পর্ব ৬ – অসীম ও কুমড়া ত্বত্ত্ব

পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবার শুনে নাও।

এই লেখাটি “আদর্শ” থেকে প্রকাশিত এবং চমক হাসান রচিত গ্রন্থ গণিতের রঙ্গে হাসিখুশি গণিত বই থেকে নেয়া হয়েছে।

অসীম ও কুমড়া

বুয়েটের হলে একবার আমরা বন্ধুরা মিলে গল্প করছি। গল্প করতে করতে এক পর্যায়ে এক বন্ধু বলল যে, ‘দোস্ত আমাদের ব্যাচের অমুক আছে না, তাকে তো আমি দুই চক্ষে দেখতে পারি না।’ আমি বললাম ‘কেন, ও তো মানুষ হিসেবে খুবই ভালো।’ ‘না দোস্ত, আমি ওকে দু’চোখে দেখতে পারি না।’ আমি বললাম ‘কেন? সেটা তো বলবি!’ আমার বন্ধু মুখে একটা ফিচকে হাসির রেখা টেনে বলল ‘আসলে দোস্ত, ও আমার দুই চোখে আঁটে না!’ বুঝতেই পারছেন!

তো, এ অধ্যায়ে আমি এরকমই একটা বিষয় নিয়ে বলব, যেটা আমাদের দু’চোখে কেন, অজস্র চোখে আঁটবে না। কখনোই আমাদের চেনা সীমানার মধ্যে তাকে ধরা যাবে না— সংখ্যার সীমার মধ্যে আটকানো যাবে না। সে হচ্ছে মহান ‘অসীম’। অসীম একটা অনেক বড় ব্যাপার, অনেক বড় কিছু একটা। কেন আমি কিছু একটা বলছি বার বার? কারণ প্রথমেই যেটা জানার দরকার— ‘অসীম’ কোনো সংখ্যা নয়। এটা একটা ধারণা! আমি আবারো বলতে চাই, ‘অসীম’ কোনো সংখ্যা নয়।

পৃথিবীতে যত সংখ্যা আছে তাদেরকে শূন্য দিয়ে গুণ করলে শূন্য পাওয়া যায়। কিন্তু অসীমকে যদি শূন্য দিয়ে গুণ করা যায় তখন কী হয়? তখন কী হয় এটা আমরা আসলে ঠিকমতো জানি না। তখন আসলে যে কোনো কিছুই হতে পারে। এটাকে বলে ‘অনির্ণেয় আকৃতি’। শূন্য গুণ অসীম(০×) এটা অনির্ণেয় আকার। আমি তৃতীয় পর্বে বলেছিলাম যে, শূন্যকে শূন্য দিয়ে ভাগ করলে একটা অনির্ণেয় আকৃতি আসে। ০-কে ০ দিয়ে ভাগ করা আর ০-কে অসীম () দিয়ে গুণ করা প্রায় কাছাকাছি। দুজনেই আসলে অনির্ণেয় আকৃতি দেয়। এটার মান যে কোনো কিছুই হতে পারে।

অসীম যদিও কোনো সংখ্যা না কিন্তু সম্প্রসারিত বাস্তব সংখ্যা পদ্ধতিতে (extended real number system) অসীমের অস্তিত্ব আছে। সেখানে আমাদের যে বাস্তব সংখ্যাজগত তার সাথে ধনাত্মক অসীম এবং ঋণাত্মক অসীম— এদের দু’জনকেও একসাথে চিন্তা করা হয়। তো সেই সম্প্রসারিত বাস্তব সংখ্যা পদ্ধতিতে অসীমকে অনেকটা সংখ্যার কাছাকাছি চিন্তা করা হয় এবং সেখানে সংখ্যার কিছু বৈশিষ্ট্য অসীমকে দেওয়া হয়। যেমন অসীমের সাথে ১ যোগ করলে কী হবে, ২ যোগ করলে কী হবে— কিংবা, অসীম থেকে ২ বিয়োগ করলে কী হবে, এমন ব্যাপারগুলো ওখানে কিছুটা সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।

এই ব্যাপারটা বুঝতে হলে চলুন আটলান্টিক মহাসাগরের পাড় থেকে একটু ঘুরে আসা যাক। চিন্তা করুন, আমি যদি আটলান্টিক মহাসাগর থেকে এক গ্লাস পানি তুলে নেই তাহলে আটলান্টিক মহাসাগরের পানির কী হবে? আসলে কিছুই হবে না, তাই না? এটা থেকে একটা কাছাকাছি চিন্তা করা যায়:  -১=। অসীম থেকে যদি ১ বাদ দেওয়া যায় তাহলে অসীমই থাকে। ঠিক একইভাবে আমি যদি আটলান্টিক মহাসাগর থেকে দুই গ্লাস পানিও তুলে নেই তাহলেও আটলান্টিক মহাসাগরের পানির কিছুই হবে না। অসীম থেকে যদি ২ বাদ দেওয়া যায় তাহলে অসীমই থাকে।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে যদি থেকে বিয়োগ করা যায় তখন কী হবে? ধরা যাক, বিশাল বড় আটলান্টিক মহাসাগর থেকে আমি একটা সমুদ্র বাদ দিয়ে দিলাম। মহাসাগর থেকে যদি সাগর বাদ দেওয়া যায় তাহলে কী হবে। দুটোতেই তো অ-নে-ক পরিমাণে পানি আছে। অনেক থেকে অনেক বাদ দিলে কী হয় সেটা আসলে আমরা জানি না। অসীম থেকে অসীম বাদ দিলে যে কোনো কিছু হতে পারে। যেমন এটাকে অনুভবে প্রমাণ করা যায়— -১ অসীমের সমান। -২ এটাও অসীমের সমান। এখন আল যাবর থেকে আমরা পাই, যদি -১=হয়, তাহলে =১। আবার -২=। তাহলে =২ হবে। ঠিক একইভাবে =৩, ৪, ৫, ৬ যা খুশি তাই হতে পারে।

তো অসীমকে নিয়ে বহু প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ ভেবেছে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে পুরনো যার কথা পাওয়া যায়, তিনি হচ্ছেন জেনো (Xeno)। জেনো বিখ্যাত হয়ে আছেন তাঁর চিন্তা করা কিছু কূটাভাস বা paradox এর জন্য। paradox হচ্ছে এমন সব চিন্তা যেগুলো মাথার ভিতর যুক্তির প্যাঁচ লাগিয়ে দেয়। একভাবে চিন্তা করলে একরকম ফল আসে, আরেকভাবে চিন্তা করলে আরেকরকম! তো সেগুলোর থেকে মধ্য থেকে আমি দু’টাকে নিজের মতো করে একটু একসাথে মিলিয়ে বলি।

একটাকে বলে একিলিস আর কচ্ছপের প্যারাডক্স, আরেকটা হলো ডাইকোটমি (dichotomy) প্যারাডক্স। একিলিস ছিলেন প্রাচীন গ্রীসের একজন বিখ্যাত বীর [আগ্রহীরা হলিউডের ‘ট্রয়’ মুভিটা দেখতে পারেন, একিলিস সম্বন্ধে অনেক আজেবাজে ভুল তথ্য জানতে পারবেন! আর ভালো কিছু জানতে চাইলে হোমারের ইলিয়ড পড়তে পারেন]।

একিলিস একদিন নদীর পাড় দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ একটা কচ্ছপের সাথে তার দেখা। কচ্ছপ তাকে ডাক দিল।

-আরে একিলিস ভাই, কেমন আছ?

একিলিস বলল, হ্যাঁ, ভালো আছি, তুমি কেমন আছ?

-হ্যাঁ, ভালো। কচ্ছপ বলল, তুমি তো অনেক বড় বীর, তোমার সাথে আমার দৌড় প্রতিযোগিতা করার খুব শখ।

একথা শুনে একিলিস তো খুবই অবাক। মনে মনে ভাবেন— তুই কচ্ছপ, তুই করবি আমার সাথে দৌড় প্রতিযোগিতা! তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, তোমার যখন এতই শখ তাহলে চলো দৌড় প্রতিযোগিতা করি’।  তো তখন কচ্ছপ বলল, ‘আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি তো জানোই আমি দুর্বল— তাহলে এক কাজ করি, আমি আধা মাইল আগে থেকেই দৌড় শুরু করি। মানে তোমার আধা মাইল সামনে থাকবো।’

এ আর এমন কী! একিলিস ভাবলেন। ‘হ্যাঁ, ঠিক আছে কোনো অসুবিধা নেই। তুমি আধা মাইল সামনে থাক তাতে আমার কিছু আসে যায় না। আমি শেষ পর্যন্ত তোমাকে হারিয়ে দিতে পারব।’ তখন কচ্ছপটা বলল, ‘আচ্ছা ঠিক আছে তাহলে এক কাজ করি, মনে কর তুমি যেই গতিতে দৌড়াবে, আমি তার থেকে অর্ধেক গতিতে দৌড়াবো…’

-‘না…… আসলে আমি আরো অনেক বেশি গতিতে দৌড়াতে পারি। আচ্ছা, তুমি যেহেতু বলছো, ঠিক আছে যাও! কচ্ছপ, তুমি যেই গতিতে দৌড়াবে আমি তার থেকে দ্বিগুণ গতিতে দৌড়াবো।’

কচ্ছপ এখন খুব খুশি। তো এবার দৌড় প্রতিযোগিতা যখন শুরু হতে যাবে, হঠাৎ করে কচ্ছপ পিছনে তাকিয়ে বলল, ‘আচ্ছা একিলিস ভাই, আমি যদি যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করে দিতে পারি যে, তুমি কোনোদিন জিততে পারবে না, তাহলে তুমি কি হার মেনে নিবে?’ একিলিস বলল, ‘হ্যাঁ,তুমি যদি প্রমাণই করতে পারো, তাহলে শুধু শুধু প্রতিযোগিতা কেন করব, এমনি যুদ্ধটুদ্ধ করে গায়ে ব্যথা! বলো তাহলে— ’

এইবার কচ্ছপ বলল, ‘দেখ একিলিস, তুমি তো আমার দ্বিগুণ গতিতে দৌড়াবে, তাই না? আমরা তো এভাবেই ঠিক করে নিয়েছি?’

‘হ্যাঁ।’

-‘আমরা তো একসাথেই দৌড় শুরু করব, তাই না?’

-‘হ্যাঁ।’

-‘তুমি চিন্তা করো, দৌড়াতে দৌড়াতে তুমি যখন আমার এখনকার জায়গায় এসে পৌঁছাবে, মানে তুমি যখন দৌড়াতে দৌড়াতে এই আধা মাইল সামনে এসে পৌঁছাবে, আমি কি আমার আগের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকব? থাকব না। আমি তখন দূরত্বে চলে যাব, তাই না? যেহেতু আমি তোমার অর্ধেক গতিতে দৌড়াই—  তুমি আধা মাইল আসলে আমি যাব ১/২+১/৪ মাইল।

-‘হ্যাঁ, ঠিক আছে।’

-‘এইবার তুমি যখন আমাকে ধরতে আরো ১/২+১/৪ মাইল যাবে, আমি কি আর ওখানে দাঁড়িয়ে থাকব? আমি নিশ্চয়ই আরেকটু এগিয়ে যাব। আমি তখন ১/২+১/৪+১/৮ মাইল পরিমাণে এগিয়ে যাব।’

-‘হ্যাঁ।’

-‘তারপর তুমি যখন আমাকে ধরতে আরো ১/২+১/৪+১/৮ মাইল দূরত্বে আসবে, আমি কি আর ওখানে দাঁড়িয়ে থাকব? তখন আমি তো আরেকটু এগিয়ে যাব। ১/১৬ মাইল পরিমাণ। তারপর তুমি যখন আমাকে এই পরিমাণে ধরতে আসবে, তখন আমি কি আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকব? আমি তো একটু এগিয়ে যাব। ১/৩২ পরিমাণে। তারপর তুমি যখন করে আমাকে ধরতে আসবে, আমি কি সেখানে দাঁড়িয়ে থাকব? তার মানে হচ্ছে, তুমি কখনোই আমাকে আসলে ছুঁতে পারবে না। কখনোই তুমি আমাকে ধরতে পারবে না, বুঝতে পেরেছো?’

একিলিস ভাবলো তাই তো, আমি ওকে ধরতে যেখানেই যাব, কচ্ছপ তার থেকে সামান্য হলেও এগিয়ে থাকবে! সে হার মেনে নিল।

এখন আপনি চিন্তা করুন তো, আসলেই কি একিলিসের হেরে যাওয়ার কথা? কেউ যদি সামনে থাকে, আর আমি যদি ওর পেছনে দ্বিগুণ গতিতে দৌড়াই তাহলে আমি কি ওকে ধরতে পারব না? আমার তো মনে হচ্ছে পারব। তাহলে এ ব্যাপারটাকে কিভাবে চিন্তা করা যায়। এই ব্যাপারটাকে যদি চিন্তা করতে হয় তাহলে, এভাবে ভাবি যে, একিলিস কত দূরে গিয়ে তাকে ধরতে পারবে? প্রথমে তাকে যেতে হবে , এরপর এভাবে করে অর্থাৎ অসীম পর্যন্ত।

তার মানে আমরা যদি এই পদগুলো অসীম পর্যন্ত যোগ করতে পারতাম এবং যোগ করে যদি কোনো নির্দিষ্ট মান পাওয়া যেত তাহলে বলা যেত যে, সে কত দূরে গিয়ে ঐ কচ্ছপটাকে ধরতে পারবে। কিন্তু এটা কি আসলেই পাওয়া সম্ভব? উত্তর হচ্ছে: হ্যাঁ। এটা আসলেই পাওয়া সম্ভব। কিভাবে পাওয়া যায়, সেটা খুব সহজেই এভাবে চিন্তা করা যায়। ধরা যাক এটার মান হচ্ছে x

x=½+¼+ ………. (১)

তাহলে, 2x=1+½+¼+ ……… (২)

সবাইকে ২ দিয়ে গুণ করা হয়েছে। এখন যদি আমরা নিচের লাইন (২ নং সমীকরণ) থেকে উপরের লাইনটা (১ নং সমীকরণ) বাদ দিয়ে দেই,  তাহলে কী হবে?

2x-x =

ডানপক্ষে এমন করে পরের পদগুলো সবই কাটা যাবে, থাকবে শুধু ১। তার মানে x=1। ১ নং সমীকরণ থেকে আমরা পাবো,1= এর মানে  হলো ½, এই সবগুলো অসীম পর্যন্ত যোগ করলেও শেষ পর্যন্ত পাওয়া যাবে মাত্র ১। তাহলে বোঝা গেল সে ১ মাইল দূরে গিয়েই আসলে ধরে ফেলতে পারবে। এখন কথাটা হচ্ছে এই ব্যাপারটাকে আমরা অনুধাবন করব কিভাবে? আমার কাছে এই ব্যাপারটা সবসময়ই অবাক লাগত। ক্লাস নাইন- টেনে যখন অসীম গুণোত্তর ধারার সমষ্টির ফরমুলা শিখেছিলাম, তখন দেখেছিলাম ওখানে লেখা ছিল যে, গুণোত্তর ধারার সমষ্টি হচ্ছে সেটা দিয়েও এটা বের করা যায়। এখানে a হচ্ছে প্রথম পদ, যার মান এখানে ½। খেয়াল করলে দেখা যাবে, প্রতিটা পদ আগের পদের সাথে ½  করে করে গুণ হয়ে তৈরি হচ্ছে।

যেমন প্রথম পদ এর সাথে গুণ হয়ে তৈরি হয়েছে দ্বিতীয় পদ। দ্বিতীয় পদ এর সাথে গুণ হয়ে তৈরি হয়েছে তৃতীয় পদ। এই সূত্রে r=½ হচ্ছে সাধারণ অনুপাত, যেটা প্রতিবার গুণ হচ্ছে। অর্থাৎ এক্ষেত্রে r এর মান হচ্ছে ½।

তাহলে সূত্র থেকে পাবো, সমষ্টি হচ্ছে —

তার মানে সূত্র থেকেও পাওয়া যাচ্ছে এই অসীম গুণোত্তর ধারার যোগফল হলো ১।

কিন্তু এরপরও আসলে মন মানতে চায় না। আমি তো কম যোগ করছি না, অসীম পর্যন্ত যোগ করছি, তারপরেও কেন মান হবে শুধুমাত্র ১? এই ব্যাপারটাকে আমি সুন্দর করে অনুভব  করতে পেরেছিলাম কুমড়া থিওরি থেকে!

মনে করা যাক আমাদের কাছে ছবির মত একটা কুমড়া আছে। এই কুমড়াটাকে আমি যদি মাঝ দিয়ে সমান দু’ভাগ করে ফেলি, তাহলে দু’টি অংশ হয়ে গেল এখন। একটা ½ , অন্যটাও ½। একটা ½  রেখে দিলাম। এখন বাকি যে ½ টা আছে এটাকে যদি আমি আবার মাঝখান দিয়ে সমান দুই ভাগে ভাগ করি তাহলে একটা হবে ¼, আরেকটা ¼। এখন এই একটা ¼ রেখে দিলাম। আরেকটা যে আছে এটাকে সমান দুই  ভাগে ভাগ করি তাহলে কী হবে? ১/৮  এবং ১/৮। এই ১/৮-কে যদি আমি আবার সমান দুই ভাগে ভাগ করি, এক্ষেত্রে পাওয়া যাবে ১/১৬ এবং ১/১৬। আবারো  যদি ঐ একটা  ১/১৬ -কে ভাগ করি, এমন করতে, করতে, করতে, করতে, আমি অ-সী-ম পর্যন্ত এগুলোকে ভাগ করেই যেতে পারব।

এখন আপনি চিন্তা করুন, যদি সমস্ত টুকরা এখন এক সঙ্গে যোগ করা যায়, তাহলে আমরা কয়টা কুমড়া পাবো? একটা কুমড়াই পাবো। আমি কি বেশি পাবো? না। তার মানে এই অসীম পর্যন্ত যোগফল, তার মান কিন্তু ১-ই— ১ এর বেশি না। এখান থেকে জিনিসটাকে সুন্দর করে বোঝা যায়। এই যে অসীম পর্যন্ত যোগ করেও একটা নির্দিষ্ট মান পাওয়া, এই ব্যাপারটাকে বলে অভিসৃতি (convergence)

তো অসীম নিয়ে বলতে গেলে একজন মানুষের কথা না বললেই নয়। তিনি হচ্ছেন সেট থিওরির জনক জর্জ ক্যান্টর। তিনি হচ্ছেন প্রথম মানুষ, যিনি দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন— এই পৃথিবীতে অসীম শুধু একটা নয়, পৃথিবীতে অসীম ধরনের অসীম সংখ্যক অসীম আছে! জর্জ ক্যান্টরের মৃত্যু হয় একটি মানসিক চিকিৎসা কেন্দ্রে। আসলে সেই সময়কার গণিতবিদগণ তাকে সুযোগ পেলেই অপমান করত, বড় বড় গণিতবিদেরা তার ধারণাগুলোকে এক ফোঁটা মেনে নিত না, হয়তো সেই কষ্ট থেকেই বেচারা…!

যাহোক তাঁর ধারণাগুলো খুবই চমৎকার ছিল। তিনি বললেন, ‘আসলে কিছু অসীম আছে গণনাযোগ্য অসীম আর কিছু অসীম আছে অগণনাযোগ্য অসীম। কী রকম? এবার বিষয়টাকে বোঝানো যাক। গণনাযোগ্য অসীম আসলে তেমন কিছু না। ধরা যাক আমাদের কাছে একটা সেট আছে, যার মধ্যে আছে পৃথিবীর সকল স্বাভাবিক সংখ্যা (natural number)। ১ থেকে বড় যত পূর্ণসংখ্যা আছে, সেগুলো সবাই মিলে একটা স্বভাবিক সংখ্যার সেটা তৈরি করে। এই সেটকে হ দিয়ে লেখা হয়। আমরা লিখতে পারব—

১,২,৩,৪,৫,৬,৭,৮,৯,১০ এমন করতে করতে আমরা কত দূর পর্যন্ত যেতে পারব? এর আসলে শেষ নেই, তাই এটা একটা অসীম সেট। কিন্তু এই সেটের উপাদানগুলোকে গোণা যায়। ৭ নম্বর উপাদান কে, সেটা কিন্তু আমরা হুট করে বলে দিতে পারব। এজন্য এটা গণনাযোগ্য অসীম (Countably infinite set)। গণনাযোগ্য অসীমকে আরেকভাবে চিন্তা করা যায়। আমরা যদি যেকোন একটা উপাদান নিয়ে ঠিক এর পরেরটা কত এটা বলতে পারি, তাহলে বুঝতে হবে এটা গণনাযোগ্য। যেমন আমি নিলাম ১০, এর পরেরটা কত? আমরা জানি এটা ১১। ইচ্ছেমতো নিলাম ১০৫, এর পরেরটা কত? আমরা জানি এটা ১০৬। [চাইলে একই সেটকে অন্য অনেকভাবে সাজানো যায়, তবে অন্তত একভাবে সাজানো যাবে, যেখানে কার পরে কে আছে সেটা বলা যায়! যেমন  ঐ একই সেটকে আমরা ১,৩,৫,২,৪,৬,৭,৯,১১,৮,১০,১২

এভাবে সাজাতে পারি। তখনও চিন্তাশীল মানুষেরা একটু তাকালেই বুঝে যাবে ৬ এর পর ৭ আসবে, ৭ এর পর ৯…]। তো এইরকম কার পরে কে, এটা যদি আমি বার বার বলতে পারি, সেই সেটটা হবে গণনাযোগ্য অসীম। আর যেখানে এই কাজটা করা যায় না, সেটা হচ্ছে অগণণাযোগ্য অসীম (Uncountably infinite)। কী রকম? ধরা যাক, বাস্তব সংখ্যার সেট। আমি যদি আপনাকে বলি, বাস্তব সংখ্যার সেটের মধ্যে নিলাম ১। এই ১ এর পরের বাস্তব সংখ্যাটা কত? আপনি বলবেন ১.০০০০  হ্যাঁ ০, তারপর ০ এবং তারপর ১, মানে ১.০০০০০০১। হলো না। আরেক জন বলতেই পারে আমি তার মাঝখানে আরো ১০০ টা ০ বসালাম। সেটা তো আরো ছোট হয়ে গেল, সেটা ১ আর ১.০০০০০০১ এর মধ্যে পড়বে। অর্থাৎ ১ এর ঠিক পরেরটা কত সেটা কিন্তু আপনি কিছুতেই বলতে পারছেন না! তাই এই যে বাস্তব সংখ্যার সেট এটা আসলে অগণনাযোগ্য।

গণনাযোগ্য সেট আর কী কী হতে পারে? পৃথিবীর যত পূর্ণ বর্গসংখ্যা তারা গণনাযোগ্য অসীমের মধ্যে রয়েছে। কারণ প্রথমটা ধরা যাক ১। তার পরের বর্গ সংখ্যাটা ৪। তার পরেরটা হচ্ছে ৯। এক্ষেত্রে  পরেরটা কিন্তু আমরা সবসময়ই বলতে পারি। এরকম করে পৃথিবীতে যত মৌলিক সংখ্যা আছে তারাও গণনাযোগ্য। প্রথমটা ২, তার পরেরটা ৩, এভাবে ৫, ৭, তারপর ১১, এরকম করে করে আমরা সামনে এগিয়ে যেতে পারব। এরাও গণনাযোগ্য। আর অগণনাযোগ্যগুলোর মধ্যে কারা কারা আছে?

যেমন আমি একটু আগেই বলেছি, পৃথিবীতে বাস্তব সংখ্যা যতগুলো হতে পারে, সেটার সেটটা গণনাযোগ্য। অমূলদ সংখ্যার সেটগুলো অগণনাযোগ্য। একটা সরল রেখাংশ নিই, এই রেখাংশের মধ্যে কতগুলো বিন্দু আছে, সেটাও আসলে একটা অগণনাযোগ্য অসীম। তো গণনাযোগ্য এবং অগণনাযোগ্য— এই দুই ধরনের অসীম সেট দিয়ে অনেক মজার চিন্তা করা যায়— যেগুলো আমাদের খালি চোখে বিশ্বাস হবে না। যে রকম আমরা প্রমাণ করে ফেলতে পারি যে, একটা ছোট রেখাংশের ভেতরে যতগুলো বিন্দু আছে, একটা মানুষের শরীরে ঠিক ততগুলো বিন্দু আছে।

একটা ছোট রেখাংশের ভেতরে যতগুলো বিন্দু আছে, এই পুরো মহাবিশ্বে ততগুলোই বিন্দু আছে। আমার শরীরে যতগুলো বিন্দু আছে, আরেকটা মানুষের শরীরে ঠিক ততগুলোই বিন্দু আছে। এক এক মিল দেখিয়ে খুবই চমৎকার করে এই প্রমাণগুলো করে ফেলা যায়। [আগ্রহীরা স্নেহভাজন অভীক রায়ের লেখা ‘ম্যাথোস্কোপ’ বইটি পড়ে ফেলতে পারেন!]

যাই হোক, অসীম আসলেই একটা চমৎকার বিষয়। আমরা অসীম নিয়ে আর কথা বাড়াবো না। চিন্তার বৈচিত্র্য বাড়াতে এই অধ্যায়টা শেষ করবো একটা সমস্যা দিয়ে, যার সাথে অসীমের কোনো সম্পর্ক নেই!!

মনে করুন, আপনার কাছে ১০-টা মোহরের থলে আছে। ঐ যে আলিফ লায়লাতে যে রকম আমরা দেখতাম মোহরের থলে, সেইরকম! মোহর না বলে আমরা কোনো স্বর্ণমুদ্রাও চিন্তা করতে পারি। মনে করুন এভাবে আমাদের কাছে ১০-টা থলে আছে। সেই ১০-টা থলের মধ্যে প্রত্যেকটাতে ১০টা করে স্বর্ণমুদ্রা আছে, যেগুলো দেখতে একেবারেই এক রকম। আপনি জানেন প্রত্যেকটা স্বর্ণমুদ্রা ১০ গ্রাম করে। কিন্তু একজন গুপ্তচর এসে আপনাকে জানালো এই দশটা থলের একটা থলেতে আছে ভেজাল! এটার ভিতরে যে স্বর্ণমুদ্রাগুলো আছে সেগুলোর প্রতিটা ৯ গ্রাম করে। বাকি থলেগুলো ঠিক আছে।

এখন আপনাকে যেটা করতে হবে, আপনাকে একটা ডিজিটাল ওজন মাপার যন্ত্র দেওয়া হলো। অর্থাৎ এটার উপর কিছু রাখলেই ওখানে সুন্দর করে ওজন উঠে যায়। এই ওজন মাপার যন্ত্র ব্যবহার করে, মাত্র ১ বার ওজন করে, আবার বলছি মাত্র একবার ওজন করে আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে, কোনো থলিটার মধ্যে কম ওজনের বস্তুগুলো আছে। আপনি যদি খুব ভাগ্যবান হন, তাহলে দেখবেন আপনি যেটা তুলেছেন সেখানেই ৯ গ্রাম ওজনের, তাহলে তো বুঝেই গেলেন। আর যদি আপনি ভাগ্যবান না হন তাহলে তো ওজন দেখে বুঝবেন না। তাহলে আপনাকে অন্য একটা উপায় বের করতে হবে। এটাই হচ্ছে সমস্যাটা। চিন্তা করুন, কিভাবে একবার মাত্র ওজনে বের করা যায়, সেই ভেজাল থলেটা কোনটা। চিন্তা করতে থাকুন, কারণ চিন্তাই ভবিষ্যতের পথ দেখায়!

চমক হাসানকে ফলো করতে পারো ফেসবুক পেইজেও!


১০ মিনিট স্কুলের লাইভ এডমিশন কোচিং ক্লাসগুলো অনুসরণ করতে সরাসরি চলে যেতে পারো এই লিঙ্কে: www.10minuteschool.com/admissions/live/

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: write@10minuteschool.com

 

Author

Chamok Hasan

চমক হাসান একজন অনলাইন শিক্ষক।পিএইচডি করেছেন তড়িৎকৌশলে, কাজ করছেন গবেষণা ও উন্নয়ন প্রকৌশলী হিসেবে। ভালোবাসেন গণিত।অবসরে গণিতের উপর ভিডিও তৈরি করেন, বই লেখেন- গণিতের আনন্দ মানুষের কাছে ছড়িয়ে দিতে।
Chamok Hasan
এই লেখকের অন্যন্য লেখাগুলো পড়তে এখানে ক্লিক করুন
What are you thinking?