যখন সব বাধা হার মানে ইচ্ছাশক্তির কাছে!

যুক্তরাষ্ট্রের চল্লিশতম প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগানের চমৎকার একটি কথা আছে, ‘মানুষের মন আকাশের চেয়েও বিশাল, তার ক্ষমতার কোন সীমা পরিসীমা নেই। আমরা নিজেরাই মনের ভেতর বাধার দেয়াল তৈরি করে নিজেদের গুটিয়ে রাখি।‘

কথাটি খুব সত্যি। কেউ যদি একবার মনের সেই বাধার দেয়ালটিকে গুঁড়িয়ে দিতে পারে, তাহলে খুব অবাক একটি ব্যাপার ঘটে- মানুষটি আবিষ্কার করবে সে এমন কিছু অর্জন করে ফেলেছে যেটি সে হয়তো কখনো কল্পনাও করতে পারেনি! আজকে তেমনই কিছু মানুষের কথা তুলে ধরবো আমরা- হাত ছাড়া গিটার বাজানো, পা ছাড়া হিমালয় বিজয় থেকে শুরু করে পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষুদে পালোয়ান আর সবচেয়ে বয়স্ক জিমন্যাস্ট- সবার গল্প একটি কথাই প্রমাণ করে- মানুষের ইচ্ছাশক্তির চেয়ে বড় আর কিছুই হতে পারে না!

১। হাত যখন জীবনের গল্প বলে

অ্যালেক্স গ্রেগরি (Alex Gregory) একজন ইংরেজ নৌকাবাইচ খেলোয়াড় (Rower)। নৌকাবাইচে তিনি দুইবার অলিম্পিকে স্বর্ণপদক লাভ করেছেন। মানুষ প্রায়ই তাকে জিজ্ঞেস করে, এ সাফল্যের রহস্য কি? অলিম্পিকে স্বর্ণপদক পাওয়ার পেছনে কতোটা পরিশ্রম লুকিয়ে রয়েছে?

তার উত্তরেই যেন তিনি এই ছবিটি প্রকাশ করেন। সবাই অবাক হয়ে দেখে অলিম্পিয়ানের হাত। বছরের পর বছর বৈঠা বাইতে বাইতে হাতের চামড়া রূক্ষ,বলিরেখায় জর্জরিত হয়ে গেছে। আঙ্গুলগুলো কেমন বিকৃত হয়ে গেছে। সাফল্য পেতে কতো ত্যাগ-তিতীক্ষা সইতে হয়, অ্যালেক্সের হাতজোড়া যেন সে কথাই বলছে।

দারুণ সব লেখা পড়তে ও নানা বিষয় সম্পর্কে জানতে ঘুরে এসো আমাদের ব্লগের নতুন পেইজ থেকে! The 10-Minute Blog!


২। শীত যার ভয়ে কাঁপে!

উইম হফ (Wim Hof) হলেন এক ভিন্নরকম ক্রীড়াবিদ। তিনি হলেন ‘Extreme Athlete’ অর্থাৎ শারীরিক সক্ষমতার সর্বোচ্চ পরীক্ষা নেয় এমন কঠিন চ্যালেঞ্জ নিয়েই তার কারবার! হল্যান্ডের এই মানুষটির ছোটবড় বিশটির বেশি বিশ্বরেকর্ড আছে, যার একটি হচ্ছে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় বরফ পানিতে গলা পর্যন্ত ডুবে থাকার। (ছবিটি সেই রেকর্ড গড়ার সময়ই তোলা) তিনি অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কিছু কৌশল আবিষ্কার করেছেন যেগুলো কাজে লাগিয়ে ভয়াবহ শীতের ভেতরও কোন সাহায্য ছাড়া টিকে থাকতে পারে মানুষ। তার আবিষ্কৃত একটি বিখ্যাত কৌশল হলো ‘’Wim Hof Technique’’ যেটি সেনাবাহিনীতেও ব্যবহৃত হয়!

ঘুরে আসুন: পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো আইডিয়াগুলো কোথায় পাওয়া যায়


৩। তারে চড়ে আকাশ পাড়ি!

নিক ওয়ালেন্ডা (Nick Wallenda) কেবল একটি কাজই জানেন- হাঁটা! এই হেঁটে হেঁটেই তিনি বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পেয়েছেন! কেনই বা পাবেন না- এই হাঁটার কাজটা যে তিনি করেন মাটি থেকে শত শত ফিট উপরে, সূক্ষ্ম তারের উপরে! তিনি ইতিহাসের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন এবং নায়াগ্রা ফলসের উপরে তারে হেঁটে পাড়ি দিয়েছেন। এই রোমাঞ্চপ্রিয়তা অবশ্য তার রক্তের ভেতরেই আছে- তারে হাঁটার খেলা যে তার দাদুর বাবাও দেখাতেন! এমনকি নিক যখন মায়ের গর্ভে, তখনও তার মা তারে হেঁটে অনুশীলন করতেন। সুতরাং বলতে পারো গর্ভে থেকেই তারের উপর হাঁটার অনুশীলনে হাতেখড়ি হয়েছে নিকের! তাদের পরিবারে একটি বেদনাদায়ক অধ্যায় রয়েছে- নিকের দাদুর বাবা একবার স্যান হুয়ানের উপর তারে হেঁটে পাড়ি দিতে গিয়ে শত শত ফিট উপর থেকে পড়ে গিয়ে প্রাণ হারান। নিক ২০১১ সালে স্যান হুয়ান তারে হেটে পাড়ি দিয়ে পূর্বপুরুষের সেই অসমাপ্ত কীর্তি সম্পন্ন করেন।

৪। হাতে রেখে হাত

Zhai Xiaowei ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতেন নাচ দিয়ে বিশ্ব মাতাবেন। সেভাবেই নিজেকে গড়ে তুলছিলেন। কিন্তু এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা সব এলোমেলো করে দিলো। গাড়ি দুর্ঘটনায় তার একটি হাত কাটা পড়ে গেলো। Zhai কে সবাই বললো তার স্বপ্নের কথা ভুলে যেতে, অন্য পেশায় যেতে। তিনি নিজের উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছিলেন, ঠিক এমন সময় তার জীবনে Ma Li এর আবির্ভাব ঘটলো! তিনিও তার মতোই নাচকে ভালবাসেন, কিন্তু তারও একটি সমস্যা আছে- এক দুর্ঘটনায় তিনি তার একটি পা হারিয়েছেন!

হাত-পা নেই তো কি হয়েছে, দুজন তো আছেন দুজনের জন্য! তাই হলো, Ma Li আর Zhai Xiaowei একসাথে নাচা শুরু করলেন, নাম দিলেন ‘হাতে রেখে হাত’ (Hand in Hand)। তাদের এই অপূর্ব নাচের প্রদর্শনী নিয়ে এ পর্যন্ত বিশটিরও বেশি দেশ মাতিয়েছেন তারা, পূরণ করেছেন ছোটবেলার সেই স্বপ্ন হাতে হাত রেখে!

৫। সবচেয়ে বয়স্ক জিমন্যাস্ট!

জোয়ানা কোয়াস (Johanna Quaas) কে প্রথম প্রথম দেখে যে কেউ অবাক হয়ে যাবে- এত বৃদ্ধা একজন মহিলা জিমন্যাস্টিকসে কসরত কেন করছেন? পড়ে হাত-পা ভাঙবেন তো! কিন্তু তাদের ভুল ভাঙতে দেরি হয় না। ৯১ বছরের এই জার্মান দাদুমণি যে জিমন্যাস্টিকসে নাতির বয়সী অনেককেও হার মানান! ৯ বছর বয়সে জিমন্যাস্টিকস শুরু করেছিলেন জোয়ানা। তারপর সেটা ছেড়ে হ্যান্ডবল, ভলিবল অনেক কিছু খেলেছেন। আবার যখন ছোটবেলার ভালবাসার জিমন্যাস্টিকসে ফিরে এলেন বয়স তখন পঞ্চাশ পেরিয়ে গেছে! তাতে কি হয়েছে? জোয়ানা বলেন, যেদিন জিমন্যাস্টিকসে ছেড়ে দেবেন সেদিন তার মরণ হবে।

ফটোগ্রাফির বেসিক শিখে ফেলো এখনই!

জীবনে শুধু পড়াশুনা করলেই হয় না। এর সাথে প্রয়োজন এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটি। আর তার সাথে যদি থাকে কিছু মোটিভেশনাল কথা, তাহলে জীবনে চলার পথ হয়ে ওঠে আরও সুন্দর।

আর তাই তোমাদের জন্যে আমাদের নতুন এই প্লে-লিস্টটি!

                                             Motivational Talks সিরিজ!


৬। সবচেয়ে ক্ষুদে পালোয়ান!

সবচেয়ে বয়স্ক জিমন্যাস্টের কথা তো হলো, এবার সবচেয়ে ক্ষুদে পালোয়ানের গল্পও শোনা যাক। রোমানিয়ার গিলিয়ানো স্ট্রো (Giuliano Stroe) যখন ২ বছর বয়সী, তখন থেকেই সে ডাম্বেল দিয়ে ব্যায়াম করে! ৪ বছর বয়সে সে হাতে ভর দিয়ে ওজন নিয়ে ১০ মিটার দূরত্বে সবচেয়ে দ্রুত হাঁটার (10 meter Hand Walk) বিশ্বরেকর্ড গড়ে! অনেকে বলে, এতো কম বয়সে এভাবে ব্যায়াম করলে শরীরের বৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তেমন কোন লক্ষণ গিলিয়ানোর মধ্যে দেখা যায়নি। আর দশটা শিশুর মতোই স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠছে সে, কেবল সবার সাথে একটাই পার্থক্য তার- তার বয়সী আর সব শিশুর চেয়ে সে বেশি শক্তিশালী!

৭। দুই পা ছাড়াই হিমালয় বিজয়!

মার্ক ইঙ্গলিস (Mark Inglis) এর যখন ২৩ বছর বয়স, তখন তার জীবনে এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। তিনি তখন নিউজিল্যান্ডের সর্বোচ্চ চূড়া বিজয়ের অভিযানে। সেখানে একটি বরফের গুহায় তার পা আটকা পড়ে যায়। সেখান থেকে বেঁচে ফিরে আসেন তিনি, কিন্তু চরম মূল দিয়ে হয় সেজন্য- তার পা দুটো কেটে ফেলতে হয়। এতে যেন আরো বেশি করে জিদ চেপে যায় মার্কের। ঠিক করেন আরো বেশি বেশি অভিযান করবেন! ২০০৬ সালে ইতিহাসের প্রথম দুই পা হারানো (Double Amputee) অভিযাত্রী হিসেবে এভারেস্ট বিজয় করেন তিনি!

ঘুরে আসুন: জীবনের লক্ষ্য ঠিক রাখার দুই হাতিয়ার: Monitoring & Controlling

কেবল যে অভিযানই করে বেড়ান মার্ক এমন নয়। এর পাশাপাশি তিনি একজন বিজ্ঞানী, প্যারা অলিম্পিয়ান, ওয়াইন প্রস্তুতকারীও বটে। তিনি অনুপ্রেরণামূলক বক্তা হিসেবে তার জীবনের গল্প শুনিয়ে হাজার হাজার মানুষকে অনুপ্রাণিত করে চলেছেন।

৮। হাত ছাড়াই গিটার বাজানো!

তার নামটা তার কীর্তির মতোই লম্বা! হোসে অ্যান্তোনিও মেলান্দেজ রদ্রিগুয়েজ (Jose Antonio Melendez Rodriguez) এর যখন জন্ম হলো, সবাই তাকে দেখে আঁতকে উঠলো! তার যে দুটো হাতই একদম কাঁধ থেকে নেই!

পাওয়ারপয়েন্ট ব্যবহার করে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ সেরে ফেলা যায়! তাই, আর দেরি না করে ১০ মিনিট স্কুলের এক্সক্লুসিভ এই প্লে-লিস্টটি থেকে ঘুরে এসো, এক্ষুনি! শিখে ফেল পাওয়ারপয়েন্টের জাদু!

কিন্তু তার চেয়েও বেশি আঁতকে উঠলো সবাই, যেদিন হোসে ঘোষণা দিলেন তিনি গিটারিস্ট হবেন! হাত যখন নেই, তখন পা-ই ভরসা! সেভাবেই শিখতে লাগলেন তিনি। ১৯৮৭ সালে পোপ দ্বিতীয় জন পলকে গিটার বাজিয়ে শুনিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিলেন হোসে! তারপর ১৯৮৯ সালে নিজের গানের এলবামও বের করে ফেললেন! হোসের গানের ভক্ত বিশ্বজুড়ে রয়েছে। ইচ্ছা থাকলে একটা না একটা উপায় যে বের হয়েই যায়- হোসের গান যেন সে গল্পই তুলে ধরে সবার কাছে।

৯। বয়সকে দৌড়ে হার মানালেন যিনি!

হ্যারিয়েট থম্পসন (Hariette Thompson) ছিলেন এক সাদামাটা গৃহিণী। কখনো যে গণ্ডির বাইরে গিয়ে কিছু করবেন ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি। কিন্তু বয়স যখন পঞ্চাশ পেরিয়ে গেলো, তখন প্রায়ই অসুস্থ হতে থাকলেন তিনি। ডাক্তার বললেন প্রতিদিন সকালে স্বামীর সাথে দৌড়াতে যেতে। তাই শুরু করলেন তিনি। কিছুদিন দৌড়ানোর পর শরীর ভাল হওয়া শুরু করলো। হ্যারিয়েট তখন ভাবলেন, একটা ম্যারাথন দৌড়ালে কেমন হয়? কিন্তু চাইলেই তো হয় না, সেজন্য দরকার কঠিন অনুশীলনের। অবশেষে হ্যারিয়েট যেদিন তার প্রথম ম্যারাথন দৌড় সম্পন্ন করলেন তখন তার বয়স ৭৬! এর মাঝে তিনি দুইবার ক্যান্সারকেও পরাজিত করেছেন! অবশেষে ৯৪ বছর বয়সে জীবনের দৌড় শেষ করেন সদা হাস্যময়ী হ্যারিয়েট, রেখে যান এক অদম্য অনুপ্রেরণার গল্প।

১০। ১২৭ ঘণ্টা!

127 Hours (2010) মুভিটি তোমরা অনেকেই নিশ্চয়ই দেখেছো! অসাধারণ রোমাঞ্চকর এই মুভিটি অ্যারন র‍্যালস্টোন (Aron Ralston) এর জীবনের গল্প নিয়ে বানানো হয়েছে। অ্যারন একবার একা একা অভিযানে গেছেন। হঠাৎ এক পাথরধসে তার হাত চাপা পড়ে যায় পাথরের নিচে। তিনদিন সেখানে আটকা থাকার পর বেপরোয়া অ্যারন নিজের হাত বাহু থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন!

এ ঘটনার পরও অ্যারন মোটেই দমে যাননি। তিনি কৃত্রিম হাত নিয়ে এখনও বহাল তবিয়তে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, অভিযান করছেন!


১০ মিনিট স্কুলের লাইভ এডমিশন কোচিং ক্লাসগুলো অনুসরণ করতে সরাসরি চলে যেতে পারো এই লিঙ্কে: www.10minuteschool.com/admissions/live/

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: 10msblogproject@gmail.com


লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
Author

Tashfikal Sami

Tashfikal Sami is a diehard wrestling & horror movie fan. Passionately loves bodybuilding, writing, drawing cartoons & a wannabe horror film director. He's currently studying at the Institute of Business Administration (IBA), University of Dhaka.
Tashfikal Sami
এই লেখকের অন্যান্য লেখাগুলো পড়তে এখানে ক্লিক করুন
What are you thinking?