তাহারেই পড়ে মনে

Picture3

তাহারেই পড়ে মনে

লেখকঃ সুফিয়া কামাল

“হে কবি, নীরব কেন ফাগুন যে এসেছে ধরায়,
বসন্তে বরিয়া তুমি লবে না কি তব বন্দনায়?”
কহিল সে স্নিগ্ধ আঁখি তুলি-
“দক্ষিণ দুয়ার গেছে খুলি?
বাতাবি নেবুর ফুল ফুটেছে কি? ফুটেছে কি আমের মুকুল?
দখিনা সমীর তার গন্ধে গন্ধে হয়েছে কি অধীর আকুল?
“এখনো দেখনি তুমি?” কহিলাম, “কেন কবি আজ
এমন উন্মনা তুমি? কোথা তব নব পুষ্পসাজ?”
কহিল সে সুদূরে চাহিয়া-
“অলখের পাথার বাহিয়া
তরী তার এসেছে কি? বেজেছে কি আগমনী গান?

ডেকেছে কি সে আমারে? শুনি নাই, রাখি নি সন্ধান।”
কহিলাম,“ওগো কবি! রচিয়া লহ না আজও গীতি,
বসন্ত- বন্দনা তব কন্ঠে শুনি- এ মোরা মিনতি।”

কহিল সে মৃদু মধু- স্বরে-
“নাই হলো, না হোক এবারে-
আমার গাহিতে গান, বসন্তেরে আনিতে বরিয়া-
রহেনি, সে ভুলেনি তো, এসেছে তা ফাগুনে স্মরিয়া।”

কহিলাম: “ওগো কবি, অভিমান করেছ কি তাই?
যদিও এসেছে তবু তুমি তারে করিলে বৃথাই।”
কহিল সে পরম হেলায়-
“বৃথা কেন? ফাগুন বেলায়
ফুল কি ফোটেনি শাখে? পুষ্পারতি লভেনি কি
ঋতুর রাজন?

মাধবী কুঁড়ির বুকে গন্ধ নাহি? করে নাই
অর্ঘ্য বিরচন?”

“হোক,তবু বসন্তের প্রতি কেন এই তব তীব্র বিমুখতা?”
কহিলাম, “উপেক্ষায় ঋতুরাজে কেন কবি দাও তুমি ব্যথা?”

কহিল সে কাছে সরে আসি-
“কুহেলি উত্তরী তলে মাঘের সন্ন্যাসী
গিয়াছে চলিয়া ধীরে ধীরে পুষ্পশূন্য দিগন্তের পথে
রিক্ত হস্তে! তাহারেই পড়ে মনে,
ভুলিতে পারি না কোনো মতে।”

মূলভাব:
‘তাহারেই পড়ে মনে’ কবিতায় কবির ব্যক্তিজীবনের দুঃখময় ঘটনার ছায়াপাত ঘটেছে। তাঁর সাহিত্য সাধনায় প্রেরণাদাতা স্বামী সৈয়দ নেহাল হোসেনের আকস্মিক মৃত্যুতে (১৯৩২, সুফিয়ার একুশ বছর বয়সে) কবির জীবনে প্রচণ্ড শূণ্যতা নেমে আসে। তাই কবির হৃদয়ে যেন শীতের রিক্ততার হাহাকার। তাঁর বাক্যসাধনার মধ্যে নেমে আসে এক দুঃসহ বিষণ্ণতা। তাই বর্তমানের বসন্ত ও এর সৌন্দর্য কবির মনে কোনো পুলকতার ভাব জন্ম পায়না। বসন্ত এলেও উদাসীন কবির হৃদয় জুড়ে রিক্ত শীতের করুণ বিদায়ের বেদনা।
এ কবিতায় প্রকৃতি ও মানবমনের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তাট্‌পর্যময় অভিব্যক্তি পেয়েছে। প্রকৃতির সৌন্দর্য মানবমনের অফুরন্ত আনন্দের উৎস, প্রকৃতি দ্বারা মানবমন নিয়ন্ত্রিত হয়। কিন্তু মানবমনে বিচ্ছিন্নতা, বেদনা অনুভূত হলে তখন মানবমনে প্রকৃতির সৌন্দর্য স্পর্শ করেনা। তবুও প্রকৃতি চলে তার আপন গতিতে। প্রকৃতির উপর মানুষের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। বসন্ত আসে আপন নিয়মে কিন্তু মানুষের গতি থেমে যায় কোনো এক শীতে। থেমে যাওয়াই শূণ্যতার শীত আর ছুটে চলাই পূর্ণতার বসন্ত।

কন্টেন্ট ক্রেডিট:
হারুন স্যার
সরকারী বিজ্ঞান কলেজ