ছাত্রজীবনে মাদকের থাবা এড়িয়ে চলবে যেভাবে!

দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ুয়া সায়েম যখন প্রথম সিগারেট হাতে নিলো তখন সে মাত্র নবম শ্রেণিতে পড়ে। বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়ার সময় নিতান্ত কৌতুহলের বসেই কাজটা করেছিলো সে। আর তার সাথে বন্ধুদের “আরে কিচ্ছু হবে নাহ!” এই বাক্যটা তাকে বেশ অনুপ্রাণিত করেছিলো। এখন তার বয়স মাত্র আঠারো। যেই বয়সে তার নিজের স্বপ্নের পিছনে দৌড়ানোর কথা ছিলো সে বয়সেই অন্ধকারের দিকে ছুটে চলেছে সে।

সায়েম নামের এই ছেলেটির গল্প আমি সম্পূর্ণ বানিয়ে বললাম। কিন্তু আসলেই কি বানিয়ে বলছি? একটু খেয়াল করে আমাদের চারপাশে এরকম হাজারটা সায়েম তুমি দেখতে পাবে। বিষয়টা অন্তত দুঃখজনক এবং অবাক করার মতন যে আমাদের তরুণ সমাজের একটা বড় অংশ এখন মাদকাসক্ত। যাদের মধ্যে বেশিরভাগই ছাত্রাবস্থায় মাদকের সাথে জড়িয়ে যায়। শুরুটা হয় কৌতুহল থেকেই, নয়তো বন্ধুদের প্ররোচনায়। কিন্তু, শেষে পরিণতিটা খুব একটা ভালো হয় না। নেশায় বুঁদ হয়ে ছাত্রজীবনটা নষ্ট হয়, আর তারপর বড় কোন অসুখ বাধিয়ে নষ্ট হয় পুরো জীবনটাই। মাদকের কোন সুফল বলে কিছু নেই। অর্থ, স্বাস্থ্য, সময় অপচয় ছাড়া আর কিছুই অর্জন করতে পারবে না তুমি।

কিভাবে তুমি নিজেকে মাদকের এই বিষাক্ত ছোবল থেকে নিজেকে দূরে রাখবে তাই চলো দেখে আসি।

দারুণ সব লেখা পড়তে ও নানা বিষয় সম্পর্কে জানতে ঘুরে এসো আমাদের ব্লগের নতুন পেইজ থেকে!

১) বন্ধু নির্বাচনে সতর্ক হও

” সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ!” কথাটা নিশ্চয়ই শুনেছো? একজন প্রকৃত বন্ধু তোমার জীবনে বিভিন্নভাবে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং সারাজীবন তোমার মঙ্গল কামনা করে। অন্যদিকে তোমার জীবনকে নেতিবাচক কোন রাস্তায় নিয়ে যেতে একজন বন্ধুই কিন্তু যথেষ্ট। আচ্ছা একবার চিন্তাই করে দেখো না। যে তোমার দিকে সিগারেট এগিয়ে দেয় এবং বলে “আরে কিচ্ছু হবে নাহ!” সে কি আসলেই তোমার বন্ধু? কোন বন্ধু কি আরেক বন্ধুর হাতে বিষ তুলে দিতে পারে?

ভালো মন-মানসিকতার, সৃজনশীল মানুষদের সাথে বন্ধুত্ব করার চেষ্টা করবে যেন সব সময় ভালো কিছু শিখতে পারো। যদি তোমার বন্ধুদের মাঝে কেউ মাদকাসক্ত থাকে, তাহলে তার সাথে ভালো ব্যবহার করো এবং চেষ্টা করো যতটা সম্ভব তাকে সঠিক পথে নিয়ে আসতে। যদি তোমার পক্ষে একান্তই সম্ভব না হয়, তবে তাকে এড়িয়ে চলাই ভালো। এতে করে তুমি নিজেকে মাদক থেকে দূরে রাখার পথে এগিয়ে যাবে কয়েকগুণে।

২) “না” বলতে শেখো

দেখা যায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই “না” বলতে না পেরে শুরুতে মাদক গ্রহণ করে অনেকে। আর শেষ পর্যন্ত এই মাদক আর সে ছেড়ে উঠতে পারে না। আসলে বিভিন্ন কথার কারণেই তুমি “না” বলে উঠতে পারো না। যেমন, “আরেহ, জীবনে সব রকমের অভিজ্ঞতারই প্রয়োজন আছে!” ; “একবার টেস্ট করে দেখ, তুই তো আর নেশাগ্রস্ত হয়ে যাচ্ছিস না!” এসব কথা শোনার পরে যদি “না” বলতে পারো, তাহলে তোমাকে তারা অন্য স্তরে নিয়ে যায় যেখানে তোমাকে সবাই ক্ষেপানোর চেষ্টা করে।

“তুইতো মায়ের কোলের ছেলে, এগুলো কেন খাবি!”- এই ধরণের কথা বার্তায় প্রভাবিত হয়ে অনেকেই ভড়কে যায়। নিজের মত পরিবর্তন করে বন্ধুর কথায় মাদক গ্রহণ করাকেই এক প্রকার চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখতে থাকে! আর এভাবেই “না” বলার মন-মানসিকতা নষ্ট হয়ে যায় কিছুক্ষণের মাঝেই।

তাই নিজের উপর বিশ্বাস রাখো। তুমি যা করছো সেটাই সঠিক। না মানে না, তারা তোমাকে যতোই রাগানোর চেষ্টা করুক তুমি স্থির থাকো নিজের সিদ্ধান্তে। যদি না পারো তাদের প্রস্তাবে না বলে সরে যাও অন্য কোথাও। যতই তাদের কথায় নিজেকে পরাজিত মনে হোক, তুমি যদি প্রথমেই “না” বলে এবং শেষ পর্যন্ত নিজের “না” শব্দের প্রতি বিশ্বাস রেখে যাও তাহলে তুমিই সত্যিকারের বিজয়ী।

ঘুরে আসুন: ছাত্রজীবনেই বিদেশ ঘুরে আসুন কম খরচে!

৩) ইতিবাচক মন মানসিকতা তৈরি করো

মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ার আরও একটি বড় কারণ হিসেবে দেখা হয় হতাশা। হতাশাগ্রস্ত সময় অতিক্রম করতেই তারা মাদক বেছে নেয়। ব্যক্তিগতভাবে, আমি এই হতাশার কারণে মাদকাসক্ত হয়ে যাওয়ার বিষয়টি কখনোই মেনে নিতে পারি না। হতাশার জন্ম হয় নেতিবাচক চিন্তা ভাবনার কারণে। কোন কাজে ব্যর্থ হয়ে হার মেনে হতাশ হওয়া কিংবা কারো কাছে আচ্ছামত বকুনি খেয়েই কি হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়তে হবে?

কোন কাজে ব্যর্থ হলে সেই ব্যর্থতার থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করতে হবে এবং চেষ্টা করে যেতে হবে বারবার। কারও বকা শুনেও হতাশ হওয়ার কিছু নেই, তোমার গুরুজন তোমার ভালো চান বলেই বকেছেন। তাদের কথা মেনে নিয়ে হাসিমুখে থাকো। এমনি প্রতিদিনের জীবনে হরেক রকম কারণে শিক্ষার্থীরা হতাশ হয়ে পড়ে। সেগুলো ইতিবাচকভাবে চিন্তা করে সমাধান করার চেষ্টা করো। নিজের কাছের মানুষদের সমস্যা কথা জানিয়ে সমাধানে আসার চেষ্টা করো। একা একা হতাশ হয়ে কোন ভুল সিদ্ধান্ত নিলে তার ফল সারাজীবন টেনে বেড়াতে হবে তোমাকেই।

দেখে নাও ছাত্র অবস্থায় টাকা উপার্জন করার কিছু উপায়!

মানুষের সাথে সুন্দর ও মার্জিতভাবে কথা বললে যেকোন কাজ কিন্তু অনেক সহজ হয়ে যায়!

কথা বলার এমন সব টিপস নিতে ঘুরে এসো এই প্লেলিস্টটি থেকে!

Communication Secrets!

৪) সৃজনশীল কাজের মাঝে নিজেকে ব্যস্ত রাখো

একাকীত্ব জীবনযাপন করাও অনেকের জন্যেই মাদকাসক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এখান থেকে বের হয়ে আসতে চাইলে তোমার স্কুল-কলেজের বিভিন্ন ক্লাবের সাথে যোগদান করো। তাদের সাথে ওয়ার্কশপ এবং ইভেন্টগুলোতে পারফর্ম করো। তোমার নিজের জানা সৃজনশীল কাজগুলো অন্যকে শেখাও এবং অন্যের কাজগুলো থেকে নিজে শেখার চেষ্টা করো। এতে করে সবার সাথে একটা ভালো সম্পর্ক বজায় থাকবে। আর তুমিও ব্যস্ত থাকবে নিজের জীবনকে নিয়ে।

আরও যা করতে পারো তা হল, সবার সাথে কথা বলা। কমিউনিকেশন স্কিল ডেভেলপ করতে থাকো, এতে অনেক ধরণের মানুষের সাথে পরিচয় হবে। একাকীত্ব সময় পার করার সুযোগই তুমি এতে পাবে না। এই সময়ে নিজেকে জানা, নিজের পছন্দ এবং প্যাশন সম্পর্কে জানা অত্যন্ত জরুরি। লেখালেখি, ভ্রমণ, নাচ, গান, কবিতা আবৃত্তির মতন নানান সৃজনশীল কর্মের মাঝে নিজের পছন্দের কাজটায় ব্যস্ত থাকলে তুমি নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে পারবে মাদকের অন্ধকার জগৎ থেকে।

৫) শরীরচর্চায় মনোযোগী হও

নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে সুস্থ জীবনযাপনের ইচ্ছা থাকলে মাদক থেকে দূরে থাকবে তুমি। সঠিক খাদ্যাভ্যাসের মাঝে নিজেকে অভ্যস্থ করতে পারলে দিন শেষে সুঠাম দেহের পাশাপাশি স্বাস্থ্যবান মানুষ হিসেবেই পার করতে পারবে সম্পূর্ণ জীবন। ছাত্রজীবন থেকেই আস্তে আস্তে রুটিন মেনে ব্যায়াম আর স্বাস্থ্যকর খাবারের ফলে নিশ্চিত জীবন পার করতে কোনই অসুবিধা হবে না তোমার।

৬) কিছু ভুল ধারণা নিয়ে কথা বলা যাক

স্মোকিং কিংবা ড্রাগস নিয়ে মানুষের মাঝে প্রচলিত বেশ কিছু ভুল ধারণা রয়েছে। এসব ভুল ধারণার উপর ভিত্তি করে ধীরে ধীরে কেও নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়লে তা আসলেই দুঃখজনক। চলো এসকল প্রচলিত ভুল ধারণা থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা করি।

ধারণা ১: ছাত্রাবস্থায় “SMOKING”-করা অনেক “COOL” একটা বিষয়!

খুব কষ্ট করে মেনে নিতে হবে কিন্তু এটাই সত্যি যে এমন ধারণা অনেক শিক্ষার্থীর মাঝেই দেখা যায়। ছেলেদের মাঝে এমন প্রবণতা সব থেকে বেশি। আকাশের দিকে তাকিয়ে সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে ফুটপাথ ধরে হেঁটে যায় আর ভাবতে থাকে “আমি তো বিশাল এক সুপারহিরো!” আরও কত কী। আসলে এসব কিছুই না। আলাদা একটা “ভাব” আছে, এমন ভেবে নিজের জীবনের মূল্যবান সময় বিসর্জন দিয়ে যাওয়া আসলে নিতান্ত বোকামি।

ঘুরে আসুন:  ছাত্রজীবনেই বিদেশ ঘুরে আসুন কম খরচে: পর্ব ২

একবার চিন্তা করে দেখো তো, একটা স্টুডেন্ট রাস্তাঘাটে নেশাগ্রস্ত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, সে তোমার কাছে “COOL” নাকি যে ছেলেটা বিজ্ঞান মেলায় অংশগ্রহন করছে, বিতর্ক শিখছে, লেখালেখি করছে, সে বেশি  “COOL”? নিজেকে ভুল পথ থেকে বাঁচিয়ে রেখে সঠিক সিদ্ধান্ত না নিতে পারলে ভয়ংকর ভবিষ্যতের দিকেই হেঁটে যাবে তুমি।

ধারণা ২: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া যখন তখন ঘুমের ঔষধ গ্রহণ!

ঘুম আসছে না দেখে কিংবা ঘুম তাড়ানোর জন্যে বিভিন্ন ধরণের ট্যাবলেট জাতীয় দ্রব্য চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতিত সেবন করাটা অনেক বড় ধরণের ঝুঁকির বিষয়। নিজে নিজেই যদি এ ধরনের কাজ প্রতিনিয়ত করতে থাকো তাহলে দেখা যাবে তুমি সেই ট্যাবলেটগুলো ছাড়া আর ঘুমাতেই পারছো না।

ঔষধ এবং মাদকদ্রব্যের মাঝে পার্থক্য রয়েছে। তুমি যদি কোন সমস্যায় ভুগছো বলে মনে করো, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিবে। সেক্ষেত্রে তোমার সমস্যা সমাধানের জন্যে কিছু ঔষধের প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু তোমার সমস্যা সমাধানের পরেও যদি তুমি নিয়ন্ত্রণহীন ভাবে সেই ঔষধগুলো গ্রহণ করতে থাকো, তাহলে সেই ঔষধগুলোই মাদক দ্রব্যে পরিণত হবে। তাই ভালো ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া নিজে নিজেই ঔষধ গ্রহণের বেলায় কোন পদক্ষেপ নেবে না।

সঠিকভাবে কোন ইংরেজি শব্দ উচ্চারণ করতে পারা ইংরেজিতে ভাল করার জন্য অত্যন্ত জরুরি।

আমার খুব পছন্দের একজন বক্তা সন্দীপ মাহেশ্বরী  একটি সেশনে বলেছিলেন, “মাদকাসক্তির শুরু হয় ‘এক’ থেকে। মজা করে, কৌতুহলের কারণে কিংবা যে কারণেই হোক তুমি যদি একবার মাদক গ্রহণ করো তাহলে ৯৯% সম্ভাবনা আছে তুমি নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়বে।”

এই বক্তব্যটি চমৎকার বক্তব্যটি সবসময় নিজের চিন্তায় রাখা উচিত। আমাদের কৌতূহলগুলোকে ভালো কাজের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করো আর ছাত্রজীবনকে সঠিকভাবে ব্যবহার করো। তোমাদের সবার জন্যে শুভকামনা।


১০ মিনিট স্কুলের লাইভ এডমিশন কোচিং ক্লাসগুলো অনুসরণ করতে সরাসরি চলে যেতে পারো এই লিঙ্কে: www.10minuteschool.com/admissions/live/

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: write@10minuteschool.com

 

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
Author
Mustakim Ahmmad

Mustakim Ahmmad

Currently, Mustakim Ahmmad is a student of Dhaka City College. Although he is only an intermediate second year student, he is 6 feet tall! But his dreams are much more higher than his height. A Sherlock Holmes fan, loves watching TV series and listening to rock music.
Mustakim Ahmmad
এই লেখকের অন্যন্য লেখাগুলো পড়তে এখানে ক্লিক করুন
What are you thinking?