


এতো খরচ! ক্যামনে কি!

দিন গড়ায়। পরের মাস আসে। হঠাৎ করেই তপন খেয়াল করলো মাসের প্রায় শেষের দিক আসি আসি করছে, অথচ তার হাতে ভালোই টাকা পয়সা আছে। কাহিনী কি! হুমমম…. কয়েকদিন ধরে এক হাজার টাকার নোট নিয়ে ঘুরছে তবে আলসেমি করে ভাঙানো হচ্ছে না……

আরে তাইতো! এই মাসে বেশ কয়েকবারই ভাঙতি টাকার অভাবে অনেক খরচ কমে গেছে। তপন খেয়াল করে দেখলো, যেসব ক্ষেত্রে সে টাকা খরচ করেনি, সেগুলো একদম ইম্পর্টেন্ট কিছুই না। মন চাইলো খরচ করে ফেললাম টাইপ আর কি! আরও কিছু ব্যাপার আছে……..

অনেকক্ষণ ভেবে ভেবে তপনের মনে হলো এই যে মাস শেষে টানাটানি, অতিরিক্ত খরচ বিষয়গুলো অনেকটা অর্থনৈতিক আবার অনেকটাই সাইকোলজিক্যাল! অথচ তার সবসময় মনে হতো আজ গরীব বলেই ……..!


এইবার বুঝছি!

বন্ধুরা, বুঝতেই পারছো, অতিরিক্ত খরচ করার এইটা সমস্যাটা আমাদের বেশিরভাগেরই প্রতিদিনকার জীবনের ঘটনা। এটা কিন্তু মামুলি বিষয় নয়, বরং এই অভ্যাসের জন্য আমরা অনেকে ভালোই বিপদে পড়ে যাই অনেক সময়। তাহলে দেখা যাক, অতিরিক্ত খরচ কমানোর কৌশলগুলো কেমন-

১. কেন খরচ কমাতে চাও!

খরচ কমাতে চাও ভালো কথা, কিন্তু প্রথমে তোমাকে শিওর হতে হবে, তুমি আসলেই কেন খরচ কমাতে চাইছো! যেমন- অনেকে হয়তো টাকা জমিয়ে একটা ল্যাপটপ কিনতে চায়, কিন্তু অপ্রয়োজনীয় কাজে টাকা খরচ করে ফেলে বলে আর জমানো হয় না। সেক্ষেত্রে ল্যাপটপ কেনাটা তার কাছে খরচ কমানোর একটা মোটিভেশন। আবার অনেকেই আছে টাকা ধারের ব্যাকলগে পড়ে যায়। সেক্ষেত্রে মানসিক যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে খরচ কমানো একটা কারণ হতে পারে। আবার অনেকের ক্ষেত্রে খরচের প্রায়োরিটি সেট করা থাকে না। যেমন ধরা যাক, মন চাইলো তাই টিউশন ফি দিয়ে একটা ব্র্যাণ্ডেড শার্ট বা টপস কিনে ফেললে। সেক্ষেত্রে টিউশন ফি যে বাকি পড়ে গেলো তার জন্য হয়তো তুমি লেখাপড়াই কন্টিনিউ করতে পারলে না। এক্ষেত্রে এই ধরণের ভবিষ্যত পরিণতি বা মান সম্মান বাঁচানোটা মোটিভেটশন হতে পারে।


টাকা জমাতে চাওয়াও খরচ কমানোর মোটিভেশন হতে পারে

২. রিমাইন্ডার রিমাইন্ডার

যে জন্য খরচ কমাতে চাইছো তা মনে করার জন্য মানিব্যাগে বা পার্সে টোকেন অথবা ছবি রাখতে পারো রিমাইন্ডার হিসেবে।

ধরো, আগামী মাসে বন্ধুরা মিলে সিলেটে বেড়াতে যাবে। তুমি এক্সাইটেড কিন্তু বাজে খরচের অভ্যাসের কারণে টাকা ম্যানেজ করতে পারবে কী না সন্দিহান। সেক্ষেত্রে সিলেটের প্রাকৃতিক দৃশ্যের ছবি ব্যাগে রাখলে টাকা অপচয় করতে গেলেই তোমার হৃদয় মস্তিষ্ক দু’টো থেকেই বাধা আসবে।


গোল রিমাইন্ডার

আবার হতে পারে, আদরের ছোট ভাই বোনের লেখাপড়ার জন্য তোমাকেই কন্ট্রিবিউট করতে হয়। সেক্ষেত্রে তার ছবি ব্যাগে রেখে দিলে অপ্রয়োজনীয় খরচে মন একেবারেই সায় দিবে না।

৩. কোন কোন খাতে টাকা খরচ হচ্ছে তা খুঁজে বের করা

এই পার্টে একটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার খেয়াল করবে। কোন কোন খাতে টাকা খরচ হচ্ছে তা খুঁজতে গেলে দেখবে, এর মধ্যে দুইটা স্পষ্ট ভাগ আছে।

এক, কিছু খাতে তোমাকে টাকা খরচ করতেই হবে এবং সেটা যৌক্তিকও। দুই, কিছু খাতে তুমি টাকা খরচ করতে চাও না, তবুও কিভাবে যেন খরচ হয়ে যায়।


টাকা খরচ হচ্ছে কোথায়!

এই দ্বিতীয় ক্ষেত্রকে অতি শীঘ্রই চিহ্নিত করতে হবে এবং সেই খরচগুলো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বন্ধ করতে হবে। মাথা চুলকে বললে হবে না, ইয়ে মানে আগামী সপ্তাহ থেকে! মনে রাখবে খরচ কমানো আর ডায়েট করা- ডিসিশান নেওয়ার সাথে সাথেই শুরু করতে হয়, আগামী দিন বলে কিছু নেই!  

৪. প্রতিদিনই বাজে খরচ হয় এমন খাতগুলো খুঁজে বের করা

কিছু খরচ থাকে যেটা হুট করে হয়, আবার কিছু থাকে প্রতিদিনই টুকটাক খরচ হচ্ছে, কিন্তু অল্প বলে মনে থাকে না। যেমন- হয়তো তোমার বাসা থেকে ক্যাম্পাসের দূরত্ব হেঁটে গেলে দশ মিনিট, অথচ রিকশায় একটু ঘুরে যেতে হয় বলে ভাড়া চল্লিশ টাকা। তুমি ক্লাসের জন্য বের হতে দেরি করো, তাই বেশিরভাগ দিনই রিকশায় উঠে পড়ো। শুধু ভাড়াতেই প্রতিদিন টুকটাক করে মাসিক একটা বড় ধরণের খরচ হয়। এক্ষেত্রে তোমার অর্থনৈতিক সঙ্কটটা তৈরি হচ্ছে আসলে টাইম ম্যানেজমেন্ট না করতে পারার কারণে।


প্রতিদিনের অতিরিক্ত খরচ বিন্দু থেকে মাস শেষে সিন্ধু হয়ে দাঁড়ায়!

আবার অনেকেই আছে পানির বোতল সাথে করে নিতে ভুলে যায় দেখে প্রতিদিনই একটা করে পানির বোতল কেনে।  এক্ষেত্রে ভুলটা কিন্তু আসলে ভুলে যাওয়ার মধ্যেই!

প্রতিদিন চা আর ক্যান্টিনে টুকটাক খাওয়া, যেটাকে দেখতে কম মনে হলেও মাসের শেষে হিসেব করলে বড় অঙ্কে দাঁড়ায়- সেরকম খরচও প্রচুর আছে। এগুলো অতি দ্রুত আইডেন্টিফাই করে, খরচ করা বন্ধ করতে হবে।

৫. প্রায়োরিটি লিস্ট

অনেকেই আছে যারা বাড়ি ভাড়ার টাকা দিয়ে মুভির টিকেট কিনে ফেলে বা পশ কোন রেস্টুরেন্টে খেতে চলে যায়। এরপর যখন এই অতি প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে টাকা জোগাতে হয়, তখন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা, আমি এতো গরীব কেন, জীবনে কোন শান্তি নাই- জাতীয় কথাবার্তা মনে হয়।

অথচ তোমার কাছে কিন্তু এই খাতে খরচ করার টাকা ছিলো! একটু খামখেয়ালীর জন্য পুরো বিষয়টাই ভেস্তে গেলো।


খরচ করার আগে প্রায়োরিটি সেট করো

তাই খরচ করার আগে প্রায়োরিটি ঠিক করতে হবে। আগে বাড়ি ভাড়া, বিদ্যুৎ-পানি-গ্যাস বিল, খাবার খরচ বা বাজার করা, পরিবহন খরচ, টিউশন ফি- সবকিছু শোধ করে তারপর মনের সাধ মেটাতে পারো।

৬. নতুন টাকায় খরচ কমে!

শুনতে মজার মনে হলেও, এটা অতিরিক্ত খরচ কমানোর অন্যতম একটা সাইকোলজিক্যাল ট্রিকস! নতুন নোটের প্রতি আমাদের বেশিরভাগেরই দুর্বলতা আছে। পুরোনো টাকা খরচ হয় তাড়াতাড়ি। কিন্তু নতুন টাকা না পারতে আমরা খরচ করতে চাই না। তাই যে অঙ্কের টাকা মাসের পরবর্তীতে লাগবে, অথচ আগেই খরচ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে, সেই পরিমাণ টাকা নতুন নোটে আলাদা করে রেখে দাও।


আহা! নতুন টাকা!

বিশ্বাস না হলে, নিজেই ব্যাগে বেশি বেশি নতুন টাকা রেখে দেখতে পারো, কোন চেঞ্জ আসছে কী না!

৭. ভাঙতি নেই তো খরচও নেই!

এইটাও একটা হাস্যকর তবে কার্যকরী ট্রিকস। হয়তো রাস্তায় হেঁটে যেতে যেতে একটা রঙীন চাদর পছন্দ হয়ে গেলো, যা কী না তোমার দরকারই নেই। ভাঙতি না থাকলে এই হুট করে বাজে খরচ থেকে বেঁচে যাবে।


ভাঙতি হবে ভাই?

আবার অনেকেই ক্লাসে যাবার পথে আইসক্রীমের গাড়ি চোখে পড়লেই দুই চারটা হে হে…..! পাঁচশো বা এক হাজার টাকার নোটের কারণে এইসব খরচ কমে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক।

৮. নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের যত্ন আর সর্বোচ্চ ব্যবহার

আমরা বেশিরভাগ জিনিসেরই সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে পারি না।  অনেকেই বারবার চশমা ভেঙে ফেলি, হেডফোন হারিয়ে ফেলি। মনে হয়, এ আর কতো টাকা। কিন্তু জিনিসগুলো সাবধানে রাখতে পারলে কিন্তু এই খরচটা করতে হয় না।

তাই কোন জিনিসটা কত দিন ধরে, কতভাবে ব্যবহার করা যাবে, কিভাবে যত্ন নিলে ভালো থাকবে- তা খেয়াল রাখতে হবে। যে জিনিসটা একদমই কাজে লাগছে না, সেটা বিক্রি করে দেওয়াটাই বেটার।


যত্ন নিলে খরচ বাঁচবে!

বন্ধুর জন্মদিনে গিফট দেওয়ার জন্য সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে খরচ করাও কমন ঘটনা। অথচ ইন্টারনেট ঘেঁটে ওয়েস্ট ম্যাটেরিয়াল দিয়ে নিজেই বানাতে পারো দারুন সব গিফট, কার্ড, ক্রাফ্ট। শুধু খরচ কমানোর উদ্দেশ্যে না, এটা ভালোবাসাও বাড়ায়!

৯. এন্টারটেইনমেন্ট, ফ্যাশন, রেস্টুরেন্ট খরচ!

সত্যি বলতে আমাদের বেশিরভাগ ফ্যাশন, গেটআপ, রেস্টুরেন্টে খাওয়া- যতটা না প্রয়োজনীয় তার থেকে অনেক বেশি শো অফ আর অন্যদের দেখাদেখি করতে চাওয়ার প্রবণতা!

জামা কাপড় কিনতে গেলে যতটা না নিজের ইচ্ছা বা দরকার, তার থেকে অন্য কাউকে দেখে কিনতে যাওয়াটাই বেশি হয়। আবার একই শেডের লিপস্টিক, কালার ভুলে যাওয়ার কারণে দুই তিনটা কিনে ফেলাও কমন ঘটনা। এই অপ্রয়োজনীয় খরচগুলো কমাতে পারলে মাস শেষে ভালো অঙ্কের টাকা বেঁচে যায়।


যা কিনতে যাচ্ছো….. আসলেই দরকার তো?

রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়া এখন প্রায় প্রতিদিনের ঘটনা। অথচ বাসা থেকে খাবার নিয়ে যাওয়ার অভ্যাস করলে বা অকারণে বাইরে খাওয়া বাদ দিতে পারলে খরচ তো বাঁচবেই, সেই সাথে শরীরও থাকবে হেলদি আর ফিট!

১০. নেট খরচ কমাও

অনেক সময়ে ডাটা কানেকশন অফ রাখার পরেও ডাটা খরচ হয়। অ্যান্ড্রয়েড ফোনের বেশিরভাগ অ্যাপসই সার্ভিস চালু রাখার জন্য ব্যাকগ্রাউন্ড ডাটা ব্যবহার করে। সেটিংস অপশনের ডাটা ইউজেস এ গিয়ে রেসট্রিক ব্যাকগ্রাউন্ড ডাটা অপশন সিলেক্ট করে দিলে ইন্টানেটের খরচ অনেকটাই কমে যাবে।

প্রয়োজনের বাইরের অ্যাপসগুলো বন্ধ করতে সেটিংস এর ডাটা ইউসেজ এ যাও। দেখতে পাবে সবগুলি অ্যাপ দেখাচ্ছে। কোন অ্যাপে কতো ডাটা খরচ হচ্ছে সেটা দেখে যে অ্যাপগুলো চালু রাখা দরকার সেগুলো বাদে বাকিগুলো রেসট্রিকটেড করে দিতে পারো।


ফোনে এখন টক-টাইম না, ইন্টারনেট প্যাকেজেই বেশি খরচ!

এই টিপসগুলো কে কতটা কাজে লাগাতে পারলে, জানাতে ভুলবে না কিন্তু! আরও কোন দারুন আইডিয়া থাকলে শেয়ার করো কমেন্ট বক্সে……

তথ্যসূত্র:

  1. https://www.wikihow.com/Reduce-Expenses
  2. https://www.thesimpledollar.com/trimming-the-fat-forty-ways-to-reduce-your-monthly-required-spending/
  3. https://www.thesimpledollar.com/21-ways-to-reduce-your-spending-without-making-your-life-miserable/
লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?