কুকুর হইতে সাবধান

কুকুরের চেয়ে প্রভু ভক্ত বিশ্বস্ত প্রাণী আর হয় না। “Man’s best friend’’ খেতাবটি শুধু শুধু দেওয়া হয়নি তাদের। কিন্তু তাই বলে সব কুকুর যে বন্ধুসুলভ আচরণ করে এমন নয়! রাস্তাঘাটে অনেক সময় বিপজ্জনক নেড়ি কুকুর ঘোরাফেরা করে। কিছুদিন আগে এক বন্ধু রাতের বেলা বাসার গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছিলো। হঠাৎ হাতে তীব্র ব্যথা, তাকিয়ে দেখে একটা কুকুর তার হাতের কবজি কামড়ে ধরে আছে! যদিও এমন ঘটনা খুবই বিরল, তবু সাবধান থাকা ভাল।

তাই পথেঘাটে হঠাৎ এমন কোন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে কি করা যায় সেটি নিয়ে Brightside একটি চমৎকার আর্টিকেল করেছে, আমরা তোমাদের জন্য সেটি বাংলায় তুলে ধরেছি।

কুকুর যদি আক্রমণ না করে, কিন্তু আক্রমণাত্মক ব্যবহার করে


“কুকুরের শারীরিক ভাষা অনেক কিছু বলে দেয়।”

কুকুরের শারীরিক ভাষা অনেক কিছু বলে দেয়। যদি কুকুরের কান পেছনের দিকে খাড়া হয়ে থাকে আর গর্জন করে তোমার দিকে চেয়ে- তার ধারেকাছে না যাওয়াই ভাল! যতোটা দূরে সম্ভব হাঁটা উচিত। কিন্তু সবসময় তো সেটি সম্ভব হয় না। তখন কী করবে?

  • কুকুরকে শান্ত করতে চেষ্টা করা বা হাসা বোকামি হবে। হাসি জিনিসটির অর্থ মানুষের কাছে একরকম, পশুদের কাছে অন্যরকম। মানুষের কাছে হাসি মানে বন্ধুত্বপূর্ণ আনন্দসূচক একটি ব্যাপার, কিন্তু পশুর কাছে হাসি মানে ‘’দাঁত বের করে আমাকে দেখাচ্ছে? আমাকে শাসানি দিচ্ছে? দাঁড়া দেখাচ্ছি মজা!’’ তাই দাঁত বের করে হাসতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে!
  • সরাসরি কুকুরের চোখের দিকে তাকানো বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তাতে আরো খেপে যেতে পারে কুকুর! ওর দিকে চোখ তুলে তাকানো এড়িয়ে চলো। তুমি হাত-পা নাড়ালে বা উদ্বেগ প্রকাশ করলে কুকুর আরো বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠবে।
  • আশেপাশে কেউ থাকলে তার সাহায্য চাও। কিন্তু চেঁচিয়ো না যেন! ঠাণ্ডা মাথায় নরম গলায় ডাকো।
  • হাতে লাঠি বা ছাতা এমন কিছু থাকলে সেটা দিয়ে ভয় দেখাতে যেয়ো না। অনেকসময় কুকুর এমনিতেই মানুষের পিছু নেয়, সে হয়তো ভালোমানুষের মতো হাঁটছে তোমার পিছু পিছু তুমি হুট করে ছাতা ঘুরিয়ে বিচিত্র মুখভঙ্গি করে ‘হই হই!’ বলে চেঁচানো শুরু করলে- তখন কিন্তু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বেচারার মাথা বিগড়ে যেতে পারে! তখন নিরীহ কুকুরও রেগেমেগে কামড়ে দিতে পারে।
  • সবচেয়ে ভাল হয় যদি একটু একটু করে পিছিয়ে আসো। তবে কুকুরের দিকে পেছন ঘুরে সরে এসো না। এমনভাবে আসো যেন কুকুরটা কী করে সেটা দেখতে পাও- সে কি আরো ক্ষেপে যাচ্ছে নাকি শান্ত হয়ে যাচ্ছে। তবে যাই করো না কেন, দৌড়াতে যেয়ো না! তুমি দৌড়ানো শুরু করলে কুকুর তার স্বভাবমতো তোমাকে ধাওয়া দিবে- এবং দৌড়ে কুকুরকে হার মানানো প্রায় অসম্ভব একটি কাজ! তারা অলিম্পিক দৌড়বিদদেরও দৌড়ে ধরে ফেলতে পারে!

কুকুর যদি আক্রমণ করে!

একটি পশু কখনো কারণ ছাড়া কাউকে আক্রমণ করে না কিন্তু সেই কারণটা সবসময় তেমন বোধগম্য নাও হতে পারে। আক্রমণ করে সাধারণত কয়েক রকম কুকুর-

ক্ষুধার্ত কুকুর: ক্ষুধার সময় খাবার না পেলে মেজাজ খিঁচড়ে থাকা স্বাভাবিক (ক্ষুধার্ত থাকলে অনেক মানুষেরও মেজাজ খিঁচড়ে থাকে তখন তাদের সাথেও কথা বলতে যাওয়া এক মুসিবত!)।

মা কুকুর: হয়তো তার ছানাপোনা আছে ধারেকাছে, তাদের রক্ষায় মা কুকুরের এই রূদ্রমূর্তি।

মাস্তান কুকুর: তার এলাকায় অনধিকার প্রবেশের জন্য শাসানি হিসেবে আক্রমণ!

তুমি হয়তো সব মেনে চললে সুবোধ বালকের মতো, তারপরও কুকুর ঘেউ করে আক্রমণ করলো তোমাকে! তখন কী করবে?

  • কুকুর ঘেউ ঘেউ করলে তুমিও পাল্টা ধমকাতে যেয়ো না! এতে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে!
  • যদি কুকুর দৌড়ে আসে আক্রমণ করতে- গায়ের জ্যাকেট, শার্ট বা যেটা আছে সেটা তাড়াতাড়ি খুলে ছুঁড়ে কুকুরের মাথার উপর দাও, এই ফাঁকে পালিয়ে যাও বা আশেপাশে পোস্ট/গাছ/দেয়াল উঁচু কিছুতে চড়ে বসো। কুকুর তোমার নাগাল পাবে না!
  • কাঁধে ব্যাগ বা কিছু থাকলে সেটা একটু দূরে ছুঁড়ে মারো। কুকুর সেটার পিছনে ছুটলে তুমি সুযোগ পাবে পালানোর। সাথে খাবার থাকলে সেটা ভালোয় ভালোয় কুকুরকে দিয়ে দাও (অনেকসময় ক্ষুধার জ্বালায় হিংস্র কুকুর খাবারের জন্য আক্রমণ করে)।
  • আক্রমণের শিকার যদি হতেই হয়, তাড়াতাড়ি তোমার হাত দিয়ে ঘাড় ঢেকে রাখো। মানুষের শরীরে ঘাড় খুব অরক্ষিত একটি জায়গা। এখানে অনেক শিরা-ধমনী আছে। কামড় যদি খেতেই হয়, গোড়ালি অথবা কব্জির উপরিভাগে কামড় খেলে তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতির আশঙ্কা।
  • মানুষের একটি সহজাত প্রবৃত্তি আছে- কেউ কামড়ে ধরলে সেটি ছাড়ানোর চেষ্টা করা। এটি ভুলেও করতে যেয়ো না। টানাটানি করতে গেলে ক্ষত আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে! (ধরো তোমাকে ইঞ্জেকশন দেওয়া হচ্ছে, সেই অবস্থায় তুমি যদি হ্যাঁচকা টান মেরে হাত সরাতে যাও আর সুঁইটা তোমার মাংস ছিঁড়ে বের হয়ে আসে কি ভয়ানক ব্যাপার হবে!)। এক্ষেত্রে যেটি করতে পারো, আত্মরক্ষার জন্য কুকুরটির চোখে-নাকে আঘাত করতে পারো। বিশেষজ্ঞদের একটি পরামর্শ হচ্ছে- কুকুরের পেছনের পা দু’টো ধরে মাটি থেকে তুলে ফেলা।
  • তোমার ওজনকে কাজে লাগাও। কনুই অথবা হাঁটু দিয়ে কুকুরটিকে চেপে ধরে রাখো মাটিতে ওজন দিয়ে। কুকুর কামড়াতে পারে কিন্তু কুস্তি খেলতে জানে না! তাই এভাবে জব্দ করে রাখো অন্য কারো সাহায্য পাওয়ার আগ পর্যন্ত।

অনেকসময় কপাল খুব খারাপ হলে যা হয়- একটা না, একপাল কুকুর তেড়ে আসে! তখনও মোটামুটি আগের কৌশলগুলোই অনুসরণ করবে কিন্তু মাথায় রাখবে- কুকুরের পাল যেন তোমাকে ঘিরে ধরতে না পারে। বেকায়দা অবস্থায় তোমার পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দাঁড়াতে পারো (তাহলে পেছন থেকে আক্রমণ করতে পারবে না) কিন্তু দৌড়াতে যেয়ো না, তাহলে তারা দলবেঁধে ধাওয়া করবে!

কামড় খাওয়ার পর করণীয়!

কামড় খাওয়ার পর যতো দ্রুত সম্ভব ক্ষতস্থানের নিরাময় জরুরী। অবশ্যই হাসপাতালে যাবে।

  • সাবান-পানি দিয়ে ক্ষতস্থান ভাল করে ধুয়ে এলকোহল দিয়ে ভাল মতো পরিষ্কার করো।
  • কামড় দেওয়া কুকুর কি রাস্তার নেড়ি কুকুর নাকি গৃহপালিত কুকুর এটা কোন ব্যাপার না। সাথে সাথে হাসপাতালে যাওয়া জরুরী।
  • সেখানে জলাতঙ্কের Vaccine নিতে হবে। অনেকে মনে করে এটা ভয়ানক একটি জিনিস, ২০-৩০টি ইঞ্জেকশন নিতে হয়! বাস্তবে মোটেও তেমন কিছু না। মাত্র ৬টি ইঞ্জেকশন নিতে হয়, সেগুলো দেওয়া হবে তোমার তলপেটে অথবা কাঁধে।
  • পরিসংখ্যান বলে- কুকুরের কামড় খাওয়ার ৯৯% ক্ষেত্রেই জলাতঙ্ক সংক্রমণ ঘটে! (এবার বুঝলে তো? কুকুর অনেক লক্ষ্মী একটি প্রাণী। কেবল অসুস্থ কুকুরগুলোই সাধারণত কামড়াতে আসে) কামড় খাওয়ার ৩০-৫০ দিনের মধ্যে জলাতঙ্কের লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়। কিন্তু সেজন্য বসে থাকলে হবে না! কামড় খাওয়ার ২ সপ্তাহের ভেতর Vaccine নিতে হবে, নাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে! জলাতঙ্কে একবার আক্রান্ত হয়ে গেলে তার কোন চিকিৎসা নেই, প্রতিকার নেই। তাই রোগ হওয়ার আগেই চিকিৎসা নিয়ে প্রতিরোধ করতে হবে।
  • শুধু যে কামড় থেকে জলাতঙ্ক হবে এমন কথা নেই। রোগের জীবাণু নানাভাবে ছড়াতে পারে। অনেকসময় রোগাক্রান্ত কুকুরের কয়েক ফোঁটা লালা তোমার গায়ে লাগাই যথেষ্ট জলাতঙ্কে আক্রান্ত হওয়ার জন্য। তাই রাস্তাঘাটে কুকুর দেখলে আদর করা পর্যন্ত হয়তো ঠিক আছে- কিন্তু কুকুর যেন আদর করে হলেও তোমার হাত-মুখ চাটতে না পারে সেটি লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন।

এখন থেকে রাস্তায় এমন বিপজ্জনক কোন পরিস্থিতিতে পড়ে গেলে কি করবে সেটি তো জেনেই গেলে! আমার এক বন্ধু আছে একটু ভীতু করে। সে কাটাবনে পশুর দোকানগুলোর সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় ভয়ে সিঁটকে থাকে। খাঁচার ভেতর ইয়া বড় হিংস্র কুকুর- হয়তো দোকানদার ঠিকমতো খাঁচা আটকাতে ভুলে গেছে সেগুলো কোনভাবে ছাড়া পেয়ে গেছে তখন কি একটা কাণ্ড হবে! (স্টিফেন কিং ইতিহাসের অন্যতম সেরা একজন হরর লেখক। তার একটি গল্প রয়েছে হিংস্র কুকুরের আক্রমণ নিয়ে। সেটি অবলম্বনে ‘Cujo’ (1983) নামে ভয়ানক একটি মুভি আছে তোমরা সেটি দেখতে পারো!)

এরকম হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে কিন্তু যদি কখনো ঘটে- তুমি তো লেখাটি পড়ে জেনেই গেলে কি করণীয়! তোমার কি এমন কোন অভিজ্ঞতা আছে কুকুর বা অন্য কোন পশু নিয়ে? কমেন্টে জানিয়ে দিও কিন্তু!  

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
Author
Tashfikal Sami

Tashfikal Sami

Tashfikal Sami is a diehard wrestling & horror movie fan. Passionately loves bodybuilding, writing, drawing cartoons & a wannabe horror film director. He's currently studying at the Institute of Business Administration (IBA), University of Dhaka.
Tashfikal Sami
এই লেখকের অন্যন্য লেখাগুলো পড়তে এখানে ক্লিক করুন
What are you thinking?