উসাইন বোল্ট: দ্য রিয়েল ফ্ল্যাশ

“তুই তো দৌড়াতেই পারিস না! স্পোর্টস এ কী করতে যাবি রে?” মৃদুল বলল কানিজ কে। কানিজ খুব আত্মবিশ্বাসের সাথে উত্তর দিলো,” দেখিস। আমি একদিন বোল্ট এর মতো দৌড় দিবো। সেদিন সবাই হা করে থাকবি।“

দৌড় বিষয়টি আসলেই আমরা উসাইন বোল্ট এর কথা স্মরণ করি। কেননা তিনি বিশ্বের দ্রুততম মানব নামে পরিচিত এবং বিশ্বের প্রায় সকলেই তাঁকে চেনেন।

উসাইন সেন্ট লিও বোল্ট তাঁর পূর্ণ নাম। পাঁচবার বিশ্ব রেকর্ড করা মানুষটির ডাকনাম “লাইটনিং বোল্ট।“ তাঁর এ নাম দেয়ার পেছনে রহস্য আমরা সকলেই জানি। জামাইকার ট্রিলনি পারিশ শহরে ১৯৮৬ সালের ২১ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন এই অপ্রতিরোধ্য, অপরাজেয়, অতিমানব। অতিমানব তো বলতেই হয়, কেননা তিনি সাধারণ মানুষের স্বপ্ন কে জয় করে দেখিয়েছেন। তাকে ডিসি কমিক্স এর ফিকশনাল চরিত্র ফ্ল্যাশ এর সাথেও তুলনা করা হয়, বলা হয় তিনিই রিয়েল লাইফ ফ্ল্যাশ। সত্যিই যেন তাই!


চিত্রেঃ বোলিং এর সময় বোল্ট

চিত্রেঃ ক্রিকেট খেলার সময় ব্যাট হাতে বোল্ট

ছোটবেলায় ক্রিকেটার হবার স্বপ্ন ছিল তাঁর, যা আমাদের অনেকেরই জানা নেই। তাঁর বাবার নাম ওয়েলেসলি বোল্ট এবং মায়ের নাম জেনিফার বোল্ট। বাবা ছিলেন মুদি দোকানদার এবং তাঁর সাথে তাঁর মা ও দোকান চালাতে সাহায্য করতেন। অতি সাধারণ একজন বালক বোল্ট তাঁর ভাই সাদেকি এবং বোন শেরিনকে নিয়ে বড়ো হয়েছেন। বোল্ট নিজেও দোকানে তাঁর বাবাকে সাহায্য করতেন, এ দোকান হতেই তাঁদের পারিবারিক আয় আসতো। 

বোল্ট এর ছোটবেলার কথাঃ

তিনি কখনই ভাবেননি যে তিনি একজন দৌড়বিদ হয়ে বিশ্ব মাতিয়ে রাখবেন। ছোটবেলা হতেই তাঁর প্রিয় ছিল ক্রিকেট। তাই তাঁকে প্রায়সই ব্যাট হাতে দেখা গিয়েছে। তিনি স্বপ্ন দেখতেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে ব্যাট-বল করছেন। একদিন কিছু না ভেবেই তিনি অংশ নিয়েছিলেন স্কুলের বার্ষিক দৌড় প্রতিযোগিতায়। ১০০ মিটার এর ট্র্যাকে প্রথম পা দিয়েই সকল কে দেখিয়ে দেন তাঁর পায়ের জাদু। সেবার তিনি প্রথম স্থান অর্জন করেন। সেদিন তাঁকে নজর এ রাখছিলেন সাবেক একজন স্প্রিন্টার। তাঁর দৌড় এর ধরন তাঁকে মুগ্ধ এবং জোর করেছে তাঁর দিকে নজর নিয়ে যেতে। সেদিন সে স্প্রিন্টার তাঁকে পরামর্শ দেন এথলেটিক্স এর প্রতি মনোযোগ দিতে। সেই থেকে তাঁর সফলতার শুরু। এরপর তাঁকে আর পিছে ফিরে তাকাতে হয়নি। তাঁর জীবনের প্রথম তিনি জামাইকার হয়ে ক্যারিবীয় অঞ্চলের ইভেন্টের ট্র্যাকে পা রাখেন ২০০১ সালে। ২০০ এবং ৪০০ মিটারের ট্র্যাকে দৌড়িয়ে তিনি অর্জন করেন রৌপ্য পদক। ২০০১ সালেই হাঙ্গেরিতে অনুষ্ঠিত হয় বিশ্ব যুব চ্যাম্পিওনশিপ। সেখানেও তিনি অংশগ্রহণ করেন ২০০ মিটারের ট্র্যাক রেসে। সেখানে ফাইনালে উত্তির্ন হতে তিনি ব্যার্থ হলেও তাঁর নিজ ক্যারিয়ার এর সেরা টাইমিং করেছিলেন সেবার(২১.৭৩ সেকেন্ড)।

 . 

বোল্ট এর অর্জন সমূহঃ

উসাইন বোল্ট তাঁর জীবন এ সর্বমোট পাঁচবার বর্ষসেরা অ্যাথলেট(পুরুষ) এর খেতাব অর্জন করেছেন। যার মাঝে তিনি টানা তিন বছর খেতাবটি অর্জন করতে সফল হয়েছেন। ২০০৮, ২০০৯, ২০১১, ২০১২ এবং ২০১৩ সাল গুলোয় তিনি এ খেতাবটি জয় করেন। ২০০৮- ২০০৯ সালে বিবিসি বহির্বিশ্বের সেরা ক্রিড়াব্যাক্তিত্ব, ২০০৮- ২০০৯ এর বছরের সেরা ট্র্যাক এন্ড ফিল্ড এথলেট, ২০০৮-২০০৯ IAAF এর বছর এর সেরা বিশ্ব এথলেট, ২০০৯- ২০১০ সালের লরিয়াসের সেরা বিশ্ব খেলোয়াড় হিসেবে তিনি পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর এতো এতো অর্জন একটি ছকের মাধ্যমে দেখে আসিঃ

নিজের সেরা-

ক্রমবিষয়সময়(সেকেন্ড) এবং তারিখমাঠ এবং রেকর্ড
১।১০০ মিটার,জার্মানি সেরা৯ দশমিক পাঁচ আট সেকেন্ড, ১৬ আগস্ট, ২০০৯ সালবার্লিন, বিশ্বের
২।১৫০ মিটার,যুক্তরাজ্য সেরাচৌদ্দ দশমিক তিন পাঁচ সেকেন্ড, ১৭ মে, ২০০৯ সাল।ম্যাঞ্চেস্টার, বিশ্বের
৩।২০০ মিটার ,জার্মানি সেরাউনিশ দশমিক এক নয় সেকেন্ড, ২০ আগস্ট, ২০০৯ সাল।বার্লিন, বিশ্বের
৪।৩০০ মিটার,প্রজাতন্ত্র সেরাত্রিশ দশমিক নয় সাত সেকেন্ড, ২৭ মে, ২০১০ সাল।অস্ত্রাভা,চেক বিশ্বের
৫।৪০০ মিটার,জামাইকাপয়তাল্লিশ দশমিক দুই আট সেকেন্ড, ৫ মে, ২০০৭ সাল।কিংস্টন, বিশ্বের
৬।৪ x ১০০ মিটার রীলে রেস, দক্ষিণ কোরিয়া সেরাসাঁইত্রিশ দশমিক শুণ্য চার সেকেন্ড, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১১ সালদাইগু, বিশ্বের

কয়েটি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় রেকর্ডসমূহ-

ক্রমবছরস্থানপ্রতিযোগিতাঘটনানোটঘটনাস্থল
১।২০০২১মবিশ্ব জুনিয়র২০০ মিটারবিশ দশমিক ছয় এক সেকেন্ডজামাইকা
২।২০০২২য়চ্যাম্পিয়নশীপ কিংস্টন৪ x ১০০ মিটার রীলেউনচল্লিশ দশমিক পনের সেকেন্ডকিংস্টন
৩।২০০২২য়৪ x ১০০ মিটার রীলে৩:০৪.০৬শেরব্রুক
৪।২০০৩১ম্বিশ্ব যুব২০০ মিটার চ্যাম্পিয়নশীপবিশ দশমিক চল্লিশ সেকেন্ডকানাডা
৫।২০০৩১মপ্যান আমেরিকান২০০ মিটারবিশ দশমিক  এক তিন সেকেন্ডবার্বাডোজ

উক্ত অর্জন সমূহ অনেক অনেক ছোট একটি অংশ মাত্র। তাঁর সকল অর্জন এর তালিকা করতে হলে আর শেষ হবেনা। অনেকেই তাঁকে নিজের আইডল হিসেবে দেখেন। তাঁদের ভেতর অনেকেই ভাবেন যে উসাইন বোল্ট এর সাফল্যের রহস্য কি হতে পারে। অনেকে জেনে অবাক হবেন তাঁর সফলতার রহস্য অনেক সাধারণ কিছু উপায়, চলুন তা জেনে আসা যাক-

১। কিছু পেতে হলে কিছু ছাড়তে হয়-কথাটি তে উসাইন বোল্ট দৃঢ় বিশ্বাসীঃ

বোল্ট মনে করেন নিজেকে সময় দেয়াটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তিনি তাঁর জীবনে নিজেকে সময় এবং বিশ্রাম দেবার জন্য বন্ধুদের কে না বলতে শিখেছেন। এক সময় তিনি তাদেরকে না বলতে পারতেন না, তাদের সাথে সময় কাটাতে চলে যেতেন, পরে এক সময় বুঝতে পেরেছেন যে সেটি অনেক বড় ভুল ছিল। কঠোর দিন শেষে নিজেকে একটু বিশ্রাম দিতেই হয় বলে জানিয়েছিলেন বোল্ট একটি ইন্টারভিউ এ।

২।নিজের লক্ষ্য ঠিক করতে হবে এবং তা সত্যি করতে হবেঃ

বোল্ট বিশ্বাস করেন নিজের লক্ষ্য ঠিক করা অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং তা সকল্কে জানানোও দরকার। শুধু সেখানে থেমে থাকলেই হবেনা, সেটিকে সত্যি করবার জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হবে।

বোল্ট বলেন-

“আপনাদের সকলকে বলেছিলাম আমি এক নম্বর হবো এবং আমি সেটাই করেছি।“

৩। হেরে যাওয়ার ভয়কে অনুপ্রেরণা হিসেবে দেখাঃ

বোল্ট সর্বদা হেরে যাওয়াকে ভয় করে সামনে এগিয়ে যান। তিনি রেইস ট্র্যাকে এ বিষয়টি মাথায় রেখেই আগাতে থাকেন, যা তাঁর জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজে আসে। তাঁর মতে এ ভয় কাটানোর অন্যতম উপায় হল- কঠোর পরিশ্রম, প্রশিক্ষন এবং একাগ্রতা।

৪। আপনাকে আপনার লক্ষ্যের চেয়ে বেশি চাইতে হবে-

বোল্ট মনে করেন তিনি একটি লক্ষ্য রেখেই এগিয়ে যেতে চান না। তিনি তাঁর লক্ষ্য কে ভেদ করে আরো সামনে অগ্রসর হতে চান সর্বদা, সে কারনেই এ মহামানবকে নিজের রেকর্ড বার বার ভাঙ্গতে দেখা যায়। আমরা অনেকেই লক্ষ্য রাখি জীবনে নির্দিষ্ট কিছু হবার তবে তাঁর চেয়েও যে আমরা আরো ভাল কিছু করতে পারি সেটি কখনও খেয়াল রাখিনা।

বোল্ট বলেন-

“আপনার পেছনে রেস ট্র্যাকে থাকা সাতজন মানুষ রেসটি ততোটুকুই জিততে চান, যতোটুকু আপনি জিততে চান। তাই আপনাকে আরো চাইতে হবে। এ জন্যেই আপনি কঠোর পরিশ্রম করে থাকেন।“

৫। তিনি মনে করেন ‘রোল মডেল’ থাকা জরুরীঃ

বোল্ট যখন ছোট ছিলেন তখন তাঁর রোল মডেল ছিলেন মাইকেল জন্সন এবং জন কোয়ারি। তিনি যাকে নিজের রোল মডেল হিসেবে দেখতেন, তাঁর মতোই তিনি হতে চাইতেন। এ মনোভাবটি তাঁকে তাঁর জীবনে এগিয়ে আসতে সাহায্য করেছে।

৬। অন্য কাউকে ভয় পেতে মানা করেছেন বোল্টঃ

অপরকে ভয় করার ফলে নিজের কাজের ওপর একটি নেগেটিভ ইফেক্ট পড়ে যার জন্য আমরা অনেক সময় সামনে অগ্রসর হতে পারিনা। যাকে আপনি ভয় করছেন তিনি আপনার স্থানেও এক সময় ছিল। তিনিও মানুষ এবং আপনিও মানুষ। তাঁর কাছে এমন কোন ম্যাজিকাল পাওয়ার ছিলনা যার জন্য তিনি প্রথম স্থানে এসেছেন, তাঁর সফলতার পিছে রয়েছে তাঁর করা কঠোর পরিশ্রম।

বোল্ট বে সম্পর্কে বলেন-

“ভয় পাওয়া? মানুষ যখন এটি সম্পর্কে বলেন তখন আমি হাসি। আমি অনেক বছর ধরে স্পোর্টস এ আছি এবং আমি কখনো কাউকে ডজ করিনি।“

৭। সফলতায় চাই সেরাদের সঙ্গ

বোল্ট মনে করেন সেরা মানুষগুলোর সঙ্গ তাঁকে তাঁর আজকের স্থানে নিয়ে এসেছে। তিনি তাঁর পরিবার, কোচ এবং বন্ধুবান্ধব্দের প্রতি কৃতজ্ঞ এ কারণে। সেরা মানুষের সঙ্গ মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যে অনেক প্রভাব ফেলে সেটি আমরা সকলেই জানি। তাই সফল হতে হলে ভাল মানুষের সাথে মেলামেশা করা জরুরী।

৮। কীভাবে শুরু করেছি সেটি কোন ব্যাপার না, কীভাবে শেষ করছেন সেটি-ই হোক মূখ্য বিষয়ঃ

অনেক দ্রুত শুরু করছেন বা অনেক ধীর গতিতে কোন কাজ করছেন, এটি কেউ কখনো দেখেননা। সবাই দেখেন সর্বশেষ ফলাফল কি হয়। তাই বোল্ট বলেছেন, তাঁর চাইতে ভাল ভাল স্টারটার আছেন, তবে তিনি নিজেকে একজন সেরা ফিনিশার হিসেবে দেখেন।

৯। নিজ কাজকে মনে প্রাণে ভালোবাসেন বোল্টঃ

তাঁর জীবনে পাওয়া সকল উপদেশ হতে তিনি একটি জিনিস শিখতে পেরেছেন এবং তা হল- কোন কাজ করার সময় সেটিকে উপভোগ করতে হবে। তবেই সে কাজে একজন সফল হতে পারবে।

১০। পজেটিভ এবং নেগেটিভ- দুটো সমালোচনাকেই কাজে লাগাতে হবে চলার পথেঃ

বোল্ট এর জন্য তাঁর কাজের সফলতায় কাজ করে তাঁর অনুসারীদের ভালোবাসা এবং সাপোর্ট। তবে তিনি মূলত তাঁর প্রতি ঘৃণার সমালোচনা কে কাজে লাগিয়ে নিজের সর্বোচ্চ তাদেরকে দেখিয়ে দেন তাঁর কাজের মাধ্যমে।

এ সম্পর্কে তিনি বলেন-

“আমি আমার অনুসারীদের প্রতি বলতে চাই আমি আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞ আপনাদের ভালোবাসা এবং সাপোর্ট এর জন্য এবং আমাকে যারা প্রশ্নবিদ্ধ করেন তাঁদের প্রতিও আমি কৃতজ্ঞ কারণ আপনারাই আমাকে নিজেকে আরো উঁচু পর্যায়ে যেতে অনুপ্রেরণা প্রদান করেছেন।“

১০০ মিটার দৌড় ৯.৫৮ সেকেন্ডে শেষ করা, ২০০ মিটার ১৯.১৯ সেকেন্ডে শেষ করা, নিজের রেকর্ড নিজে ভাঙ্গা এ ব্যাক্তি ২০১৬ সালে রিও অলিম্পিকে জয় করেছেন ৯টি স্বর্নপদক। তাঁর অর্জন এবং সফলতার পেছনে থাকার রহস্যগুলো খুবই সাধারণ এবং কেউ যদি সেগুলো অনুসরণ করেন তবে তিনি তাঁর অবস্থান থেকে সেরা হিসেবে বিবেচিত হতে পারবেন একদিন।

ছবি এবং তথ্যসূত্রসমূহ-

১.https://www.gonews24.com/m/sports/news/42945/উসাইন-বোল্ট-মুদি-দোকানির-ছেলের-সফলতার-গল্প

২.https://bn.m.wikipedia.org/wiki/উসেইন_বোল্ট

৩.https://wealthygorilla.com/7-success-lessons-usain-bolt/

৪.https://www.prothomalo.com/we-are/article/1533116/উসাইন-বোল্টের-সাফল্যের-১০-সূত্র

৫.https://www.google.com/search?q=usain+bolt&client=ms-android-huawei-rev1&prmd=inv&source=lnms&tbm=isch&sa=X&ved=2ahUKEwi1-NXRu9TfAhWLQo8KHc1hCYgQ_AUoAXoECA0QAQ

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?