সফল যারা কেমন তারা (পর্ব-১৩)

বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের কাছে এই মুহুর্তে যে কয়জন ব্যক্তি আইকন হিসেবে রয়েছেন তাদের মধ্যে  সোলায়মান  সুখন অন্যতম। মানুষকে ইতিবাচক চিন্তা করতে সাহায্য করে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনে সহায়তা করে তার জীবন সহজকারক বক্তব্য। এমন মূল্যবান দিক নির্দেশনা কাজে লাগিয়ে অনেকেই অনুপ্রাণিত ও উপকৃত হয়েছেন। ক্যারিয়ার বিষয়ক দিক নির্দেশনা দেওয়ার জন্য তরুণ প্রজন্মের কাছেও তিনি ভীষণভাবে জনপ্রিয়। দেশের বিভিন্ন স্বনামধন্য কোম্পানিতে এবং সামরিক বাহিনীতে কাজ করার অভিজ্ঞতা তার বক্তব্যগুলোকে আরও জীবনঘনিষ্ট করে তোলে।

নিয়াজ আহমেদ : কিভাবে আপনি আজকের সোলায়মান সুখন হয়েছেন? কর্পোরেট ক্যারিয়ারে নেতৃত্বস্হানীয় অবস্হানে আসার পিছনে গল্পটা যদি একটু বলতেন।

সোলায়মান সুখন : আর দশ জন মানুষের মতো আমিও একজন খুব সাধারণ মানুষ। তবে বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই আমূল পরিবর্তন আমি আট দশ বছর আগেই অনুমান করতে পেরেছিলাম। এই কারণেই আমি চাকরির পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং মিডিয়াকে মানুষের জীবন এবং ক্যারিয়ারে বাড়তি ভ্যালু অ্যাড করার একটি মাধ্যম হিসেবে বেছে নেই। তাছাড়া সামরিক বাহিনী, এফএমসিজি, টেলকো এবং টোব্যাকা সেক্টরে কাজ করার মিশ্র অভিজ্ঞতা আমাকে সহজেই জনমানুষের খুব কাছাকাছি যেতে সাহায্য করেছিলো।

ঘুরে আসুন: ভুল করাকে ভুল মনে করাই আসল ভুল

নিয়াজ আহমেদ : বর্তমান অবস্হানে আসতে আপনাকে কী কী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়েছে?

সোলায়মান  সুখন : আমি আসলে চ্যালেঞ্জ শব্দটির চেয়ে অভিজ্ঞতা শব্দটিকে বেশি পছন্দ করি, কারণ আমার পুরো ক্যারিয়ারের প্রত্যেকটি চ্যালেঞ্জ আমাকে আরও অভিজ্ঞ করে তুলেছে। যখন আমি আমার এই অভিজ্ঞতাগুলো সবার সাথে শেয়ার করি তখন তারা এর সাথে নিজের জীবনের মিল খুঁজে পান। আমি যেভাবে সমস্যাগুলো সমাধান করেছি সেটা শুনে অনেকে নিজেদের সমস্যাগুলোর সমাধানের পথ খুঁজে নেন। সেটা অনেককে নিজেদের সমস্যার সমাধানের পথ খুঁজে পেতে সাহায্য করে।

নিয়াজ আহমেদ : বেকারত্ব সমস্যা দেশের একটি বড় সমস্যা, প্রতিবছর যে সমস্ত গ্র্যাজুয়েট চাকরির বাজারে প্রবেশ করছেন তাদের অনেকেরই ক্যারিয়ার সম্পর্কে কোন ধারণা নেই, গত কয়েকবছর যাবত বেকারত্ব সমস্যা আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। আপনার মতে এই সমস্যার প্রধান কারণগুলো কী কী?

সোলায়মান সুখন : ব্রিটিশ পিরিয়ডে এদেশের মানুষের প্রধান কাজ ছিলো কৃষিকাজ, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কিছু লোক নিরাপদ ভবিষ্যতের আশায় বিদেশে পাড়ি জমায়। কিছু লোক দেশেই থেকে যায় এবং পুনরায় কৃষি কাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ শুরু করে। বিদেশে পাড়ি জমানো অধিকাংশ লোকই এখনো শারিরীক পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছে। এছাড়া লক্ষ লক্ষ নারী পুরুষ পোশাক শিল্প কারখানায় কর্মরত আছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ৪-৫সদস্যের একটি পরিবার একজনের আয়ের উপরে নির্ভর করছে।

দুঃখজনক হলেও সত্যি, এই লোকগুলোর পারিবারিক, সামাজিক এবং চারপাশ থেকে যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করে তা তাদের উন্নত চিন্তাধারা, যোগাযোগ কৌশল, উপস্হাপনা কৌশল এবং উদ্যোক্তা মনোভাব জাগ্রত করার জন্য খুবই অপর্যাপ্ত। তাছাড়া আমাদের দেশের স্কুল কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পুঁথিগত শিক্ষার সাথে বৈশ্বিক শিক্ষা ব্যবস্হার একটা বেশ বড় রকমের পার্থক্য রয়েছে। তাই আমরা নিজস্ব উদ্যোগ নিয়ে কাজ করার চেয়ে অপরের অধীনে কাজ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।  

কর্মজীবনের জন্য প্রয়োজনীয় বিভিন্ন দক্ষতার ব্যাপক ঘাটতি থাকার কারণে চাকরির বাজারে এসে একজন তরুণ দক্ষতার অভাব, পারিপার্শ্বিক চাপ এবং মানসিক দ্বিধা-দ্বন্দ্বে দিশেহারা হয়ে পড়ে। তাছাড়া আমাদের দেশের অর্থনৈতিক অবস্হা উচ্চ শিক্ষিতদের জন্য পরিমিত মাত্রায় চাকরির সুযোগ তৈরি করতে পারছে না। এই সবগুলো কারণ মিলেই বেকারত্ব সমস্যাকে দিনে দিনে আরও প্রকট করে তুলছে ।

কথায় বলে, MUN is fun!

বর্তমান সময়ের বহুল আলোচিত একটি কম্পিটিশানের নাম MUN বা Model United Nations।

কিন্তু কী এই মডেল ইউনাইটেড নেশন্স? কিভাবে ভালো করতে হয় এটিতে?

নিজেই দেখে নাও এই প্লে-লিস্ট থেকে!
১০ মিনিট স্কুলের MUN সিরিজ!

নিয়াজ আহমেদ : এদেশে পড়াশুনা শেষ করে অনেকেই নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। আমরা কি তাদের ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দিতে পারছি না? মেধাবী এসব তরুণদের দেশের উন্নয়নে নিয়োগ করতে হলে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে?

সোলায়মান সুখন : আকারে পৃথিবী গোলাকার হলেও গুগলের এই যুগে পৃথিবী এখন আর গোল নেই। মুঠোফোনের মাধ্যমে পৃথিবীর কোথায় কী হচ্ছে, কোন প্রান্তে কী কী সুযোগ সুবিধা রয়েছে, তা খুব সহজেই জানা যাচ্ছে। তাই তরুণরা যখন দেখছে পৃথিবীর অপর প্রান্তে নিশ্চিত ভবিষ্যত, বাড়তি বেতন ও কর্মসংস্হানের ব্যবস্হা রয়েছে, তখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বাস্তবতা বনাম দেশপ্রেমের মাঝে মানুষ অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাস্তব অবস্হার প্রেক্ষিতে বিদেশে পাড়ি জমানোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়।

নিয়াজ আহমেদ :  কিছু কিছু সমালোচক ইদানীং জীবন সহজকারক ও অনুপ্রেরণামূলক কথার সমালোচনা করেন। তাদের মতে তরুণদেরকে ভুল স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে। এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কী?

সোলায়মান সুখন : মানুষের ভিন্নমত থাকতেই পারে, কিন্তু বড় করে স্বপ্ন দেখতে কোন দোষ নেই। আমাদের দেশে যেসব বক্তারা জীবন সহজকরক ও অনুপ্রেরণামূলক কথা বলে তরুণদের উজ্জীবিত করছেন তাদের প্রত্যেকেরই জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পিছনে রয়েছে একটি জীবন যুদ্ধের গল্প। যে গল্প তরুণদের উজ্জীবিত করে। তবে যখনই সমাজে কোন নতুন ধারা জনপ্রিয়তা পায়, তখন  কিছু অপেক্ষাকৃত কম দক্ষ লোক এর সুবিধা নেওয়া চেষ্টা করে। অনেকে আছে শুধু জনপ্রিয়তাটা দেখে, কিন্তু জনপ্রিয় হওয়ার জন্য যে পরিশ্রম ও দক্ষতা দরকার সেটাকে যথাযথ গুরুত্ব দেয় না। তবে জনগণ বোকা নয় তারা ভালো ও মন্দ এর পার্থক্য করতে পারে।

নিয়াজ আহমেদ : অনেক সময় অনুপ্রেরণা কাজ করে না। কিন্তু কেন? কীভাবে অনুপ্রেরণাকে কর্মজীবনে কাজে লাগানো যায়?

সোলায়মান সুখন : আমাদের নিজেদের আত্মপর্যালোচনা করতে হবে, নিজেদের কোন কোন দক্ষতাগুলোর ঘাটতি আছে সেগুলো খুঁজে বের করতে হবে এবং সেগুলো কাটিয়ে উঠার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রশিক্ষণের জন্য সময় এবং অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে। সবসময় আত্মউন্নয়নের জন্য কাজ করতে হবে এবং কখনোই হাল ছেড়ে দেওয়া চলবে না।

নিয়াজ আহমেদ : প্রতি বছর ৫ বিলিয়ন ইউএসডি পরিমাণ অর্থ বাইরে দেশের নাগরিকেরা আমাদের দেশ থেকে চাকুরি করে বেতন হিসেবে নিয়ে যাচ্ছে অথচ আমাদের দেশেরই লাখো যুবক এখনো বেকার। কীভাবে আমাদের দেশের কোম্পানিগুলোর দেশীয় যুব শক্তির প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব?

রাজধানীর নাম জানাটা সাধারণ জ্ঞানের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই ১০ মিনিট স্কুলের এই মজার কুইজটির মধ্যমে যাচাই করে নাও নিজেকে! জেনে নিই রাজধানীর নাম!

সোলায়মান সুখন : এই প্রশ্নের উত্তর আমি আগেই দিয়েছি। আমাদের শিক্ষাগত পরিবর্তন আনতে হবে। তরুণদের ইতিবাচক চিন্তা উন্নত যোগাযোগ দক্ষতা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, সময়ানুবর্তিতা, অধ্যবসায় এবং কথা দিয়ে কথা রাখা ইত্যাদি গুণাবলী রপ্ত করা বিশেষ জরুরি। তাহলেই চাকুরিদাতা এবং বর্তমান তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই দূরত্ব এবং এই দূরত্বকে কাজে লাগিয়ে বিদেশী চাকুরীজীবীদের দৌরাত্ম, উভয়ই কমানো সম্ভব।

নিয়াজ আহমেদ : একজন উদ্যোক্তা সহজেই অপরের সমালোচনা শুনে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে পড়েন এবং অনুপ্রেরণা হারিয়ে ফেলেন, সমালোচনাকে সামলে নিয়ে কীভাবে এগিয়ে যাওয়া যায়?

সোলায়মান সুখন : পৃথিবী কখনো সমালোচকদের মনে রাখে না, বরং যারা সমালোচিত তাদের মনে রাখে। আর যারা সৃষ্টিশীল পরিবর্তনের চেষ্টা করে এবং সমাজ ব্যবস্থাকে উন্নত থেকে উন্নততর স্তরে এগিয়ে নিতে কাজ করে, যুগে যুগে তারা সকলেই সমালোচিত। এর মাঝেই ভালো কাজ হচ্ছে। আয়মান সাদিকের টেন মিনিট স্কুল, জুবায়ের হোসেনের ভ্যাট চেকার, ওসামা বিন নুরের Youth Opportunities এবং আপনার কর্পোরেট আস্ক- কোন উদ্যোগই সমালোচনা ছাড়া এতটা সফল হতে পারতো না। কাজেই নতুন আইডিয়া নিয়ে আসতে হবে। পরিশ্রম করতে হবে, লেগে থাকতে হবে এবং কিছুতেই হাল ছেড়ে দেওয়া চলবে না। সমালোচনাকে আত্নউন্নয়নের কাজে লাগাতে হবে। কখনোই ভেঙে পড়া চলবে না। সমালোচনার চেয়ে বরং ব্র্যান্ডিং আর কিছু নেই।

নিয়াজ আহমেদ : আপনি সবসময় তরুণ প্রজন্মকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে দক্ষতা বাড়াতে অনুপ্রাণিত করেন। এতে করে কী তাদের সামাজিক মূল্যবোধ কমে আসছে না?

সোলায়মান সুখন : বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কখনোই আমাদের শত্রু নয় বরং পরম বন্ধু। কিন্তু পুরো ব্যাপারটাই নির্ভর করছে যিনি ব্যবহার করছেন তার উপর। কলম আবিষ্কার করা হয়েছিলো লেখার জন্য, কিন্তু এটাকে কেউ যদি চোখ উপড়ে ফেলার কাজে ব্যবহার করে তাহলে সেই দোষ কলম কিংবা কলম আবিষ্কারকের নয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে মূলত শিক্ষা এবং নেটওয়ার্কিং-এর কাজে ব্যবহার করা উচিত। এছাড়াও পারিবারিক জীবন ও কর্মজীবনে সামঞ্জস্য বজায় রাখা একজন মানুষের জন্য ভীষণভাবে জরুরি।

ঘুরে আসুন: একটা হাসির অনেক ক্ষমতা!

নিয়াজ আহমেদ : আপনার জীবনের বড় অজর্নগুলো কী কী বলে মনে করেন?

সোলায়মান সুখন : আমি যেসব কোম্পানিতে কর্মরত ছিলাম তাদের সবার সাথে আমার এখনো চমৎকার সম্পর্ক রয়েছে। নিজেকে প্রতিনিয়ত আমি নতুন কাজে নিবিষ্ট করেছি। আমার উপরে অর্পিত যেকোন দায়িত্ব আমি সফলভাবে পালন করতে চেষ্টা করেছি, কখনো হাল ছাড়িনি এবং লেগে থেকেছি। প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সময় প্রতিষ্ঠানকে আমি নিজের প্রতিষ্ঠান বলে মনে করতাম এবং কখনো কর্মক্ষেত্রে কোন অনৈতিক কাজ করিনি কিংবা আদর্শ থেকেও একচুল পরিমাণ বিচ্যুত হইনি। আমার বহুমাত্রিক কাজের অভিজ্ঞতাই আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় সাফল্য বলে আমি মনে করি।

নিয়াজ আহমেদ : তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশ্যে আপনার কী মেসেজ দেওয়ার আছে?

সোলায়মান সুখন :তরুণ প্রজন্মকে আমি এজন্য বৈশ্বিক নাগরিক হতে অনুরোধ করবো যাতে করে তারা পৃথিবীর সব জায়গায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। নিরাপদ ভবিষ্যতের চিন্তায় দেশত্যাগ করা কোন সমাধান নয়, বরং  একজন বৈশ্বিক বাংলাদেশী নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশে বসবাস করে এদেশের উন্নয়নে মিলিত ভাবে কাজ করার জন্য সকলের প্রতি আমার বিনীত অনুরোধ রইলো


১০ মিনিট স্কুলের লাইভ এডমিশন কোচিং ক্লাসগুলো অনুসরণ করতে সরাসরি চলে যেতে পারো এই লিঙ্কে: www.10minuteschool.com/admissions/live/

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: [email protected]

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?