মিরোস্লাভ ক্লোসা: বিশ্বকাপে গোল যাঁর কাছে ছেলেখেলা!

পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবারে শুনে নাও!

মহানায়কের অভিষেক:

২০০২ বিশ্বকাপ। গত বিশ্বকাপে নবাগত ক্রোয়েশিয়ার কাছে নাকানিচুবানি খেয়ে বাদ পড়া জার্মানির অবস্থা এবার আরো করুণ। গত কয়েক বছরের মধ্যে সবথেকে দুর্বল দল নিয়ে খেলতে নেমেছে। দলে একেবারেই আনকোরা এক তরুণ। খাড়া চুল, ভদ্র চেহারা, দেখলে ফরোয়ার্ড বলে মনেই হয় না!

প্রথম ম্যাচ। প্রতিপক্ষ নবাগত সৌদি আরব। দুর্বল দল, কিন্তু গতবারের নতুন দল ক্রোয়েশিয়ার অঘটনের পর থেকে কোন নতুন দলকেই ছোট করে দেখছে না জার্মানরা। বলা যায় না, কখন কী হয়!

ম্যাচ শুরু হলো। খাড়া চুলের সেই সাদাসিধে তরুণ স্টার্ট করছেন। তাকে দেখে খুব আত্মবিশ্বাসী বলে মনে হচ্ছে না, এই ছেলে গোল করবে- খুব বেশি মানুষ সে বাজি ধরবে বলে মনে হয় না!  

খেলার সবে ২০ মিনিট হলো, ডি-বক্সে উড়ে এলো একটা ক্রস। ফ্ল্যাশের মতোই বিদ্যুতবেগে একটা মাথাকে এগিয়ে আসতে দেখা গেলো। দারুণ হেডার। দারুণ গোল। গোল করেছেন সেই সাদাসিধে তরুণই!

গল্প এখানেই শেষ না। সেদিন আরো দুবার তার মাথাটা কাজে লেগেছিলো। আরো দুটো গোল করে হ্যাটট্রিক করেছিলেন সেই মানুষটি। বিশ্বকাপ অভিষেকে ম্যাচেই হ্যাটট্রিক- সেই ‘৩০ সালে গির্লেমো স্ট্যাবিলের পর এমন রেকর্ড আর কারো নেই! প্রতিটি গোলের পর তার শূণ্যে ডিগবাজি বা ‘সমারসল্ট’ উদযাপন ছিল সেই বিশ্বকাপের সবথেকে আকর্ষণীয় অংশগুলোর একটি!

বলা বাহুল্য, শান্ত-সৌম্য কিন্তু গোলপোস্টের সামনে ভয়ংকর হয়ে ওঠা মানুষটার নাম মিরোস্লাভ ক্লোসা। তিনি সেই বিশ্বকাপে আরো দু’বার গোল করেছিলেন, জার্মানি উঠেছিলো ফাইনালে। ব্রাজিলের রোনালদো নাজারিয়া ডি লিমা নামের আরেক কিংবদন্তী ফরোয়ার্ড না থাকলে হয়তো ফাইনালে বিজয়ীর মেডেলটা ক্লোসাই পরতেন!

আমরা প্রায়ই টেনশনে পড়ে যাই আমাদের ক্যারিয়ার নিয়ে, ভবিষ্যত নিয়ে। এই টেনশন থেকে মুক্তি পেতে চাইলে ঝটপট ঘুরে এসো ১০ মিনিট স্কুলের এই এক্সক্লুসিভ প্লে-লিস্ট থেকে!

শুরুর কথা:

ক্লোসার এই শান্ত-সৌম্য ভাবের রহস্য জানা গেল পরে। শৈশবটা খুব ভালো কাটেনি তাঁর, কমিউনিস্ট পোল্যান্ড থেকে পালাতে হয়েছে তাঁর মা-বাবাকে, ফ্রান্সে বসতি গড়তে গিয়েও পারেননি তাঁরা, শেষমেষ জার্মানিই সহায় হয়েছে তাঁদের। প্রতিদানটা ঠিক ঠিক দিয়েছেন ক্লোসা, টানা চার বিশ্বকাপে জার্মানির সহায় হয়েছেন তিনিই!

এত শত জায়গায় ঘোরার কারণেই ক্লোসা আশ্চর্য রকম শান্ত। বেশিরভাগ ফরোয়ার্ড যেখানে আক্রমণাত্মক, ক্লোসা সেখানে অদ্ভুত শীতল! দালাই লামা কোনকালে ফুটবল খেললে মনে হয় এমনই খেলতেন!

২০০৬ বিশ্বকাপ। এবারের ক্লোসা আরেকটু পরিপক্ক। আরো ভয়ানক। এবারও ৫ গোল। বিশ্বকাপ এলে যখন বড় বড় তারকারা গোল করতে হা-পিত্যেশ করেন, ক্লোসা তখন হেসেখেলে গোল করেন। গ্রুপ পর্বেই এলো ৪ গোল। আর্জেন্টিনার সাথে মহা গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তাঁর গোলেই ম্যাচে ফিরলো জার্মানরা, জিতলো টাইব্রেকারে। সেমিতে ইতালি-বাধা পেরুতে না পারলেও, গোল্ডেন বুটটা ঠিকই জিতে নিয়েছিলেন ফ্যানদের কাছে ‘মিরো’ নামে পরিচিত এই মানুষটি।

ক্লোসার ‘ক্লোসা’ হয়ে ওঠা:

পরের বিশ্বকাপের কথা বলার আগে, ক্লোসার জীবনের গল্প আরেকটু বলা যাক। ছেলেবেলা খুব সুখে কাটেনি তার, দারিদ্রের কষাঘাতে পড়তে হয়েছে ক্লোসাকেও। বেশিরভাগ ফুটবলারেরই ছোটবেলার স্বপ্ন থাকে নামী খেলোয়াড় হবার, ক্লোসার তাও ছিল না। অর্থাভাবে তিনি ১৯ বছর বয়স পর্যন্ত কাজ করেছেন একজন কাঠমিস্ত্রি হিসেবে। বছর তিনেক পরে এই কাঠমিস্ত্রীই বিশ্বকাপ মাতাবেন, কে জানতো?

ঘুরে আসুন: সফল মানুষেরা যেই ১০টি অভ্যাস মেনে চলেন প্রতিদিন 

২০১০ বিশ্বকাপ। ক্লোসার বয়স ৩২। ক্লাবে একদমই ফর্মে ছিলেন না, তাঁকে জার্মান দলে নেয়া হবে কি হবে না এই নিয়েও বিতর্ক চলেছে! কিন্তু মানুষটা ক্লোসা, বিশ্বকাপ হলেই যেন তার গোলমেশিন চালু হয়ে যায়! সেবারের বিশ্বকাপেও ৪ গোল, যার তিনটাই নকআউট স্টেজে। জার্মানি সেবার দুর্দান্ত, দ্বিতীয় রাউন্ডে ইংল্যান্ডকে চার গোল, কোয়ার্টারে আর্জেন্টিনাকেও চার গোল!

মনের ভেতরে থাকা ভয়গুলো কে দূর করে ফেলো এখনই !

আমাদের সবার একটা ভুল ধারণা হল ছাত্রজীবন শুধু পড়াশুনা করার সময়। এসময় অন্য কোন কাজ করলে পড়ালেখায় ক্ষতি হতে পারে। কিন্তু পড়াশোনার বাইরে-ও অনেক কাজ আছে যা আমাদেরকে গড়ে তোলে একজন সফল মানুষ হিসেবে।

দেখে নাও আজকের প্লে-লিস্টটি আর শিখে নাও কীভাবে এসব থেকে বের হয়ে সাফল্য পাওয়া যায়!

১০ মিনিট স্কুলের Life Hacks সিরিজ

দুর্দান্ত ফর্মের সেই জার্মানিকে আটকে দিলো স্পেন, সেবারের বিশ্বকাপটাও জিতে নিলো তারা। চার গোল ক্লোসাকে নিয়ে গেল পেলেকে ছাড়িয়ে বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলস্কোরারের তালিকায়। সামনে শুধু সেই ২০০২ বিশ্বকাপের রোনালদোর ১৫ গোল।

ফেয়ার প্লে-এর এক অনন্য নিদর্শন!

লাজিওর হয়ে খেলার সময় একটা কাণ্ড করে ক্লোসা বেশ আলোচিত হয়েছিলেন। সেটা ২০১২ সাল। ক্লোসার হাতে লেগে একটা গোল হয়েছিল, ম্যাচের ফলাফল নির্ধারণ করতে দরকার ছিল সেই গোলটিই। ক্লোসা সটান রেফারির কাছে গিয়ে বলে দেন, এটা গোল হয় নি, তাঁর হাতে বল লেগেছিল।

রেফারি হতভম্ব হয়ে ক্লোসাকে আর হলুদ কার্ড দেন নি, এমন ফেয়ার প্লে ক’জন দেখায়? জার্মানি ফুটবল এসোসিয়েশন এজন্যে ক্লোসাকে ফেয়ার প্লে এওয়ার্ড দিয়েছিল, ক্লোসা এর প্রেক্ষিতে নির্লিপ্তভাবে বলেছিলেন:

“রেফারি জিজ্ঞেস করলো, আমি বলে হাত দিয়েছি কি না। আমার তো হ্যাঁ বলতে কোন সমস্যা হয় নি! অনেক তরুণ ফুটবলার আমাদের খেলা দেখে, আমাদের আদর্শ ভাবে। তাঁদের জন্যে হলেও তো স্বীকার করা উচিত সবার!”

স্বপ্নপূরণ:

সালটা ২০১৪। ক্লোসার বয়স ৩৬, খেলেন লাজিওতে। এই বয়সে বেশিরভাগ ফুটবলারই রিটায়ার করে হ্যাপি হলিডের প্ল্যানিং করেন, কিংবা রিটায়ারের চিন্তাভাবনায় বসেন। আমাদের মিরো কিন্তু অন্য ধাতুতে গড়া। তিনি বললেন, বিশ্বকাপে খেলবেন। ভাবা যায়?

ক্লোসার মনে আসলে তখন অন্য কিছু চলছিল। ক্লাব জীবনে জিতেছেন সম্ভাব্য প্রায় সব ট্রফিই, কেবল চ্যাম্পিয়নস লীগটাই পাননি, যাকে বলা চলে ক্লাব ফুটবলের অলিখিত বিশ্বকাপ। জাতীয় দলের হয়ে নিজে জিতেছেন গোল্ডেন বুট, সিলভার মেডেল, ব্রোঞ্জ মেডেল। কিন্তু এখানেও ওই চ্যাম্পিয়নস লীগের মতোই, বিশ্বকাপের সোনার মেডেলটা নেই!

বিশ্বকাপের বরপুত্র যিনি, বিশ্বকাপটা তাঁর হাতে না মানালে চলে?

ফুটবল-ঈশ্বর নিশ্চিত করেই ছকটা কেটেছিলেন, কারণটা বলছি একটু পরেই। ১৪’ বিশ্বকাপের শুরুটা জার্মানি করেছিল দুর্দান্ত, কিন্তু দ্বিতীয় ম্যাচেই হোঁচট, হেরেই যাচ্ছিলো ঘানার কাছে। ২-১ থেকে ২-২ করে ম্যাচ বাঁচিয়েছিল জার্মানরা, একেবারে শেষের দিকে। গোলটা কে করেছিলো জানেন? ৩৬ বছরের সেই চিরতরুণ ক্লোসা!

এই এক গোলেই ব্রাজিলের কিংবদন্তী রোনালদোকে ছুঁলেন ক্লোসা, দুজনেরই তখন ১৫ গোল। পুরো পৃথিবী তখন অধীর আগ্রহে বসে আছে, ক্লোসা কি পারবেন রোনালদোর রেকর্ড ভাঙ্গতে?

ফুটবল ঈশ্বরের ছকের কথা বলছিলাম, পরের ঘটনাটাই তার প্রমাণ। ক্লোসা পেরেছিলেন সেই রেকর্ড ভাঙ্গতে। গোলটা এসেছিল সেই রোনালদোর ব্রাজিলের বিপক্ষেই! এই এক গোলেই ক্লোসা পেলেন অমরত্ব, বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার শিরোপাটা এখন তাঁরই!

কিন্তু ক্লোসা তো সে শিরোপা চান নি। ক্লোসা চেয়েছেন বিশ্বকাপ। সফল ক্যারিয়ারে তাঁর অন্যতম অপ্রাপ্তি। বিশ্বকাপটাই যে বেশি করে দরকার তাঁর!

বিশ্বকাপের বরপুত্রের কপালে বিশ্বকাপ জুটেছিল, সে গল্প সবার জানা। রূপকথার মতো করেই সাফল্যের সাথে শেষ হয় ক্লোসার ক্যারিয়ার, যে রূপকথার অপেক্ষায় আছেন হালের মেসি-রোনালদোর মতো হাজারো তারকা!

একজন আদর্শ ফুটবলার:

জার্মানির হয়ে একগাদা রেকর্ড তাঁর, দেশটির সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতাও তিনি, এই যুগে ৭১ গোল করা কি চাট্টিখানি কথা নাকি?

দারুণ সব লেখা পড়তে ও নানা বিষয় সম্পর্কে জানতে ঘুরে এসো আমাদের ব্লগের নতুন পেইজ থেকে!

একুশ শতকের সবথেকে কার্যকর স্ট্রাইকারদের একজন তিনি। বিশ্বকাপের একজন কিংবদন্তী তো বটেই! এত শত কৃতিত্বের পরেও ক্লোসার আরেকটা পরিচয় আছে। ফুটবলীয় আদর্শের এক বিরল উদাহরণ ক্লোসা।

ঘুরে আসুন: লেখাপড়ার মাঝেও বিনোদন? কি করে সম্ভব?

২০০৫ সালের একটা ঘটনা বলা যাক। তখন তিনি ওয়ের্ডার ব্রেমেনে খেলেন। রেফারি ক্লোসার দলকে একটা পেনাল্টি দিয়েছিলেন, ক্লোসা দেখেছিলেন সেটা আসলে পেনাল্টি হয় না। আর সেজন্যে ক্লোসা সেই পেনাল্টিটা গ্রহণ করেননি! এমন ফেয়ার প্লে-এর জন্যে তাঁকে  ফেয়ার প্লে এওয়ার্ড দেয়া হয়, তিনি সেই এওয়ার্ড গ্রহণ করে বলেছিলেন:

“এটা আমার জন্যে অনেক সম্মানকর, এই এওয়ার্ডটি। কিন্তু আমি বিষয়টি নিয়ে কিছুটা বিব্রত, আমার কাছে মনে হয় এটাই স্বাভাবিক হওয়া উচিত, আমি এর পরেও এটা করবো, বার বার করবো!”

মিরোস্লাভ ক্লোসা, ভক্তদের ‘মিরো’ শুধু ফুটবল ফ্যানদের কাছেই নয়, বিশ্বের সকল মানুষের কাছে আদর্শের আরেক নাম। ফুটবলীয় প্রজ্ঞা হোক, পরিশ্রম হোক, ফেয়ার প্লে হোক- সবকিছুতেই ক্লোসা অনন্য।

ফুটবলের গণ্ডি ছেড়ে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে সম্মানিত হতে ক’জন পারে?

ক্লোসা পেরেছেন।

এই লেখাটির অডিওবুকটি পড়েছে মনিরা আক্তার লাবনী


১০ মিনিট স্কুলের লাইভ এডমিশন কোচিং ক্লাসগুলো অনুসরণ করতে সরাসরি চলে যেতে পারো এই লিঙ্কে: www.10minuteschool.com/admissions/live/

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: write@10minuteschool.com

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?