ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯

Picture3

ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯

লেখকঃ শামসুর রাহমান

আবার ফুটেছে দ্যাখো কৃষ্ণচূড়া থরে থরে শহরের পথে
কেমন নিবিড় হয়ে। কখনো মিছিলে কখনো-বা
একা হেঁটে যেতে যেতে মনে হয়- ফুল নয়, ওরা
শহিদের ঝলকিত রক্তের বুদ্বুদ, স্মৃতিগন্ধে ভরপুর।
একুশের কৃষ্ণচূড়া আমাদের চেতনারই রং।

এ রঙের বিপরীতে আছে অন্য রং,
যে-রং লাগে না ভাল চোখে, যে রং সন্ত্রাস আনে
প্রাত্যহিকতায় আমাদের মনে সকাল-সন্ধ্যায়
এখন সে রঙে ছেয়ে গেছে পথ-ঘাট, সারা দেশ
ঘাতকের অশুভ আস্তানা।

আমি আর আমার মতোই বহু লোক
রাত্রি-দিন ভূলুণ্ঠিত ঘাতকের আস্তানায় কেউ মরা, আধমরা কেউ,
কেউ বা ভীষণ জেদি, দারুণ বিপ্লবে ফেটে পড়া। চতুর্দিকে
মানবিক বাগান, কমলবন হচ্ছে তছনছ।
বুঝি তাই উনিশশো উনসত্তরেও
আবার সালাম নামে রাজপথে, শূন্যে তোলে ফ্ল্যাগ,
বরকত বুক পাতে ঘাতকের থাবার সম্মুখে।

সালামের চোখে আজ আলোচিত ঢাকা,
সালামের মুখ আজ তরুণ শ্যামল পূর্ব বাংলা।

দেখলাম রাজপথে, দেখলাম আমরা সবাই
জনসাধারণ
দেখলাম সালামের হাত থেকে নক্ষত্রের মতো
ঝরে অবিনাশী বর্ণমালা

আর বরকত বলে গাঢ় উচ্চারণে
এখনো বীরের রক্তে দুঃখিনী মাতার অশ্রুজলে
ফোটে ফুল বাস্তবের বিশাল চত্বরে

হৃদয়ের হরিৎ উপত্যকায়সেই ফুল আমাদেরই প্রাণ,
শিহরিত ক্ষণে ক্ষণে আনন্দের রৌদ্রে আর দুঃখের ছায়ায় ।


মূলভাব
ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ কবিতায় প্রস্ফুটিত হয়েছে সংঘবদ্ধ প্রতিবাদী আন্দোলন। এখানে তিনি স্বাধিনতাকামী মানুষের চেতনাবোধের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। সাধারণ জনতা এই প্রতিবাদের হাতিয়ার। এ কবিতায় জিবনের তাৎপর্যের দার্শনিকতার উন্মোচন ঘটেছে।
১৯৬৯-এর পাকিস্তানি শাসকদের নির্মম অত্যাচার, স্বৈরতান্রিক মনোভাব, অমানবিক নিষ্ঠুরতায় পূর্ববাংলায় মাওনবিকতার ধ্বংসযজ্ঞ কবিতাটিতে বর্ণিত।
১৯৫২ সালে ফাল্গুন/ফেব্রুয়ারি মাসে মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে ভাষা আন্দোলন হয়েছিল এদেশে। ভাষা আন্দলনে অনেক তাজা প্রাণ ঝড়ে গিয়েছিল।, ফাল্গুন মাসে প্রস্ফুটিত ফুল যেন শহিদদের সেই রক্ত ধারণ করে লাল হয়েছে । তাই পথের ধারে থরে থরে লাল কৃষ্ণচূড়া দ্বারা বায়ান্নর ভাষাশহিদদের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। ৫২’র পরে বাঙালি আরো কিছু বিপ্লব ও সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছে। যা ঊনসত্তরে এসে আরো বিস্তৃত হয়। তাই ‘সালামের মুখে আজ তরুণ শ্যামল পূর্ব বাংলা।‘
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালিদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন ও অত্যাচার চালায়। চারদিকে হত্যা, সন্ত্রাস, লুন্ঠন জনজীবনে আতঙ্ক তৈরি করে। সারাদেশ অশুভ আস্তানায় পরিণত হয়। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের কথা ঊনসত্তরে এসে বাঙালিকে প্রেরণা দেয়। বাংলা ভাষারূপ ফুল ফোটে এই ভয়াল বাস্তবতায়। “সেই ফুল আমাদেরই প্রাণ”-পঙতিটিতে সেই ফুল বলতে বাংলা ভাষাকে নির্দেশ করা হয়েছে- যা প্রকৃতপক্ষে আমাদের প্রাণের প্রিয়।

কন্টেন্ট ক্রেডিট:
হারুন স্যার
সরকারী বিজ্ঞান কলেজ