এক ঢিলে শিকার হোক একটাই পাখি

পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবারে শুনে নাও!

 

‘Extraordinary results happen only when you give the best you have to become the best you can be at your most important work.’ – Gary Keller

‘ঈর্ষণীয় ফলাফল তখনই আসে, যখন আপনি সেরাদের সেরা হওয়ার লক্ষ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজে আপনার সেরাটা ঢেলে দেন।’- গেরি কেলার

অল্পবিস্তর পড়ালেখা করেছেন অথচ গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের নাম শোনেননি, এরকম মানুষ পাওয়া কঠিন। কারণ তাঁর বহুমাত্রিক বিচরণ। দর্শন, বিজ্ঞানের এমন কোনো শাখা নেই, যেখানে অ্যারিস্টটলের অবদান নেই। তেমনিভাবে প্লেটোসহ তৎকালীন প্রায় সব মনীষীই বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনেক শাখাতেই তাঁরা পাণ্ডিত্য অর্জন করেছেন।

সেই ধারা কি এখনো বহমান? চাইলেই কি কেউ সব শাখাতে বিশ্বসেরা হতে পারে?

সোজা উত্তর, ‘না’। বর্তমান সময়ে অনেকেই জীবনে সফলতার মুখ দেখতে না পাওয়ার অন্যতম কারণ তারা অ্যারিস্টটল হতে চান। সব শাখাতেই মাতব্বর হতে চান। ফলে তারা কোনোটাতেই দক্ষ হতে পারেন না। মাঝারি মানের অদক্ষ হয়ে কোনোমতে জীবন পার করেন।

ফরমুলা খুব সোজা। মেসি হতে চাইলে শুধু ফুটবল নিয়েই থাকেন। শয়নে-স্বপনে শুধুই ফুটবল। একই সাথে মেসি আবার সাকিব আল হাসান হতে পারবেন না। অযথা সময় নষ্ট। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ঠিক করে গভীর মনোযোগের সাথে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে গেলে সাফল্য অনিবার্য। কেউ আপনাকে ঠেকাতে পারবে না।

কিন্তু সমস্যা আছে, আমার তো সময় নেই। কোনো কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে পারি না। একই কাজ বেশি দিন ভালো লাগে না।

সময় নেই!

অনেক তরুণ-তরুণীই বলে, সময় নেই, সময় নেই, মহা ব্যস্ত! খাওয়ার সময় নেই, ঘুমানোর সময় নেই, গোসলেরও সময় নেই। জিজ্ঞেস করি, সারাদিন কী কী করেন? একটু আপনার দৈনিক রুটিনটা বলেন তো?

এই তো সকালে উঠেই ক্লাস, ক্লাস শেষে গিটার শিখতে যাই। এরপর জাপানি ভাষার কোর্স। তারপর টিউশনি। টিউশনি শেষে বন্ধুদের সাথে বসি। একটা ডকুমেন্টারি তৈরির কাজ করছি। টুকটাক লেখালেখি তো আছেই। এর বাইরে হঠাৎ হঠাৎ এখানে-ওখানে যেতে হয়। বন্ধুবান্ধব আসে, তাদের সময় দিতে হয়। বোঝেনই তো?

হুম, বুঝলাম। পড়ালেখা করার সময় হয়?

কই আর হয়? পরীক্ষার আগে পড়েই তো পার করলাম চার বছর।

তো, আপনি কীসের পণ্ডিত হতে চান? লোকে আপনাকে কী নামে চিনবে?

চুপচাপ। দ্বিধায় পড়ে গেল। কিছুক্ষণ পর বলল, আসলে আমি নিজেও ক্লিয়ার না।

আপনাকেও যদি এই ‘সময় নেই’ ভাইরাসে আক্রমণ করে, তাহলে খবর আছে! সাবধান হয়ে যান। দৌড়াতেই থাকবেন, কিন্তু সীমানায় পৌঁছাতে পারবেন না। লক্ষ্য যেন মরীচিকা। আপনি যতই আগাচ্ছেন, সে-ও তত পেছাচ্ছে। মহা মুশকিল।

গন্তব্যে পৌঁছাতে চাইলে, ঠাণ্ডা মাথায় ভাবুন। ভেবে ভেবে বের করুন এক থেকে সর্বোচ্চ তিনটা শাখা, যার চূড়ায় আপনি উঠতে চান। এরপর সেগুলোকেই গলার মালা বানিয়ে পরে বেড়ান। বাকি সব ঝেড়ে ফেলে দিন। দেখবেন, কত সময় আপনার হাতে।

মেধাবীরা মেধার জোরে পার হয় না, তারা সঠিক সময়ে সঠিক কাজ করে বলেই পার হয়। আপনার প্রতিটি শ্রমের বিনিময়ে কী অর্জিত হচ্ছে, সেটার চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে হবে। অহেতুক কাজে সময় নষ্ট করার মতো সময় কি আপনার হাতে আছে? জীবনটা আসলেই অল্পদিনের। ছেলেখেলার কোনো সুযোগ জীবন আমাদের দেয়নি।

কাজের গতি বাড়াবেন কীভাবে?

কাজের গতি বলতে ফলপ্রসূ কাজ করার হারকে বোঝাচ্ছি। দিন শেষে হিসাব করলে যেন দেখা যায়, আজ কী কী কাজের কাজ করেছি।

আমার অভিজ্ঞতায় বলি। কিছুদিন আগেও মনে হতো, অনেক কাজ করছি। সব সময় একটা স্ট্রেসের মধ্যে থাকি। সারা দিন কাজ করি, রাতে বাসায় গিয়েও কাজ করি, তাও যেন কাজ শেষ হয় না। অথচ দিন শেষে, সপ্তাহ শেষে হিসাব কষলে দেখা যায়, কাজের কাজ কিছুই হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজ যেখানে ছিল, সেখানেই আছে। নিজেকে চুলচেরা স্ক্যান করে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি ভাইরাস পেলাম। আপনার সাথে শেয়ার করছি।

ভাইরাস এক: এক ঢিলে ১০ পাখি মারার চিন্তা

অন্যভাবে বললে মাল্টি-টাস্কিং অর্থাৎ একই সময়ে একাধিক কাজ করা। জার্নাল পেপার পড়ছি, সাথে ফেসবুকে চ্যাট করছি, পেছনে মিউজিক বাজাচ্ছি, স্কাইপ অন রেখেছি। কে কখন নক করে, তার ঠিক আছে? মোবাইলে তো কথা চলেই। এভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার হয়, আমার গবেষণা পেপার পড়া শেষ হয় না। পড়া হলেও বোঝা হয় না। সময়, শক্তি ঠিকই খরচ হলো, আউটপুট শূন্য।

এর একমাত্র কারণ একসাথে অনেক কাজ করতে যাওয়া। আমাদের ব্রেন এতগুলো জিনিসে একসাথে মনোযোগ ধরে রাখতে পারে না। ফলে গুণগত ফলাফল কোনোটাতেই আসে না।

এরপর, যখন যেটা করব বলে ঠিক করলাম, তখন শুধু সেটাই করা আরম্ভ করলাম। বাকি সব বাদ। দারুণ ফল পেলাম। একটা একটা করে কাজ করার ফলে হাতের কাজ তাড়াতাড়ি শেষ হয়, ফলে হাতে থাকে পর্যাপ্ত সময়।

ভাইরাস দুই: আমাকে ব্যবহার করুন

ডাস্টবিনের গায়ে এই লেখাটা থাকে। অতিরিক্ত স্ট্রেসের সময় হঠাৎ একদিন নিজেকে প্রশ্ন করলাম, আমি কী এমন করছি, কেন করছি, কার জন্য করছি?
স্ক্যান করে দেখলাম, আমার ব্যস্ততার অধিকাংশই অন্যের লক্ষ্য হাসিলের জন্য। এখানে আমার কিছু নেই। যেমন- সকালে উঠেই মোবাইলে ইমেইল চেক করলাম। চার-পাঁচটা ঘটনা থাকে ইমেইলের তালিকায়। যেমন- বিভিন্ন ধরনের অফার, অন্যের চিন্তা, আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক, আমন্ত্রণপত্র, সমস্যা, চাহিদা, অভিযোগ। কী দাঁড়াল? সকালে উঠেই মাথা দখল হয়ে গেল অন্যের এজেন্ডায়। এখানে আমার নিজের জন্য কি কিছু আছে?

এরপর চেক করি ফেসবুক। ২৫-৩০টা নোটিফিকেশনস, তিন-চারটা মেসেজ। এখানেও অন্যের এজেন্ডা। কার বিয়ে হলো, কার গার্লফ্রেন্ড চলে গেল, কোথায় কুদরতি ক্ষমতা দেখা গেল, কোন নায়কের বাথরুম করতে সমস্যা হচ্ছে, কোন নায়িকার ভুঁড়ি বেড়ে যাচ্ছে… চলছে।

“সফল আর বিফলের মধ্যে পার্থক্য এক জায়গায়। কে কত যত্নের সাথে নিজের সময় ও শক্তি ব্যবহার করতে পারে।”

ফল কী হলো? আমার দিনটাই শুরু হলো অন্যের আজগুবি এজেন্ডা মাথায় নিয়ে। ব্রেন হ্যাক হয়ে গেল অন্যের দ্বারা। ফলে নিজের ওপর থাকল না কোনো নিয়ন্ত্রণ। যেন হয়ে গেলাম, ‘আমাকে ব্যবহার করুন’ লেখা ডাস্টবিন।

এর থেকে বেরোনোর তরিকা কী তাহলে?

খুব সিম্পল। আপনার ব্রেইনে এন্টিভাইরাস ইনস্টল করুন। সকালে উঠেই ইমেইল, ফেসবুক, পত্রিকাসহ আরও যেসব সোর্স থেকে ভাইরাস আসতে পারে, সেগুলো পরিহার করুন। ঘুম থেকে উঠেই অন্তত ৩০ মিনিট দিনের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো নিয়ে ভাবুন। ডায়েরি, নোটপ্যাড এমনকি মোবাইলেও লিখে ফেলুন আজকের দিনের ভাইটাল কাজগুলো। নাম দিতে পারেন আজকের টু-ডু লিস্ট। তারপর সেই লিস্ট ধরে এগোবেন। টু-ডু লিস্ট করা হয়ে গেলে এরপর যা খুশি দেখতে পারেন।

এতে আপনার ব্রেন হ্যাক হওয়ার সুযোগ থাকবে না। পরিষ্কার মাথা নিয়ে দিন শুরু করতে পারবেন। আপনার অবচেতন মন আপনাকে দিনের কাজ শেষ করতে দারুণভাবে সহায়তা করবে। দিনের শেষে দেখবেন গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো ঠিকই হয়ে গেছে। নিজের সময়ের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে চলে আসবে। আপনার জীবনছবির পরিচালক তো আপনিই, তাই না?

ভাইরাস তিন: অগ্রাধিকার করা নিয়ে ধাঁধাঁ

কাজে যাচ্ছেন, হঠাৎ কল এল, আপনার বন্ধু এসেছে ঢাকা থেকে। দুপুরে আপনার সাথে দেখা করতে চায়। আপনি আসতে বললেন। অফিসে গিয়েই দেখলেন, আপনার কলিগের কম্পিউটারে একটা ফাইল ওপেন হচ্ছে না। লেগে গেলেন ঠিক করতে। অফিস থেকে বাসায় ফিরছেন, এলাকার পরিচিত একজনের সাথে দেখা হলো। তার মেয়েকে ঢাকায় পাঠাবে কোচিং করাতে। আপনাকে সাহায্য করতে হবে। কোন কোচিং করবে, কোথায় থাকবে- এসব আর কী। কারণ, আপনার অনেক জানাশোনা। ঘণ্টা খানেক ব্যয় করলেন। একে ওকে ফোন করে একটা উপায় বের করলেন। বাহ, বেশ ভালো তো। অন্যের কত উপকারই না করছেন! এরকম মানুষ এযুগে কয়জন আছে?

কিন্তু, একটু ভেবে দেখেন, দিনশেষে নিজেকে কি এলোমেলো লাগছে? শরীরে পর্যাপ্ত শক্তি অবশিষ্ট আছে? এভাবে যদি আপনার জীবন চলে, তবে অগ্রাধিকার করা নিয়ে ধাঁধাঁয় আছেন। কোনটা গুরুত্বপূর্ণ আর কোনটা অহেতুক, পার্থক্য করতে পারছেন না।

আত্মনিয়ন্ত্রণ বাড়াতে হলে, কাজের অগ্রাধিকার শাণিত করতে হবে। আপনি একাই সবাইকে খুশি করতে পারবেন না। সবাইকে অল্প অল্প করে খুশি করতে গিয়ে আপনার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় বেহাত হয়ে যাবে। ফলে একসময় হতাশায় ভুগবেন। যা হওয়ার ছিল, তা তো হলো না। আফসোস করবেন, আমি সবার জন্য করলাম, এর বিনিময়ে কী পেলাম?

দয়া করে এরকম দ্বন্দ্বে ভুগবেন না। আপনি সবাইকে সাহায্য করতে পারবেন না। আপনার সাহায্য ছাড়া পৃথিবী অচল হয়ে যাবে না। মনে রাখবেন, আপনি নিজের পায়ে শক্তভাবে দাঁড়াতে না পারলে অন্যের হাত শক্ত করে ধরতে পারবেন না।

স্বার্থপরতার গন্ধ পাচ্ছেন? পেতে পারেন। অন্যের ভালোর জন্য নিজেকে যোগ্য করে তৈরি করতে হবে। সেজন্য যথাযথ অগ্রাধিকার তালিকা করে সময় ও শক্তি ব্যয় করা জরুরি। সফল আর বিফলের মধ্যে পার্থক্য এক জায়গায়। কে কত যত্নের সাথে নিজের সময় ও শক্তি ব্যবহার করতে পারে। মিথ্যা পরোপকারীর পোশাক পরে ক্লান্ত হয়ে বসে থাকলে তা কারও জন্যই মঙ্গলের হবে না।

এই লেখাটি নেয়া হয়েছে লেখকের “মানসিক প্রশান্তি আর মর্যাদাপূর্ণ জীবনের জাদুকাঠি” বইটি থেকে। বিশেষ ছাড়ে বইটি কিনতে চাইলে চলে যান এই লিংকে!

এই লেখাটির অডিওবুকটি পড়েছে মনিরা আক্তার লাবনী


১০ মিনিট স্কুলের লাইভ এডমিশন কোচিং ক্লাসগুলো অনুসরণ করতে সরাসরি চলে যেতে পারো এই লিঙ্কে: www.10minuteschool.com/admissions/live/

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: [email protected]

What are you thinking?