যখন সব বাধা হার মানে ইচ্ছাশক্তির কাছে! (পর্ব ২)


পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবার শুনে নাও।

সবাই মুখে সোনার চামচ নিয়ে জন্মায় না। সবার ‘অসম্ভব মেধাবী’, ‘দারুণ সুন্দরী’- এমন ঈশ্বর প্রদত্ত গুণ থাকে না। পৃথিবীর বহু মানুষ প্রমাণ করে দেখিয়েছেন, সফল হতে এসব কিছু লাগে না। লাগে কেবল একটি গুণ- সাফল্যের পেছনে লেগে থাকা, কামড়ে ধরে থাকা, ঝুলে থাকা।

কখনো কখনো ব্যর্থতা-হতাশা এমনভাবে ঘিরে ধরে যে মনে হয় আর এগোনো সম্ভব নয়, হাল ছেড়ে দেওয়ার কথা মাথায় আসে। মনে হয় সফল হওয়া অসম্ভব। কিন্তু এই ‘অসম্ভব’-কেই বিশ্বাস করে এগিয়ে যাও, কথা দিচ্ছি লক্ষ্যে একদিন না একদিন পৌঁছবেই! আজ এমনই দশ জন নাছোড়বান্দা স্বপ্ন দেখে যাওয়া মানুষের গল্প নিয়ে আমাদের আয়োজন।

১। Gabriel Jesus (যেন রূপকথার গল্প!)

রূপকথার গল্পের মতোই যেন ফুটবলার Gabriel Jesus এর জীবনের উত্থান! ২০১৪ বিশ্বকাপ ফুটবল যখন হচ্ছে, Gabriel তখন হতদরিদ্র এক কিশোর। রাস্তায় সাইন আঁকার কাজ করে পেট চালাতেন, পায়ে কোন স্যান্ডেল পর্যন্ত ছিলো না তার। একদিন তিনি টিভিতে তার প্রিয় দলের একটি ফুটবল ম্যাচ দেখলেন। কিশোর Gabriel ঠিক করে ফেললেন নিজের জীবনের লক্ষ্য- একদিন জাতীয় দলের হয়ে ফুটবল খেলবেন। এবং তার সেই স্বপ্ন সত্যি সত্যি পূরণও করে ফেললেন!

২০১৪ বিশ্বকাপে রাস্তায় জীবন কাটানো Gabriel ২০১৮ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের অন্যতম সেরা নতুন তারকা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন! মাত্র একটি বিশ্বকাপের ব্যবধানেই জীবন আমূল বদলে গেলো! বর্তমানে তিনি ম্যানচেস্টার সিটিতে খেলছেন, তার সাপ্তাহিক আয়ই আশি হাজার ডলারের উপরে।

২। Howard Schultz (What an আইডিয়া!)

Howard Schultz-কে সবাই স্টারবাকস এর জন্য একনামে চেনে। মজার ব্যাপার হলো, তিনি একসময় স্টারবাকসে চাকরি করতেন এবং মালিকপক্ষের সাথে বনিবনা না হওয়ায় চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন! এর পেছনের কারণটাও ইন্টারেস্টিং- স্টারবাকস তখন কেবল কফির বীজ বিক্রি করতো। হাওয়ার্ডের অনেক অভিনব একটি স্বপ্ন ছিলো- চমৎকার স্বাদের কফি, আর দারুণ একটি পরিবেশ উপহার দেওয়া- যেন ক্রেতারা বারবার ছুটে আসে কফির টানে। কিন্তু মালিকপক্ষ তার আইডিয়া শুনেই নাকচ করে দিলো! হাওয়ার্ডও চাকরি ছেড়ে বেরিয়ে আসলেন।

দারুণ সব লেখা পড়তে ও নানা বিষয় সম্পর্কে জানতে ঘুরে এসো আমাদের ব্লগের নতুন পেইজ থেকে! The 10-Minute Blog!

তার ঠিক দুই বছর পর হাওয়ার্ড ফিরে এলেন- স্টারবাকসের মালিক হিসেবে! স্টারবাকসকে নতুন করে সাজিয়ে তুললেন তিনি। কফির বীজের ব্যবসা ছেড়ে নিজের স্বপ্নের আইডিয়াটিকে বাস্তবায়ন শুরু করলেন। বর্তমানে স্টারবাকস বিশ্বজুড়ে সমাদৃত একটি বিলিয়ন ডলার কোম্পানি।

৩। Nick Woodman (ব্যর্থতা যখন সাফল্যের চাকা ঘুরিয়ে দেয়!)

আমরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন করার পর চাকরি খুঁজি না, হয় বিসিএস-এর প্রস্তুতি নেই, নিক উডম্যান গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে হয়ে গেলেন উদ্যোক্তা- Funbug নামে একটা গেমিং প্ল্যাটফর্ম তৈরি করলেন! সেটা দারুণ সাফল্য পেলেও শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেনি, দেউলিয়া হয়ে যায়।

ঘুরে আসুন: ২০১৮ সালে কেমন রেজুমে চাই?

বেচারা নিক দুঃখ ভুলতে বন্ধুদের সাথে নিরুদ্দেশ হলেন। অস্ট্রেলিয়ার সমুদ্র সৈকতে সার্ফিং দেখতে দেখতে হঠাৎ তার মাথায় আইডিয়া খেলে গেলো- কেমন হয় যদি ছোটখাটো শক্তপোক্ত টেকসই একটা ক্যামেরা থাকতো যেটা দিয়ে সার্ফাররাও সুন্দরমতো ভিডিও করে মুহূর্তগুলো ধরে রাখতে পারতো?! সেই চিন্তা থেকেই কাজ শুরু করলেন নিক- আবিষ্কার হলো- GoPRo –খুব দ্রুতই অসম্ভব জনপ্রিয়তা পেলো ছোট্ট এই একশন ক্যামেরাটি, নিকও হয়ে গেলেন বিলিয়নেয়ার! পেছন ফিরে দেখলে নিক বলতেই পারেন- Funbug এর দেউলিয়া হয়ে যাওয়াটা ছিল তার জীবনের সেরা মুহূর্ত! এমন প্রায়ই হয়- তোমার সবচেয়ে খারাপ মুহূর্তটি তোমার জীবনের সবচেয়ে ভালো মুহূর্তের দোর খুলে দেয়।

৪। Soichiro Honda (জাপানের স্বপ্ন সারথি)

জনাব হোন্ডার জন্ম নিতান্ত দরিদ্র এক পরিবারে। ছোটবেলা থেকেই বাবার সাথে কাজে সাহায্য করতেন তিনি। পড়ালেখাও খুব বেশিদূর করা হয়নি তার,সামান্য একজন মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করতেন তিনি। মোটরসাইকেল- বাইসাইকেল এগুলো নিয়েই ছিল তার কাজ, সাইকেল মেরামত করা, পুরোন ইঞ্জিন যুক্ত করা ইত্যাদি। সেগুলো করতে গিয়েই তিনি স্বপ্ন দেখলেন একদিন অনেক বড় একটি কোম্পানি খুলবেন তিনি- অনেক দামী দামী যন্ত্রাংশ দিয়ে মোটরসাইকেল বানাবেন!

বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করে হোন্ডা সাহেব বেশ কিছু টাকা জমিয়েছিলেন। সেগুলো দিয়ে সত্যি সত্যি তিনি নিজের নামে স্বপ্নের কোম্পানিটি খুলে ফেললেন। তার কোম্পানি বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত উন্নতমানের মোটরসাইকেল তৈরি করে চলেছে। এমনকি বাংলাদেশেও হোন্ডা কোম্পানি এতো জনপ্রিয় যে ‘হোন্ডা’ শব্দটি ‘মোটরসাইকেল’ এরই একটি সমার্থক নাম হয়ে গেছে!

৫। Anna Wintour (নতি স্বীকার? কভি নেহি!)

Anna Wintour কাজ করতেন Harper’s Bazaar নামের বিখ্যাত একটি ম্যাগাজিনে ফ্যাশন কলাম লেখক হিসেবে। প্রায় আধবছর কাজ করার পর একটি বিষয় নিয়ে সম্পাদকের সাথে মতামতে দ্বন্দ্ব বাঁধলো তার। নিজের অবস্থান থেকে সরে আসবেন না তিনি, সম্পাদকের আপত্তি চুলোয় যাক! কী আর করা- চাকরি চলে গেলো বেচারি অ্যানার!

তাই বলে বসে রইলেন না তিনি। তার এই হার না মানা মনোভাব দারুণভাবে আকৃষ্ট করলো বড় বড় ম্যাগাজিনগুলোকে। খুব শীঘ্রই নতুন চাকরি জুটে গেলো অ্যানার। এখন তো বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ফ্যাশন ম্যাগাজিন Vogue এর Editor-in-chief তিনি!

লিডারশিপ এর ব্যাপারে সব তথ্য জেনে নাও এখান থেকে!

কর্পোরেট জগতে চাকরির ক্ষেত্রে কিছু জিনিস ঠিকঠাক রাখা অত্যন্ত জরুরি।

বিস্তারিত জানতে ঘুরে এসো ১০ মিনিট স্কুলের এক্সক্লুসিভ এই প্লেলিস্টটি থেকে। 😀

১০ মিনিট স্কুলের Presentation Skills সিরিজ!

নিজের অভিজ্ঞতা থেকে এই শিক্ষাটিই তুলে ধরেছেন তিনি- তোমার যদি কোন মতামত থাকে, ভয় করো না অন্যদের। নিজের মতামত তুলে ধরো, সেটির জন্য লড়াই করো। তেলবাজ পা-চাটা মানুষরা তেলাপোকার মতো টিকে থাকে বটে, কিন্তু সত্যিকারের বড় হতে হলে নিজের অবস্থান আত্মবিশ্বাসের সাথে তুলে ধরতে জানা খুব জরুরি, এবং ভয় না পেয়ে সত্যি কথা বলতে জানা মানুষদের কদরও অনেক বেশি।

৬। Harland Sanders (হাজারবার ব্যর্থ যিনি)

তার জীবনের গল্পটি এতো বেশি বিখ্যাত যে তোমরা অনেকেই জেনে থাকবে নিশ্চয়ই! কর্নেল স্যান্ডার্স সারাজীবনে কতোরকম পেশায় যে কাজ করেছেন সেটির হিসেব করতে ক্যালকুলেটর লাগবে!

বুড়ো কর্নেল শেষবয়সে এসে ভাবলেন একটা রেস্তোরাঁ খুলবেন নিজের। কিন্তু সেটাও দেউলিয়া হয়ে গেলো! কিন্তু একটা লাভ হয়েছিলো- রান্না-বান্না নিয়ে কাজ করতে গিয়ে অনেক কিছু শেখা হয়েছিলো তার। তাই ৬৫ বছর বয়সে বুড়ো কর্নেল জীবনের আরেক অধ্যায় শুরু করলেন- নিজের উদ্ভাবিত সুস্বাদু মুরগির রেসিপি নিয়ে আমেরিকা ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় ঘুরলেন যদি কেউ সেটিকে গ্রহণ করে। গুণে গুণে ১০০৮ বার তাকে ব্যর্থ হতে হয়েছিলো! ভাগ্যিস হাজারবার অপমানিত হয়েও কর্নেল হাল ছাড়েননি! তাই তো আজ KFC বিশ্ব জুড়ে এতো বিখ্যাত!

৭। Ursula Burns (দশ বছর ধরে প্রমোশনের অপেক্ষায়)

Ursula Burns ইঞ্জিনিয়ারিং এ মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেই আমেরিকান Xerox কোম্পানিতে ইন্টার্ন হিসেবে যোগদান করেন। সেখানে তার অধ্যবসায় এবং পরিশ্রম দিয়ে সবার নজরে আসেন তিনি, Assistant হিসেবে চাকরিও পেয়ে গেলেন। কিন্তু তারপরও ভাগ্য যেন খুললো না বেচারি উর্সুলার। বয়স বত্রিশ পেরিয়ে গেলেও জুনিয়র পোস্টেই পড়ে রইলেন তিনি।

খুব সহজেই মার্কেটিং শিখে নাও আমাদের এই মার্কেটিং প্লে-লিস্টটি  থেকে! ১০ মিনিট স্কুলের মার্কেটিং ভিডিও!

কিন্তু তাই বলে হাল ছেড়ে দেওয়ার পাত্রী নন তিনি! পরিশ্রমের ফলাফল আসুক আর না আসুক, নিজের মনে কাজ করে যেতে লাগলেন তিনি। এক বছর…দুই বছর…পাঁচ বছর…কোন ফলাফল নেই! একদম দশ বছর পর তার পরিশ্রমের ফল পেলেন উর্সুলা! প্রথমে কোম্পানির Global Manufacturing এর ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে উন্নীত হলেন, এখন তো গোটা Xerox কোম্পানির প্রধান (Chairwoman) তিনি!

৮। Woody Allen (উডি এলেন, দেখলেন, জয় করলেন!)

Woody Allen একজন কিংবদন্তির চলচ্চিত্র নির্মাতা। মজার ব্যাপার হচ্ছে তিনি যখন নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে Cinematography-তে পড়তেন তখন তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয় বারবার পরীক্ষায় ফেইল করার জন্য! তবে তাতে উডি এলেনের বয়েই গেছে- তার কাছে একাডেমিক পড়াশোনা এমনিতেই অনেক বিরক্তিকর লাগতো, ফেইল করে তিনি খুশিই হলেন! পরবর্তীতে চলচ্চিত্র জগতে তার যে কীর্তি- তার নাম ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

ঘুরে আসুন: একটি লাইভ ইন্টারভিউ

(একাডেমিক পড়াশোনার চেয়ে সত্যিকারের কাজের কাজ করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেটি উডি এলেন দেখিয়েছেন। ক্লাসে অনেক অনর্থক অহেতুক জিনিস পড়তে হয় যেগুলোর কোন মূল্য নেই। তাই সত্যিকারের যেই বিদ্যাগুলো জানা দরকার- নিজের উৎসাহে সেগুলো ঘেঁটে ঘেঁটে শিখে নেওয়াটা খুব দরকার!)

৯। Stan Smith

স্ট্যানলি রজার স্মিথ (Stan Smith) ছোটবেলায় ছিলেন ‘বল বয়’ অর্থাৎ তার কাজ ছিলো টেনিস খেলার সময় যে বলগুলো কোর্টের বাইরে চলে যায় সেগুলো কুড়িয়ে আনা। কিন্তু বেচারা স্ট্যানকে সেই কাজ থেকে বরখাস্ত করা হলো, কারণ দর্শানো হলো স্ট্যান ‘অমনোযোগী’ এবং ‘অগোছালো’!

স্ট্যান এমন তুচ্ছতাচ্ছিল্য আর অপমানের পরও হাল ছাড়লেন না। তার বিশ্বাস ছিলো টেনিস খেলেই তিনি বিখ্যাত হবেন। এবং সত্যি সত্যি তিনি US টিমের জন্য আটবার কাপ জিতেছেন! অপমানের জবাব বুঝি এভাবেই দিতে হয়!

১০। Elon Musk

ইলন মাস্ক মানুষটির কর্মকাণ্ড যেন একদম গল্পের বইয়ের মতো! ছোটবেলা থেকেই অনেক অন্তর্মুখী (Introvert) তিনি। অন্যরা যখন খেলাধুলায় ব্যস্ত, ইলন তখন চুপচাপ বই পড়তেন। স্কুলে অনেক গুণ্ডা মতো ছেলেপুলে থাকে, বেচারা ইলনের মতো গোবেচারা নিরীহ বাচ্চাদের কিলিয়েও সুখ- তাই তাদের হাতে প্যাঁদানি খেয়ে হাসপাতালে যেতে হয়েছিল ইলনকে।

কিন্তু তাই বলে তিনি কখনোই বসে ছিলেন না। নানা রকম আইডিয়া সারাক্ষণ গিজগিজ করতো তার মাথায়!

তিনি PayPal-কে প্রায় দেউলিয়া করে ফেলেছিলেন! তার শাস্তিস্বরূপ তাকে বোর্ড অফ ডিরেক্টরস কোম্পানি থেকে বের করে দেন- ততোক্ষণে ইলনের মাথায় নতুন আইডিয়া চলে এসেছে! Tesla, SpaceX সহ নানা বিচিত্র প্রকল্প তার, এবং সেগুলো তাকে বিশ বিলিয়ন ডলারের মালিক বানিয়ে দিয়েছে! ছোটবেলার অন্তর্মুখী সেই ছেলেটি আজ প্রযুক্তি জগতের সবচেয়ে আকর্ষণীয় চরিত্রগুলোর একজন।


১০ মিনিট স্কুলের লাইভ এডমিশন কোচিং ক্লাসগুলো অনুসরণ করতে সরাসরি চলে যেতে পারো এই লিঙ্কে: www.10minuteschool.com/admissions/live/

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: [email protected]

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
Author

Tashfikal Sami

Tashfikal Sami is a diehard wrestling & horror movie fan. Passionately loves bodybuilding, writing, drawing cartoons & a wannabe horror film director. He's currently studying at the Institute of Business Administration (IBA), University of Dhaka.
Tashfikal Sami
এই লেখকের অন্যন্য লেখাগুলো পড়তে এখানে ক্লিক করুন
What are you thinking?