মিশরের শেষ রাণী ক্লিওপেট্রার জীবন থেকে নেয়া শিক্ষণীয় দিক

যখন নারী পুরুষের সমতার কথা আসে তখন অতীত পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইতিহাস সবসময়ই নারীদের পক্ষে সামান্য বৈষম্য করেছিল। এটি সম্পূর্ণরূপে পুরুষের দোষ নয়, যুগে যুগে ইতিহাস তৈরিতে নারীদের সম্পূর্ণরূপে সক্রিয় ভূমিকা পালন করার অনুমতি দেওয়া হয়নি এবং এটি-ই নিয়ম বলে বিবেচিত হয়ে আসছিল। নারীরা শেকল ভেঙে বেরিয়ে আসতে চায়নি আর পুরুষও তাদের অনুপ্রে্রণা যোগায় নি। আবার কিছু ক্ষেত্রে নারীরা ছিল নিষ্পেষিত। কিন্তু তবুও এমন কিছু নারী ছিল, যারা তাদের প্রকৃত পিতৃপুরুষের জগতে বৈষম্যের দেয়াল ভেঙ্গেছিল এবং নিশ্চিত করেছিল যে তাদের নাম স্বর্ণাক্ষরে ইতিহাসে লেখা থাকবে। তেমন-ই একজন নারী ছিলেন মিশরের রাণী ক্লিওপেট্রা।

ক্লিওপেট্রাকে মনে করা হয় সীমাহীন সৌন্দর্য আর অসীম ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে। সাধারণভাবে তিনি ক্লিওপেট্রা সপ্তম  হিসেবে পরিচিত। মেসিডোনিয়ান বংশোদ্ভূত সপ্তম মিসরীয় রানী হওয়ায় তাকে এই পরিচিতি বহন করতে হয়। তার আগে আরো ছয়জন কিওপেট্রা ছিলেন। তিনি ছিলেন টলেমী দ্বাদশের তৃতীয় মেয়ে। তিনি জন্মগ্রহণ করেন খ্রিষ্টপূর্ব ৬৯ সালে। ক্লিওপেট্রা প্রাচীন মিসর এবং ইতিহাসের এক বিস্ময়কর নাম। ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত নারী তিনি। তার সহজাত বৈশিষ্ট্য ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তাই তাকে সর্বকালের সেরা মহিলাদের কাতারে স্থান করে দিয়েছে। ইতিহাসখ্যাত এই রমণীকে ঘিরে রয়েছে অনেক রহস্যের জাল। মিশরের সর্বশেষ এই রানীর জীবনের বেশ কিছু শিক্ষণীয় দিক রয়েছে।

বুদ্ধিমত্তার উপযুক্ত প্রয়োগ

ক্লিওপেট্রা নিজের রাজনৈতিক অবস্থান আরও দৃঢ় করার প্রয়াসে রাজ্যে নিজের মুখাবয়ব অঙ্কিত মুদ্রার প্রচলন করেন। মিশরের প্রভাবশালী এই রানীর মুখায়বয়ব অঙ্কিত মুদ্রা ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক ছিল সে সময়ে। যদিও সে সময়ের মুদ্রায় অঙ্কিত ছবিতে ক্লিওপেট্রাকে পরমাসুন্দরী হিসেবে দেখা যায় না। তবে তার প্রসন্নভাব, স্পর্শকাতর নিখুঁত গ্রিসিয়ান মুখাবয়ব, গোলাকার দৃঢ় চিবুক, ধনুকের মতো ঢেউ খেলানো ভুরু যুগলের নিচে অদ্ভুত সুন্দর ভাসা ভাসা চোখ, প্রশস্ত ললাট আর সুতীক্ষ্ণ নাসিকার চমৎকার সমন্বয় দেখা যায়। আর সৌন্দর্যে কিছুটা ঘাটতি থেকে থাকলেও প্রখর বুদ্ধিমত্তা, যেকোনো পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নেয়ার মতো, অপরকে বশ করার সামর্থ্য তাকে তুলনাহীন করে তুলেছিল। তবে মুদ্রায় অঙ্কিত ক্লিওপেট্রার মুখাবয়বের সাথে কবি সাহিত্যিকদের বর্ণনার অপার সৌন্দর্যের মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। বরং দেখা যায় খুব সাদা-মাটা ধরনের এক নাকের অধিকারিনী রানীর ছবি।

নিজেকে সব সময় ‘বড়’ ভাবা

ক্লিওপেট্রা নিজেকে দেবতা- দেবীদের সমতুল্য মনে করতেন। তিনি নিজেই অনেক নীতি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যেসবের কিছু কিছু এখনো মিশরে প্রচলিত আছে। রাজ্যের শাসনভার পাবার পর থেকেই ক্লিওপেট্রা মনোনিবেশ করেছিলেন কীভাবে মিশরকে আরও উন্নত করা যায় এবং শক্তিশালী জনবল তৈরির দিকে মনোযোগ দেন।

তিনি আমাদের নারীদের দেখিয়েছেন যে, আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে এবং একসঙ্গে চাইলেই একযোগে অন্যদের সেবা করতে পারি। নারী হিসাবে আমরা রক্ষক ও শাসক হতে পারি।

ভয়কে জয় করা

ক্লিওপেট্রার একটি বিখ্যাত উক্তি আছে-

“Don’t be afraid your life will end; be afraid that it will never begin.”

খ্রিস্টপূর্ব ৪৪ অব্দে যখন সিজারকে হত্যা করা হয়েছিল, তখন ক্লিওপেট্রা একা-ই মিশর জয়ের জন্য এগিয়ে গিয়েছিলেন। অক্টোভিয়ানের সাথে একত্রিত হয়ে মার্ক এন্টনির বিরুদ্ধে মিশর জয়ের জন্য কুরুক্ষেত্রে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তিনিই প্রথম নারী ছিলেন যিনি নৌবহর নিয়ে সমুদ্রে যুদ্ধ করেন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে স্বয়ং উপস্থিত থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করেন।

ক্লিওপেট্রার চরিত্রের এই কঠোর ও উচ্চাভিলাসী দিকটি থেকে অনেক শিক্ষণীয় দিক রয়েছে। এমন অনেক সময় আপনার জীবনে থাকবে যেখানে আপনার অভিষ্ট অর্জনের জন্য আপনার কঠোর লড়াই করতে হবে, কিন্তু আপনি যদি না করেন তবে আপনার জায়গায় অন্য কেউ করবে; আর আপনি পিছিয়ে পড়বেন। পূর্বের লোকেরা কী করেছে বা কোনটি সঠিক বলে বিবেচিত হয়েছে তার দ্বারা নিজেকে সীমাবদ্ধ করবেন না। ক্লিওপেট্রা যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে গিয়েছিল, যেখানে কোন মহিলা পূর্বে সমুদ্রপথে যুদ্ধ করেনি। যদি আপনার লক্ষ্য অর্জন প্রয়োজন হয়, তবে শুধু সেটি-ই ফোকাস করুন। লোকে কী ভাববে তা ভেবে পিছিয়ে যাবেন না।

কালজয়ী উপন্যাস ও চরিত্রসমূহের কেন্দ্রবিন্দু

রানী ক্লিওপেট্রা স্বল্প সময়েই একের পর এক নাটকীয় ঘটনার সৃষ্টি করেন। সে যুগের কোনও পুরুষের পক্ষেও যে ধরনের কাজ করা ছিল প্রায় অসম্ভব, তিনি সেসব কাজগুলি বিনাবাধায় করেন। অপ্রচলিত কাজগুলো করে নিজের অবস্থান পৃথিবীর বুকে প্রতিষ্ঠা করে রেখে যাওয়াটাও তার সে কাজগুলো করার পেছনের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল। নিজের পদচিহ্ন প্রতিষ্ঠা করতে হলে সব সময় ভিন্ন কিছু করতে হয়। আর দশজন যা করলো আপনিও যদি তা-ই করেন তাহলে আপনি মারা যাবার পর মানুষ আপনাকে মনে রাখবে কেন?

বিশ্ববিখ্যাত অনেক সাহিত্যিকই তাকে নিয়ে কালজয়ী উপাখ্যান রচনা করেছেন। এগুলোর মধ্যে আছে উইলিয়াম শেক্সপিয়রের ‘অ্যান্টনি অ্যান্ড ক্লিওপেট্রা’, জর্জ বার্নাড শ’র ‘সিজার ক্লিওপেট্রা’, জন ড্রাইডেনের ‘অল ফর লাভ’, হেনরি হ্যাগার্ডের ‘ক্লিওপেট্রা’। মূলত তার চরিত্রের দৃঢ়তা ও মনোবলই তাকে সে সময়ের অবিসংবাদিত নেত্রীর চরিত্রে উপনীত করেছিল।

বহুমূখী প্রতিভা (ভেষজ বিদ্যায় পারদর্শীতা)

ঐতিহাসিকরা বলেন, ক্লিওপেট্রা চিকিৎসাশাস্ত্র, অ্যালকেমি প্রভৃতির ওপর বই লিখেছিলেন। তাঁর অসংখ্য বিদ্যার মাঝে একটি ছিল ভেষজ বিদ্যা। এই ভেষজ জ্ঞান তিনি ব্যবহার করতেন তাঁর রূপচর্চাতেও। তাঁর আবিষ্কৃত সৌন্দর্য চর্চার নানান পদ্ধতি আজো ব্যবহৃত হয়। মুখের মাখার ক্রিমও তিনিই প্রথম তৈরি করেন। ২ টেবিল চামচ অ্যালোভেরা জুস, ৪ ফোঁটা গোলাপের তেল, ১ টেবিল চামচ বাদামের তেল, মৌচাকের মোম মিশিয়ে তৈরি হতো তার সেই ফেস ক্রিম; এখনও যা সৌন্দর্য চর্চায় অনবদ্য একটি উপাদান। তিনি প্রসাধন শিল্পকে পুরোহিতদের চিরায়ত প্রথা থেকে উন্নত করে চিকিৎসা বিদ্যার কাছাকাছি নিয়ে গিয়েছিলেন।

আপনার যদি কোনো সুপ্ত প্রতিভা থাকে তা নিয়ে কাজ করুন এবং কর্মে প্রতিফলন করুন। সুপ্ত প্রতিভা নিয়ে ব্রাজিলিয়ান এক লেখকের একটি  বিখ্যাত উক্তি মনে পড়ে গেল। তিনি একবার তার কোনো এক বইয়ে লিখেছিলেন-

“Your talent is God’s gift to you. What you do with it is your gift back to God.”

জীবের প্রতি ভালোবাসা

ক্লিওপেট্রা সাপ ভালোবাসতেন। এমনকি রাজপ্রাসাদে বিষমুক্ত পাইথনও রাখতেন তিনি। পাইথন ছাড়াও আরও অনেক ধরনের সাপ তার সংগ্রহে ছিল। তার শাসনামলে পশুপাখি নিধন অপরাধ হিসেবে গণ্য হত। সে সময় উচ্চবংশীয় মানুষদের প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা বা দুর্বলতা দেখা যেত। এটি অনেকটা আভিজাত্য বলে অভিহিত করা হত।

মিসরের রানী ক্লিওপেট্রার মৃত্যু রহস্য নিয়ে নানা কাহিনী প্রচলিত। সব কল্পকাহিনীর মধ্যে সাপের কামড়ে রানীর মৃত্যু হয়েছে এ যুক্তি ক্রমেই সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে গবেষকরা সাপের কামড়ে রানীর নিহতের তত্ত্বকে অবাস্তব বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। প্রচলিত ছিল, বাইরে থেকে রানীর জন্য আনা কোনো ঝুড়ির মধ্যে লুকানো সাপের কামড়েই রানী ও তার দাসীর মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু গবেষকরা বলেন, মিসরে যে ধরণের সাপ প্রচলিত আছে, যেমন কোবরা বা ভাইপার, এগুলো এত বড় যে ঝুড়ির মধ্যে লুকিয়ে থাকতে পারে না বা ছোবল দেওয়ার আগে কারো চোখে পড়বে না। আবার, রানী ও তার দুই দাসী, মোট তিনজনকে পর পর ছোবল দেওয়ার মত স্বভাব এসব সাপের নেই। গোখরো অবশ্যই বিষধর সাপ এবং গোখরোর ছোবলে মৃত্যুও সম্ভব, কিন্তু সেই মৃত্যু আরও ধীরে ঘটে থাকে। কাজেই একের পর এক ক্লিওপেট্রা ও তার দুই দাসী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। কাজেই ক্লিওপেট্রার মৃত্যুর কারণ রহস্য-ই থেকে গেল।

ক্লিওপেট্রার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মিসরে প্রায় ৩০০ বছরের মেসিডোনিয়ান শাসনের অবসান ঘটে। তিনি ছিলেন মিশরের শেষ রানী। অতি স্বল্প আয়ুর এই বিখ্যাত রানীর শাসনকাল অতি সংক্ষিপ্ত হলেও তার জৌলুসপূর্ণ শাসনামলের কথা পৃথিবী যুগে যুগে স্মরণ করবে।

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?