চিন্তাটা হোক নিজের ভাবনা-চিন্তা নিয়েই!

পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবারে শুনে নাও!

Change your thoughts and you change your world. — Norman Vincent Peale

নিজের চিন্তায় পরিবর্তন আনুন, পৃথিবীকে বদলে দিতে পারবেন— নরমান ভিনসেন্ট পেল

“জানেন, ইদানীং আমার খুব রাগ বেড়ে গেছে। অল্পতেই রেগে যাই, বিশেষ করে আপনজনদের সাথে। আমি খুব বিরক্ত। কারো সাথে কথা শুরু হলেই ঝগড়া, মনোমালিন্য, তারপর সারা দিন মেজাজ বিগড়ে থাকে। আমার পড়ালেখার তো বারোটা বাজার মতো অবস্থায়। ক্লাসে মন দিতে পারি না, অনেক এসাইনমেন্ট, ক্লাস টেস্ট ঝুলে আছে।” বিড়বিড় করে কথাগুলো বলল ২২ বছরের ভার্সিটি-পড়ুয়া এক তরুণ। মেধায় তুখোড়, বাবা শিক্ষিত, সরকারি কর্মজীবী। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান।

“আচ্ছা, কেন এত ঝগড়া হয়? আমি বুঝতে পারছি, এতে আমার সমস্যা আছে, কিন্তু কেমনে কী করব বুঝতে পারছি না! আমার আত্মবিশ্বাস তো জিরো লেভেলে চলে যাচ্ছে।”

আমি খুশি হয়ে তাকে বললাম, “আপনার উপলব্ধি এবং সাহায্য চাওয়ার জন্য ধন্যবাদ। বিষয়টাকে অস্বীকার না করে তা থেকে কীভাবে উত্তরণ ঘটানো যায়, তা নিয়ে আপনি ভাবছেন এবং একজন পেশাদারের শরণাপন্ন হয়েছেন— এটাকে আমি সম্মান করছি।”

অনেক তরুণ-তরুণী এরকম নানা সমস্যা নিয়ে আমাদের কাছে আসেন। এসব অভিজ্ঞতা থেকে প্রাপ্ত কিছু মৌলিক চিন্তাধারা নিয়ে এখন কথা বলব। আপনার অথবা আপনার পরিচিত কারও সাথে এসব কথা মিলে যেতে পারে।

আমরা কতটুকু মানসিক প্রশান্তিতে থাকব তার অনেকখানি নির্ভর করে আমরা কীভাবে ভাবছি বা একটা বিষয় নিয়ে আমার বিশ্লেষণ কী অথবা আমার চিন্তার ধরনটা কী রকম। যে ছেলেটি সারাক্ষণ বন্ধুদের সাথে ঝগড়া, পরিবারের সাথে রাগারাগি নিয়ে সাঙ্ঘাতিক মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তার কথাই ধরা যাক। তার চিন্তাধারার মূলে কী আছে, তা আলাপের মাধ্যমে বোঝা গেল।

“আমি যা চাই তা-ই পেতে হবে,

আমি যা ভাবছি তা-ই সঠিক,

আমার প্রিয়জন আমার মতো চলবে,

আমার প্রিয়জন আমার কথা শুনবে। কারণ আমি তার ভালো চাই,

আমি তাকে বারবার ফোন করি। কারণ তার ব্যাপারে আমি খোঁজখবর রাখি।”

এগুলো তার গভীর বিশ্বাস; যা নিয়ে সে নিজেও সচেতন নয়। এই “গভীর বিশ্বাস”-গুলো অন্যদের সাথে তার কথাবার্তা এবং সম্পর্কে প্রভাব ফেলছে। অবশ্যই প্রভাবটা নেতিবাচক।

এই ছেলেটির কথোপকথনের ধরন বিশ্লেষণ করলে পর্দার আড়ালের তীব্র কিছু চাওয়া বা প্রত্যাশা বের হয়ে আসে।

আমি বললাম, “আপনি কি আপনার আপনজনকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছেন? আপনি চাচ্ছেন সে আপনার মতো চলুক! আপনি কি মনে করছেন তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হয়নি? ভালো-মন্দ বোঝার বয়স হয়নি?”

ছেলেটি খানিকক্ষণ চুপ থাকল।

“আপনার এই ‘চাওয়া’কে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? কেমন লাগবে যখন অন্য একজন আপনার কাছে ঠিক একই প্রত্যাশা করবে?”

আরও কিছুক্ষণ চুপ থাকার পরে তিনি বললেন, “আসলে এভাবে আগে চিন্তা করিনি। আমার এই চাওয়াটা ঠিক না। আমি তাকে পরামর্শ দিতে পারি, সাপোর্ট করতে পারি, কিন্তু তার সবকিছুই যে আমার মতো করে হতে হবে, তা ঠিক না। সবারই একটা নিজস্বতা আছে। অতিরিক্ত কেয়ারিং করতে গিয়ে আমি অন্যের নিজস্বতাকে দাম দিচ্ছি না। আমার কেয়ারিং অন্যের জন্য আসলে যন্ত্রণার হয়ে যাচ্ছে!”

আমি বললাম, “আপনি ব্রিলিয়ান্ট!”

পরিবারেই মূলত আমাদের চিন্তার এই ত্রুটিটি গড়ে ওঠে। মা-বাবারা কখনোই মেনে নিতে চান না তাদের সন্তান বড় হয়েছে। বড় ভাই মনে করে, বোনের দুনিয়া সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই, সে কীভাবে নিজের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে? আমি বা আমরাই তাদের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি।

হ্যাঁ, আপনারা হয়তো পারেন আবার না-ও পারেন। কিন্তু আপনাদের এই চাওয়াটা যখন দাবিতে পরিণত হয়, তখনই সমস্যা দেখা দেয়। প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের নিজের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার শতভাগ অধিকার রয়েছে। কেননা, ভালো হোক, মন্দ হোক সিদ্ধান্তের ফলটা শতভাগ তাকেই ভোগ করতে হয়। আমাদের আপনজনেরা সেটাকে স্বীকার করতে চান না। এভাবেই চলে আসে নিয়ন্ত্রণ করা, নিজের মত চাপিয়ে দেওয়া, জোর বা জেদ করার মতো ঘটনা। এগুলো একজন মানুষের মানসিক শান্তি বিনষ্ট করার জন্য যথেষ্ট।

মানসিক প্রশান্তি বিনষ্ট করে সামনের পথচলা রুদ্ধ করে এরকম আরও কিছু ভ্রান্ত চিন্তা আমাদের অনেকের মধ্যে আছে।

১। হয় হরি, নয় দেশান্তরি বা সাদাকালো চিন্তা

এ-প্লাস পেলেই ভালো, নইলে গেল। সুন্দর মানেই ফর্সা মুখ, লম্বা দেহ। এর বাইরে সব জঘন্য।

এরকম হাজারো চিন্তার ধরন দেখা যায় আমাদের মধ্যে। সবকিছুকেই দু’টি চূড়ান্ত মেরুতে নিয়ে চিন্তা করি। মাঝামাঝি কোনো বিকল্প মাথায় আসে না।

২। ঘটনার অতি-সরলীকরণ

একটা লেখা জমা দিয়েছেন, সম্পাদক তা বাতিল করে দিলেন। আপনি ধরে নিলেন, আপনি লিখতে পারেন না। আপনার দ্বারা লেখা সম্ভব না। প্রিয় মানুষটা আপনার দিকে তাকাল কিন্তু হাসল না, আপনি ধরে নিলেন সে আপনার প্রতি মারাত্মক রেগে আছে। এরকম আরও কত-শত অভিজ্ঞতা আমাদের আছে, তাই না?

এটা খুব খারাপ চিন্তার ধরন। এরকম চিন্তা আপনাকে সব সময় পেছনে টেনে ধরবে।

৩। শুধু খারাপটাই চোখে পড়ে

ক্লাস টুয়ের এক বাচ্চা ২০টির মধ্যে ১৮টি বানান সঠিক লিখেছে। দুইটা ভুল। সেই দুইটা ভুলের জন্য তার মা অকথ্য ভাষায় বকাঝকা শুরু করল। এত পড়াই, এত পয়সা খরচ করি, তারপরও ভুল…

এরকম চিন্তা, মানুষকে ভালোটা দেখতে বাধা দিয়ে শুধু মন্দটাকে নির্দেশ করে। রাস্তাঘাটে, হাটে-বাজারে কিংবা কোনো আড্ডায় খেয়াল করবেন, নতুন কিছু সামাজিক উদ্যোগ হয়তো সরকার বা অন্য কেউ নিয়েছে। মানুষ বলা শুরু করবে, “হুঁ, কত দেখলাম। দু’দিন পরে কই যাবে। দুর্নীতির আরেক ক্ষেত্র তৈরি হলো। এই মেয়র কী করবে, কেউ কোনোদিন কিছু করতে পেরেছে?”

৪। মন পড়ে ফেলা টিয়া পাখি

Confidence, development, growth, self, thinking, আত্ম-উন্নয়ন, আত্মবিশ্বাস, উন্নতি, চিন্তা, ভাবনা

“সাহানা চৌধুরীর কাছে গিয়েছিলে, তোমাদের প্রজেক্টের ব্যাপারে আলাপ করতে?”

“গিয়ে কী হবে? উনি তো দেখেই না করে দেবেন।”

এ ধরনের চিন্তাও বেশ দেখা যায়। অন্যেরা কী মনে করছে বা করবে তা আমরা আগে থেকেই বলে দিই। আসলে তা বলা বেশ কষ্টসাধ্য। অথচ আমরা এই কঠিন কষ্টের কাজটা অবলীলায় করে ফেলি। তারপর সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাই। ভয়ানক অস্বাস্থ্যকর ব্যাপার!

৫। সাঙ্ঘাতিক অতিরঞ্জিত করে চিন্তা করা

ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে দুই দল ছাত্রের সংঘর্ষ হচ্ছে। এক ছাত্র হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বলল, রক্তারক্তি মারামারি চলছে। এতক্ষণে তিন-চারটা লাশ পড়েছে নিশ্চিত। আমি খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, তেমন কিছুই না। হালকা ধাওয়া-পালটা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

চিন্তার এই ত্রুটিগুলো ক্ষতিকারক ভাইরাসের মতো আপনার উন্নতি স্তিমিত করে দেবে

এভাবে প্রায় আমরা কোনো ঘটনাকে এমন ভয়ানকভাবে চিন্তা করি, দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। পাবলিক ভার্সিটিগুলোতে কিছু হলে এটা বেশি দেখা যায়। সাধারণ জনগণ ধরেই নেয়, এগুলোতে শুধু মারামারি, কাটাকাটি হয়, পড়ালেখার প-ও নাই। নিজে নিজেও আমরা এরকম ভয়ানক চিন্তা করি। ভাইভা দিতে যাব, না জানি কী ভয়ানক কিছু হবে! নিজেকে গুটিয়ে রাখি। ফলাফল প্রতিযোগিতা করার আগেই হেরে বসে থাকা।

৬। তকমা লাগিয়ে দেওয়া

ক্লাসে আসতে পাঁচ মিনিট দেরি হলো। স্যার বলে বসল, তুমি একটা ‘অলস।’ ছাত্র ভাবল, আসলেই সে অলস! তার দ্বারা সময়মতো আসা সম্ভব না। অফিসের কাজে সামান্য ভুল হলো, বস বলে বসল, আপনি কি ঘাস খান? ‘গাধা’র মতো কাজ করেছেন।

এরকম ঘটনায় ব্যক্তি আর তার কাজকে পার্থক্য না করে একটা তকমা লাগানো হয়। মানুষটা বুঝতে পারে না, কোন জায়গায় উন্নতি করতে হবে। ধরেই নেয়, সে গাধা, অলস, ছাগল। ফলে আত্মবিশ্বাস কমে যায়। কাজেরও মান খারাপ হতে থাকে।

৭। ভবিষ্যৎ বলে দেওয়া

মন পড়ার মতো কথায় কথায় ভবিষ্যৎ বলে দেওয়াটাও একটা ত্রুটিপূর্ণ চিন্তা। আমার এক বন্ধুকে যে উদ্যোগ নিতে বলি, সে বলে দেয়, না, এটা হবে না। প্রতিবার চাকরির ফরম তোলে কিন্তু পরীক্ষার দিন আর হলে যায় না। জিজ্ঞেস করি, কী হয়েছে? না, আমার দ্বারা হবে না। প্রশ্ন কঠিন হবে। আমি বলি, প্রশ্ন না দেখে কীভাবে তুই ধরেই নিলি পারবি না? এরকম অনেককে চিনি, যারা ১২ বছর ধরে ঠিক একই জায়গায় স্থির আছে। শরীর স্বাস্থ্য বেড়েছে, কিন্তু মানসিক উৎকর্ষ আসেনি।

৮। সবকিছুই নিজের গায়ে মাখা

আমি যখন ভিখারী হই, দেশে তখন আকাল পড়ে। এই প্রবাদটি এরকম চিন্তার মানুষদের বেলায় প্রযোজ্য। কোনো কিছু ঘটলে, তারা ধরে নেয় তার জন্য নিজেরা কোনো না-কোনোভাবে দায়ী। কোনো বাছবিচার না করেই নিজের গায়ে মেখে নেয়।

চিন্তার এই ত্রুটিগুলো ক্ষতিকারক ভাইরাসের মতো আপনার উন্নতি স্তিমিত করে দেবে। তাই জীবনে সফল হওয়ার জন্য যত দ্রুত সম্ভব এই ভাইরাসগুলো শনাক্ত করে ডিলিট করুন।

এই লেখাটি নেয়া হয়েছে লেখকের “মানসিক প্রশান্তি আর মর্যাদাপূর্ণ জীবনের জাদুকাঠি” বইটি থেকে। বিশেষ ছাড়ে বইটি কিনতে চাইলে চলে যান এই লিংকে!

এই লেখাটির অডিওবুকটি পড়েছে লুবাবা জারিন অহনা

What are you thinking?