পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জেলখানা!

বছর কয়েক আগের কথা, হঠাৎ একদিন বাংলাদেশের জেলখানা নিয়ে একটা বিজ্ঞাপন চোখে পড়লো। মানে জেলখানার ভিতর কয়েদীরা কীভাবে থাকে কী করে এইসব নিয়ে। আমি তো দেখে অবাক। আগে জানতাম বিজ্ঞাপন দেখানো হয় কোনো জিনিসের বেশি বেশি করে প্রচার চালিয়ে মানুষকে সেইটার প্রতি আকৃষ্ট করতে। তা জেলখানার বিজ্ঞাপন দেখে কি মানুষ জেলখানায় যেতে চাইবে? এই কথাটা মনে করে সেইসময় বেশ একটু হেসেওছিলাম বলে আমার মনে আছে। তবে, এটা কি জানো যে পৃথিবীতে এমন কিছু জেলখানা আসলেই আছে যেখানকার কয়েদীদের জীবনযাপন দেখে মনে হয় আসলে তারা সাজাপ্রাপ্ত অপরাধী না, বরং ছুটি কাটাতে আসা একদল মানুষ? শুনতে অবাক লাগলেও কথাটা কিন্তু সত্যি। পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জেলখানা বলা হয়ে থাকে ‘বাস্তয় জেলখানাকে’। আসো, জেনে নেওয়া যাক এই জেলখানা সম্পর্কে কিছু কথা।

অবস্থান

তোমরা কি জানো, পৃথিবীর সবচেয়ে মানবিক দেশ বলা হয় কোন দেশগুলোকে? উত্তরটা হচ্ছে স্ক্যান্ডানেভিয়ার কিছু দেশ। সবচেয়ে সুন্দর জেলখানাটাও যে এই দেশগুলোর মধ্যে কোনো একটাতেই হবে সে আর আশ্চর্য কী! বাস্তয় জেলখানার অবস্থান নরওয়েতে। নরওয়ের রাজধানী অসলো থেকে ৭৫ কিলোমিটার দক্ষিণে ২.৬ বর্গকিলোমিটারের ছোট্ট একটা দ্বীপে এই জেলখানার অবস্থান। আসলে দ্বীপে অবস্থান না বলে বলা উচিত পুরো দ্বীপটাই জেলখানা। জেলখানার নামও এই দ্বীপের নামেই।

প্রশাসনিকভাবে এই দ্বীপটার অবস্থান হরটন পৌরসভার মধ্যে। ভূখণ্ডে যাতায়তের জন্য আছে নিজস্ব ফেরিঘাট আর ফেরির ব্যবস্থা।

দারুণ সব লেখা পড়তে ও নানা বিষয় সম্পর্কে জানতে ঘুরে এসো আমাদের ব্লগের নতুন পেইজ থেকে! The 10-Minute Blog!

ইতিহাস

আজকে বাস্তয়ের যে খ্যাতি তা কিন্তু সবসময় ছিল না। বরং একটা সময় এই দ্বীপ ‘কুখ্যাত’ হিসেবেই পরিচিত ছিল। ১৯০০ সালে এই দ্বীপে একটা কিশোর সংশোধনাগার তৈরি করা হয়। সেই কিশোর সংশোধনাগারের নিয়ম-কানুন এতই কড়া ছিল যে বছর কয়েক পরে সেখানে আটক থাকা ছেলেরা প্রশাসনের বিরুদ্ধে একরকম বিদ্রোহই করে বসে। এই ঘটনা ১৯১৫ সালের। সেই বছরের ২০ মে তারিখে ৩০-৪০ জন ছেলে তাদের নির্ধারিত কাজ করতে অসম্মতি জানায়। তারপরে দ্বীপে ব্যবহৃত কৃষিকাজের বিভিন্ন সরঞ্জাম নিয়ে দ্বীপজুড়ে দাঙ্গা বাঁধিয়ে দেয়। এইদিকে জেলখানা বলতে আমরা যা বুঝি বাস্তয় তখন সেইরকম কিছু ছিল না। বরং অপরাধে জড়িয়ে পড়া কিশোরদের সংশোধনের জন্য স্কুল হিসেবেই বাস্তয় পরিচিত ছিল। ফলে এই বিদ্রোহ থামানোর মতো পর্যাপ্ত গার্ডও ছিল না দ্বীপে। এই সুযোগে বিদ্রোহীরা দ্বীপের টেলিফোন লাইন কেটে একটা শস্যাগারেও আগুন ধরিয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি সামলাতে মূল ভূখণ্ড থেকে ডাকতে হয় সেনাবাহিনীকে। সেনাবাহিনীর সাহায্যেই দমন করা হয় বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহের ঘটনা নিয়ে নরওয়েজিয়ান ভাষায় ‘King of Devil’s Island’ নামে একটা সিনেমাও তৈরি হয়েছে। তোমরা চাইলে সেইটা দেখে ফেলতে পারো।

তবে, এই অভ্যুত্থানের পরেও যে এই সংশোধনাগারের শৃঙ্খলার কড়াকড়ি খুব পাল্টেছিলো তা না। ১৯৫৩ সালে নরওয়ে সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সংশোধনাগারটা অধিগ্রহণের আগে পর্যন্ত বাস্তয় চলেছে আগের মতোই। পরবর্তীতে ১৯৭০ সালে নরওয়ে সরকার এই সংশোধনাগারটা বন্ধ করে দেয়। এরপরে ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আজকের বাস্তয় জেলখানা।

ঘুরে আসুন:  ৮টি অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ কাজকে করবে আরো সহজ!

জেলখানার বর্ণনা

একটা গ্রামের কথা চিন্তা করলে আমাদের কল্পনায় কী ভাসে? ছড়ানো-ছিটানো ছিমছাম কিছু বাড়ি-ঘর, দুই-একটা দোকান, হয়তবা একটা স্কুল, বিশাল মাঠের মধ্যে কিছু গরু-ছাগল চড়ে বেড়াচ্ছে, এইতো! এখন কল্পনাটা যদি এই দেশের গ্রাম থেকে সরিয়ে ইউরোপের কোনো গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয় তাও দৃশ্যপট কিন্তু খুব একটা পাল্টাবে না। নতুন বলতে হয়ত গ্রামের ঠিক মধ্যিখানে চলে আসবে একটা চার্চ, দেশে যেখানে মাঠে চড়ে বেড়াতো ছাগল সেইখানে হয়ত চড়বে ভেড়া আর গরুর গাড়ির জায়গা নিয়ে নিবে ঘোড়ায় টানা গাড়ি। বাস্তয় জেলখানা দেখতে ঠিক এরকমই, যতটা না জেলখানা তারচেয়ে বেশি ছোট একটা গ্রাম। দ্বীপজুড়ে ছড়িয়ে আছে কিছু কাঠের কটেজ, এই কটেজগুলোর বাসিন্দা সাজাপ্রাপ্ত আসামিরাই। এদের কেও এখানে এসেছে খুনের দায়ে, কেওবা ধর্ষন বা চোরাচালানের মতো অপরাধের শাস্তি ভোগ করতে। জেলখানা মানেই যে কয়েক বর্গফুটের এক প্রকোষ্ঠ, এই নীতিতে বাস্তয় বিশ্বাসী না। সেইজন্য কটেজের চাবি থাকে বন্দিদের কাছেই, সুযোগ আছে নিজের কটেজকে পছন্দমতো মতো সাজিয়ে নেওয়ারও। আর যারা কটেজ পায় না তাদের জায়গা হয় ‘দ্য বিগ হাউজ’ নামে এক অট্টালিকায়, প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে যেটাকে জেলখানার চেয়ে কোনো এক কলেজের ডর্মেটরি বলেই বেশি মনে হয়।

জেলখানার জীবন

পৃথিবীর বেশিরভাগ জেলখানায় কয়েদীদের চলতে ঘড়ি ধরে, কাজ করতে হয় জেল কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুযায়ী। সুযোগ নাই এক চুল এদিক-ওদিক হওয়ার। বাংলাদেশের জেলখানার যে বিজ্ঞাপনটার কথা বললাম সেখানে জেলখানাকে যত ভালোভাবেই দেখানোর চেষ্টা করা হোক না কেন জেলের এই বাঁধাধরা নিয়মের বাইরে সেইটাও যেতে পারে নাই। এইখানেই বাস্তয় অনন্য। শৃঙ্খলার মধ্যে রেখেও কীভাবে কয়েদীদের স্বাধীনতা দেওয়া যায় সেইটাই দেখিয়ে দিয়েছে বাস্তয়। এখানে প্রতিদিন সকাল সারে ৮টায় কাজে যোগ দিতে হয় ঠিকই, কাজ করেও যেতে হয় সারে ৩টা পর্যন্ত; কিন্তু কী কাজ? এইখানেই বাস্তয় কয়েদীদের দেয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ। কেও হয়ত কাজ করছে মাঠে, তৈরি করছে বাগান। আবার কেওবা সাইকেল সারাইয়ের কাজ করছে। কেও কাঠ কাটছে, কিংবা ঘোড়াদের যত্ন নিচ্ছে। এমনকি বাস্তয় দ্বীপের সাথে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ রক্ষা করে যে ফেরি সেই ফেরিতেও কাজ করছে এই বন্দীরাই। এইসব কাজ কিন্তু মুফতে না, প্রতিদিনের কাজের জন্য আছে প্রায় ১০ ডলারের ভাতা। এছাড়াও প্রতি মাসে খাবার খরচের জন্য প্রত্যেক বন্দিকে দেওয়া হয় ১২৫ ডলার। এই টাকাতেই খাবার কিনে সকালের নাস্তা আর দুপুরের খাবার নিজে রান্না করে নিতে হয়। আর রাতের খাবার? সেইটা দেওয়া হয় জেলখানার পক্ষ থেকেই। যদিও রান্নার দায়িত্বে থাকে কয়েদীদের মধ্যেই কেও।

ইংরেজি ভাষা চর্চা করতে আমাদের নতুন গ্রুপ- 10 Minute School English Language Club-এ যোগদান করতে পারো! English Language Club!

এ তো গেল কাজের সময়, আর অন্যান্য সময়? সেইসময়ও আছে পছন্দমতো কাজ করার সুযোগ। বাস্তয় দ্বীপের মধ্যখানেই আছে একটা চার্চ। অবসর সময়ে কেও চাইলে সেখানে যেয়ে অংশ নিতে পারে প্রার্থনায়। আবার দ্বীপের স্কুল বা লাইব্রেরিতে যেয়ে পড়াশোনা করেও কাটিয়ে দেওয়া যেতে পারে সময়টা। আছে দ্বীপের নিজস্ব দোকানে যেয়ে কেনাকাটা করার সুযোগও। সেই দোকানও কিন্তু পরিচালনা করছে কয়েদীরাই। এইসব কাজ যারা করে তাদের উপর নজরদারির জন্য কোনো গার্ড থাকে না অনেকসময়ই। যে গার্ডরা থাকে তারাও হয় নিরস্ত্র। এমনকি এই জেলখানার গার্ডরা নিজেদেরকে গার্ড বলার চেয়ে সোশ্যাল ওয়ার্কার হিসেবে পরিচয় দিতেই পছন্দ করে, যাদের কাজ বন্দীদের চোখে চোখে রাখা না, বরং বন্দীরা যেন জেলের সময়টা শেষ করে স্বাভাবিক মানুষের মতো সমাজে ফিরতে পারে সেইটা নিশ্চিত করা।

এর বাইরেও আছে বিভিন্নরকম বিনোদনের ব্যবস্থা। দ্বীপের মধ্যেই আছে টেনিস কোর্ট, আছে মাছ ধরার সুযোগ। বা এর কোনোটাই ভালো না লাগলে সৈকতে বসে সমুদ্রের দিকে তাকিয়েও কাটিয়ে দেওয়া যেতে পারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, বাধা দিতে আসবে না কেও। সুযোগ আছে নিজের কটেজে বসে টেলিভিশন দেখারও, যদিও সেই টেলিভিশনটা নিজেরই নিয়ে আসতে হয়, কর্তৃপক্ষ দেয় না।

ঘুরে আসুন: এতগুলো মোবাইল সেন্সর কী কাজে লাগে?

এতদূর পড়ার পর তোমাদের অনেকের নিশ্চয়ই ভ্রূ কুঁচকে গেছে। ভাবছো যে জেলখানা তৈরিই তো করা হয় অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার জন্য, জেলখানায় যেয়ে যদি কেও সিনেমায় দেখানো সামার ক্যাম্পের মতো করে থাকে তাহলে তার শাস্তিটা হলো কোথায়! এইখানেই বাস্তয়সহ নরওয়ের অন্যান্য জেলখানার স্বার্থকতা। ইউরোপিয় ইউনিয়নের অন্যান্য দেশের মতো নরওয়েতেও যে কোনো অপরাধের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধ। অর্থাৎ এখানে শাস্তি বলতেই কারাবাস। কিন্তু যে অপরাধীই কারাগারে আটক থাকুক না কেন, একসময় তো সে মুক্তি নিয়ে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরবে, তাই না? এই কথাটাই নরওয়ে বলে এইভাবে – “আজকে যারা অপরাধী, কালকে তারা প্রতিবেশী”। অর্থাৎ আজকে যে মানুষটা জেলে সময় কাটাচ্ছে, সে আগামীকালকে আমার পাশের বাড়িতেও থাকতে পারে। কিন্তু একজন মানুষ যখন বছরের পর বছর জেলের প্রকোষ্ঠের মধ্যে আটকা পড়ে থাকবে তখন তার মানসিকতা অনেকটাই পালটে যায়। ফলে দেখা যায় জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরেও সে খাপ খাইয়ে নিতে পারে না সমাজে, আবার জড়িয়ে পড়ে কোনো অপরাধে। কোনো অপরাধী জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়লে সেইটাকে বলা হয়ে থাকে ‘Reoffending’। আমেরিকা ও ইউরোপে বেশিরভাগ দেশে এই রিঅফেন্ডিঙের হার প্রায় ৭০%। অনেক দেশে এই সংক্রান্ত পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না, কিন্তু হারটা কাছাকাছিই হবে বলে ধারণা করা হয়। মানে প্রতি একশজন জেলফেরত মানুষের মধ্যে সত্তরজনই আবার অপরাধে জড়িয়ে জেলে ফেরত এসেছে। কিন্তু নরওয়েতে এই হার কত জানো? মাত্র ২০%! বাস্তয়ের ক্ষেত্রে সংখ্যাটা আরো কম, মাত্র ১৬%! এইবার বুঝলা তো বাস্তয়কে কেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জেলখানা বলা হয়? বাস্তয়ে অপরাধীরা শুধু কারাবাসের সময়টাই পার করে না, জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরে সমাজে মানিয়ে নেওয়ার শিক্ষাটাও বাস্তয়ে পায় এই কয়েদীরা। এমনকি ভবিষ্যতে যেন কাজের অভাবে অপরাধে জড়িয়ে পড়তে না হয় সেই সুযোগও আছে এখানে। যাদের কারাবাসের মেয়াদ শেষের দিকে তারা দিনে বাস্তয় থেকে মূল ভূখণ্ডে যেয়ে পড়াশোনার সুযোগ পর্যন্ত পায়।

একবার যে অপরাধ করে ফেলেছে সেই ভুলের জন্য যেন তাকে সারাজীবন ভুগতে না হয়, সে যেন নিজেকে সংশোধন করে আবার ফিরতে পারে স্বাভাবিক জীবনে সেইটা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত একটা মানবিক সমাজের লক্ষ্য। আর এই উদ্দেশ্য নিয়েই নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে বাস্তয়।  

তথ্যসূত্র:-

1.     http://www.bastoyfengsel.no/English/bastoy-fengsel-Eng.html

2.     https://allthatsinteresting.com/bastoy-prison

3.      https://pulitzercenter.org/reporting/bastoy-prison-creating-good-neighbors-0

4.      https://www.weforum.org/agenda/2017/06/this-norwegian-prison-is-the-nicest-in-the-world/

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?