ভর্তিপরীক্ষা আর স্বপ্নপূরণের গল্প

পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবারে শুনে নাও!

সামনে ভর্তি পরীক্ষা আসছে। জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া একটি সময়। তোমরা যারা ভর্তি পরীক্ষার্থী, খুব সম্ভবত জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়টা পার করছো এখন। যেই ছেলেটা বা মেয়েটা ডাক্তার হতে চেয়ে চান্স না পেয়ে অন্য সাবজেক্টে ভর্তি হয়ে যাবে, তার হয়তো আর কখনো সাদা এপ্রোন গায়ে চড়ানোর স্বপ্নটা পূরণ হবে না! কয়েকটা মাসের পড়াশোনার উপর চিরদিনের জন্য নির্ধারিত হয়ে যাবে তার জীবনের গতিবিধি! তাই এই অমানুষিক পরিশ্রম আর মানসিক চাপের ভেতর দিয়ে যায় যখন মানুষ, সবারই বলার মতো কিছু না কিছু একটা গল্প তৈরি হয়। কারোটা উল্লাসের, কারোটা চাপা কষ্টের। তোমাদেরও অনেক রকম বলার মতো গল্প হবে।

আজকের এই গল্পটি আমার।

একটা মানুষের সাফল্যের পিছে কতজনেরই না অবদান থাকে! আমার ক্ষেত্রে গল্পটা একটু ভিন্ন। আমার গল্পটা মাত্র একজন মানুষকে নিয়ে। সেই মানুষটাকে আমি আবার কখনো সামনাসামনি দেখিনি! গল্পটা হয়তো একটু বড়, লেখাও হয়তো অনেক অগোছালো। প্রিয় পাঠক, শুধু অনুরোধ করবো ধৈর্য ধরে গল্পটা পুরোটা পড়ুন।

দারুণ সব লেখা পড়তে ও নানা বিষয় সম্পর্কে জানতে ঘুরে এসো আমাদের ব্লগের নতুন পেইজ থেকে!

আমার গোটা ইন্টার লাইফটা সোজা কথায় “hell” ছিল। ইন্টারের পড়া আমি কিছু বুঝতাম না এবং মোটামুটি সারাক্ষণই ভয়াবহ ডিপ্রেশনে ভুগতাম।

প্রিয় পাঠক, “ডিপ্রেশন” শব্দটার সাথে আপনারা সবাই কম বেশি পরিচিত। শ্রুতিমধুর একটি শৌখিন ইংরেজি শব্দ, কায়দামত ব্যবহার করতে বেশ(!) লাগে। মেডিকেল ডিকশনারিতে এটার কাঠখোট্টা সংজ্ঞা থেকে থাকবে, কিন্তু আমি সোজা বাংলায় আমার মত করে জিনিসটাকে ব্যাখ্যা করি- ডিপ্রেশন হল যখন আপনি একজন স্টুডেন্ট এবং আপনি দিনের পর দিন, মাসের পর মাস আপ্রাণ চেষ্টা করেও কিছু পড়তে পারেন না, শুধু বইয়ের পৃষ্ঠার দিকে রাতের পর রাত শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকাই সার। যখন আপনি প্রাণপণ চেষ্টা করেও কোন পড়াই মনে রাখতে পারেন না এবং প্রতিটা কুইজ, প্রতিটা এক্সামে বেহায়ার মত বন্ধুদের করুণার পাত্র হয়ে তাদের খাতা দেখে দেখে লিখে কোনমতে পাস মার্ক এর ঠেলা উতরে আসেন।

ক্রমাগত ব্যর্থতা আর পুঞ্জিভূত হতাশায় আপনার আত্মবিশ্বাস, আত্মসম্মানবোধ এত তলানিতে গিয়ে ঠেকে যে বেঁচে থাকার বিন্দুমাত্র আগ্রহটুকু হারিয়ে ফেলেন আপনি, সবার থেকে গুটিয়ে নেন নিজেকে, ঘর অন্ধকার করে গুটিশুটি হয়ে বসে পার করে দেন সারাদিন। যখন আপনার প্রতিরাতে দফায় দফায় ঘুম ভাঙে ভয়াবহ সব দুঃস্বপ্ন দেখে এবং ঘুম ভাঙার পর “যাক, এটা কেবল একটা দুঃস্বপ্ন ছিল!” ভেবে আপনি কোন স্বস্তি পান না, কারণ জাগ্রত অবস্থার সময়গুলো আপনার জন্যে দুঃস্বপ্নের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। যখন আপনি খাওয়া-দাওয়ার প্রতি সম্পুর্ণ আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন এবং কয়েক মাসের ব্যবধানে রাতারাতি আপনার ওজন কেজি সাতেক কমে যায়, যখন আপনার অসংলগ্ন মস্তিষ্কে কোন চিন্তা লজিক্যালি ধরে রাখাই অসম্ভব হয়ে যায়- That, my friend, is “depression”.

এরমধ্যে টেস্ট পরীক্ষার আগে আগে একটি বিচিত্র ঘটনা ঘটলো। সিলেটে বেড়াতে গিয়ে সহপাঠীর এক বন্ধুর সাথে পরিচয় হয়েছিলো, তার হোন্ডায় চড়ে আমরা সিলেটের টিলা-টক্কর-পূজামন্ডপ থেকে শুরু করে হেন জায়গা নেই যেখানে ঢুঁ মারিনি। বেড়ানো শেষে ঢাকায় ফিরে আসতে না আসতেই শুনি সেই বন্ধুটি নাকি সুইসাইড করে ফেলেছে!

খোঁজ নিয়ে জানলাম তার মানসিক অবস্থাও বলতে গেলে অনেকটা হুবুহু আমার মত ছিল। এই দুঃসহ বোঝা দিনের পর দিন সহ্য করার মত ধৈর্য অথবা ইচ্ছা কোনটাই হয়তো তার ছিল না, তাই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়ার সহজ পথটাই বেছে নিল সে- ডিপ্রেশনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ফাঁকি দিয়ে কেটে পড়লো জীবনের পালা চুকিয়ে। আমি মোটামুটি মোহগ্রস্তের মত শুনলাম পুরো কাহিনী, মনে মনে ভাবছি- “বাহ! কী সহজ সমাধান! আমার মাথায় কেন আসেনি এতদিন!!”

ঘুরে আসুন: ১০টি কৌশল যা পড়া মনে রাখতে সাহায্য করবে!

বুঝতেই পারছেন, এই “বুদ্ধি”টির বাস্তব প্রয়োগ ঘটালে গল্পটা বলার জন্য হয়তো আজ আপনার সামনে থাকতাম না আমি! আল্লাহর অশেষ রহমত, এই “বুদ্ধি” সম্পাদনের আগেই বরং আরেকটা জিনিস খুঁজে পেলাম আমি, অনেকটা অপ্রত্যাশিত ভাবেই- সেটা হচ্ছে একটা ভিডিও কোর্স-“Vocabulary course by Farhad Hossain Masum”। ঝোঁকের বশে একটি ভিডিও প্লে করলাম এবং অত্যন্ত বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করলাম- “Actually… I can memorize it!”

আমার আর হাজারটা ব্যর্থ প্রচেষ্টার মত এই সংকল্পটা হারিয়ে যায়নি

আমার রীতিমত হাত কাঁপতে লাগলো উত্তেজনায়! ডুবন্ত মানুষ খড়কুটো আঁকড়ে ধরেও বাঁচার চেষ্টা করে, আমি ঝটপট কোর্সটার সবগুলো ভিডিও ডাউনলোড করে ফেললাম। “Addled, Muddled, Befuddled!!- হতবাক, হতভম্ব এবং হতবিহবল!!” “Were I in a divulgatory mode, what then I might divulge?- ফাঁস করার ইচ্ছা যদি জাগেই, কী কী ফাঁস করতে হবে শুনি?!”

মজায় মজায় অংক শিখ!

অঙ্ক এমন একটা জিনিস যা আমাদের সারা জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপেই কাজে লাগে।

তাই আর দেরি না করে, আজই ঘুরে এস ১০ মিনিট স্কুলের এই এক্সক্লুসিভ প্লে-লিস্টটি থেকে!

ম্যাথ হ্যাকস!

“simper & smirk” হচ্ছে ‘আগেই তো কইসিলাম’ টাইপ হাসি! “আমার নানাকে যখন নানী জিজ্ঞেস করতো উনি কয় ডজন ডিম এনেছে, নানা ডজন না বলে বলতো কজন! এখান থেকে মনে রাখতে পারেন “cozen” মানে প্রতারণা করা!” এরকম কত বিচিত্র বিচিত্র নিমোনিকস, ফাঁকে ফাঁকে লর্ড অফ দ্যা রিংস আর ভি ফর ভেন্ডেটা থেকে ভুরিভুরি উদাহরণ- আমি চোখ বড় বড় করে মন্ত্রমুগ্ধের মত সব গোগ্রাসে গিলতে শুরু করলাম।

এ পৃথিবীতে আমি একটা স্বস্বীকৃত অপদার্থ, আমার চাকরি-বাকরি ইতংবিতং জগত-সংসার এর কোন বোঝা নেই, একমাত্র কর্তব্য পড়ালেখা করা- এবং সেটাতে আমি আশ্চর্য জাগানিয়া পর্যায়ের ব্যর্থ(!), এই অবস্থায় কোর্সটা হয়ে উঠলো আমার একমাত্র স্বান্ত্বনার অবলম্বন, একমাত্র ভরসা। “I’m not totally worthless”-পৃথিবীতে অন্তত এই একটা কাজে আমি কিছুটা হলেও মনোযোগ ধরে রাখতে পারি, সুতরাং এখানে আমি আমার সবটুকু ঢেলে দিলাম। ততদিনে জেনে গেছি যে এই কোর্সটা শিখলে ভোক্যাবগুলো SAT, IBA এডমিশান টেস্ট সহ বিভিন্ন কাজে লাগে- সুতরাং আমার জন্য একটুখানি আশা আছে বৈকি!

আমার পাঠ্যবই এর পড়া হয়তো এক লাইন ও পারিনা আমি, কিন্তু তাই বলে হাল ছাড়বো না। এই কোর্সটা খুব মনোযোগ দিয়ে শিখবো এবং একদিন এর প্রায়োগিক উপযোগিতা প্রমাণ হবে। আমার এখনো মনে আছে, যেদিন vocabulary course-এর সর্বশেষ ভিডিওটি পাবলিশ করা হল, ভিডিওটির একদম শেষে “Vocabulary Course আপনাদের কাজে লেগে থাকলে আমার কষ্ট সার্থক।

stay awesome, Bangladesh!” জায়গাটায় pause করে আমি অনেকক্ষণ হাউমাউ করে কাঁদলাম এবং দাঁতে দাঁত চেপে শপথ করলাম-যেভাবেই হোক একদিন আমি ঠিকই IBA-তে চান্স পাবো এবং সেইদিন আমি একটা খোলা চিঠি লিখবো ফরহাদ হোসেন মাসুম ভাইয়াকে, তাঁকে জানাবো কিভাবে তার কোর্সটি আমার শুধু “কাজে লাগেনি”, বরং আমার গোটা জীবনটাই বদলে দিয়েছে!

আল্লাহর কাছে অশেষ শুকরিয়া, আমার আর হাজারটা ব্যর্থ প্রচেষ্টার মত এই সংকল্পটা হারিয়ে যায়নি। আজ সেই দিন এসেছে। আমি হার মানি নাই। মাসের পর মাস নির্ঘুম চোখে লেগে থেকে অবশেষে বিজয়ের মাসে বিজয় নিশান উড়িয়ে দিয়েছি!

I’ve kept my promise, I’ve gotten into IBA, & right now I’m writing this letter with tears rolling down my cheeks. I don’t know how to express my gratitude. I just want to promise one thing- You Sir, have changed my life. Some day I’ll get myself into a position from where I’ll change thousands of people’s lives।”

ব্লগটি পড়তে পড়তেই চল খেলি কিছু মজার ব্রেইন টীজার গেইম!

(আইবিএ ভর্তি পরীক্ষার ফলাফল যেদিন প্রকাশিত হলো, এই লেখাটি সেদিন সন্ধ্যায় লেখা। মজার ব্যাপার হচ্ছে আমার জীবনে টেন মিনিট স্কুলের সাথেও এই লেখাটির গুরুত্বপূর্ণ একটি সম্পর্ক রয়েছে। ফেসবুকে একজন এই লেখাটি পড়েছিল এবং প্রায় সাত মাস পর যখন টেন মিনিট স্কুল ব্লগ নতুন উদ্যমে চালু করা হচ্ছে, নতুন লেখক প্রয়োজন, তখন সেই মানুষটি আমার এই লেখাটি ব্লগের সম্পাদককে পড়তে দিয়েছিলো। তারপর যথারীতি যোগাযোগ, যোগদান।

এই লেখাটি না থাকলে হয়তো কোনদিন টেন মিনিট স্কুলে কাজ করাই হতো না! এখন টেন মিনিট স্কুল ব্লগে “গল্পে গল্পে Vocabulary” নামে একটি ভিডিও সিরিজ শুরু হয়েছে, তার পেছনেও অনুপ্রেরণা হিসেবে রয়েছে সেই মাসুম ভাইয়ের ভোক্যাবুলারি কোর্স!

তোমার একটি ভাল কাজ কতোভাবে যে কতোজনের জীবনে ভূমিকা রাখতে পারে সেটি কখনো কল্পনা করার মতো নয়! এইযে তুমি আজ এই লেখাটি পড়ছো, একদিন তুমিও এভাবে কাউকে খোলাচিঠি লিখবে। আমি সেই চিঠিটি পড়ার প্রত্যাশায় রইলাম। সবার জন্য অনেক অনেক শুভকামনা!)

এই লেখাটির অডিওবুকটি পড়েছে মনিরা আক্তার লাবনী


১০ মিনিট স্কুলের লাইভ এডমিশন কোচিং ক্লাসগুলো অনুসরণ করতে সরাসরি চলে যেতে পারো এই লিঙ্কে: www.10minuteschool.com/admissions/live/

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: write@10minuteschool.com

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
Author
Tashfikal Sami

Tashfikal Sami

Tashfikal Sami is a diehard wrestling & horror movie fan. Passionately loves bodybuilding, writing, drawing cartoons & a wannabe horror film director. He's currently studying at the Institute of Business Administration (IBA), University of Dhaka.
Tashfikal Sami
এই লেখকের অন্যন্য লেখাগুলো পড়তে এখানে ক্লিক করুন
What are you thinking?