যে ২০টি ভুলে আপনার ই-মেইল গুরুত্ব হারাবে

পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবারে শুনে নাও!

 

আমাদের জীবনে যোগাযোগের একটা বড় অংশ হচ্ছে ই-মেইল। বর্তমান বিশ্বে, প্রতিদিন গড়ে ২০০ বিলিয়ন ই-মেইল আদান প্রদান করা হয়। তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে আমরা সবাই কমবেশি ই-মেইল ব্যবহার করলেও, আমাদের মাঝে অনেক কম মানুষই এর সঠিক ব্যবহারটা জানি তবে দোষটা অবশ্য আমাদেরও না, কারণ আমাদের ছোটবেলা থেকে চিঠি এবং দরখাস্ত লেখার আদবকেতা শেখানো হলেও শেখানো হয়নি ই-মেইল লেখার আদবকেতা।

আমরা সবাই জানি যে, ফেসবুকের টেক্সট কিংবা মোবাইলের টেক্সট যোগাযোগের খুবই ইনফরমাল একটি মাধ্যম। আবার আমরা এও জানি যে, কাগজে লেখা দরকারি কাগজগুলো হতে হয় খুবই ফরমাল। তাহলে ই-মেইলকে কোন ভাগে ফেলা উচিত? ফরমাল না ইনফরমাল? এই দ্বিধা যেন আমাদের ই-মেইলিং- কোনো ব্যাঘাত না ঘটাতে পারে সেজন্য আমাদের জেনে রাখা উচিত ই-মেইল করার সময় আমরা সচরাচর করে থাকি এমন কিছু কাজের মাঝে কোনগুলো করা একদমই উচিত নয়।

দারুণ সব লেখা পড়তে ও নানা বিষয় সম্পর্কে জানতে ঘুরে এসো আমাদের ব্লগের নতুন পেইজ থেকে!

১। অস্পষ্টভাবে বিষয় লেখা

আমরা বেশিরভাগ মানুষ ই-মেইলের বিষয়ের ঘরটা খালিই রেখে দিই। যারা লিখি, তারাও এমনভাবে লিখি যাতে করে প্রাপকের কাছে ই-মেইলটির মূল বিষয় অস্পষ্টই থেকে যায়। যেমন, একবার আমাদের এক লেকচারারই দেখিয়েছিলেন, তার কাছে একটা মেইল এসেছে তার বিষয়টা হচ্ছে, “Email to meet”- যা দেখে প্রাপক কখনোই একবারে ধরতে পারবে না ই-মেইলটি কী বিষয়ে পাঠানো হয়েছে।

প্রথমত, বিষয়ে অপ্রয়োজনীয় অংশ বাদ দিতে হবে। এরপর এক লাইনে যতটা সম্ভব, প্রাপককে ই-মেইলের বিষয়বস্তু সম্পর্কে ধারণা দিয়ে দিতে হবে। মনে রাখবেন, আপনার প্রাপক ব্যস্ত। তার সময় নেই আপনার পুরো মেইলটি পড়ার আর ই-মেইলের বিষয়টাই হচ্ছে আপনার সম্পর্কে প্রাপকের ফার্স্ট ইম্প্রেশন।

২। নিজের পরিচয় না দেয়া

যেমনটা বললাম, আপনার প্রাপক ব্যস্ত। সে হয়ত আপনাকে মনেই রাখেনি, আবার আপনার যে তাকে ই-মেইল করার কথা ছিল তাও হয়ত তার মাথায় নেই আর। এজন্য, ই-মেইলের শুরুতেই নিজের পরিচয় দিন। আপনি কে, প্রাপককে কীভাবে চেনেন তা বলুন। এরপর কী নিয়ে লিখছেন, কেন লিখছেন, তা বলে নিন। না হলে শুরুতেই প্রাপক বিরক্ত হবে।

৩। ‘Urgent’ অপশনের অপব্যবহার

আমি যখন অনেক ছোট ছিলাম, নতুন নতুন শিখলাম যে ফোনে আর্জেন্ট টেক্সট পাঠানো যায়। এরপর আর কী! ইচ্ছামত সবাইকে, বিশেষ করে বাবাকে আর্জেন্ট টেক্সট পাঠানো শুরু করলাম। আর বাবাও বারবার একেকটা টেক্সট দেখত আর ভড়কে যেত। কিন্তু এখন তো আমরা আর ছোট নেই, আর ই-মেইলের প্রাপকও আমাদের বাবার মত না। তাই আপনি যদি সাধারণ ইমেইলও আর্জেন্ট ই-মেইল হিসেবে পাঠান তাহলে আপনি শুধু শুধু প্রাপকের বিরক্তির কারণ হবেন।

ডেডলাইন, শর্ট নোটিস কিংবা জরুরি রিমাইন্ডার বাদে আর কোনো ইমেইল আর্জেন্ট ই-মেইল হিসেবে পাঠানো ঠিক না। সব মেইল আর্জেন্ট হিসেবে পাঠালে পরে আবার রাখালের মত আপনার আসল আর্জেন্ট মেইলই পাত্তা পাবে না।

৪। অতিরিক্ত বড় ফাইল পাঠানো

এ্যাটাচমেন্টটা যতটুকু সম্ভব, ততটুকু ছোটই যেন হয়। বড় ফাইল ডাউনলোড করা খুবই বিরক্তিকর আর তা প্রাপকের ডিভাইসের স্পেসও নষ্ট করে। এর চেয়ে বরং বড় ফাইলকে কম্প্রেস করে পাঠান। জিপ ফাইল ব্যবহার করলে অনেক সময় তা সিকিউরিটির কারণে আটকে যায়, তাই তা ব্যবহার না করাই ভাল। ওয়ার্ড, এক্সেল এবং এক্সেস ফাইল গুগল ডক, এক্সেল এবং এক্সেসের মাধ্যমে পাঠানো যায়।

ঘুরে আসুন: Communication Skill গড়ে তোলার সহজ উপায়!

৫। ব্যক্তিগত তথ্য ই-মেইলে জানতে চাওয়া

ব্যক্তিগত কিংবা স্পর্শকাতর অনেক তথ্য প্রাপক ই-মেইলের মাধ্যমে দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। তাই ই-মেইল কখনোই এসকল বিষয়বস্তু সম্পর্কে জানার জন্য একটি উপযোগী মাধ্যম নয়। শুধু যে প্রাপকেরটা জানতে চাইবেন না তাই নয়, বরং নিজের দিক থেকেও ই-মেইলে এধরনের তথ্য সরবরাহ করা থেকে বিরত থাকুন। এতে করে প্রাপক অস্বস্তির শিকার হতে পারে।

৬। অনুপযোগী কথা

আপনি যদি মনে করে থাকেন যে ই-মেইল একদম পার্সোনাল, আপনি প্রাপককে যা বলবেন তা প্রাপক পর্যন্তই থাকবে তবে আপনি ভুল ভাবছেন। ই-মেইলের মাধ্যমে যেকোনো কথা অনেক তাড়াতাড়ি ছড়াতে পারে। তাই যেকোনো ধরনের অনুপযোগী কথা বলার আগে আরেকবার ভেবে নিন।

৭। CC এবং BCC এর ভুল প্রয়োগ

আমরা যখন একসাথে অনেক মানুষকে ই-মেইল করি, তখন এই দু’টির একটি অপশন ব্যবহার করে থাকি। CC অর্থাৎ Carbon Copy করলে, সেই প্রাপককে অন্যকোনো প্রাপক দেখতে পারবে, আর BCC অর্থাৎ Blind Carbon Copy করলে হবে তার উল্টোটা।

তাই কখনো CC করতে গিয়ে ভুলে BCC করলে, শুধু শুধু একজন প্রাপকের কাছে আরেকজনের নাম চলে যাবে যা আপনার ভাবগাম্ভীর্যতাও নষ্ট করতে পারে এবং অন্যরা এই ধারণা করতে পারে যে আপনি প্রাইভেসি রক্ষা করতে জানেন না। ই-মেইলের সাথে সম্পর্কিত নয় এমন থার্ড পার্টিকে CC-তেও যুক্ত করা ঠিক না।

৮। গ্রামাটিকাল মিস্টেক

ই-মেইলকে ইনফরমাল মনে করে আমরা অনেক সময়ই গ্রামাটিকাল মিস্টেকগুলো গা করি না। কিন্তু মনে রাখবেন, আপনার লিখিত প্রতিটা বাক্য আপনাকে উপস্থাপন করে। ই-মেইলে গ্রামাটিকাল মিস্টেক দেখলে প্রাপকের আপনার সম্পর্কে বাজে ধারণার সৃষ্টি হবে।

৯। ট্রেইলসহ ই-মেইল করা

আপনি যখন ই-মেইলের রিপ্লাই দেন কিংবা আরেকজনকে মেইল ফরোয়ার্ড করেন, খেয়াল করলে দেখবেন তাতে কে কবে কত তারিখে কী পাঠিয়েছে- সব লেখা থাকে যার ফলে মেইলটা দেখতে একদম ফরমাল আর ভাল দেখায় না। তাই ফরোয়ার্ড কিংবা রিপ্লাই দেয়ার আগে ই-মেইলের প্রিভিয়াস ট্রেইলটা মুছে নিতে হবে।

১০। রাগান্বিত ই-মেইল পাঠানো

অনেক সময় আমরা অনেক রাগের কারণে কাউকে খারাপভাবে মেইল করে দেই। এর থেকে কখনো সুফল পাওয়া যায় না। তাই অনেক রেগে গেলে ই-মেইল সাথে সাথে সেন্ড না করে বরং ড্রাফটে রেখে তা পরে মাথা ঠাণ্ডা হলে পড়ে দেখতে হবে, আসলেই তা পাঠানোর যোগ্য কিনা।

 

দেখে নাও আমাদের Interactive Video গুলো!

এতদিন আমরা শুধু বিভিন্ন ইন্সট্রাক্টর ভাইয়া-আপু’দের ভিডিও দেখেছি। কেমন হবে যদি ভিডিও চলার মাঝখানে আমরা কতটুকু শিখেছি সেটার উপর ছোট ছোট প্রশ্ন থাকে?
না, ম্যাজিক না। দেখে নাও আমাদের Interactive Video প্লে-লিস্ট থেকে!

১০ মিনিট স্কুলের Interactive Video!

১১। অযথা বড় ই-মেইল করা

ই-মেইল হতে হবে স্পেসিফিক এবং সংক্ষিপ্ত। আপনার প্রাপক ব্যস্ত। শুধু শুধু সৌজন্যমূলক কথা বলে তাকে বিব্রত করবেন না।

১২। সম্পর্ক অনুযায়ী শব্দের প্রয়োগ না করা

আমরা আমাদের বন্ধুকে যে ভাষায় মেইল করব, অফিসিয়াল মেইলের ভাষা অবশ্যই তার থেকে অনেক ভিন্ন হবে। ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ ই-মেইলে শর্টকাট, ইমোটিকন এবং স্ল্যাং ব্যাবহার করা উচিত না।

১৩। অসময়ে ই-মেইল করা

অসময়ে ই-মেইল করা দুই রকমের হতে পারে। প্রথমত, আমরা জানি যে মেইল যে সময়ই করা হোক না কেন, ডিভাইসে নেট কানেক্ট করার আগ পর্যন্ত প্রাপক তা পাবে না। কিন্তু তাই বলে রাত ২টায় কিংবা ভোর ৫টায় মেইল পাঠানো যাবে না। এতে করে প্রাপকের সামনে আপনি আনপ্রফেশনাল হিসেবে পরিচিত হবেন। ই-মেইল পাঠানোর জন্য সবচেয়ে ভাল সময় হচ্ছে অফিসটাইম কিংবা আপনার জানামতে প্রাপক যেই সময় মেইল চেক করে।

এতে করে আপনার ই-মেইলটি প্রাপকের চোখ এড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম। দ্বিতীয়ত, যদি ই-মেইলে কোনো ডেডলাইন দেয়া থাকে, তাহলে এমন সময় ই-মেইলটি পাঠাতে হবে যাতে করে প্রাপক ডেডলাইন মিট করার জন্য পর্যাপ্ত সময় পায়। ইলাভেন্থ আওয়ারে মেইল করা খুবই আনপ্রফেশনাল।

ঘুরে আসুন: সাবলীল বক্তা হওয়ার জন্য দশটি কার্যকরী উপদেশ

১৪। “Reply to all” অপশন অপ্রয়োজনে ব্যবহার করা

ধরে নিন, আপনার বসের প্রোমোশন হয়েছে। এজন্য সে তার পছন্দমত কিছু কর্মীকে নিজে একত্রে ই-মেইল করে ঘটনাটা জানাল। এর মাঝে আপনিও আছেন। এখন আপনি যদি শুভেচ্ছা জানিয়ে ই-মেইলের Reply অপশনে ক্লিক করেন, তাহলে শুধু আপনার বসের কাছেই ই-মেইলটি যাবে। কিন্তু যদি ‘Reply to all’ অপশনে ক্লিক করেন, তাহলে সকল কর্মীর কাছে আপনার ই-মেইলটি চলে যাবে যা অনেক সময় বিরক্তির সৃষ্টি করে।

১৫। ই-মেইলের নিচে সিগনেচার না দেয়া।

ই-মেইলের নিচে সিগনেচার দেয়ার একটা অপশন থাকে। এটা ছাড়া পুরো ই-মেইলটাই অনেকটা খাপছাড়া দেখা যায় আর ব্যপারটা খুবই আনপ্রফেশনাল। তাই ই-মেইলে নিজের নাম, পদবী এবং প্রতিষ্ঠানের নাম সম্বলিত সিগনেচার তৈরি রাখতে হবে।

১৬। “To whom it may concern” লিখে ইমেইল শুরু করা

কোনো প্রতিষ্ঠানে মেইল করতে হলে, কার উদ্দেশ্যে মেইলটা যাবে তা জেনে, উল্লেখ করুন। To whom it may concern- লিখে ই-মেইল শুরু করলে, প্রতিষ্ঠানের কর্মীরাও সংশয় পড়ে যায়। এভাবে মেইল করা অনেকটা ফাঁকা গুলি ছোড়ার মত।

১৭। বর্ণনা ছাড়াই লিঙ্ক দেয়া

ই-মেইলে কোনো লিঙ্ক দিতে হলে অবশ্যই তাতে কী রয়েছে তা বলে দিতে হবে, আর লিঙ্কটা নিরাপদ কিনা তা সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত না হয়ে লিঙ্ক দেয়া ঠিক না।

এবার ঘরে বসেই হবে মডেল টেস্ট! পরীক্ষা শেষ হবার সাথে সাথেই চলে আসবে রেজাল্ট, মেরিট পজিশন। সাথে উত্তরপত্রতো থাকছেই!

১৮। নেতিবাচক ই-মেইল করা

কোনো কর্মীকে ফায়ার করতে হলে, কাউকে কোনো জায়গা থেকে বাদ দিতে হলে কিংবা আপনার গ্রাহকের কোনো সুবিধা বন্ধ করতে হলে তা ই-মেইলের মাধ্যমে না বলে বরং সময় নিয়ে সরাসরি বলা উচিত।

১৯। জানা জিনিস আবার জানতে চাওয়া

আপনি প্রাপকের সম্পর্কে ইতোমধ্যে যা জেনে গেছেন, তা ই-মেইলের মাধ্যমে আবার জানতে চাওয়ার কোনো দরকার নেই। এতে করে প্রাপক হয় নিজেকে ছোট মনে করবে যে আপনি তার বিষয় কিছু মনে রাখেননি, কিংবা আপনাকে অমনোযোগী মনে করবে। উভয়ক্ষেত্রেই প্রাপক আপনাকে পরবর্তীতে কোনো তথ্য দিতে নিরুৎসাহিত হবে।

২০। সৌজন্যমূলক কিছু না বলে শেষ করা

ই-মেইলের জরুরি কথা শেষে ঐভাবেই পাঠিয়ে না দিয়ে সৌজন্যমূলক কিছু কথা তাতে লিখে দেয়া উচিত। নাহলে প্রাপক হীনমন্যতায় ভুগতে পারে এবং আপনার প্রতি বিরুপ ধারণাও পোষণ করতে পারে।

মার্কিন চাকুরিজীবিরা দৈনিক গড়ে ঘণ্টা ই-মেইলের পেছনে ব্যয় করে। এই বহুল ব্যবহৃত যোগাযোগ মাধ্যমটি কতটুকু ফরমাল তা এখনো কেউ নিশ্চিত নয় যেমনটা শুরুতে বলেছিলাম। কিন্তু এই অনিশ্চয়তার জন্য যেন আমাদের ই-মেইলিং-এ কোনো সমস্যা না হয়, সেজন্যই এই কয়েকটা কাজ একটু এড়িয়ে চলতে হবে। মনে রাখতে হবে, আপনার একটা ই-মেইল আপনাকে উপস্থাপন করতে পারে। একটা ই-মেইলই আপনার সাথে আপনার প্রাপকের সম্পর্ক কেমন হবে তা নির্ধারণ করতে পারে।

এই লেখাটির অডিওবুকটি পড়েছে আব্দুল্লাহ আল মেহেদী


১০ মিনিট স্কুলের লাইভ এডমিশন কোচিং ক্লাসগুলো অনুসরণ করতে সরাসরি চলে যেতে পারো এই লিঙ্কে: www.10minuteschool.com/admissions/live/

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: write@10minuteschool.com

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?