হেয়ালিপনার রাজার গল্প শোনো : সুকুমার রায়

কুমড়োপটাশের কথা মনে আছে? ওই যে, যেই প্রাণীটা হাসলে, কাঁদলে এমনকি নাচলেও আমাদের সতর্ক থাকতে হয়। বেশ অদ্ভুত নিয়ম পালন করতে হয়। যেমন হাসির ব্যাপারটাই ধরা যাক।
     (যদি) কুম্‌ড়োপটাশ হাসে—
        থাকবে খাড়া একটি ঠ্যাঙে রান্নাঘরের পাশে ;
        ঝাপসা গলায় ফার্সি কবে নিশ্বাসে ফিস্‌ফাসে ;
        তিনটি বেলা উপোস করে থাকবে শুয়ে ঘাসে !
শুধু কি তাই! কুমড়োপটাশ কাঁদলেও যে আমাদের রক্ষে নেই।
  (যদি) কুম্‌ড়োপটাশ কাঁদে—
খবরদার ! খবরদার ! বসবে না কেউ ছাদে ;
উপুড় হয়ে মাচায় শুয়ে লেপ কম্বল কাঁধে,
বেহাগ সুরে গাইবে খালি ‘রাধে কৃষ্ণ রাধে !’
ছেলেবেলায় এমন হাজারো অদ্ভুত আর খেয়াল খুশির রাজ্যে আমাদের রাঙ্গিয়ে রেখেছিলেন সুকুমার রায়। তাঁর ননসেন্স রাইম পড়ে আমরা যেমন হেসেছি তেমনি পরিচিত হয়েছি এমন সব প্রাণীর সাথে যাদেরকে তুমি বা আমি কেন! পুরো দুনিয়ার তাবৎ লোকের কেউই আগে কখনো দেখেইনি। এই যেমন ধরো, শ্রী কাকেশ্বর কুচকুচে, ল্যাগব্যাগর্নিস, গোমড়াথোরিয়া কিংবা এই কুমড়োপটাশ।

চলো আজ ঘুরে আসা যাক ননসেন্স রাইম আর খেয়ালখুশির রাজ্যে এবং পরিচিত হয়ে আসা যাক সেই রাজ্যের রাজা সুকুমার রায়ের সাথে।

দারুণ সব লেখা পড়তে ও নানা বিষয় সম্পর্কে জানতে ঘুরে এসো আমাদের ব্লগের নতুন পেইজ থেকে!
একাধারে লেখক, ছড়াকার, শিশুসাহিত্যিক, রম্যরচনাকার, প্রাবন্ধিক, নাট্যকার ও সম্পাদক সুকুমার রায় জন্মগ্রহণ করেন ৩০শে অক্টোবর ১৮৮৭ সালে। তার বাবাও ছিলেন একজন জনপ্রিয় শিশু সাহিত্যিক। তৎকালীন সময়ে শিশু সাহিত্যে অভূতপূর্ব ভূমিকা পালন করা উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীই হলেন সুকুমারের পিতা। আর সুকুমার রায়ের একমাত্র সন্তান হলেন উপমহাদেশের জনপ্রিয় চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়। যিনি কিনা গোয়েন্দা ফেলুদা কিংবা অনন্য বিজ্ঞানী প্রফেসর শঙ্কুর মত বিখ্যাত সব চরিত্রের সৃষ্টিকর্তা, যাঁর সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নেই।
এরকম হেয়ালিপনা করে লেখা অসংখ্য ছড়া কবিতা আর খেয়ালখুশির রাজ্য চষে বেড়ানো এই মানুষটা হয়তো তাই নিয়ে সারাদিন পড়ে থাকতেন। এ কারণে লেখাপড়া তেমন হয়ে উঠেনি। তুমি যদি এমনটাই ভেবে থাকো তবে এক্ষুণি জিভে কামড় দিয়ে ভুল স্বীকার করে ফেলো। তা নাহলে কুমড়োপটাশের হাসি বা কান্নার মত কিছু না কিছু কেলেঙ্কারি হয়েই যেতে পারে। সুকুমার রায় বিজ্ঞানের বাঘা দুই বিষয় পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নের উপর করেছেন ডাবল অনার্স। সময়টা সেই ১৯০৬ সাল। শুধু কি তাই? এখানেই তিনি থামেননি। বিলেত গিয়ে ফটোগ্রাফি ও মুদ্রণ প্রযুক্তির উপর পড়াশোনা করেন। সেই উনিশ শতকের শুরুতে ১৯১৩ সালে সুকুমার রায় কলকাতা ফিরলেন ঠিকই। কিন্তু সাথে আনলেন ফিজিক্স ও কেমিস্ট্রির উপর বিএসসি (অনার্স), আলোকচিত্র ও প্রেস টেকনোলজি বিষয়ক উচ্চশিক্ষায় “লিথোগ্রাফার” নামক বিরল এক ডিগ্রী নিয়ে। বয়স তখন তাঁর মাত্র ২৬!
আদিনিবাস ময়মনসিংহ জেলার মসুয়া গ্রামে হলেও তার জন্ম কলকাতায়। কলকাতা সিটি স্কুলেই নিয়েছেন মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা। সুকুমার রায়ের বাবার সাথে ভালো সম্পর্ক ছিলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। এছাড়াও রায় পরিবারের সাথে আগে থেকেই সম্পর্ক ছিলো জগদীশ চন্দ্র বসু, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের মত বিখ্যাত সব মানুষদের। সে হিসেবে সুকুমারের পরিবারকে অবশ্য সম্ভ্রান্ত না বললে অপরাধ হবে।
সুকুমার রায় ইংল্যান্ডে পড়াকালীন সময়ে তাঁর বাবা উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী একটি জমি ক্রয় করে সেখানে উন্নত-মানের রঙিন হাফটোন ব্লক তৈরি ও মুদ্রণ সক্ষম একটি ছাপাখানা স্থাপন করেছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত সুকুমার ফিরে আসার কিছুদিনের মধ্যেই তার বাবা মারা যান। তখন এই ব্যবসার ভার তাঁর কাধে এসে পড়ে। এছাড়াও তাঁর বাবার সম্পাদনায় চলা মাসিক পত্রিকা ‘সন্দেশ’ এর দায়িত্বও পালন করেন সুকুমার রায়। আর এই সন্দেশ পত্রিকার মাধ্যমেই সুকুমার রায়ের হাত ধরে শুরু হয় বাংলা শিশু সাহিত্যের নতুন এক অধ্যায়। আমরা খুঁজে পাই হেঁয়ালিপনা ও খেয়ালখুশির নতুন এক রাজ্যের।
অনেক তো কথা হলো। এখন রিফ্রেশমেন্টের জন্য আবার একটা ছড়ার কিছু অংশ শোনা যাক। দেখো তো সুকুমার রায় আবার তোমার কাহিনীটাই ফাঁস করে দিলো না তো!
 পুলিশ দেখে ডরাইনে আর, পালাইনে আর ভয়ে,
আরশুলা কি ফড়িং এলে থাকতে পারি সয়ে।
আধাঁর ঘরে ঢুকতে পারি এই সাহসের গুণে,
আর করে না বুক দুর্ দুর্ জুজুর নামটি শুনে।
কিন্তু তবু শীতকালেতে সকালবেলায় হেন
ঠান্ডা জলে নাইতে হ’লে কান্না আসে কেন?
সাহস টাহস সব যে তখন কোনখানে যায় উড়ে-
ষাড়ের মতন কন্ঠ ছেড়ে চেঁচাই বিকট সুরে!
সুকুমার রায় খুব কম দিন বেঁচে ছিলেন। কিন্তু এই অল্প সময়ে তিনি যেসব ছড়া কবিতা বা গল্প লিখে গেছেন তা এতদিন পর এখনো আমাদের বিমল আনন্দ দেয়। মনে হয় যেন লেখাটি কেবল রচনা করা হলো মাত্র। আগেই বলেছি সুকুমার রায় নিজের খেয়ালখুশি মত বেশ অনেক প্রাণী ও চরিত্রের বর্ণনা করেছেন। বাস্তবে যাদের আদৌ কোন অস্তিত্ব নেই। চলো সেরকমই কিছু প্রাণীর সাথে পরিচিত হওয়া যাক।

যুক্ত প্রাণী:

প্রত্যেকটি প্রাণীই তো শারীরিক গঠন ও নিজের বৈশিষ্টের দিক থেকে আলাদা। কিন্তু সুকুমার রায়ের ভাবনাই ছিলো আলাদা। দু’টো প্রাণীকে যুক্ত করে একটি প্রাণীর রূপ দিয়েছেন তাঁর লেখায়। যেমন এরকম একটি প্রাণী হলো- হাঁসজারু। হাঁস আর সজারু মিলেই মূলত তৈরী হয়েছে হাঁসজারু। এ সম্পর্কে যেমন সুকুমার বলেছেন,
   “হাঁস ছিলো সজারু (ব্যাকরণ মানি না)
    হয়ে গেলো হাঁসজারু, কেমনে তা জানি না।”

বৈশিষ্ট্য সহ নাম:

তোমরা হয়তো বিজ্ঞান বইতে পড়েছো বৈজ্ঞানিক নামকরণের পদ্ধতি। যেখানে একই নামের মধ্যে গণ ও প্রজাতিটি উল্লেখ থাকে। মজার বিষয় হলো, সুকুমার রায় কিছুটা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতেই খেয়ালখুশি মত নাম দিতেন আজব সব প্রাণীর। এই যেমন ‘বেচারাথেড়িয়াম’। অথবা ‘চিল্লানসোরাস’। অনেক অসহায় প্রাণী হওয়ায় নামের আগে বেচারা শব্দটা লেগেই আছে। আর চিৎকারে পটু এক প্রজাতির ডাইনোসরের নাম হলো ‘চিল্লানসোরাস’। দুই শিং ওয়ালা গোমড়া মুখো এক প্রাণীর নাম আবার ‘গোমড়াথেরিয়াম’। এছাড়াও পাক্কা গণিতবিদ কাকের নাম নাকি আবার ‘শ্রী কাকেশ্বর কুচকুচে’।

উদো এবং বুদো:

উদো আর বুদো যমজ ভাই। এরা কখনো ঝগড়া করে, আবার কখনো বন্ধুত্ব করে। দেহের আকৃতি দেড় হাত, পা পর্যন্ত সবুজ রঙের দাড়ি, হাতে হুঁকো যাতে কোন কল্কে নেই। টাকের উপর খড়ি দিয়ে কেউ একটা কিছু লিখছে এমন দৃশ্যও রয়েছে।

ব্যাকরণ শিং, বি.এ. খাদ্যবিশারদ:

একটি রামছাগল যে বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য রাখে। যেমন: ছাগলে কী না খায়!

চন্দ্রবিন্দু:

চন্দ্রবিন্দু হল একটি অদ্ভুত মোটাসোটা লাল টকটকে বেড়াল। এটা মুলত ‘হ য ব র ল’ গ্রন্থের একটি চরিত্র। সে কথায় কথায় এক চোখ বন্ধ করে ফ্যাচফ্যাচ করে হাসতে থাকে।
তুমিই বলো এসব অদ্ভুত কাণ্ডকারখানা যার মাথায় ঘোরে, সেরকম একজন সাহিত্যিক কি তল্লাটে বারেবারে পাওয়া যাবে? অনেকে তো দাবী করেন পুরো পৃথিবীতেই ননসেন্স লিটরেচারে সুকুমার রায় ক্ষমতাবান এবং অনন্য এক প্রবাদ পুরুষ।
বাংলা শিশু সাহিত্যে তিনিই পরিচয় করিয়ে দেন হাঁসজারু, বকচ্ছপ, বিছাগল অথবা গিরগিটিয়ার সাথে। সুকুমার রায়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় গ্রন্থের একটি হলো “আবোল তাবোল”। হ্যাঁ নামের মত ভেতরে ছাপা ছড়াগুলোও কিন্তু বেশ গোলমেলে। যার মধ্যে প্রকাশিত ‘রামগরুড়ের ছানা’ কিংবা ‘বাবুরাম সাপুড়ে’ ছড়া আমরা প্রায় সবাইই পড়েছি। এই গ্রন্থে ছাপা হওয়া প্রায় সব লেখাই পূর্বেই প্রকাশিত হয়েছে রায় পরিবারের নিজস্ব মাসিক পত্রিকা সন্দেশে। যার কথা আগেই বলেছি।
উপেন্দ্রকিশোর রায় এবং তাঁর ছেলে সুকুমার রায় দুজনই মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই পত্রিকার সাথে ছিলেন। এখানে একটা বিষয় না বললেই না, যে সুকুমার রায়ের বাবা এই পত্রিকা ও এর ছাপা নিয়ে এতই চিন্তা করতেন যে গভীর চিন্তায় রীতিমতো নতুন মুদ্রণ পদ্ধতিই আবিষ্কার করে ফেলেন তিনি! আর এই ‘সন্দেশ’ পত্রিকা যে শুধু রায় পরিবারের ঐতিহ্য ছিলো তা কিন্তু নয় ; বরং এখানে লিখেছেন অতুলপ্রসাদ রায়, কামিনী রায়, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম এমনকি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মত নামকরা সব লেখক।

এতক্ষণ তাঁর লেখা নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। বেশ দীর্ঘ সময় গেছে। এই বহুমুখী প্রতিভার অধিকারি শুধু লেখাতেই ক্ষান্ত থাকেননি; বরং আঁকাতেও রেখেছেন নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর। তবে সে বিষয় বলার আগে সময় হয়েছে আরেকটি রিফ্রেশমেন্টের। পড়ে আসবো সুকুমার রায়ের গোলমেলে আরেকটি ছড়া।

ফটোগ্রাফির বেসিক্স শিখে ফেলো এখনই!

জীবনে শুধু পড়াশুনা করলেই হয় না। এর সাথে প্রয়োজন এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটি। আর তার সাথে যদি থাকে কিছু মোটিভেশনাল কথা, তাহলে জীবনে চলার পথ হয়ে ওঠে আরও সুন্দর।

আর তাই তোমাদের জন্যে আমাদের নতুন এই প্লে-লিস্টটি!

Motivational Talks সিরিজ!

“আর যেখানে যাও না রে ভাই সপ্তসাগর পার,
কাতুকুতু বুড়োর কাছে যেও না খবরদার!
সর্বনেশে বৃদ্ধ সে ভাই যেও না তার বাড়ি—
কাতুকুতুর কুলপি খেয়ে ছিঁড়বে পেটের নাড়ি।
কোথায় বাড়ি কেউ জানে না, কোন্‌ সড়কের মোড়ে,
একলা পেলে জোর ক’রে ভাই গল্প শোনায় প’ড়ে।
বিদ্‌ঘুটে তার গল্পগুলো না জানি কোন দেশী,
শুনলে পরে হাসির চেয়ে কান্না আসে বেশি।
না আছে তার মুণ্ডু মাথা না আছে তার মানে,
তবুও তোমায় হাসতে হবে তাকিয়ে বুড়োর পানে।
কেবল যদি গল্প বলে তাও থাকা যায় সয়ে,
গায়ের উপর সুড়সুড়ি দেয় লম্বা পালক লয়ে।
 কেবল বলে, “হোঃ হোঃ হোঃ, কেষ্টদাসের পিসি—
বেচ্‌ত খালি কুমড়ো কচু হাঁসের ডিম আর তিসি।
ডিমগুলো সব লম্বা মতন, কুমড়োগুলো বাঁকা,
কচুর গায়ে রঙ-বেরঙের আল্‌পনা সব আঁকা।
 অষ্ট প্রহর গাইত পিসি আওয়াজ করে মিহি,
ম্যাও ম্যাও ম্যাও বাকুম বাকুম ভৌ ভৌ ভৌ চীঁহি।”
এই না বলে কুটুৎ ক’রে চিম্‌টি কাটে ঘাড়ে,
খ্যাংরা মতন আঙুল দিয়ে খোঁচায় পাঁজর হাড়ে।
তোমায় দিয়ে সুড়সুড়ি সে আপনি লুটোপুটি,
যতক্ষণ না হাসবে তোমার কিচ্ছুতে নাই ছুটি।”
এবার আসি আঁকাআঁকিতে। সত্যি বলতে সুকুমারের ড্রয়িং ও ছিলো বেশ অদ্ভুতুরে। ছড়ার সাথে সাথে তিনি আজব ঐ প্রাণীগুলোকে আঁকতেন। তাতে স্পষ্ট ফুটে উঠতো সৃজনশীলতা। তাঁর ছেলে সত্যজিত রায়ের মধ্যেও ছিলো এরকম আঁকার ধারাবাহিকতা। সুকুমার রায়ের বাবা উপেন্দ্রকিশোর রায় সাহেবও কিন্তু ছিলেন শখের আর্টিস্ট।  মজার ব্যাপার হলো, সুকুমার ও উপেন্দ্রকিশোর অর্থাৎ বাপ-ছেলে উভয়ের কারোরই অংকনের উপর ছিলোনা কোন প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান। তারপরেও তাঁরা এঁকেছেন অনন্য এবং অদ্ভুত সব জিনিস। চোখ বন্ধ করে সুকুমার নিয়ে ভাবলেই চারপাশে ভেসে উঠে তার আঁকা অদ্ভুত ও আজব সব প্রাণীতে ঠাসা বিরাট রাজ্য। আর সেই রাজ্যে বসে ননসেন্স রাইম লিখছেন সেখানকার রাজা সুকুমার রায়।
এরকম খামখেয়ালি রাজ্যের রাজা একাই শুধু হেয়ালিপনা করে যাবেন তা কী হয়? বিলেত থেকে পড়াশোনার পাট চুকিয়ে যখন কলকাতা ফিরে আসেন সুকুমার, তখন তৈরী করেন MONDAY CLUB অথবা মান্ডে ক্লাব। এটাই কিন্তু প্রথম নয়। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময়ই তৈরী করেছিলেন ‘ননসেন্স ক্লাব’। এর মুখপাত্র ছিলো আবার ‘সাড়ে বত্রিশ ভাজা’। তো যাই হোক, মান্ডে ক্লাব গঠনের পর প্রতি সোমবারে বসতো সাহিত্য আসর। সাথে চলতো ননসেন্স আড্ডা।
নামটা শুনতে বোকা বোকা মনে হলেও এখানে প্রায় নিয়মিতই যোগ দিতেন সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, অতুলপ্রসাদ সেন অথবা সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের মত তৎকালীন জনপ্রিয় সব লোকজন। এই ফাঁকে একটা কথা মনে পড়ে গেলো। আমাদের দেশের জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক প্রয়াত হুমায়ুন আহমেদ নিজেও কিন্তু সুকুমার রায়ের মত আড্ডা বসানোর জন্য একটা সংঘ খুলেছিলেন যার নাম ওল্ড ফুল ক্লাব। সহজ বাংলায় যার নাম দাঁড়ায় ‘বৃদ্ধ বোকা সংঘ’।
পাওয়ারপয়েন্ট ব্যবহার করে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ সেরে ফেলা যায়! তাই, আর দেরি না করে ১০ মিনিট স্কুলের এক্সক্লুসিভ এই প্লে-লিস্টটি থেকে ঘুরে এসো, এক্ষুনি!

তো সুকুমার রায়ের কলেজে পড়ুয়া সময়ে গড়া ননসেন্স ক্লাবে কিন্তু মাঝেমধ্যে বেশ আয়োজনও হতো। তার মধ্যে একটা ছিলো হলো নাটকের আসর। সুকুমার রায় নিজেই ননসেন্স ক্লাবের জন্য ‘ঝালাপালা’ এবং ‘লক্ষণের শক্তিশেল’ নামের দুটো নাটক লিখেছিলেন। দেখলে! নাটকের নামটাও গোলমেলে। তার ননসেন্স ক্লাবের নাটক দেখতে মহল্লার বেশিরভাগ লোকেরাই ভিড় জমাতো। এ বিষয়ে পূণ্যলতা বলেছিলেন, কোন বাধা মঞ্চও থাকতো না বা সিনও থাকতো না। থাকতো না দেখার মত কোন মেক আপ। তবুও গল্পে থাকতো রসবোধ। তাই সবাই উপভোগ করতো বেশ ভালোভাবেই।

ঘুরে আসুন:  ইন্টারভিউ থেকে বাদ পড়ার ৫০ টি কারণ!
ভুলে গেলে চলবে না পদার্থ ও রসায়নে ডাবল অনার্স করেছিলেন সুকুমার। সুতরাং এই বিদ্যা নিয়ে তিনি কিছুই করবেন না তা কি হয়? তাই তাঁদের পত্রিকা সন্দেশে তিনি প্রায় নিয়মিত লিখতেন বিজ্ঞান নিয়ে। কিন্তু একদম চিরচেনা হেঁয়ালিপনার সাথেই। একটা উদাহরণ দেয়া যাক। ১৩২৫ বঙ্গাব্দের কার্তিক সংখ্যায় সুকুমার একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। যার শিরোনাম ছিলো ‘বেগের কথা’। সেখানে ‘বেগ’ ও ‘বল’ এর মধ্যকার সম্পর্ক বুঝিয়েছিলেন এভাবে –  –“তাল গাছের উপর হইতে ভাদ্র মাসের তাল যদি ধুপ করিয়া পিঠে পড়ে তবে তার আঘাতটা খুবই সাংঘাতিক হয়; কিন্তু ঐ তালটাই যদি তাল গাছ হইতে না পড়িয়া ঐ পেয়ারা গাছ হইতে এক হাত নীচে তোমার পিঠের উপর পড়িত, তাহা হইলে এতটা চোট লাগিত না। কেন লাগিত না? কারণ, বেগ কম হইত। কোন জিনিস যখন উপর হইতে পড়িতে থাকে তখন সে যতই পড়ে ততই তার বেগ বাড়িয়া চলে। ……”।
এছাড়াও উনি সন্দেশে লিখেছেন বিজ্ঞানের উপর অনেক লেখা। বিজ্ঞানের উপর তাঁর প্রথম লেখা ছিলো ‘সূক্ষ্ম হিসাব’। অবাক করা ব্যাপার হলো বেতার যন্ত্র বোঝাতে সুকুমার লিখেছিলেন ‘আকাশবাণী যন্ত্র’ শিরোনামের একটি লেখা। আমাদের রেডিও আকাশবাণী কিন্তু তখনও সৃষ্টিই হয়নি। তবে কি এই ‘আকাশবাণী’ নামটাও সুকুমার রায়ের দেয়া?
তাঁর পারিবারিক জীবন নিয়ে কয়েক কথা জানা যাক। তবে তা জানার আগে পড়ে আসবো সুকুমারের ছোট্ট এক গোলমেলে ছড়া।
“আমার নাম বাঃ,
বসে থাকি তোফা তুলে পায়ের উপর পা।”
“যদি” ঢুকেই বলল :
“আমার নাম যদি,
আশায় আশায় বসে থাকি হেলান দিয়ে গদি।”
“বটে” ঢুকেই বলল :
“আমার নাম বটে,
কটমটিয়ে তাকাই যখন সবাই পালায় ছুটে।”
সুকুমার রায় বিলেত থেকে দেশে ফিরে বিয়ে করেন সুগায়িকা সুপ্রভাকে। তাঁর বিয়েতে আমন্ত্রণ জানানো হয় কবিগুরুকেও। কিন্তু তিনি চিঠি দিয়ে জানান, শিলাইদহে জমিদারীতে ব্যস্ত থাকায় তিনি উপস্থিত হতে পারবেন না। তবে বিয়ের দিন সবাইকে চমকে দিয়ে হঠাৎ উদয় হন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এতে বোঝা যায় তোমার আমার মত রবীন্দ্রনাথও খুব সম্ভবত সারপ্রাইজ দিতে পছন্দ করতেন।
সুকুমার রায়ের সঙ্গে সুপ্রভা দাশের বিয়ে হয় ১৯১৩ সালে ডিসেম্বর মাসে। একমাত্র পুত্র সত্যজিতের জন্ম ১৯২১-এর ২রা মে। সেবছরই দুই মাস বয়সী সত্যজিতকে নিয়ে যাত্রা হয় শান্তিনিকেতনে। বিখ্যাত সত্যজিৎ রায় তাঁর নিজের লেখা রচনা ‘যখন ছোট ছিলাম’ লেখায় লিখেছেন- আমার বাবা যখন মারা যান তখন আমার বয়স আড়াই বছর। সে ঘটনা আমার মনে নেই। কিন্তু বাবা যখন অসুস্থ, এবং আমার বয়স দুই কিংবা আরও কম তখনকার দু’টো ঘটনা আমার পরিষ্কার মনে আছে। বাবা অসুখে পড়েন আমি জন্মাবার কিছুদিনের মধ্যেই।
এ অসুখ আর সারেনি, তবে মাঝে মাঝে একটু সুস্থ বোধ করলে বাবাকে বাইরে চেঞ্জে নিয়ে যাওয়া হত। বাবার সঙ্গেই আমি গিয়েছিলাম একবার সোদপুর আর একবার গিরিডি। গঙ্গার উপর সোদপুরের বাড়ির উঠোনটা আমার মনে আছে। একদিন বাবা ছবি আঁকছেন, ঘরে জানালার ধারে বসে, এমন সময় হঠাৎ বললেন, ‘জাহাজ যাচ্ছে।’ আমি দৌড়ে উঠোনে বেরিয়ে এসে দেখলাম একটা স্টীমার চলে গেল।”
১৯২১ সালে সুকুমার রায় কালাজ্বরে আক্রান্ত হন। তখন এই রোগের কোন চিকিৎসা ছিলোনা। প্রায় নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও অসীম মানসিক ধৈর্যের দৃশ্য দেখিয়েছিলেন সুকুমার রায়। রুগ্নশয্যাতে থেকেই তিনি পত্রিকা, ছাপাখানা বা ক্লাব নিয়ে কাজ চালিয়ে যান।
তখন মাঝেমধ্যেই অসুস্থ ‘যুবক বন্ধু’কে দেখতে আসতেন রবীন্দ্রনাথ। মৃত্যুপথ যাত্রীদের বিচিত্র সব ইচ্ছে হয়। সুকুমারের একদিন ইচ্ছে হলো তিনি রবীন্দ্রনাথের নিজের কণ্ঠে গান শুনবেন। শুধুমাত্র দুই লাইন গান শুনাতে শান্তিনিকেতন থেকে আসলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি সুকুমার রায়ের শয্যার পাশে বসে গাইলেন- ‘ আছে দুঃখ আছে মৃত্যু’, ‘আমার সকল দুখের প্রদীপ’, ‘দুঃখ এ নয় সুখ নহে গো গভীর শান্তি এ যে’ গান কয়টি।
সুকুমার রায়ের ডাক নাম ছিলো তাতা। সবাই ডাকতেন তাতাবাবু। ১৯২৩ সালের ১০ই সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে ১০০নং গড়পার রোডের বাড়িতে তাতাবাবু চোখ বুজলেন। আর খুললেন না। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে মারা গেলেন সুকুমার রায়।
১৯৮৭ সালে সুকুমারের জন্মশতবর্ষে তার সুযোগ্য পুত্র সত্যজিৎ রায় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রযোজনায় তাঁর নিজের পরিচালনায় আধঘন্টার একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন। অভিনয়াংশে ছিলেন উৎপল দত্ত, সৌমিত্র চ্যাটার্জি, তপেন চ্যাটার্জি, সন্তোষ দত্ত প্রভৃতি অভিনেতা। ভাষ্যপাঠ করেছেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। সঙ্গীত পরিচালনা করেছিলেম সত্যজিৎ নিজেই।
তাঁর বিখ্যাত বই ‘আবোল তাবোল’ বের হয় তার মৃত্যুর ঠিক ন’দিন পর। তিনি রোগশয্যায় থেকেই এর খোঁজ খবর নিতেন। মৃত্যুর কিছুদিন আগে তিনি জীবনের শেষ খেয়ালখুশি মত একটি ছড়া লিখেন। কিন্তু তাতেও উপস্থিত ছিলো বিদায়ের সুর।
আজকে দাদা যাবার আগে
বলব যা মোর চিত্তে লাগে-
নাই বা তাহার অর্থ হোক
নাইবা বুঝুক বেবাক লোক।
…..  ……..  ……..   ……..
আদিম কালের চাঁদিম হিম
তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম।
ঘনিয়ে এলে ঘুমের ঘোর,
গানের পালা সাঙ্গ মোর।
সুকুমারদের বিনাশ নেই। তাঁরা জীবন্ত তাদের কর্মে। বা হেয়ালিপনার রাজত্বে।

১০ মিনিট স্কুলের লাইভ এডমিশন কোচিং ক্লাসগুলো অনুসরণ করতে সরাসরি চলে যেতে পারো এই লিঙ্কে: www.10minuteschool.com/admissions/live/

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: write@10minuteschool.com

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?