অর্পাহ থেকে অপরাহ উইনফ্রে!

ফেসবুকে অনেক প্রচলিত বিষয়গুলোর মাঝে উপরের দিকে থাকে একটা বিষয়, অসচ্ছল মানুষের দুঃখগাঁথা। কেউ একজন হঠাৎ করে এই দুঃখগাঁথা নিয়ে কিছু বললেই হয়েছে, মুহুর্তের মাঝে হাজারো রিয়্যাকশন পড়ে যায়, হাজারো শেয়ার হয়ে যায়… সবাইই যেন, কোনো না কোনো দিক দিয়ে কথাগুলোর সাথে নিজের জীবনের মিল পেয়ে যায়। আর পাবেই না বা কেন? বাংলাদেশে এই মধ্যবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত শ্রেণীর মানুষের সংখ্যাই যে সবচেয়ে বেশি! আমিও নিজেও একটা খাঁটি মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্য!

এই অসচ্ছলতা নিয়ে আমাদের কত্ত অভিযোগ! কতবার মনে মনে বলেই ফেলি, ইস! অবস্থাটা আরেকটু ভাল হত! কষ্ট নিয়ে কত বড় বড় স্ট্যাটাসও লিখে ফেলি। কিন্তু কখনো কি “অবস্থাটা কেন একটু ভাল হয় না?” এর পরিবর্তে কি মনে হয় না যে, “অবস্থাটা কেন একটু ভাল করি না?” দুঃখের কথা বাদ দিয়ে কখনো কি ভাবি না, একটা সমাধানের কথা? ছোটবেলা থেকে এই জেনে বড় হয়েছি যে, সৃষ্টিকর্তা শুধুমাত্র তাদের সাহায্য করেন, যারা নিজেরা নিজদের সাহায্য করে। আমাদের মাঝে অনেকেই রয়েছে যারা শুধু এই বাক্যে বিশ্বাস করেনি বরং বাস্তবে এই বাক্যের প্রয়োগও করেছে। আজকে তাদের মাঝে একজনের গল্পই বলব। তিনি আর কেউ না, আমেরিকার সবচেয়ে প্রভাবশালী নারীদের মাঝে একজন, অপরাহ উইনফ্রে!

“The greatest discovery of all time is that a person can change his future by merely changing his attitude.

– Oprah Winfrey

অপরাহ  উইনফ্রে, Queen of all media- এর জন্ম ২৯ শে জানুয়ারি, ১৯৫৪ সালে, মিসিসিপির কসিউস্কো এর এক নিতান্ত দরিদ্র পরিবারে। ছোটবেলায় হিব্রু বাইবেল থেকে নিয়ে, তার নাম রাখা হয়, অর্পাহ। কিন্তু তাঁর মা সহ পরিচিত কেউই সে নাম উচ্চারণ করতে পারত না, তাই পরে সে নিজেই তাঁর নাম বদলে রাখেন অপরাহ । তাঁর মা, ভার্নিটা লি ছিলেন গৃহপরিচারিকা, বাবা ভার্নন উইনফ্রে ছিলেন নাপিত। মা-বাবার বিচ্ছেদের কারণে জন্মের পরপরই তাঁর আশ্রয় হয় নানির কাছে যেখানে দারিদ্র্যের জন্য তাঁকে জামার বদলে ‘আলুর বস্তা’ পড়ে সমবয়সীদের হাসির পাত্র হতে হয়।

দারুণ সব লেখা পড়তে ও নানা বিষয় সম্পর্কে জানতে ঘুরে এসো আমাদের ব্লগের নতুন পেইজ থেকে!

নানা-নানির সাথে আমাদের যেমন সুখকর স্মৃতি থাকে, অপরাহর তা ছিল না। ছোটবেলায় একটু পান থেকে চুন খসলেই অপরাহকে নানির বেত দিয়ে মার খেতে হত। তারপরও অপরাহর রোল মডেল সেই নানিই, তিনি আজকে যে অবস্থায় আছেন, তাঁর কৃতিত্ব তিনি তাঁর নানিকেই দেন। তাঁর ভাষ্যমতে, তাঁর নানির থেকে তিনি তাঁর জীবনে সবচেয়ে বড় উপহারটা পেয়েছেন। তা হচ্ছে, মাত্র তিন বছর বয়স থেকেই পড়তে শেখা। স্কুলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত অপরাহ উইনফ্রে জুতো কী জিনিস জানতেন না, আলুর বস্তা বাদে কোনো পোশাকও পড়েননি। তাঁর কাছে তখন বিনোদনের মাধ্যম ছিল পশুপাখির সাথে খেলা করা আর প্রচুর বই পড়া।

“Books were my pass to personal freedom. I learned to read at age three, and soon discovered there was a whole world to conquer that went beyond our farm in Mississippi.

অপরাহ  সবসময় অল্পতেই খুশি থাকতেন এবং যাই করতেন, খুব মন দিয়ে করতেন। ছোটবেলায় তাঁর নানি তাঁকে প্রতি রোববার চার্চে নিয়ে যেত যেখানে মানুষ তাঁর রিসাইটেশন শুনে শ্রদ্ধায় দাঁড়িয়ে যেত।

“Be thankful for what you have; you’ll end up having more. If you concentrate on what you don’t have, you will never, ever have enough.

এরপর মাত্র নয় বছর বয়স থেকে তিনি আশেপাশের মানুষদের থেকে নিগৃহীত হতে থাকেন এছাড়াও এই অল্পবয়সেই তাঁকে সাক্ষী হতে হয় অনেক কাছের মানুষের করুণ মৃত্যুর।

পড়ুয়া অপরাহ  কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি হবার পরে নিজে থেকে প্রিন্সিপালকে দরখাস্ত পাঠায় এই আবেদন করে যে, তাঁকে যেন সরাসরি প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ করে দেয়া হয়। প্রিন্সিপাল কৌতুহলের বশে তাঁর আবেদন গ্রহণ করেন। এরপর তাঁর সাফল্যে খুশি হয়ে প্রিন্সিপাল এবার নিজে থেকেই তাঁকে তৃতীয় শ্রেণিতে উত্তীর্ণ করে দেন। তখন থেকেই এই দারিদ্রতার সাথে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করা ছোট্ট মেয়ের ভবিষ্যতের ব্যাপক সফলতার আভাস পাওয়া যায়।

জেনে নাও জীবন চালানোর সহজ পদ্ধতি!

আমাদের বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের একটা বড় সমস্যা হতাশা আর বিষণ্ণতা।

দেখে নাও আজকের প্লে-লিস্টটি আর শিখে নাও কীভাবে এসব থেকে বের হয়ে সাফল্য পাওয়া যায়!

১০ মিনিট স্কুলের Life Hacks সিরিজ

এরপর তাঁকে পাঠিয়ে দেয়া হয় অন্য শহরে, তাঁর মায়ের কাছে। যেখানে জীবনযাপন হত সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রথায়। নতুন শহরে গিয়ে অনেক দারিদ্রের মাঝেও অপরাহ উইনফ্রে বিভিন্ন এ্যক্টিভিটিজে অংশগ্রহণ করতেন যেই অংশগ্রহণই তাঁকে নিয়ে গেছে বহুদূরে। এই প্রসঙ্গে অপরাহ উইনফ্রে বলেন যে, তিনি এত খারাপ সময় পার করেছেন কিন্তু সবকিছুর মাঝেও সবসময় বিশ্বাস করতেন যে একদিন তিনি সফল হবেনই।

“Passion is energy. Feel the power that comes from focusing on what excites you.

মায়ের শহরে তাঁর দিন ভাল যাচ্ছিল না বিধায় তিনি সেখান থেকে পালিয়ে তাঁর বাবার কাছে চলে যান কিন্তু পরবর্তীতে আইনানুযায়ী তাঁকে তাঁর মায়ের কাছে ফিরে আসতে হয়। এরপর মাত্র নয় বছর বয়স থেকে তিনি খুব কাছের মানুষদের থেকে ক্রমাগত নিগৃহীত এবং নির্যাতিত হতে থাকেন। পরে সহ্য করতে না পেরে তিনি আবার পালিয়ে যান। কিন্তু তাঁর সব টাকা শেষ হয়ে যাওয়ায় তাঁকে এক পরিচিত পাদ্রীর কাছে আশ্রয় নিতে হয়। সে পাদ্রী তাঁকে  আবারো ফিরিয়ে দেন তাঁর মায়ের কাছে এবং বারবার পালিয়ে যাওয়ার কারণে তাঁর মা তাঁকে ত্যাজ্য করে দেন। পরে সেই অবস্থায় তাঁর বাবা তাঁকে সাহায্য করেন। এছাড়াও এই অল্পবয়সেই তাঁকে সাক্ষী হতে হয় অনেক কাছের মানুষের করুণ মৃত্যুর।

“Surround yourself with only people who are going to lift you higher.

এত কিছুর পরও, কিশোর বয়সেই অপরাহ উইনফ্রে নিজ যোগ্যতায় প্রথম আফ্রিকান- আমেরিকান হিসেবে ন্যাশভিল টেলিভিশনে সংবাদ উপস্থাপনার চাকরী পেয়ে যান কিন্তু তা তাঁর জন্য তেমন একটা সুখকর হয়না। কেননা, সেখান থেকে তাঁকে বিনা দোষে তাঁকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর তিনি বাল্টিমোরে একজন সাংবাদিক এবং এক টেলিভিশনে সহউপস্থাপকের পদে চাকরী পেয়ে যান। তাঁর ভয় ছিল এই যে, তাঁর জাত এবং অবস্থার কারণে আমেরিকানরা তাঁকে পছন্দ করবে না কিন্তু তাঁর প্রতিভা এবং পরিশ্রমের কারণে তাঁর অনুষ্ঠান রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এরপর অপরাহ উইনফ্রে অনেক টিভি শো এবং ছবিতে অভিনয় করার সুযোগ পান এবং সেখানেও ব্যাপক সমাদৃত হন।

ইংরেজি ভাষা চর্চা করতে আমাদের নতুন গ্রুপ- 10 Minute School English Language Club-এ যোগদান করতে পারো!

অপরাহ উইনফ্রের মতে তাঁর এই সাফল্যের একমাত্র কারণ ছিল স্বপ্নকে কখনো ভুলে না গিয়ে সে হিসেবে জীবনে এগোনো।

“The biggest adventure you can take is to live the life of your dreams.

১৯৮৮ সালে অপরাহ উইনফ্রে “দ্যা হার্পো এন্টারটেইনমেন্ট গ্রুপ” নামে নিজের কোম্পানি খোলেন। ২০০০ সালে বাজারে আনেন তাঁর ম্যাগাজিন, “দ্যা অপরাহ ’স ম্যাগাজিন”। তাঁর “দ্যা অপরাহ  উইনফ্রে’স শো” বর্তমান শতাব্দীর শীর্ষস্থানীয় অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম, এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে পারলেই রাতারাতি খ্যাতি পাওয়া যায় এমনটাই মনে করেন সমগ্র বিশ্বের মানুষজন। বিংশ শতাব্দীর সর্বোচ্চ ধনী মার্কিন-আফ্রিকান হিসেবে আখ্যায়িত অপরাহ উইনফ্রের মোট সম্পদের পরিমাণ, ২.৮ বিলিয়ন ডলার যার একটা অংশ যায় সমাজসেবায়। বর্তমানে তিনি উত্তর আমেরিকার প্রথম এবং একমাত্র মাল্টি-বিলিয়নিয়ার কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবে পরিচিত।

“Think like a queen. A queen is not afraid to fail. Failure is another steppingstone to greatness.

আজ যেই অপরাহ উইনফ্রেকে আমরা দেখি, তিনি একদিনে এমনটা হননি। তাঁকে পেরিয়ে আসতে হয়েছে অনেক অমসৃণ পথ। এত বাঁধা পেরিয়ে অপরাহ যদি এত সফলতা পেতে পারেন, তাহলে আমাদের অজুহাতটা কী?

“Where there is no struggle, there is no strength.

– Oprah Winfrey


১০ মিনিট স্কুলের লাইভ এডমিশন কোচিং ক্লাসগুলো অনুসরণ করতে সরাসরি চলে যেতে পারো এই লিঙ্কে: www.10minuteschool.com/admissions/live/

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: write@10minuteschool.com

 

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?