Uncategorized

উদ্দীপনায় আচরণগত পরিবর্তন, ট্যাক্সেস, প্রতিবর্তী ক্রিয়া, সহজাত আচরণ, সহজাত আচরণ যাচাই

Supported by Matador Stationary

মানুষ এবং অন্যান্য প্রাণীদের মধ্যে মূল কিছু পার্থক্যের মাপকাঠির মধ্যে অন্যতম হচ্ছে তাদের মধ্যে আচরণের ভেদাভেদ। প্রত্যেক প্রাণীর আচরণের সাথে তার আশেপাশের পরিবেশ এবং পরিস্থিতির সম্পর্ক আছে। এই পরিবেশের প্রভাবটাকে জীববিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় উদ্দীপনা (Singular: Stimulus/ Plural: Stimuli)। তুমি যেভাবে উদ্দীপনার প্রতি সাড়া দিবে, তোমার পোষা বিড়াল অবশ্যই সেভাবে সাড়া দিবে না।

জীববিজ্ঞানের যেই শাখায় প্রাণীর আচরণ নিয়ে আলোচনা করা হয় তাকে আচরণবিদ্যা বা ইথোলজি (Ethology) বলা হয়।

এই স্মার্টবুকটাতে ইথোলজির সাধারণ কিছু বিষয় তার চেয়েও সাধারণ কিছু উদাহরণ দিয়ে বুঝানোর চেষ্টা করেছি এবং আশা করি স্মার্টবুকটা পড়ে ইথোলজির একঘেয়ে বিষয়গুলো তোমাদের কাছে ইন্টারেস্টিং মনে হবে

আচরণের প্রকৃতি (The Nature of Behaviour)


শুরুতেই বলেছি, একেক প্রাণীর ক্ষেত্রে আচরণের ধরন একেক রকমের হতে পারে। খুব সহজ একটা উদাহরণ দেই। ধরো তুমি দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রুগার ন্যাশনাল পার্কে বেড়াতে গেছো। ঘুড়তে ঘুড়তে যখন তুমি বুঝতে পারলে এবার ট্যুরে ইতি দিয়ে কিছু খাওয়া দরকার, তখনই তুমি খেয়াল করলে একটা সিংহ একটা জেব্রার দিকে লক্ষ করে এগিয়ে আসছে এবং কয়েক মিনিটের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার পর সিংহরাজ তার ডিনার নিয়ে অন্যদিকে চলে গেলো।

এবারে আচরণের প্রকৃতির ভিন্নতার দিকে খেয়াল করো। তুমিও ক্ষুধার্ত ছিলে এবং সিংহটাও ক্ষুধার্ত ছিলো কিন্তু জেব্রাটাকে দেখে তুমি দৌড়ানো শুরু করলেনা কিন্তু সিংহটা করলো, কেনো? কারণটা হচ্ছে “ক্ষুধা” যদি একটা উদ্দীপনা হয়ে থাকে তাহলে সিংহের ক্ষেত্রে সেই উদ্দীপনার প্রতি সাড়া হচ্ছে “শিকার করা”। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে আচরণগত ভাবে সাড়াটা অন্যভাবে প্রকাশ পায়। তাহলে বোঝা যায় আচরণের প্রকৃতি একেক প্রাণীর ক্ষেত্রে একেক রকম।

অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, আচরণগত সাড়া একাধিক উদ্দীপনার কারনে হয়। এই একাধিক উদ্দীপনাকে সম্মিলিত ভাবে “মোটিভেশন”।


উদ্দীপনায় আচরণগত পরিবর্তন


প্রাণীর সকল আচরণ প্রকাশ পায় উদ্দীপনার কারনে এবং অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, উদ্দীপনার কারনে প্রাণীর আচরণগত কিছু পরিবর্তন ঘটে থাকে।আচরণগত পরিবর্তন ঘটায় এমন কিছু সংকেতকে সাংকেতিক উদ্দীপনা বলা হয়। উৎপত্তি ও কাজের ভিত্তিতে সাংকেতিক উদ্দীপনা ৩ রকমের।

ড্রপ ডাউনগুলোতে ক্লিক করে জেনে নাও বিস্তারিত


সঠিক উত্তরে ক্লিক করো


আচরণ ও বংশগতির মধ্যে সম্পর্ক
(Relation between Behaviour and Heredity)


হাইলাইট করা শব্দগুলোর উপর মাউসের কার্সর ধরতে হবে। মোবাইল ব্যবহারকারীরা শব্দগুলোর উপর স্পর্শ করো।

আমরা জানি, একটা জীব কেমন হবে তা তার ডিএনএ নির্ধারণ করবে। ডিএনএর মধ্যে অবস্থিত জিনগুলোই মূলত জীবের শারীরিক এবং শারীরবৃত্তিক প্রক্রিয়া এবং আচরণগত সাড়া নিয়ন্ত্রণ করে। তার মানে, প্রত্যেকটা প্রাণী কোন উদ্দীপনার প্রতি কেমন ভাবে সাড়া দিবে বা কতক্ষণের জন্য সাড়া দিবে তার সবকিছুই সেই প্রাণীর ডিএনএর মধ্যকার তথ্য নির্ণয় করবে।

প্রত্যেক প্রাণীর ক্ষেত্রে কিছু আচরণ সহজাত এবং কিছু আচরণ অর্জিত। সহজাত আচরণগুলো জিনগত এবং বংশানুক্রমে এগুলো একই প্রজাতিভুক্ত প্রাণীর মধ্যে সঞ্চারিত হতে পারে কিন্তু অর্জিত আচরণগুলো পরিবেশ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং এই আচরণগুলো বংশানুক্রমে সঞ্চারন করা সম্ভব হয় না। একটা সহজ উদাহরণ দেই। ধরো তুমি একটা অন্ধকার রুমে ঢুকে লাইটটা জ্বালালে আর সাথে সাথে দেখলে একটা তেলাপোকা রুমের কোণায় থাকা একটা আলমারির নিচে লুকিয়ে গেলো। তেলাপোকা সম্প্রদায় অন্ধকারে থাকতে পছন্দ করে আর তাই আলো দেখলেই সে অন্ধকার কোনো একটা জায়গায় লুকাতে পারলে বাঁচে। এটা তেলাপোকার সহজাত আচরণ এবং এই তেলাপোকার পরবর্তি যত বংশধর হবে সকলেই অন্ধকার কোনো স্থানে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে। আবার, খেয়াল করে দেখবে তোমার পোষা কুকুরটা যেভাবে তোমার কথা বুঝতে পারে, রাস্তার সাধারণ কুকুরগুলো কিন্তু সেটা পারেনা। এই ধরনের আচরণগুলো অর্জিত এবং ভবিষ্যতে তোমার কুকুরের যত বংশধর হবে তারা কিন্তু জন্মগত ভাবে মানুষের কথা বুঝতে পারার ক্ষমতা নিয়ে জন্মাবে না, তারা তাদের আশেপাশের পরিবেশ থেকে এই আচরণ করার ক্ষমতা অর্জন করবে।

তাহলে বলা যায় একটা প্রাণীর মধ্যে যত ধরনের আচরণ প্রকাশ পায়, সেগুলো সহজাত এবং অর্জিত আচরণের মিশ্রণ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে কখন কোন ধরনের আচরণ প্রকাশ পাবে তা নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে ডিএনএ অনেক বড় একটি ভূমিকা পালন করে।



ট্যাক্সেস (Taxes)


বিভিন্ন রকমের উদ্দীপনার প্রতি আচরণগত সাড়াটা বিভিন্ন ধরনের হয়। কিছু উদ্দীপনা আছে যেগুলোর প্রতি প্রাণীরা সহজাত আচরণগত সাড়া দেয় এবং সাড়া দেওয়া ক্ষেত্রে দিকমুখিতা লক্ষ করা যায়। এই ধরনের দিকমুখি উদ্দীপনাকে ট্যাক্সিস বা বহুবচনে ট্যাক্সেস (sing.Taxis; plu.Taxes) বলা হয়।


ট্যাক্সিসের প্রকারভেদ


বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে ট্যাক্সিসকে নানা ভাগে ভাগ করা যায়। নিচে ট্যাক্সিসের প্রকারভেদগুলো দেওয়া হলো :-

দেহের দিকমুখিতার ভিত্তিতে ট্যাক্সিস ২ রকমের হতে পারে :


উদ্দীপনার উৎসের ভিত্তিতে জীবে নিম্নোক্ত বিভিন্ন ধরনের আচরণ দেখা যায় :

১। অ্যারোট্যাক্সিস

২। কেমোট্যাক্সিস

৩। এনার্জি ট্যাক্সিস

৪। গ্র্যাভিট্যাক্সিস/জিওট্যাক্সিস

৫। গ্যালভানো ট্যাক্সিস/ইলেক্ট্রোট্যাক্সিস

৬। ম্যাগনেটোট্যাক্সিস

৭। ফোনোট্যাক্সিস

৮। ফটোট্যাক্সিস

৯। রিওট্যাক্সিস

১০। থার্মোট্যাক্সিস

১১। থিগমোট্যাক্সিস

১। ক্লাইনোট্যাক্সিস

২। মেনোট্যাক্সিস

৩। নেমোট্যাক্সিস

৪। টেলোট্যাক্সিস

৫। ট্রোপোট্যাক্সিস



প্রতিবর্তী ক্রিয়া বা রিফ্লেক্স (Reflexes)


কোনো একটা উদ্দীপনার প্রতি সাড়া দেওয়ার জন্য প্রাণী সাথে সাথে যেই কাজটা করে সেটাকে প্রতিবর্তী ক্রিয়া বা রিফ্লেক্স বলা হয়। তার মানে, উদ্দীপনা যদি একটা একশন হয় তাহলে সেই একশনের প্রতি রিয়েকশন হচ্ছে রিফ্লেক্স।

একটি উদ্দীপনা যত শক্তীশালী হবে, তার প্রতি রিফ্লেক্স হবে তত দ্রুত।

তার মানে,

রিফ্লেক্স উদ্দীপনা


রিফ্লেক্সের প্রকারভেদ



সহজাত আচরণ যাচাই


সহজাত আচরণগুলো প্রত্যেক প্রাণী জন্মগত ভাবে অর্জন করে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে একটি প্রজাতির সকল সদস্যই কোনো প্রকারের প্রশিক্ষণ ছাড়াই এই ধরনের আচরণগুলো করে থাকে। প্রত্যেক প্রাণীর মধ্যে এক ধরনের অন্তর্নিহিত “Driving Force” থাকে যার সাহায্যে, আত্মরক্ষা ও প্রজাতি রক্ষার জন্য প্রাণীরা যুগ যুগ ধরে একই ধরনের আচরণ করে থাকে। এই অন্তর্নিহিত শক্তিকে বলা হয় “ইন্সটিংট”

আমার মাঝে মাঝে মনে হয় অন্যান্য প্রাণীরা মানুষের চেয়েও অনেক এডভান্সড। ভেবে দেখো, কোনো কিছু শিখতে আমাদের কতটা দীর্ঘ সময় পার করতে হয় কিন্তু প্রাণীরা সেই যায়গায় জন্ম থেকেই সবকিছু শিখেই আসে। যেমন ধরো, একটা মানব সন্তান গড়ে জন্মের ১-২ বছর পর হাঁটতে এবং কথা বলতে শিখে কিন্তু সেই যায়গায় একটা ভাল্লুকের সন্তান জন্মের কয়েকদিনের মাথায় হাঁটতে শিখে যায়। ব্যাপারটা মজার তাইনা?

শীতকালে বাংলাদেশের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে রাশিয়া থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে আসা Spoon-billed Sandpiper (Eurynorhynchus pygmeus)। এই প্রশ্নটা অনেকেই করে থাকে যে কেনো পাখিগুলো হঠাৎ করে নিজের দেশ ছেড়ে আরেক দেশে মাইগ্রেট করে। উত্তরটা হচ্ছে সহজাত আচরণের কারনে। এই প্রজাতির যত ধরনের পাখি আছে, তাদের ইন্সটিংট বলে দেয় যে নির্দিষ্ট একটা সময়ে তাদেরকে পরিযান করতে হবে এবং যেই স্থানে তারা যাচ্ছে সেখানে কী করলে তারা আহার খুঁজতে ও খেতে পারবে। এই প্রজাতির সকল পাখি একই রকমের আচরণ দেখায় এবং তারা এই আচরণ বংশানুক্রমে অন্যদের মধ্যে সঞ্চারন করবে।

সহজাত আচরণের আরেকটি জনৈক উদাহরণ হচ্ছে অপত্যের যত্ন। প্রত্যেক জীবের জন্যে প্রজননের নির্দিষ্ট একটি সময় আছে। দেখা গেছে, প্রজননের সময় যখন কাছাকাছি আসে, জীবদের মধ্যে তখন আচরণগত ভিন্নতা লক্ষ করা যায় তার মধ্যে সবচেয়ে অন্যতম আচরণ হচ্ছে সন্তানের লালন-পালন এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বাসা নির্মাণ করা। মানুষের ক্ষেত্রে একাই একটা আস্ত বিল্ডিং তুলে ফেলা কখনই সম্ভব না। অনেকগুলো মানুষ মিলেও যদি একটা বিল্ডিং বানায়, সেটাও জানার জন্য দরকার অনেক ধরনের প্রশিক্ষণ। প্রাণীদের ক্ষেত্রে কিন্তু তারা কোনো প্রকারের প্রশিক্ষণ ছাড়াই এই কাজগুলো সুনিপুণ ভাবে করতে পারে। এটা থেকেই বুঝা যায়, প্রাণীদের বেশিরভাগ আচরণই তারা জন্মগত ভাবে লাভ করে।

মাকড়শার জাল সবাই দেখেছো তাই না? কখনো কী মাকড়শার জালের দিকে বিজ্ঞানীর নজরে দেখে থাকো তাহলে খেয়াল করবে, সমস্ত জাল জুড়ে অসংখ্য প্যাটার্ন আছে এবং এই অসাধারণ প্যাটার্নগুলো তৈরি করার ক্ষমতা কিন্তু প্রত্যেকটা মাকড়শা জন্মগত ভাবেই অর্জন করে। একজন ডিজাইনার যখন কোনো ডিজাইন তৈরি করে তাকে অসংখ্য নির্ঘুম রাত কাটাতে হয় কিন্তু একটা মাকড়শা মাত্র আধ ঘন্টারও কম সময়ে জাল বুনে ফেলে। মাকড়শার উদরে এক ধরনের বিশেষ সিল্ক গ্রন্থি (silk gland) আছে যেখানে তিনজোড়া স্পিনারেট (spinnerets) আছে যার মাধ্যমে সুতা নির্মাণ করা হয়। সিল্ক গ্রন্থি থেকে স্ক্লেরোপ্রোটিন (scleroprotein) ক্ষরণ হয় যা বাতাসের স্পর্শে আসলে শক্ত রেশমি সুতাই পরিণত হয়। পরীক্ষা করে দেখা গেছে একই ব্যাসে ইস্পাতের সুতার অপেক্ষায় মাকড়শার সুতা আরো শক্তিশালী।


আশা করি, এই স্মার্ট বুকটি থেকে তোমরা আচরণগত পরিবর্তন, ট্যাক্সেস, প্রতিবর্তী ক্রিয়া, সহজাত আচরণ, সহজাত আচরণ যাচাই সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেয়েছো। 10 Minute School এর পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য শুভকামনা রইলো।