ভাষা বনাম ব্যাকরণ: জ্ঞানের উন্মেষ ও অন্যান্য

ছুটির দিন কাটাচ্ছিলাম। এরই মধ্যে ফোন করেন আমার খালামণি। বেশ চিন্তিত তিনি। অর্ণবকে বাংলা পড়াতে হবে। তার প্রচুর অনীহা ব্যাকরণের প্রতি। কোন ছাড় দেয়া নিষেধ। আমার ছুটিতে আয়েশের দিনগুলোও যে ভেস্তে চলে যাবে এরই মধ্যে- বুঝতে বাকি রইল না। ওহ, বলতে ভুলে গেছি, অর্ণব আমার খালাতো ভাই। মেধাবী। চমৎকার দাবা খেলে। অনেক কৌতুহল থাকলেও ব্যাকরণের নাম শুনতেই পালাই পালাই করে। অবশেষে খালামণির বাসায় গিয়ে পড়ানো শুরু করতেই বাঁদরটা বলে উঠে:

– ভাইয়া, মা তোমাকে যে কী বললো, আমি জানি না। তবে ব্যাকরণ জিনিসটা মোটেও ইন্টারেস্টিং মনে হয় না আমার।
– হুম, তা… এমনটা কেন মনে হলো?
– আমার মনে আছে, ক্লাস ফাইভে যখন বিশ্বজিৎ স্যার আমাদের ক্লাসে ঢুকেই ব্যাকরণের সংজ্ঞা পড়াতে লাগলেন, সেদিন একঘেয়েমির কোন শেষ ছিলো না। প্রচুর ঘুম পেয়ে বসে। ভাবতে লাগলাম, কীভাবে একজন মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যাকরণ পড়তে পারে! এ যেন আমার ধারণার বাইরে।
– হাহা! বেশ তো, পড়িয়েছেন যখন, ব্যাকরণ কী তা জানো নিশ্চয়ই?
– তা জানবো না! আলবত জানি। এতদিনে এইটুকু জানবো না! শোনো তাহলে: যে পুস্তক পাঠ করিলে ভাষা শুদ্ধভাবে বলিতে, লিখিতে ও পড়িতে পারা যায়, তাহাই ব্যাকরণ!
– হয়নি! (অর্ণব ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে, যেন পরিস্থিতি তার মাথার উপর দিয়ে গেল।)
– কেন?
– পুরো ভুল না হলেও সংজ্ঞাটি অর্ধসত্য, বলার অপেক্ষা রাখে না। তুমি যে মুহূর্তে সংজ্ঞাটি সাধু ভাষায় বললে তখনই সন্দেহ হচ্ছিলো যে তুমি কথাটি বুঝে বলোনি। মুখস্থ করে বলেছো। শোনো, জ্ঞানের উন্মেষ ঘটে একটি সঠিক প্রশ্ন দিয়ে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় সাধারণত প্রথমেই ভুল প্রশ্নটি করা হয়। ভেবে দেখো, একটি ভবন নির্মাণ করতে গিয়ে তুমি পিলার না বানিয়েই মেঝে তৈরির প্রকল্প নিলে, কী হবে এতে?

১০ মিনিট স্কুলের পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য আয়োজন করা হচ্ছে অনলাইন লাইভ ক্লাসের! তা-ও আবার সম্পূর্ণ বিনামূল্যে!

– ভবনটি তৈরি তো করা যাবে, কিন্তু টিকবে না। কয়েক তলা করতে করতেই ধস্ করে ভেঙে পড়বে। পিলার তো এখানে ভবনের Foundation. একে অস্বীকার করে, কিংবা বাদ দিয়ে পরের পদক্ষেপে যাওয়া নিরেট বোকামির সামিল।
– হ্যা অর্ণব! এক্স্যাক্টলি! তার মানে দাঁড়াচ্ছে যেকোনো কিছু শিখতে, এবং প্রগাঢ়ভাবে আত্মস্থ করতে হলে এর foundation কী তা জানতে হবে, সঠিক প্রশ্নটি করতে হবে। ব্যাকরণের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই। তোমার ব্যাকরণের প্রতি এমন অনীহা আর ভীতি এজন্য আছে কারণ বুদ্ধিমান অর্ণব পিলার না নির্মাণ করেই মেঝে মির্মাণ করে ফেলছে এবং বারবার ভাবছে, ‘ভবনটি পড়ে গেলে? তখন কী হবে?’

ঘুরে আসুন: গণিত নিয়ে ভাবনা? আর না!


অর্ণব ইতোমধ্যে তার ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছে।
– আচ্ছা, তাহলে তুমিই বলো কী সেই সঠিক প্রশ্ন।
– হুম, ব্যাকরণ কোন জিনিসকে কেন্দ্র করে বলো তো?
– হুম… কী হবে… ভাষা?
– রাইট অর্ণব! একদম তাই! এখন বল দেখি, ভাষা কাকে বলে?
– আরেকটা সহজ প্রশ্ন তুমি জটিল বানাবে বুঝতে পারছি! তবে এটাও শোনো, যাহা দ্বারা মনের ভাবকে প্রকাশ করা যায়, তাহাই ভাষা।
– বটে?
খালামণি রান্নাঘর থেকে ঠিক তখনই জিজ্ঞেস করল, ‘বাবা, নাস্তা কি এখন করবে?’
না-সূচক নাড়া দিতেই খালা বুঝে গেলেন। এবার অর্ণবের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলাম:
– কোন শব্দ উচ্চারণ না করেই আমি খালামণির কাছে মনের ভাবটি প্রকাশ করলাম। এক্ষেত্রে তোমার ‘ভাষা’র সংজ্ঞা কী বলে? একেও কি ভাষা বলবে?
– এটাকে সাইন ল্যাংগুয়েজ তো বলতে পারো।
– তা পারি বটে। কিন্তু সেখানে তো ব্যাকরণের কোনো হদিস নেই। কথাটা তো মূলত ব্যাকরণের, তাই না? ঐ অর্থে এটা ভাষা নয়।
– আচ্ছা! বুঝতে পেরেছি! (অর্ণবের চোখ জ্বলজ্বল করছে) তার মানে… তার মানে… ভাষা হলো ধ্বনি উচ্চারণ করে মনের ভাব প্রকাশ করা। তাই তো?
– কাছাকাছি গিয়েছো কিন্তু ব্যাপারটা এখনও ঘোলাটে রয়ে গেছে। আচ্ছা, কুকুরের ঘেউঘেউ, শেয়ালের হুক্কাহুয়া, কাকের কা-কা, ব্যাঙের ঘ্যাঙর-ঘ্যাঙ শব্দ উচ্চারণ করে কি তারা ‘কী খবর?’, ‘মাসি ভাল আছে তো?’, ‘ঢাকা থেকে কবে ফিরলে হে?’, ‘আমার মাথা নত করে দাও তোমার’ এগুলো বোঝায়?
–  আহা! কথা হচ্ছে মানুষের ভাষা নিয়ে, আর ব্যাকরণ নিয়ে। ওখানে ফিরে আসা যাক?

এরই মধ্যে প্রিয় খালামণি পুরো লহমাটাকে আরেকটু রোমাঞ্চকর করে তুলতে আমাদের জন্য কফি নিয়ে এলেন। তর্ক-বিতর্ক এবার অনেক বেশি জমে উঠেছে।

– তোমাকে বিভ্রান্ত করার কোন শখ আমার নেই, অর্ণব। তুমি আদতে প্রথমেই অনেক বিভ্রান্ত হয়ে আছো। আমি কেবল তোমার পিলার নির্মাণের সিমেন্টটুকু দিয়ে যাচ্ছি এতক্ষণ- সঠিক প্রশ্ন করতে শেখাচ্ছি। তুমি ভাষা কী, তা না জেনেই যদি ব্যাকরণ কাকে বলে পড়তে থাকো, তাহলে এর থেকে বেশি বিভ্রান্তিকর আর ভয়াবহ ব্যাপার কী হতে পারে?

(অর্ণবের এবার মনোযোগ এসেছে।)

কফির কাপে একটু চুমুক দিয়ে বলতে লাগলাম,
– তাহলে এবার বোঝা দরকার ভাষা আদতে কী। মনের ভাব প্রকাশ করা ভাষার কাজ- এতে এক তিল সন্দেহ নেই। কিন্তু, তা চোখ দিয়ে বা ইশারা করে দিলেই হয়ে ওঠে না। ভাষার মৌলিক দিকটি হলো ধ্বনি বা আওয়াজ। তবে এখানেও অনেক কিছু বিবেচনায় রাখার মতো ব্যাপার রয়েছে। এখানে ধ্বনি কোন পশু-পাখির হলে চলবে তো না-ই, এমনকি অনেক পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের নিঃসৃত ধ্বনিও ভাষার আওতায় পড়ে না। যেমন: উঃ! আঃ! করে কেঁদে উঠলে তা ভাষা নয়। কিংবা, খেতে খেতে কড়মড় শব্দ করলেও তা ভাষা নয়। অতএব, ভাষার প্রথম শর্ত- এটি ধ্বনি হতে হবে। এবং, দ্বিতীয় শর্ত হলো ধ্বনিটি অর্থবোধক হতে হবে।
– তাহলে মোদ্দা কথাটা দাঁড়াচ্ছে, অর্থপূর্ণ ধ্বনি উচ্চারণের ফলে যে মনের ভাব প্রকাশ পায়, তাকে ভাষা বলে। ঠিক?

এবার বাংলা শেখা হবে আনন্দের!

আমাদের প্রতিটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বাংলা ভাষা চর্চার গুরুত্ব অপরিসীম!

তাই আর দেরি না করে, আজই ঘুরে এস ১০ মিনিট স্কুলের এক্সক্লুসিভ বাংলা প্লে-লিস্টটি থেকে!

১০ মিনিট স্কুলের বাংলা ভিডিও সিরিজ

– ঠিকই বলেছো। কিন্তু পাকা হয়ে ওঠোনি এখনও। অর্থপূর্ণ ধ্বনি কী তাও একটু বুঝে নেয়া উচিত। চলো একটু আদিম সমাজে ঘুরে আসা যাক। সভ্যতার সূচনার আগেও মানুষের মধ্যে তার চাহিদা, আকাঙ্ক্ষা, বেদনা ইত্যাদি বোঝাবার সহজাত ধর্ম বিদ্যমান ছিলো। কিন্তু কোন শব্দ করলেই সে তার মনের ভাবটি প্রকাশ করতে পারতো না। কারণ, সেই ধ্বনি বোঝা শক্ত ছিলো। তবে ধ্বনির নির্দিষ্ট ব্যবহার সময়ের সাথে সাথে ভাষা হয়ে ওঠে। মানুষ নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট ধ্বনিকে, নির্দিষ্ট অর্থে স্থির করে নেয়।

ঠিক তেমনই তুমি লক্ষ করবে যে একজন পর্তুগিজের সঙ্গে তুমি চাইলেই বাংলায় কথা বলতে পারবে না। আবার পর্তুগিজ চাইলেও তার মাতৃভাষায় কথা বলে তোমাকে কিছু বোঝাতে পারবে না। মজাটা এখানেই, যে তোমাদের দুইজনের ভাষাই অর্থপূর্ণ। তবুও কেন বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে? কারণ ভাষা কোন ব্যক্তিগত জিনিস নয়। বরং, এটি সামাজিক। অর্থাৎ একাধিক মানুষের মধ্যে প্রকাশিত ভাষার ধ্বনি শুধু অর্থপূর্ণই নয়, এটি সামাজিকভাবে স্বীকৃতও হওয়া চাই। তাই তৎকালীন সময়ে রাজাকে ‘মালিক’ না বলে ‘মালি’ বলে ফেললে তোমাকে শূলে চড়ানো হতো! কী ভয়াবহ হতো সেটা তা বুঝতেই পারছো। কাজেই ধ্বনির অর্থপূর্ণতা যদি নির্দিষ্ট সমাজের জন্য বোধগম্য না হয়, তা কোনভাবেই ভাষা নয়।

– হুম, এতগুলো কথা তো বললে। কিন্তু পরীক্ষার আর কয়েকটা দিন বাকি। এখন আমাকে প্লিজ বলবে কোন সংজ্ঞা ভাষার ক্ষেত্রে সঠিক? কোনটা লিখবো?
– যদি সত্যি সত্যিই বুঝে থাকো, নিজে একটা সংজ্ঞা বানিয়ে নিলেই পারো। বুঝতে পারলে এবং সঠিক ভাষাজ্ঞান থাকলে একটা সংজ্ঞাকে কখনই Stone-written হতে হয় না। নিজে নিজেই তৈরি করা সম্ভব। ব্যাকরণ বোঝার অনেক আগে ভাষাটাকে ভালভাবে বুঝতে হবে। তবে হ্যাঁ, তুমি চাইলে ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের সংজ্ঞা পড়ে দেখতে পারো: ‘মনের ভাব প্রকাশের জন্য বাগযন্ত্রের সাহায্যে উচ্চারিত ধ্বনির দ্বারা নিষ্পন্ন কোন বিশেষ জনসমাজে ব্যবহৃত, স্বতন্ত্রভাবে অবস্থিত তথা বাক্যে প্রযুক্ত শব্দ সমষ্টিকে ভাষা বলে।’ সংজ্ঞাটি বেশ বড়, তবে বুঝে পড়লে পানির মত সোজা।

ঘুরে আসুন: লেখাপড়ার মাঝেও বিনোদন? কি করে সম্ভব?


অর্ণব মুখে হাত রেখে খুব গম্ভীরভাবে ভাবছে। ওকে কিছু একটা বোঝাতে পেরেছি মনে করে ভাল লাগছিল। হঠাৎ কী মনে করে লাফ দিয়ে জিজ্ঞাসা করে উঠলো:

– আচ্ছা, ব্যাকরণের সংজ্ঞাটা তাহলে কী দাঁড়াচ্ছে?
– এবার এসেছো কথায়। ব্যাকরণ আদতে একটি বিজ্ঞান।
– বিজ্ঞান? মজা নিচ্ছো আমার সাথে? কীভাবে?
– অবশ্যই বিজ্ঞান। ঠিক যেমন জীববিজ্ঞান আছে, পদার্থবিজ্ঞান আছে তোমাদের, তেমনই ব্যাকরণও এক প্রকার বিজ্ঞান। জীববিজ্ঞান জীব বিষয়ক বস্তু নিয়ে, পদার্থবিজ্ঞান পদার্থ নিয়ে। আর ব্যাকরণ এক্ষেত্রে সুর বাঁধে ভাষার সঙ্গে। তুমি আগে আমাকে বল, বিজ্ঞান শব্দটার অর্থ কী?
– ওহ, দাঁড়াও। অনেক আগে পড়েছি। হুম… বিজ্ঞান অর্থ… বিজ্ঞান অর্থ বিশেষ জ্ঞান।
– চমৎকার! কিন্তু বিশেষ জ্ঞান কেন বলা হয় জানো তো? জ্ঞানকে দুইভাগে ভাগ করা যায়। সাধারণ জ্ঞান, এবং বিশেষ জ্ঞান। আমাদের প্রতিদিনের জীবনের, সাধারণ অভিজ্ঞতা দিয়ে আমরা যে জ্ঞান লাভ করি, তা হলো সাধারণ জ্ঞান। আর, গভীর পর্যবেক্ষণ আর এক্সপেরিমেন্ট করার মধ্য দিয়ে কোন কিছুর ধর্ম, বৈশিষ্ট্য যখন জানতে পারা যায়, তখন সেটি হয়ে ওঠে বিশেষ জ্ঞান, বা বিজ্ঞান! যেমন ধরো, ইতিহাসে কি একমাত্র নিউটন সাহেবের মাথার উপরেই কোন বস্তু পড়েছিলো? তার আগে কারও মাথায় কিচ্ছু পড়েনি? সাধারণ মানুষ কিন্তু কোনো বস্তু ফেলে দিলে নিচে পড়বে, তা ভাল করেই জানতো। তবে স্যার আইজ্যাক নিউটনই সর্বপ্রথম আপেল ঠিক কীভাবে আর কেন পড়েছে তা বিশ্লেষণ করেন। যাকে আজ আমরা ‘মহাকর্ষ’ হিসেবে জানি। তো এখন বল তো অর্ণব, ব্যাকরণ কীভাবে বিজ্ঞান হলো?
– তার মানে কি ব্যাকরণ ভাষাকে বিশ্লেষণ করে?
– শাবাশ! আগেই বলেছি ভাষা সামাজিকভাবে স্বীকৃত হওয়া চাই। এবং স্বীকৃত কখন হওয়া সম্ভব? যখন এর কিছু নিয়ম থাকে। ব্রহ্মান্ডের সব কিছু যেমন একটি সূক্ষ্ম নিয়ম, আইন, অর্ডারের তালে তালে চলছে, তেমনই ভাষাও কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়মে চলে। আচ্ছা, কফির মগটা রেখে দিয়ে আসবি তুমি?
– … (অর্ণব কিছুই বুঝলো না)
– অদ্ভুত শোনালো না? আমরা সামাজিকভাবে ‘তুমি’- এর পর ‘আসবি’ বা ‘যাবি’ শুনি না। কারণ একে এটা বাংলা ভাষার নিয়মের বাইরে। আর দ্বিতীয়ত, নিয়মের বাইরে থাকায় শুনতেও বেমানান লাগছে।
– আমি এবার ধরতে পেরেছি, ভাইয়া! (লাফ দিয়ে উঠলো) ব্যাকরণ হলো সেই পুস্তক, যা পাঠ্য করলে ভাষা শুদ্ধভাবে পড়তে…
– এবার ভুল করলে। যা বলছিলাম, ভাষার এ নিয়মগুলো ব্যাকরণ শুধু আবিষ্কার (Discover) করে। যেমন, জে. জে. থমসন এবং তাঁর সহকর্মীরা প্রোটন আবিষ্কার করেন। এক্ষেত্রে বোঝা জরুরি, যে প্রোটন আগেই ছিল, কিন্তু তাঁরা এটি পর্যবেক্ষণ করে খুঁজে বার করেন। আবার রেডিওঅ্যাকটিভিটি আবিষ্কার করেন হেনরি ব্যাকক্যুরেল, রাধানাথ শিকদার প্রথম হিমালয়ের উচ্চতা আবিষ্কার করেন। কিন্তু গ্রাহাম বেল টেলিফোন আবিষ্কার করেন না। তিনি তা উদ্ভাবন (Invent) করেন।

এভাবেই ব্যাকরণ মানুষের ভাষাকে আবিষ্কার করে, উদ্ভাবন নয়। ভাষাগত গোলমাল থাকার কারণে অনেকেই ধরে নেয় যে ব্যাকরণ আগে এসেছে। তুমি কি বাংলা বলতে শিখেছো মুনীর চৌধুরী স্যারের বই পড়ে? নাকি খালামণির কাছ থেকে? অবশ্যই তোমার হাতে এক-দেড় বছর বয়সে কোন ব্যাকরণ বই ধরিয়ে দেয়া হয়নি! তুমি তোমার মত করেই বলতে এবং আস্তে আস্তে যখন বড় হতে লাগলে তখন তোমার ভাষাজ্ঞানও বাড়তে থাকে, ততোই তুমি সামাজ-স্বীকৃত বাংলায় কথা বলতে লাগলে। এখন তুমি যদি লিখতে গিয়ে কোন ভুল করে বসো, তাহলে ব্যাকরণ বলে দেবে কোথায় ভুলটি করেছো।

তবে তার মানে এই নয় যে ব্যাকরণ সমগ্র ভাষাটাকেই শুদ্ধ করছে। ব্যাকরণে কেবলই মানুষের মুখে বলা ভাষাটি কীভাবে ভাষা হয়ে উঠলো, কেন ভাষা হয়ে উঠলো, ‘তুমি’ এর পর ‘আপনি’ ঘরানার শব্দ কেন বসে না, এগুলো বিশ্লেষণ করে। তাই তোমাকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে- ভাষা কখনও ব্যাকরণ মেনে চলে না। বরং ঘটনাটি সম্পূর্ণ উল্টো। অর্থাৎ সময়ের সাথে সাথে ভাষা ব্যাকরণের উপর আরোপ করতে পারে, ব্যাকরণ ভাষার উপরে আরোপ করতে পারে না।

ইদানীং লক্ষ্য করে থাকবে, আরবান ডিকশনারি বলতে একটা ব্যাপার চলে এসেছে- বিভিন্ন দেশের আঞ্চলিক শব্দের অর্থ সেখানে সাজানো আছে। আঞ্চলিক শব্দ ওভাবে গুরুত্ব পেত না, তবে সময়ের সঙ্গে মানুষের ব্যবহৃত ভাষার পরিবর্তন হয় বলে তাকে অস্বীকার করা যায় না। অতএব সমাজের প্রয়োজনে যে ভাষা গঠিত, তাকে বিশ্লেষণ করাই ব্যাকরণের কাজ। ব্যাকরণকে এখানে একটি বাধ্য সন্তানের মত করে চলতে হয়।
– তাহলে ‘ব্যাকরণ’ শব্দটির অর্থ কী?
– শুনলে আশ্চর্য হবে, ব্যাকরণ শব্দটি আদতে ‘আবিষ্কারে’র সমার্থক শব্দ। যদি গুছিয়ে বলি, ব্যাকরণ হচ্ছে সেই বস্তু, বা tool, যা দ্বারা ভাষা সর্বপ্রথম আবিষ্কার হয়েছে। এবং আবিষ্কার হওয়া মাত্রই ব্যাকরণ তার কাজ ছেড়ে দেয়নি। বিজ্ঞানের ধর্মই হচ্ছে একটির ফলাফল বের হলে, ঐ ফলাফলকে কাঁচের মত ভাঙতে ভাঙতে আবার আরেকটি সিদ্ধান্তে আসা। তেমনই ব্যাকরণ ভাষাকে তো বটেই, শব্দকেও ভেঙেছে। যেকারণে তোমরা আজ সন্ধি বিচ্ছেদ পড়ো। আস্তে আস্তে আমাদের বাক্য কীভাবে গঠিত হয়, কী কী শব্দ থাকে, কেনই বা থাকে, শব্দগুলো কোত্থেকে এলো, কোন ভাষা থেকে এলো, আমাদের কথা বলার ভঙ্গিকে ভেঙে বিরামচিহ্ন বের করা ইত্যাদি ব্যাকরণ করেছে।

তার মানে কী দাঁড়াচ্ছে? একটি ভাষা কী নিয়মে চলে তার বিশ্লেষণই ব্যাকরণ। বা সহজে বললে, যা ভাষাকে বিশ্লেষণ করে তাই ব্যাকরণ। তবে হ্যাঁ, এ সংজ্ঞাটি তোমাকে বোঝানোর জন্য বললাম বৈকি। তবে আবারও ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের সংজ্ঞাটি মাথায় রাখতে পারো: যে শাস্ত্র কোন ভাষাকে বিশ্লেষণ করে তার স্বরূপ, আকৃতি ও প্রয়োগনীতি বুঝিয়ে দেয়া হয়, সেই শাস্ত্রকে বলে সেই ভাষার ব্যাকরণ।

অর্ণব এবার সুকান্ত ভট্টাচার্যের মত এক গালে হাত দিয়ে নিচে তাকিয়ে আছে। আর কী যেন একটা ভাবছে। ওর মধ্যে একই ভাবটি দাবা খেলার সময় দেখা যায়।

মুচকি হাসি দিয়ে বললাম:
– ভাবনায় পড়ে গেলে মনে হচ্ছে!
– হুম, আমার ভাবতেই অবাক লাগছে এত প্রগাঢ় বিষয় ভাষা আর ব্যাকরণ হতে পারে। একথাগুলো আমার কয়েকদিন ভেবে দেখা দরকার। আমার এখন ব্যাকরণ বিষয়টা ভয় লাগছে না, বরং অনেক বেশি ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে। এবার আমাকে বলো, ব্যাকরণের প্রয়োজনটা ঠিক কোথায়? আমরা কেন ব্যাকরণ কেন শিখবো?
– এই যে এখন তুমি আসল প্রশ্নটি করেছো। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন শুরু হয় ‘কেন’ দিয়ে। সবসময় মনে রাখবে এই কথা।

ইংরেজি ভাষা চর্চা করতে আমাদের নতুন গ্রুপ- 10 Minute School English Language Club-এ যোগদান করতে পারো!

– হ্যাঁ ভাইয়া, আমাকেও বলতে হবে, ব্যাকরণ জিনিসটা আমি যা ভেবেছিলাম, তা এটা কোন দিক দিয়েও নয়। আমার তো মনে হচ্ছে (হেসে) এখন মাথায় আগের থেকেই যা জোর করে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে, তার উপর প্রশ্নবোধক চিহ্ন রেখে দিতে হবে। নইলে যে কোন উপায় নেই ভাইয়া! হাহা!
– ঠিক বলেছো। তুমি যা-ই জানো না কেন, সবসময় কিছু মুহূর্ত স্থির থেকে বিবেচনা করতে শিখবে। তুমি মাত্র যে কথাটি বললে, আমার মনে হয় তোমার জ্ঞানের উন্মেষ ঘটতে আর দেরি নেই। ব্যাকরণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আরেকদিন বলবো। চলো এখন একটু দাবা খেলা যাক, আজ তো আমি জিতেই ছাড়বো।
– ও তোমাকে দিয়ে হবে না, ভাইয়া! হাহা!


১০ মিনিট স্কুলের লাইভ এডমিশন কোচিং ক্লাসগুলো অনুসরণ করতে সরাসরি চলে যেতে পারো এই লিঙ্কে: www.10minuteschool.com/admissions/live/

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: [email protected]

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?