ঝালিয়ে নিন সামাজিক দক্ষতাগুলো!

পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবারে শুনে নাও!

 
‘Communication – the human connection – is the key to personal and career success.’- Paul J. Meyer

ব্যক্তিগত ও পেশাগত সাফল্যের অন্যতম চাবি হলো যোগাযোগ দক্ষতার উন্নয়ন- পল জে মায়্যার

পঁচিশ বছরের সুমন আমাকে একটা চিঠি পাঠালো। এই সময়ে হাতে লেখা চিঠি পাওয়া রীতিমতো অবাক করার মতো ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক মুহূর্ত দেরি না করে খাম ছিঁড়ে চিঠি পড়া শুরু করলাম। সুমন বছর খানেক আগে আমার সাথে দুইবার বসেছিল। তার বাসা নোয়াখালী। ঢাকা এসে তার সেশন নেওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে। সেটা দিয়েই শুরু করেছে তার লেখা।

‘বাবার সাথে আমার সম্পর্ক অনেক ভালো হয়েছে। আমি যা চাই তা বলতে পারি। ভয়টা অনেকটা কমেছে। আসলে আমার বাবা অতটা বদমেজাজি না, যতটা আমি ভেবেছিলাম। আগে বছরে দুইবার কোলাকুলি করতাম, এখন প্রতি শুক্রবার করি।’

চিঠিতে মূলত তার পরিবর্তনের কথা বিস্তারিত লিখেছে। আমার চোখে পড়ল, কোলাকুলি করতে পারার বিষয়টা।

আচ্ছা, আমরা সবাই কি বাবার সাথে কোলাকুলি করি? অথবা করতে পারি?

এই প্রশ্ন করলাম কয়েকজন ছাত্র ও বন্ধুকে। অবাক হলাম, সুমনের মতো শতকরা ৯০ ভাগই বলল, তারা বাবার সাথে স্বাচ্ছন্দ্যে কোলাকুলি করতে পারে না। ইতস্তত বোধ করে।

কেউ কেউ জানাল বাবার সাথে একেবারেই কম কথা হয়। বাবা যখন ঘরে ঢোকে আমি তখন বেরিয়ে যাই।

আশ্চর্য করার মতো ব্যাপার। নিজের বাবা, অথচ তাকেই এত ভয় লাগে, কথা বলতে অস্বস্তি হয়, জড়িয়ে ধরতে ইতস্তত বোধ হয়?

বাবার সাথে না হয় বুঝলাম, অন্য মানুষের সাথেও কি তারা প্রাঞ্জলভাবে মেলামেশা করতে পারে? প্রাণ খুলে স্পষ্টভাষায় কথা বলতে পারে? আমার জানার আগ্রহ বেড়ে গেল।

অনুসন্ধান করে হতাশার চিত্রই পেলাম। সামাজিক পরিবেশে, বন্ধুবান্ধব বা সম্পর্ক তৈরিতে অথবা নিজের কর্মক্ষেত্রে সবখানেই তারা কোনো না কোনো সমস্যায় পড়ছে। অনেকের উন্নতি থেমে আছে। সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে না, যারা এখন সম্পর্কে আছে, সেটাও নড়বড়ে অবস্থা।

মানুষের সাথে কথা বলা, ব্যাপারটার আসলেই ওজন আছে।

আমরা বলি সামাজিক দক্ষতা। একজন ব্যক্তি অন্য এক বা একাধিক ব্যক্তির সাথে স্বাভাবিক প্রয়োজনে কথাবার্তা বলবে, নিজের চাহিদার কথা জানাবে, অনুভূতি বিনিময় করবে। এই তো। কীসের এত ঝামেলা?

না, ব্যাপারটা আসলেই এত সহজ না। বুদ্ধিতে পটু হলেও সামাজিক দক্ষতায় অনেকের রয়েছে সাংঘাতিক দুর্বলতা। আর এই দুর্বলতার জন্য অনেকের জীবনগাড়ি থেমে থাকে। চললেও চলে খুব ধীরে।

নিচের ঘটনাগুলোতে আপনার অবস্থা কী রকম, ভেবে বলুন তো?

  • বাবা-মায়ের সাথে কথা-বার্তা বলতে গেলেই ঝগড়া হচ্ছে।
  • আপনার চাহিদা সরাসরি বাবা-মাকে/বন্ধু-বান্ধবকে বলতে পারছেন না।
  • অফিসের বস অথবা সহকর্মীর সাথে সংকোচ, কাঁপাকাঁপি ছাড়া কথা বলতে পারছেন না।
  • শিক্ষককে যা বলতে চাচ্ছেন, তার পুরোটাই গুছিয়ে বলতে পারছেন না। পরে আফসোস করছেন।
  • বাসে পাশের লোকটা জোরে জোরে কথা বলছে, আপনার খুব বিরক্ত লাগছে অথচ তাকে কিছুই বলতে পারছেন না।
  • প্রায়ই মানুষ আপনাকে নিয়ে গেম খেলে, হাসির পাত্র বানায়।
  • মন খারাপ হয়ে থাকে, কেন তাকে ওই সময় আপনার অনুভূতি প্রকাশ করতে পারেন নি।
  • প্রায়ই অন্যরা অভিযোগ করছে, আপনার মেজাজ চড়া অথবা আপনি একটা ঘাড়ত্যাড়া।
  • আপনি কাউকে ‘না’ বলতে পারেন না। ‘না’ বলতে গেলেই ভয় লাগে।
  • আপনার প্রেমিক/প্রেমিকা/স্বামী/স্ত্রী বারবার একই অন্যায় আবদার করছে, আপনার অনেক খারাপ লাগে, কিন্তু আপনি কিছুই বলতে পারছেন না।
  • দোকানদার আপনাকে যা-ই বলছে, আপনি তাতেই পটে যাচ্ছেন।
  • ভাইভা দিতে গেলে ভয়ে গলা শুকিয়ে যায়। মাথা থেকে মুহূর্তেই সব উধাও হয়ে যায়।

ওপরের পরিস্থিতিগুলো সচরাচর আমাদের চোখে পড়ে। সামাজিক দক্ষতার অভাবেই মূলত এরকমটা হয়ে থাকে। মর্যাদাপূর্ণ জীবন পেতে চাইলে সামাজিক দক্ষতায় পেতে হবে এ প্লাস। সামাজিকভাবে দক্ষ মানুষরা অন্যদের চেয়ে শত গুণ এগিয়ে থাকে। তাদের ফল হয় টপ, চাকরি আর প্রমোশন হয় দ্রুত। ব্যবসা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়া শুরু করে। মনের মানুষের সন্ধান পায় সহজে। সম্পর্কটাও হয় মধুর। মানুষের সাথে বিবাদ কম হয়, ফলে সামাজিক সম্পর্ক থাকে সব সময় চাঙা। মনটা থাকে ফুরফুরে।

এই মুহূর্তে যদি আপনাকে অগ্রাধিকার তালিকা করতে হয়, তবে সামাজিক দক্ষতা শাণিত করাই হবে এক নম্বরে।

কীভাবে সেটা করবেন তার দিশা পাবেন নিচের অংশে।

সামাজিক দক্ষতার মূলে রয়েছে সামাজিক যোগাযোগ। একে অন্যের সাথে আমাদের দৈনন্দিন যে যোগাযোগ হয়, সেটাই সামাজিক যোগাযোগ। এটা করতে গিয়েই তো দুনিয়ার ঝামেলা।

সামাজিক দক্ষতার ঘাটতি তখনই দেখা দেয়, যখন সামাজিক যোগাযোগ যথাযথ হয় না।

যা চাই, তা বলতে পারি না,

যা চাইনি, তা-ই বলে ফেলি,

যেভাবে বলা দরকার, সেভাবে হয় না।

একে অন্যের সাথে আমাদের যে যোগাযোগ হয়, সেগুলো প্রধানত তিনটি প্যাটার্নের হয়।

এক. প্যাসিভ বা নিষ্ক্রিয় যোগাযোগ

ছাত্রাবস্থায় আমি দু’টি করে টিউশনি করতাম। টিউশনি শেষ করে হলে ফিরতে ফিরতে রাত ১০টা বাজত। খেয়ে-দেয়ে রুমে আসতাম ১১টায়। বই নিয়ে বসেছি, তখনি এক বন্ধু এল। দোস্ত, চল পলাশি বাজার যাই, চা খাব। আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লাম। চা শেষ করে ফিরলাম সাড়ে ১১টায়। এরপর এলাকার একদল বড় ভাই এল। আজহার, পিকনিক হবে। চল, পরিচিত যারা আছে, সবার কাছে যাই। চাঁদা তুলতে হবে। গেলাম তাদের সাথে। পুরো হল চক্কর দিয়ে ফিরলাম রাত একটায়।

এরপর যখনই টেবিলে বসলাম, এল আরেক বন্ধু। তোর কাছে অমুক সিনেমাটা আছে না? পেনড্রাইভ আছে, একটু দে তো। কম্পিউটার চালু করলাম। তাকে বিদায় করতে করতে বেজে গেল প্রায় দেড়টা। এরপর শরীরটা আর কুলাচ্ছে না। আগামীকাল আটটায় ক্লাস। নয়টায় আছে মিডটার্ম পরীক্ষা। মাথায় কিছুই কাজ করছে না। রাগে ক্ষোভে নিজেকে বিড়বিড় করে বকতে লাগলাম।

আমার এই অবস্থাটা হয়েছিল প্যাসিভ বা নিষ্ক্রিয় যোগাযোগের ফলে। এখানে আমি আমার অধিকার বা স্বার্থ রক্ষা করতে পারিনি। অন্যের চাহিদা পূরণ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে শেষে বিমর্ষ হয়ে গেছি।

যারা যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্যাসিভ তাদের স্বভাবে এবং কথার ধরণে কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়।

আমার নিজেকে বিশ্লেষণ করে দেখেছি, কোনো কথা স্পষ্ট করে বলছি না। বাক্যের মধ্যে কনফিউশন থাকে। কথা বলতে গেলে গলা জড়িয়ে যায়। কণ্ঠে ম্যানম্যানা সুর। যেন কী যে অপরাধ করেছি। প্রায়ই বলি, আপনি যদি কিছু মনে না করেন…, তুমি কি মাইন্ড করবা…। নিজেকে অন্যের কাছে গুরুত্বহীনভাবে উপস্থাপন করার প্রবণতা ছিল।

প্যাসিভ কমিউনিকেটররা সাধারণত চোখে চোখ রেখে কথা বলতে পারে না। কথা বলতে গেলে খুব বেশি নড়াচড়া করে, হাত-পা সোজা থাকে না। হাত, নখ কামড়ায় অথবা দুহাত কচলাতে থাকে। নতজানু স্বভাব স্পষ্ট ফুটে ওঠে।

কেন এরকম করতাম আমি? আমি চাইতাম কেউ যেন কষ্ট না পায়। আমি তেমন গুরুত্বপূর্ণ কেউ না। বন্ধুরা কি মনে করবে সেটা নিয়ে চিন্তিত থাকতাম।

ফলে আমার নিজের কোনো কাজ হতো না। ক্লাসে দেরিতে যাওয়াটা রীতিমতো অভ্যাসে পরিণত হলো। বদ অভ্যাস। নিজের ওপর আস্থা থাকত না। ভীষণ ক্লান্ত বোধ হতো। ক্লাসে ঝিমাতাম। এক সময় কিছুই ভালো লাগত না।

দুই. অ্যাগ্রেসিভ বা আক্রমণাত্মক যোগাযোগ

আচ্ছা, আমি যদি প্যাসিভ না হয়ে অ্যাগ্রেসিভ হতাম, কী হতো? অনেক রাতে চা খাওয়ার কথা বললে সেই বন্ধুকে সরাসরি বলতাম, তোর কি মাথা খারাপ? এত রাতে চা খেতে বলছিস! তোর শখ তুই যা। গ্লাসে গ্লাসে চা খা। চা-খোর কোথাকার!

অথবা, এলাকার ভাইদের বলতাম, ভাইয়েরা, আপনাদের টাইম সেন্স বলতে কি কিছু নাই? আমি পারব না। আপনাদের এত শখ, আপনারাই যান। দরজায় দরজায় টোকা দেন।

অথবা ফিল্ম নিতে আসা বন্ধুকে বলতাম, তোকে এত রাতে রুমে ঢুকতে দিয়েছে কে? কামকাজ নাই, খালি সিনেমা দেখস। ভাগ এখান থেকে!

এ ধরনের যোগাযোগে ব্যক্তি নিজের চাহিদাটাকেই বড় করে দেখে। অন্য সব গুরুত্বহীন। নিজে বাঁচলে বাপের নাম। এরা নিজের প্রয়োজনটা ভালোই বোঝেন কিন্তু অন্যেরটাকে পাত্তায় দেন না। অন্যকে প্রায় তাচ্ছিল্য করেন। অন্যের অনুভূতি ধরতে পারেন না। কথা দিয়ে আক্রমণ করাই এদের প্রধান কাজ। ভালো কিছু বললেও ত্যাড়া একটা জবাব দেবে।

ফলে অন্যরা আঘাতপ্রাপ্ত হবে। যতটা পারা যায়, এদের এড়িয়ে চলার চেষ্টা করা ভাল। নিজের সম্মান হারাতে কে চায়?

তিন. অ্যাসারটিভ বা দৃঢ়প্রত্যয়ী যোগাযোগ

তিনটি কমিউনিকেশন ধরনের মধ্যে অ্যাসারটিভ কমিউনিকেশন সবচেয়ে স্বাস্থ্যসম্মত এবং ফলপ্রসূ। এখানে দুই পক্ষের কেউ ক্ষতিগ্রস্ত বা ছোট হয় না।

যোগাযোগে দৃঢ়প্রত্যয়ী হওয়া মানে অন্যের অধিকার খর্ব না করে নিজের অধিকার ভোগ করা। উদাহরণ দিলেই পরিষ্কার হবে।

আমার উদাহরণটাতেই ফিরে আসি। আমি যদি অ্যাসারটিভ হতাম, তাহলে সেই পরিস্থিতিতে আমার যোগাযোগ হতো,

রাত ১১টায় বন্ধু এসেছে, চা খেতে বাইরে যাবে…

দোস্ত, আমি বুঝতে পারছি, আমাকে নিয়ে বাইরে চা খেতে গেলে তোর ভালো লাগবে। আমারও ভালো লাগত। কিন্তু আমি মাত্র রুমে ফিরলাম। আগামীকাল সকাল নয়টায় আমার মিডিটার্ম পরীক্ষা আছে। দোস্ত, আমি দুঃখিত। আমি এখন বাইরে যেতে চাচ্ছি না।

এতে কী হতো? বন্ধুটি আমার অবস্থা বুঝতে পারত। তাই মন খারাপের কিছুই  থাকত না। আমারও পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যাঘাত ঘটত না।

অর্থাৎ অ্যাসারটিভ কমিউনিকেশনে ব্যক্তি নিজের সুবিধা, অসুবিধা, চিন্তা, অনুভূতি, বিশ্বাস পরিষ্কার ভাষায় এমনভাবে বলবে, যাতে অপরপক্ষ আঘাত না পায়। এতে নিজের অধিকার খর্ব হয় না, আবার অন্যকেও অসম্মান করা হয় না। তুমিও খুশি, আমিও খুশি। মাঝে কোনো ঘাপলা নেই।

অ্যাসারটিভ ব্যক্তির যোগাযোগ খেয়াল করলে বুঝতে পারবেন, তারা  শান্তভাবে ভদ্রতা বজায় রেখে পরিষ্কার ও দৃঢ় কণ্ঠে কথা বলে। তারা সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে, তাই অন্যের  মতামতকে গুরুত্ব দেয়। এরা অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়। একজন কেন, কোন অবস্থা থেকে কথা বলছে, তা আন্দাজ করার চেষ্টা করে। তাই তারা দোষারোপ না করে গঠনমূলক সমালোচনা করে। সরাসরি অন্যের মতামতকে উড়িয়ে দেওয়া বা বাতিল করে দেয় না; বরং বলে, ‘আমার অভিজ্ঞতা তোমার থেকে ভিন্ন…’। অপরপক্ষ কথা বলার সময় ধীরস্থির থেকে মনোযোগ দিয়ে শোনে।

বোঝাই যাচ্ছে অ্যাসারটিভ কমিউনিকেশনের ফল কী হতে পারে। যেহেতু কোনো পক্ষের অধিকার বা সম্মান নষ্ট হচ্ছে না, সম্পর্কে ঝামেলা হওয়ার আশঙ্কা একেবারেই থাকে না। যোগাযোগের প্রকৃত লক্ষ্য হাসিল হয়। ভুল বোঝাবুঝি থাকে না।

সামাজিক দক্ষতা শাণিত করার কার্যকর তিনটি টনিক

১। আপনার চিন্তা, বিশ্বাস স্ক্যান করে দেখুন

আপনার চিন্তা এবং চিন্তার মূলে কী আছে তা বের করুন। আপনার চিন্তা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে সামাজিক দক্ষতা বাড়ানো কঠিন। কারণ, আপনার ভেতরের চিন্তা, আবেগ আর বাইরের আচরণ একসূত্রে গাঁথা। একটাতে ভাইরাস আক্রমণ করলে অন্যগুলো আপনা-আপনি এলোমেলো হয়ে যায়।

আপনার চিন্তায় যদি ‘অতি সরলীকরণ, সাদা কালো, ভুল ধরা, মন পড়ে ফেলা’ ইত্যাদি ভাইরাস থাকে, তাহলে আপনার যোগাযোগে তা ফুটে উঠবে। ফলে নেতিবাচক আবেগ যেমন- রাগ, বিরক্তি, ভয়, উদ্বিগ্নতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। যোগাযোগ হবে প্যাসিভ অথবা অ্যাগ্রেসিভ।

২। শরীরের ভাষা বুঝুন

মুখের কথার চেয়ে শরীর প্রায় তিনগুণ বেশি মনের ভাব প্রকাশ করে। কথায় যত মধু থাকুক না কেন, শরীরের ভাষা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে না পারলে আপনি অর্থবহ যোগাযোগ রক্ষা করতে পারবেন না। এর জন্য অবশ্যই যে বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবে-

শরীরের অঙ্গভঙ্গি: কথা বলার সময় হাতের ব্যবহার সাংঘাতিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। মঞ্চে যারা কাজ করেন তারা জানেন, সঠিক ব্যবহার না জানলে হাতটা যেন বোঝা মনে হয়। পকেটে হাত ঢোকাবো, নাকি কোমরে রাখবো, পেছনে না সামনে ধরবো, অনেক দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। যেভাবে রাখেন না কেন, আস্থার সাথে হাতের ব্যবহার করতে হবে। হাতের নড়াচড়ায় যেন আপনাকে নার্ভাস মনে না হয়। অতিরিক্ত নড়াচড়া না করাই ভালো।

এ ছাড়া দাঁড়িয়ে কথা হলে, দুই পায়ে সমানভাবে ভর দিয়ে মেরুদণ্ড সোজা রাখা ভালো। এতে আপনার দৃঢ়তা প্রকাশ পাবে। লোকে আপনাকে কনফিডেন্ট ভাববে।

গলার স্বর: মিনমিনে আওয়াজ যেমন ভালো লাগে না, তেমনি মাইকের মতো স্বরও বিরক্তিকর। পরিস্থিতি বুঝে গলার স্বরের ব্যবহার করতে হবে। আমার কথা অপরপক্ষ কেমন শুনছে, তা বোঝার জন্য জিজ্ঞেস করতে পারেন। শ্রোতাই বলে দেবে, সাউন্ড বাড়াতে হবে না কমাতে হবে।

চোখে রাখো চোখ: শুধু প্রেম করার ক্ষেত্রেই নয়, অন্য সব যোগাযোগে চোখে চোখ রেখে কথা বললে দারুণ ফল পাবেন। শোনেন নি, চোখ যে মনের কথা বলে? তাই আপনার মনের কথাটা পরিষ্কার বোঝানোর জন্য চোখ দুটোকে কাজে লাগান। সোজাসুজি অন্য ব্যক্তির চোখে চোখ রেখে কথা বলুন। আপনার ভেতরের দম মানুষের নজরে চলে আসবে।

কথা বলার গতি: কেউ খুব দ্রুত কথা বলে, কেউ বলে ধীরে। দুটোই অন্য পক্ষের জন্য অসুবিধা তৈরি করতে পারে। আপনার কথার গতি অন্যের জন্য সুবিধাজনক কি না, তা পরিচিতজনদের প্রশ্ন করে জেনে নিতে পারেন। সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন। লজ্জার কিছু নেই। মনে রাখবেন, লজ্জা একটা ভাইরাস।

চেহারার অভিব্যক্তি: আপনি যদি কষ্টের কথা বলেন বা কারও কাছ থেকে শোনেন, আপনার চেহারায় তা ফুটে ওঠার কথা। একইভাবে আনন্দের বিষয়ে উচ্ছলতা থাকবে। তা যদি না থাকে, তবে অসঙ্গতি দেখা যাবে। মানে আপনি যা বলছেন তা আসলেই ভেতর থেকে বলছেন না। আপনি বুঝতে না পারলেও অপরপক্ষ ঠিকই ধরে ফেলবে।

স্পর্শ ও ব্যক্তিগত সীমানা: আলাপ করতে করতে গায়ে হাত রাখছে, এরকম অভিজ্ঞতা প্রায় সবারই হয়েছে। কিছু কিছু সময় তা আমাদের ভালো লাগলেও অনেক সময় তা বিরক্তির কারণ। কাকে, কখন আপনি ছুঁবেন বা গায়ে হাত রাখবেন তা নির্ভর করছে সেই মানুষটার সাথে আপনার সম্পর্কের গভীরতা, বয়স, লিঙ্গ ইত্যাদি বিষয়ের ওপর। একেবারে নিশ্চিত না হয়ে কারও গায়ে স্পর্শ না করাই ভালো।

আবার অনেক সময় একেবারে গায়ে গা ঘেঁষে অনেকে কথা বলে, বসে। খুব খারাপ একটা অভ্যাস। প্রত্যেক মানুষের একটা নির্দিষ্ট ব্যক্তিগত বাউন্ডারি রয়েছে। একান্ত আপনজন যেমন- স্বামী-স্ত্রী, ছেলেমেয়ে ছাড়া অন্য কেউ সেই বাউন্ডারি ভেদ করে কাছে এলে বিরক্তির উদ্রেগ হয়। প্লিজ, খেয়াল রাখবেন, নিজের অবচেতনে যেন অন্যের ব্যক্তিগত সীমানা ভেদ না করেন।

৩। সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে সামাজিক দক্ষতা বাড়ান

কলেজ, ভার্সিটিতে যারা পড়ছেন, তাদের জন্য সামাজিক দক্ষতা ঝালাই করার দারুণ সুযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক সংগঠনে জড়িত হয়ে সামাজিক দক্ষতার প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস করতে পারবেন। ছাত্র সংগঠন, ডিবেট, রক্তদান, টুরিজম, ফিল্ম, নাটক, আবৃত্তির হাজারো সংগঠন, ক্লাব, সোসাইটি আছে দেশের সব কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে।

যদি এখনো কোনোটাতে জয়েন না করে থাকেন, আজই মেম্বার হন। এগুলোর গুরুত্ব কত বেশি তা পাস করে বেরিয়ে কর্মক্ষেত্রে গেলেই টের পাওয়া যায়। সংগঠনের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতে গেলে আপনার সামাজিক দক্ষতার ঘাটতি কোথায়, তা বুঝতে পারবেন। সেভাবে সমস্যার জায়গা চিহ্নিত করে তাতে মলম লাগান। অন্যদের ফিডব্যাক নিন। সেই অনুসারে এগিয়ে যান। দেখবেন বছর যেতে না-যেতেই আপনার কত উন্নতি হয়।

এই লেখাটি নেয়া হয়েছে লেখকের “মানসিক প্রশান্তি আর মর্যাদাপূর্ণ জীবনের জাদুকাঠি” বইটি থেকে। বিশেষ ছাড়ে বইটি কিনতে চাইলে চলে যান এই লিংকে!

এই লেখাটির অডিওবুকটি পড়েছে তাওহিদা আলী জ্যোতি


১০ মিনিট স্কুলের লাইভ এডমিশন কোচিং ক্লাসগুলো অনুসরণ করতে সরাসরি চলে যেতে পারো এই লিঙ্কে: www.10minuteschool.com/admissions/live/

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: write@10minuteschool.com

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?