Wheels of Life: যাচাই করো জীবনকে

নিত্য নৈমিত্তিক কাজের মধ্যে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলার কারণেই কিন্তু বিষণ্ণতা নেমে আসে তোমার  জীবনে।

যখন কাজ, পড়াশোনার ভারে ন্যুব্জ হয়ে ব্যক্তিগত জীবনের কথা ভুলে যাও, কিংবা যখন জীবনকে উপভোগ করতে গিয়ে কাজের কথা একেবারেই ভুলে যাও তখনই কিন্তু জীবন ভারসাম্য হারায়। আর তা উপনীত হয় বিষণ্ণতায়।  

কোন একটি কাজের প্রতি অনেক বেশি মনোযোগী হতে গিয়ে বাকিগুলোর কথা ভুলে গিয়ে, খেই হারিয়ে নিজেদের বড্ড বেশি ক্ষতি করে ফেলি আমরা। অনেকের ক্ষেত্রে এই ভারসাম্যহীনতা চলে যায় চরম পর্যায়ে।

১০ মিনিট স্কুলের পক্ষ থেকে এ বছর বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি-সহায়ক অনলাইন লাইভ এডমিশন কোচিংয়ের আয়োজন করা হচ্ছে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে!

কাজ বা পড়াশোনার চাপ তো কখনোই পিছু ছাড়বে না। তবে তুমি যে ধীরে ধীরে পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, সামাজিকতা, বিনোদন হতে দূরে সরে যাচ্ছো, তা কি খেয়াল করেছ? আর এজন্যই হয়তো তোমার মাঝেমধ্যেই ভাল্লাগে না!

জীবন যখন তেজপাতা হয়ে যায়, কোথা থেকে আবার শুরু করা উচিত তা নিয়ে চলতে থাকে দোদুল্যমানতা।

তখন কি মনে হয় না যে, “ইশ! জীবনটাকে যদি একটা ছকের মতো করে এঁকে বুঝতে পারতাম যে ঠিক কোন জায়গায় আমার ভুল হচ্ছে?”  

এই আফসোসকে দূর করে সত্যি সত্যিই জীবনকে একটা ছকের মধ্যে দেখতেই তোমাকে সাহায্য করবে Wheels of Life।

কী এই Wheels of Life?

Wheels of Life একটি মানচিত্রের মতো। জীবনের মানচিত্র। জীবনের নানা দিক গুলো এই মানচিত্রে ভাগ ভাগ করে সজ্জিত থাকে আর সেই ভাগগুলোতে বসাতে হয় কিছু মান (যেমন ০-১০)। এই মানগুলো দিয়েই তৈরি হয় নতুন একটি  নকশা যা আমাদের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে চোখের সামনে।

এই নকশা আমাদের  জানান দেয় যে, আমরা জীবনে কোথায় আছি এবং কোথায় পৌঁছাতে চাই। প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করছি তো? নাকি শুধু সাফল্যের জন্যই একরোখা হয়ে কাজ করেই যাচ্ছি কিন্তু ভুলে যাচ্ছি যে সুখে থাকাও সাফল্যের অংশ?  

কেমন হয় এই মানচিত্র?

সাফল্য ও সুখের মাঝে ভারসাম্য আনার জন্য Wheels of life এর যেই ক্ষুদ্র প্রয়াস, তা দেখতে কিছুটা এরূপ:

১। চাকা = তোমার জীবন

অর্থাৎ, পুরো চাকাটি তোমার জীবনের প্রতিনিধিত্ব করে।

২। চাকার এক একটি ভাগ= জীবনের এক একটি ক্ষেত্র/দিক

যেমন ধরো তোমার:

  • Career/Job (ক্যারিয়ার/ চাকুরি)
  • Education (পড়ালেখা)
  • Health (স্বাস্থ্য)
  • Family (পরিবার)
  • Friends, socialization (বন্ধু-বান্ধব, সামাজিকতা)
  • Personal growth (আত্ম-উন্নয়ন)
  • Finance/Money (অর্থ, সচ্ছলতা)  
  • Fun and recreation (বিনোদন/আনন্দ-উল্লাস)
  • Contribution to society & country (সমাজ ও দেশের প্রতি অবদান)
  • Physical environment (ঘর-বাড়ি, থাকার পরিবেশ)
  • Romance (স্বামী/স্ত্রী’র সাথে আপনার সম্পর্ক)
  • Mental health (মানসিক স্বাস্থ্য)
  • Performance & productivity (কর্মক্ষমতা)  ইত্যাদি

কীভাবে সাজাবে তোমার Wheel?

তোমার যেসকল জায়গায় বিচরণ রয়েছে, তা নিয়েই তুমি এই ক্ষেত্রগুলো নির্বাচন করে তোমার নিজস্ব Wheel তৈরি করো। উপরোক্ত তালিকাটির সবগুলোই মোটামুটি সবার জীবনেই বিদ্যমান। তবে সবগুলো হয়তো সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

যেমন ধরো, নবম শ্রেণীর একজন শিক্ষার্থী হিসেবে তুমি হয়তো Career, Romance, Physical environment ইত্যাদির মত ক্ষেত্রগুলো বাদ রাখতে পারো তোমার wheel থেকে। কারণ এগুলো তোমার জীবনে এখনো আসার সুযোগই তৈরি হয় নি! অতএব, যেই ক্ষেত্রগুলো তোমার জীবনে বিদ্যমান, শুধু সেগুলোই রাখো তোমার Wheel এ।

ছবিঃ গুগল হতে সংগৃহীত

এভাবে নিজ নিজ জীবনের সাথে মিল রেখে সাজিয়ে নাও তোমার নিজস্ব Wheel টি ।

কথায় বলে, MUN is fun!

বর্তমান সময়ের বহুল আলোচিত একটি কম্পিটিশানের নাম MUN বা Model United Nations।

কিন্তু কি এই মডেল ইউনাইটেড নেশন্স? কিভাবে ভালো করতে হয় এটিতে?

নিজেই দেখে নাও এই প্লেলিস্ট থেকে!
১০ মিনিট স্কুলের MUN সিরিজ!

Wheel এ কীভাবে বসাবে মানগুলো?

চিত্রটি দেখে হয়তো বুঝতেই পারছো যে Wheels of life দেখতে কেমন হয়।

এবারে প্রতিটা ভাগের মাঝ বরাবর কেন্দ্র হতে সীমা পর্যন্ত একটি করে লাইন টানো ও প্রতিটি লাইনের মধ্যে ০-১০ পর্যন্ত মান গুলো লিখে ফেলো। কেন্দ্রে থাকবে ০, সীমায় থাকবে ১০।

এখানে,

০= একেবারেই অসন্তুষ্ট (Dissatisfied)

১০= অনেক বেশি সন্তুষ্ট (Extremely Satisfied)

এবার আসো আসল খেলায়!

প্রতিটি ভাগে তোমার সন্তুষ্টিকে প্রকাশ করো ০-১০ এর মাঝে একটি মান দিয়ে। সবগুলো মান বসানো হয়ে গেলে তোমার সামনে যেন ফুটে উঠবে তোমার জীবনের একটি জলজ্যান্ত নকশা! জীবনকে দেখতে পাবে এক টুকরো কাগজে!  

নম্বর দেয়ার সময় নিজেকে নিম্নোক্ত উপায়গুলোতে প্রশ্ন করতে পারো:

Career/Job: আমার বর্তমানের চাকুরিতে আমি কতটুকু সন্তুষ্ট। আমি কি আমার ক্যারিয়ার নিয়ে খুশি? খুশি হলে কতটুকু খুশি? এবার নম্বর টা বসিয়ে দাও Wheel এ। ধরো তুমি ৭/১০ দিলে।

Education: আমার পড়াশোনার স্থিতি কেমন? কতটুকু সন্তোষজনক?

Personal growth: আমি কি আত্মোন্নয়নমূলক কাজগুলো ঠিক মতো করছি? বই পড়ছি কিংবা মুভি দেখছি? জ্ঞান অর্জনের পথে পা বাড়াচ্ছি? ঠিকমত সিদ্ধান্ত নেওয়া শিখছি? নতুন নতুন দক্ষতাগুলো অর্জনের পথে এগোচ্ছি?

Physical environment: আমার বাসস্থান কতটুকু আরামদায়ক? আমার এলাকাটি কতটুকু পছন্দ করি? আমার গাড়িটি কত ভালো সার্ভিস দিচ্ছে?

Mental health: আমি মানসিকভাবে কতটুকু সুখী? আমি যতটুকু কাজের চাপ নিই, তা আমি কতটুকু সামলাতে পারি? আমি কতটুকু সন্তুষ্ট আমার মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে?

Fun & recreation: আমি কতটুকু আনন্দ-বিনোদনে নিয়োজিত? মনের খাদ্য নিচ্ছি তো ঠিকমতো? নাকি শুধু কাজই করে যাচ্ছি?

Health: আমি স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করছি তো? আমার কোন স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি আছে কি?

Performance & Productivity: সময় মতো কাজ শেষ করার ক্ষেত্রে আমি কতটুকু সন্তুষ্ট? আমি কি আমার কাজে ১০০% দিতে পারছি?

Family/Friends & socializing: আমি তাদের ঠিকমতো সময় দিচ্ছি তো? তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছি না তো?

Finance/Money: আমার আর্থিক অবস্থা কি সন্তোষজনক? এখকার উপার্জিত অর্থ কি আমার প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম?

Contribution: দেশ বা সমাজের জন্য কতটুকু করতে পেরেছি? এতটুকু কি যথেষ্ট?

Romance: আমার জীবনসঙ্গীর প্রতি আমি কি খেয়ালী নাকি অমনোযোগী? তাকে যতটুকু সময় দিচ্ছি, তা সন্তোষজনক তো?

এভাবেই নিজেকে প্রশ্নগুলো করে, সন্তুষ্টির উপর ভিত্তি করে নম্বর বসিয়ে দাও রেখাগুলোর উপর। মুহূর্তের মধ্যেই দেখতে পারবে যে কতটা ভারসাম্যে/ভারসাম্যহীন অবস্থায় তুমি এতোগুলো দিন যাপন করে এসেছো। নিম্নে একটি উদাহরণ দেওয়া হল:

ছবিঃ গুগল হতে সংগৃহীত

এই এক টুকরো কাগজে আঁকা নকশা তোমাকে বলে দিবে যে জীবনের কোন ক্ষেত্রটি তোমার একটু যত্ন নেয়ার প্রয়োজন আর কোন ক্ষেত্রটিতে তুমি প্রয়োজনের চেয়েও অধিক সময় দেওয়াতে বাকিগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

আত্ম-উপলব্ধি হওয়ানোর জন্য এর থেকে ভালো পথ আপনাকে আর কে দেখাতে পারে?

আজ পর্যন্ত অনেক অনুপ্রেরণামূলক ভিডিও দেখেছো, ব্লগ পড়েছো। সেই অনুপ্রেরণাটুকু জীবনে কতটুকু কাজে লাগিয়েছো, তা কি পরখ করা হয়েছে তোমার? যদি না হয়ে থাকে, তাহলে অনতিবিলম্বে এঁকে ফেলো তোমার নিজের Wheels of Life।

আমার Wheels of life আমাকে বলেছে স্বাস্থ্য,বিনোদন ও পড়াশোনা- এ তিনটি জায়গায় আরও মনোযোগী হতে। তোমার Wheels of life তোমাকে কী বলে?  

করণীয়ঃ

তুমি যখন জেনে যাবে যে কোথায় তোমার আরও মনোযোগী হওয়া উচিত, সেখানে সময় বিনিয়োগ করা শুরু করো। সাথে এটাও দেখো, যেই ক্ষেত্রগুলোতে তুমি ৯-১০ এর মতো নম্বর দিয়েছো, সেগুলোতে তোমার আসলেই এতো সময় বিনিয়োগ করার প্রয়োজন আছে কি না? যদি মনে হয় যে সেগুলোতে বেশি সময় দেওয়ার জন্যই বাকি ক্ষেত্রগুলো ভারসাম্য হারিয়েছে, তাহলে তোমার কাজগুলো একটু নতুন করে সাজানো শুরু করো, পুনরায় Prioritize করো।

কোনো সমস্যায় আটকে আছো? প্রশ্ন করার মত কাউকে খুঁজে পাচ্ছ না? যেকোনো প্রশ্নের উত্তর পেতে চলে যাও ১০ মিনিট স্কুল ফোরামে!

কেন এটি তৈরি করা প্রয়োজন?

  • Wheels of Life কে শুধু জীবনের মানচিত্র বললেই ভুল হবে। এটি একটি আয়নাও বটে। মুহূর্তের মধ্যে এটি তুলে ধরে জীবনের প্রতিচ্ছবি। বিষণ্ণতায় ভুগে যেন কেউ সাফল্য ও সুখের ভারসাম্য না হারায়, তাই Wheels of life তৈরি করা জরুরী।
  • যেকোনো একটি ক্ষেত্রের প্রতি অসাবধানতা যে অন্যগুলোতেও খারাপ প্রভাব ফেলে, তা বুঝতে  হলে Wheels of life এর চিত্রের দিকে তাকাতেই হবে। যেমনঃ Career এ ভালো না করলে তোমার finance এর উপর প্রভাব পড়বে। আবার ধরো, Education এ মনোযোগী না হলে হয়তো career ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিংবা ধরো, Entertainment এর জন্য সময় বরাদ্দ না করার ফলে তোমার Mental health এর উপর প্রভাব পড়বে।
  • নিজের খুঁত খুঁজে পেতে এমন একটি দৃশ্যমান চিত্র তোমাকে এনে দিবে Instant motivation। তাছাড়া, সারাক্ষণ চোখের সামনে থাকলে, তুমি হয়তো আর কখনোই জীবনে ভারসাম্য আনার ক্ষেত্রে কোন আপস করবে না।

কী দেখলে তবে? জীবনের ভারসাম্য আছে তো?

(সাধারণত পৃথিবীর অনেক Life coach এই Wheels of Life পদটি ব্যবহার করে থাকেন। Success Motivation Inc. এর প্রতিষ্ঠাতা Paul J. Meyer মূলত এই ধারণাটির উদ্ভাবক।)


পড়াশোনা সংক্রান্ত যে কোনো তথ্যের জন্য, সরাসরি চলে যেতে পারেন ১০ মিনিট স্কুলের ওয়েবসাইটে: www.10minuteschool.com

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি আপনার লেখাটি ই-মেইল করুন এই ঠিকানায়: write@10minuteschool.com

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?