হাইজেনবার্গের গল্প: রোগ যখন জীবন বাচাঁয়

অসুখ বিসুখ আমাদের জন‍্য অত‍্যন্ত ভয়ের ব‍্যাপার। কিন্তু, কখনো কখনো অসুখ আপনার জীবন বাঁচিয়ে পর্যন্ত দিতে পারে। এরকমই একটা ঘটনা ঘটে গেছে আফ্রিকার মানুষজনের সাথে। Sickle Cell Anemia (SCA) নামক একটি জেনেটিক রোগ আছে যা আমাদের লোহিত রক্ত কণিকা (Red Blood Cell) এর আকৃতি নষ্ট করে দেয়। তাই, যাদের Anemia হয় তাদের রক্ত ভালোভাবে অক্সিজেন পরিবহণ করতে পারে না। মারাত্মক অবস্থায় রোগীর মৃত‍্যু পর্যন্ত হতে পারে।

এই Sickle Cell Anemia আছে আবার দুই ধরণের। ব‍্যাপারটা নির্ভর করছে আমাদের জিনের উপর। মানুষের প্রতিটি জিনের দুটি কপি থাকে। যাদের একটি কপি নষ্ট হয়ে যায় তাদের আমরা বলি Anemia এর বাহক; আর দুটি কপিই নষ্ট হলে সেই ব‍্যক্তি পূর্ণাঙ্গ রোগী। দুই কপি নষ্ট যাদের তারা মারাত্মক শ্বাস কষ্টে ভুগে যা মৃ‍ত‍্যু পর্যন্ত ডেকে আনে। আর যাদের একটি কপি নষ্ট সেই বাহকরা মোটামুটি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। মূলত Anemia বাহকদের লম্বা সিড়িঁ বেয়ে উঠতে কষ্ট লাগে। তারা বেশিক্ষণ পরিশ্রম করতে পারেন না। 

এবার আসা যাক আফ্রিকার সেই মানুষগুলোর গল্পে। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, আফ্রিকার বেশ বড় একটা জনসংখ‍্যা Anemia এর বাহক। এবং এই সংখ‍্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। কিন্তু, এর কারণ কি? সাধারণত, একটা জিনের পরিমাণ কোন জনগোষ্ঠীতে বৃদ্ধি পায় যদি সেই জিনটি কোন বিশেষ সুবিধা প্রদান করে থাকে। তাহলে কি Anemia বাহকদের এক কপি নষ্ট হয়ে যাওয়া জিন কোন বিশেষ সুবিধা দেয়?

উত্তর হচ্ছে “হ‍্যাঁ”। Anemia এর নষ্ট জিনের কারণে সেই মানুষ গুলোর ম‍্যালেরিয়া হবার সম্ভাবনা কমে যায়। শ্বাস-প্রশ্বাসের জন‍্য প্রয়োজনীর দুটি জিনের একটি নষ্ট হয়ে গেলে একজন মানুষ Anemia এর বাহক হয় ঠিকই; কিন্তু, একই সাথে সে জিতে নেয় এক লটারি। তারা বেচেঁ যায় ম‍্যালেরিয়ার মরণ ছোবল থেকে। আফ্রিকায় Anemia অপেক্ষা ম‍্যালেরিয়া অনেক ভয়ানক একটি রোগ যার কারণে প্রতিবছর অসংখ‍্য মানুষ মারা যায়। সুতরাং, কম ক্ষতিকর Anemia বাহক হলে বেশি ক্ষতিকর ম‍্যালেরিয়া প্রতিরোধ করা যায়। একটি রোগ আপনাকে বাচিঁয়ে দিলো অন‍্যটির ছোবল থেকে।

আফ্রিকায় কেন Anemia বাহকের সংখ‍্যা সর্বোচ্চ? কেন এর সংখ‍্যা ধীরে ধীরে বাড়ছে?

উত্তর দেয়া যায় ডারউইন সাহেবের Natural Selection এর থিওরী থেকে। যাদের এক কপি নষ্ট জিন আছে তাদের একধরণের Advantage থাকছে যে, তারা ম‍্যালেরিয়ার হাত থেকে বেচেঁ যায়। এখন ধরা যাক, আফ্রিকার একটি জায়গায় ১০০ জন মানুষ আছে যাদের মাত্র ২০ জন Anemia এর বাহক। চিন্তা করে দেখুন, বাকি ৮০ জন Anemia এর বাহক না হওয়ায় তাদের ম‍্যালেরিয়া হবে। কারণ, আফ্রিকায় মশার প্রকোপ প্রচন্ড। সেই ৮০ জনের ধরুণ ১০ জন ম‍্যালেরিয়ায় মারা গেল।

এখন চিন্তা করে দেখুন, সেই জায়গায় কত জন মানুষ থাকবে? উত্তর হলো ৯০ জন যাদের মধ‍্যে ২০ জন Anemia এর বাহক এবং ৭০ জন নরমাল (কিন্তু, ম‍্যালেরিয়ার প্রতি সেনসিটিভ)। দিন যত যাবে নরমাল (জেনেটিক্সের ভাষায় বলা হয় ওয়াইল্ড টাইপ) মানুষ গুলোর ম‍্যালেরিয়া হয়ে মৃত‍্যু ঘটবে; অন‍্যদিকে বেচেঁ যাওয়া Anemia বাহকেরা বংশবৃদ্ধি করে নিজেদের জিনের সংখ‍্যা বাড়াতে থাকবে। এভাবে চলতে থাকলে ১০০০ বছর পর হয়তো দেখা যাবে আফ্রিকার সেই অঞ্চলে সবাই Anemia এর বাহক হয়ে গেছে। কোন নরমাল মানুষ নেই। কারণ, নরমাল মানুষ হলে সেখানে ম‍্যালেরিয়া হয়ে মারা যায়।

বিশ্বাস করুণ, ডারউইন কোনদিনই বলেন নাই মানুষ বানর থেকে এসেছে। যারা বিজ্ঞান ২ লাইন পরে বুঝার চেষ্টা করে তারা সেই গুজবের স্রষ্টা। ডারউইন যেই Natural Selection এর কথা বলেছিলেন তা ব‍্যাখ‍্যা করে দেয় কিভাবে বহু বছর ধরে পরিবেশের প্রেশারের কারণে একটি জনগোষ্ঠীতে জিনের পরিবর্তন আসে। যেমনটি এসেছে মশার প্রকোপে ভুগতে থাকা আফ্রিকান মানুষে। তারা সবাই ধীরে ধীরে Anemia এর জিন অর্জন করছে।

Sometimes you pet a dog to keep the wolf away.

Author
Shamir Montazid

Shamir Montazid

This author leads a dual lifestyle. In daylight, he is a badass genetic engineer trying to dance with DNA. At night, he turns himself into 'The Heisenberg'. He was last seen cooking some funky biology and chemistry tutorials in his Meth-lab.
Shamir Montazid
এই লেখকের অন্যন্য লেখাগুলো পড়তে এখানে ক্লিক করুন
What are you thinking?