সাম্যবাদী

Picture3

সাম্যবাদী

লেখকঃ কাজী নজরুল ইসলাম

গাহি সাম্যের গান–
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান,
যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রিশ্চান।

গাহি সাম্যের গান!
কে তুমি? পার্সি? জৈন? ইহুদি? সাঁওতাল, ভীল, গারো-
কনফুসিয়াস? চার্বাক-চেলা? বলে যাও, বল আরও!
বন্ধু, যা খুশি হও,

পেটে-পিঠে, কাঁধে-মগজে যা খুশি পুঁথি ও কেতাব বও,
কোরান– পুরাণ– বেদ– বেদান্ত– বাইবেল– ত্রিপিটক-
জেন্দাবেস্তা -গ্রন্থ-সাহেব পড়ে যাও যত সখ,
কিন্তু কেন এ পন্ডশ্রম, মগজে হানিছ শূল?

দোকানে কেন এ দর- কষাকষি? পথে ফোটে তাজা ফুল!
তোমাতে রয়েছে সকল কেতাব সকল কালের জ্ঞান,
সকল শাস্ত্র খুঁজে পাবে সখা খুলে দেখ নিজ প্রাণ!

তোমাতে রয়েছে সকল ধর্ম, সকল যুগাবতার,
তোমার হৃদয় বিশ্ব- দেউল সকলের দেবতার।
কেন খুঁজে ফের দেবতা- ঠাকুর মৃত- পুথি-কঙ্কালে?
হাসিছেন তিনি অমৃত- হিয়ার নিভৃত অন্তরালে!
বন্ধু, বলিনি ঝুট,
এইখানে এসে লুটাইয়া পড়ে সকল রাজমুকুট
এই হৃদয়ই সে নীলাচল, কাশী, মথুরা, বৃন্দাবন,
বুদ্ধ- গয়া এ, জেরুজালেম এ, মদিনা, কাবা- ভবন,
মসজিদ এই, মন্দির এই, গির্জা এই হৃদয়,

এইখানে বসে ঈসা মুসা পেল সত্যের পরিচয়।
এই রণভূমে বাঁশির কিশোর গাহিলেন মহাগীতা
এই মাঠে হলো মেষের রাখাল নবিরা খোদার মিতা।
এই হৃদয়ের ধ্যান-গুহা মাঝে বসিয়া শাক্যমুনি
ত্যজিল রাজ্য মানবের মহা-বেদনার ডাক শুনি।

এই কন্দরে আরব-দুলাল শুনিতেন আহ্বান,
এইখানে বসি গাহিলেন তিনি কোরানের সাম-গান!

মিথ্যা শুনিনি ভাই,
এই হৃদয়ের চেয়ে বড়ো কোনো মন্দির-কাবা নাই।


মূলভাব:

কাজী নজরুল ইসলাম এই কবিতায় হৃদয়-ধর্মকে প্রাধান্য দিয়ে সাম্যের গান গেয়ে মানবসমাজকে ঐক্যবদ্ধ করতে আগ্রহী। সাম্যবাদী (১৯২৫) কবিতাটিতে বৈষম্যহীন অসাম্প্রদায়িক মানবসমাজ গঠনের প্রত্যাশা উচ্চারিত হয়েছে। তাঁরমতে ধর্মকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে প্রয়োজন প্রগাঢ় মানবতাবোধ। তাই সাম্প্রদায়িকতার ব্যবধান দূর করতে মানবিকতাবোধসম্পন্ন হৃদয় নামক তীর্থক্ষেত্রে ‘মানুষ’ পরিচয়ে সকলকে একীভূত হতে হবে।
মানব হৃদয় অনন্ত, অসীম জ্ঞানভাণ্ডারের উৎসমূল। সকল শাস্ত্র, ধর্ম, যুগাতোর এবং উপাসনালয় মানুষের অন্তরের মাঝেই অবস্থিত। আত্মজ্ঞানী বলে সকল শাস্ত্র নিজের অন্তরাত্মার মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যাবে।
পুঁথি তথা শাস্ত্রগ্রন্থ বা কেতাব মৃতবট্‌ কঙ্কালস্বরূপ। নিজের হৃদয়ে সত্যবোধ না থাকলে সেখানে সৃষ্টিকর্তাকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। ধর্মগ্রন্থের মূলমন্ত্র যে মানবতাবোধ, তা আত্মস্থ না থাকলে তা পাঠ পণ্ডশ্রম হয়।
বিশ্বব্যাপী এক মানবজাতির চেতনা যাঁরা মনেপ্রাণে হৃদয়ে লালন করেন, কবি হৃদয়ের সেই প্রশস্ত ভূমিতে সাম্যের গান গাইতে চেয়েছেন।
কবির দৃষ্টিতে মানবহৃদয়ই সকল দেবতার সবচেয়ে বড় উপসনালয়। মানুষ আপন অন্তরে আরাধ্য বিধাতার অবস্থান অনুভব করার চেষ্টা না করে বই পুস্তকের মৃত কঙ্কালে তাঁকে খুঁজে হয়রান হয় বলে দেবতা-ঠাকুর অমৃত-হিয়ার নিভৃত অন্তরালে থেকে হাসেন। মানবহৃদয় সত্য সন্ধানের প্রকৃত ও পরম স্থান- যেখানে ঈশ্বরের সান্নিধ্য পাওয়া যায়, যা সব ধর্মের ধর্মপ্রবক্তাগণ পেয়েছিলেন।

কন্টেন্ট ক্রেডিট:
হারুন স্যার
সরকারী বিজ্ঞান কলেজ