অষ্টম শ্রেণি: বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ও উন্নয়ন

Supported by Matador Stationary
সংস্কৃতি বলতে আমরা সাধারণত সমাজের মানুষের জীবন-যাপনের ধারাকে বুঝে থাকি। অর্থাৎ সংস্কৃতি হলাে আমাদের জীবন-প্রণালি। মানুষ তার অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে এবং তার মৌলিক প্রয়ােজনগুলাে পূরণের লক্ষ্যে যা কিছু সৃষ্টি করে তা-ই হলাে তার সংস্কৃতি। মূলত মানুষের এসব সৃষ্টি বা কাঙ্গ দুই ধরনের হয়ে থাকে। একটি হলাে বস্তুগত অপরটি অবস্তুগত। সংস্কৃতিকেও তাই দুইভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। বস্তুগত সংস্কৃতি ও অবস্তুগত সংস্কৃতি। বস্তুগত সংস্কৃতি হচ্ছে ঘরবাড়ি, তৈজসপত্র, আসবাবপত্র, উৎপাদন হাতিয়ার। আর অবস্তুগত সংস্কৃতি হচ্ছে তার দক্ষতা, জান, চিন্তা-ভাবনা, আচার-ব্যবহার, বিশ্বাস, ধ্যান-ধারণা, সংগীত, সাহিত্য ও শিল্পকলা ইত্যাদি। সংস্কৃতি পরিবর্তনশীল। আদিকাল হতে সমাজে বসবাসকারী মানুষ তার সৃষ্টিকে বিভিন্ন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আধুনিক সাংস্কৃতিক জীবনে উন্নীত করেছে। এ অধ্যায়ে আমরা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিবর্তন, উন্নয়ন এবং বাঙালির সংস্কৃতি ও শিল্পকলা সম্পর্কে জানব 

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ও উন্নয়ন ধারণা

মানুষ সমাজে মিলেমিশে বাস করে। এভাবে বাস করতে গিয়ে সে নিজের প্রয়ােজনে নানা কিছু সৃষ্টি করে। মানুষের সৃষ্টিশীল সকল কাজই তার সংস্কৃতি। সমাজ ও অঞ্চল ভেদে সংস্কৃতির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় ৰূপ ভিন্ন হয়ে থাকে। বাংলাদেশের মানুষ ও সমাজের রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতি। এদেশের সংস্কৃতি কি এক জায়গায় থেমে নেই। পরিবেশ-পরিস্থিতি ও যুগের সাথে তাল মিলিয়ে নিজেদের প্রয়ােজন। মিটাতে আমাদের সংস্কৃতিরও পরিবর্তন ঘটছে। সংস্কৃতির ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত বা ইতিবাচক পরিবর্তনই উন্নয়ন। সংস্কৃতি এক জন হতে অন্য প্রজনন হস্তান্তরিত হয়। এই প্রক্রিয়ায় হস্তাস্তুরিত হতে হতে সংস্কৃতির মধ্যে কিছু কিছু পরিবর্তন ঘটে। আবার অন্য সংস্কৃতির সংস্পর্শে এসেও সংস্কৃতি তার রূপ। বদল করে। একেই সংস্কৃতির পরিবর্তন বা সাংস্কৃতিক পরিবর্তন বলে।

পরিবর্তন যে ধরনেরই হােক, সংস্কৃতি স্থির নয়। মানুষ যে পরিবেশে বাস করে তার মধ্যে থেকে সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ঘটতে পারে আবার বাইরের উপাদান সংগ্রহ করেও এই সাংস্কৃতিক পরিবর্তন। সাধারণভাবে উন্নয়ন বলতে বােঝায় কোনাে কিছু শুরু থেকে ক্রমশ পরিপূর্ণতা লাভ করা। একসময় উন্নয়ন বলতে কেবল অর্থনৈতিক অবস্থার কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন বা অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে বােঝানাে হতাে। কিন্তু সমাজবিজ্ঞানীরা উন্নয়ন বলতে সামাজিক উন্নয়ন’ কথাটিকে নির্দেশ করেন। তাই মানুষের জীবনযাত্রার মানের উন্নয়নই প্রকৃত উন্নয়ন। সাধারণত উন্নয়ন বা সামাজিক উন্নয়ন হলো একধরনের সামাজিক পরিবর্তন’ । কোনাে সমাজের উন্নয়নের ফলে যেমন সাংস্কৃতিক পরিবর্তন হয়। তেমনি সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের ফলেও সমাজে উন্নয়ন ঘটে। যেমন বাংলাদেশে অনেক জায়গায় এখন লালের পরিবর্তে ট্রাক্টর ব্যবহার বম্বগত সাংস্কৃতিক পরিবর্তন। এর ফলে কৃষি উৎপাদন বেড়ে যাওয়ায় মানুষের জীবনযাবার মানের উন্নয়ন হয়েছে। এইভাবে সাংস্কৃতি ও সামাজিক পরিবর্তন ও উন্নয়ন সমম্বিতভাবে সমাজের উন্নয়ন ঘটায়।

সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ও উন্নয়নের বৈশিষ্ট্য
আমরা উপরে সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ও উন্নয়ন সম্পর্কে জেনেছি। এখন সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ও উন্নয়নের বৈশিষ্ট্যগুলাে নিচে আলােচনা করা হলাে:
  •  সমাজে সকলের জীবনযাত্রার মানের উন্নতি সাধন, শোষণ ও বৈষম্যের মাত্রা কমানাে বা অবসান করা, জ্ঞানবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে মানব কল্যাণে কাজে লাগানােই উন্নতি বা উন্নয়নের লক্ষ্য। মানুষের জীবনযাত্রার প্রণালি হচ্ছে সংস্কৃতি। জ্ঞানবিজ্ঞান, প্রযুক্তি প্রভৃতির উন্নয়ন সাংস্কৃতিক পরিবর্তনকেই নির্দেশ করে। তাই অনেক সময় সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ও উন্নয়নকে সমার্থক মনে হয়। এই সাংস্কৃতিক পরিবর্তনও উন্নয়নের একটি বৈশিষ্ট্য।
  • বস্তুগত সংস্কৃতি যত দ্রুতগতিতে পরিবর্তন হয় অবস্তুগত সংস্কৃতি তত দ্রুত পরিবর্তন হয় না। ফলে সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের এই অসমতা সমাজে সমস্যা তৈরি করে যা সমাজে উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সংস্কৃতির পরিবর্তনের এই গতি বা পার্থক্য সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের বৈশিষ্ট্য। আর উন্নয়নের গতি বা ধীরগতির উপর নির্ভর করে সংস্কৃতির বিভিন্ন অংশের পরিবর্তনের মাত্রা হচ্ছে। উন্নয়নের বৈশিষ্ট্য।
  • উন্নয়ন মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের অগ্রাধিকার দেয়। এটি উন্নয়নের একটি বৈশিষ্ট্য। মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ হলে সমাজের অগ্রগতি ঘটে, উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। ফলে সমাজে নানা ক্ষেত্রে পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। যা সামাজিক পরিবর্তন হিসাবে গণ্য করা হয়। আর সামাজিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ঘটে।
  • সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ও উন্নয়নের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- পরিবর্তন সকল সময় একটি সরলরেখায় । ক্রমশ উর্বগতিতে এগিয়ে যায় না। অনেক সময় সাংস্কৃতিক পরিবর্তন নিম্নগতির দিকে যায়। তাই উঞ্চগতি ও নিম্নগতি দুটোই পরিবর্তন। একটি ইতিবাচক অন্যটি নেতিবাচক। তবে উন্নয়ন বলতে উধর্বগতি ৰা ইতিবাচক পরিবর্তনকে বােঝায়। তাই সংস্কৃতির উন্নয়ন হলাে সংস্কৃতির ইতিবাচক পরিবর্তন।
  •  সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ও উন্নয়ন দুটোই সময়ের মাত্রার মধ্যে সংগঠিত হয়। এটিও পরিবর্তনের একটি বৈশিষ্ট্য। যেমন; পুরাতন পাথর যুগ ও নতুন পাথরের যুগ দুইটি সময়কাল। দই সময়ের সংস্কৃতিতে পার্থক্যও আছে। এই পার্থক্য সময়ের পরিবর্তনের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে। অনেকক্ষেত্রে এই পরিবর্তন পরবর্তী সময়েও ধারাবাহিকভাবে ঘটে থাকে। যেমন পুৱাহন পাথর যুগের অনেক হাতিয়ার নতুন পাথর যুগের সময়ে উন্নতি ঘটেছে। এটি হচ্ছে সংস্কৃতির উন্নয়ন তথা সাংস্কৃতিক পরিবর্তন।
সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ও উন্নয়নের বিভিন্ন দিক 
আমরা জানি সংস্কৃতি স্থির বিষয় নয়। পরিবর্তন সংস্কৃতির ধর্ম। পৃথিবীর বিভিন্ন জনগােষ্ঠীর সংস্কৃতিতে ভিন্নতা থাকলেও সেখানে প্রতিনিয়ত সংযােজন ও বিয়ােজন চলে। একসময় সংস্কৃতির পার্থক্য বা পরিবর্তনশীলতার মধ্যে আবার নতুন সংস্কৃতির পরিবর্তন ও উন্নয়ন ঘটে। সংস্কৃতির এই পরিবর্তনশীলতার কয়েকটি কারণ রয়েছে। যেমন:
বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ও উন্নয়ন
বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষের জীবন আচরণ বা সংস্কৃতিতে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। একে বলা হয় সাংস্কৃতিক পরিবর্তন। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাৰ সৰচেয়ে বেশি। এছাড়া ধর্মীয় সংস্কৃতি, লােকসংস্কৃতির প্রভাবও একেবারে কম নয় যেমন : পােশাক, খাদ্যাভ্যাস, শিক্ষা, কৃষি, চিকিৎসা, প্রযুক্তি, সংগীত, কলা, দৃষ্টিভঙ্গি, আচরণ,ফ্যাশন ইত্যাদিতে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাবে অনেক পরিবর্তন এসেছে। যাকে আমাদের সংস্কৃতি থেকে পৃথক করা। সম্ভব নয়। বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনে তাে বটেই শহরের জীবনেও ইদানিং বিভিন্ন লােক উৎসব, বর্ষবরণ, মেলা ইত্যাদির আধিক্য ও বিভিন্ন লােক সামগ্রীর সম্ভার দেখে এই পরিবর্তন স্পষ্টই চোখে পড়ে। বিশ্বায়নের প্রভাবেও বাংলাদেশের নিজস্ব সংস্কৃতিতে পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। আগে। যেমন যাত্রা, পালাগান, সার্কাস, জারিসারির মাধ্যমে মানুষ বিনােদনের চাহিদা পূরণ করত, বর্তমানে ঘরে বসে ফেসবুক, মিডিয়ার মাধ্যমে সে চাহিদা পূরণ করছে।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়ন সাংস্কৃতিক পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করে। বস্তুগত ও অবস্তুগত উভয় সংস্কৃতিতে আমাদের দেশে পরিবর্তন ঘটেছে। তবে এক্ষেত্রে বস্তুগত সংস্কৃতি এগিয়ে আছে। যত দ্রুত আমরা ফ্রিজ, টেলিভিশন গ্রহণ করি তদ্রুত অন্য দেশের ধ্যান ধারণা, দৃষ্টিভংগি ও বিলাস সামগ্রী গ্রহণ করতে পারি না। বাংলাদেশে পারিবারিক ব্যবস্থায় বা পারিবারিক সম্পর্কে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। পূর্বের যৌথ পরিবার ভেঙে এখন একক পরিবার গ্রাম শহর উভয় স্থানে গড়ে উঠেছে যা তাদের আচার-আচরণে ও জীবনযাপন পদ্ধতিতে প্রকাশ পাচ্ছে। অর্থনীতিতে নারীর অংশ গ্রহণ পরিবারে নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর সমঅধিকার ও নারী স্বাধীনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে যা নারী-পুরুষের চিরায়ত সম্পর্কে পরিবর্তন এনেছে। এখন নারী-পুরুষ একত্রে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে। প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আমাদের সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। যার ফলে বাংলাদেশ ডিজিটাল বাংলাদেশে পরিণত হচ্ছে।

বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উন্নয়ন
সংস্কৃতির বস্তুগত ও অবস্তুগত উপাদানের ইতিবাচক বা উধ্বমুখী পরিবর্তন সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ঘটাচ্ছে। বিশেষ করে প্রযুক্তি এক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটিয়েছে। এছাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি, গবেষণা, খেলাধুলা, বিনােদন, রাজনীতি, শিল্প-সাহিত্য, বৈদেশিক সম্পর্ক ও বাণিজ্য, শিল্প-কারখানা, নারী পুরুষ সম্পর্ক ইত্যাদি ক্ষেত্রেও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ঘটেছে। কৃষি, শিল্প, চিকিত্সা ও শিক্ষায় উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। যা বাংলাদেশের মানুষের সংস্কৃতিতে উন্নয়ন বয়ে আনছে। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অনুসরণে আমাদের দেশে বিভিন্ন ব্যাংক, বিমা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, রেস্টুরেন্ট, রেন্ট, হােটেল, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়, বহুজাতিক কোম্পানি, আধুনিক বিপণী বিতান ইত্যাদির সম্প্রসারণ হয়েছে। ফলে এগুলােকে ঘিরে এক ধরনের সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে যা সাংস্কৃতিক উন্নয়ন।

বিশ্বের উন্নত দেশের অনুকরণে প্রচলিত ধারার শিক্ষার সাথে মাল্টিমিডিয়া ব্যবহার করে শিক্ষাকে । যুগোপযােগী করার চেষ্টা চলছে। আবার প্রচলিত ধারার শিক্ষার পাশাপাশি দূরশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষাকে মানুষের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমাদের দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে এসব পরিবর্তন মুলত শিক্ষা সংস্কৃতিই পরিবর্তন। যা শিক্ষাসংস্কৃতিক উন্নয়ন ঘটিয়েছে।

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিবর্তন ও উন্নয়নের বিকাশ ধারা
বাঙ্কালি সমৃদ্ধ সংস্কৃতির অধিকারী একটি প্রাচীন জাতি। মানুষ যেভাবে জীবনযাপন করে,যেসব জিনিস ব্যবহার করে, যেসব আচার-অনুষ্ঠান পালন করে, যা কিছু সৃষ্টি করে, সব নিয়েই তার সংস্কৃতি। খাদ্য, বাসস্থান, তৈজসপত্র, যানবাহন, পােশাক, অলঙ্কার, উস, গীতবাদ্য, ভাষা-সাহিত্য সবই তার সংস্কৃতির অংশ। তবুও এর মধ্যে সৃষ্টিশীল কিছু কিছু কাজ সংস্কৃতির বিচারে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এসব কাজে একটি জাতির চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীল প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়। এগুলােকে আমরা বলি শিল্পকলা। আমরা আমাদের সেই সব সৃষ্টিশীল সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহ্যের সাথে পরিচিত হব এবং দৃশ্যশিল্প, সাহিত্যশিল্প ও সঙ্গীতশিল্প এই তিন শাখায় আমাদের অবদান ও কীর্তি স্মরণ করব।

এক সময় ঘচি অনুযায়ী মাটির তৈরি ইট দিয়ে মন্দির বানানাে হয়েছে। তবে এক্ষেত্রে শিল্পমূল্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে মাটির ফলক বা পাত তৈরি করে তাতে ছবি অঙ্কন করে পুড়িয়ে স্থায়ী রূপ দেওয়া। এগুলােকে টেরাকোটা বা পােড়ামাটির শিল্প বলা হয়। দিনাজপুরের কাজি মন্দিরে এভাবে পােড়ামাটির শিল্পকর্মে রামায়ণের কাহিনিসহ নানা সামাজিক জীবনের চিত্র ফুটে উঠেছে। পাহাড়পুরের সােমপুর বিহারেও পােড়ামাটির প্রচুর কাজ আছে। এতে সেকালের সমাজ জীবনের ছবি পাওয়া যায়। কালাে রঙের কষ্টিপাথর আর নানা রকম মাটি দিয়ে হিন্দু ও বৌদ্ধ দেবদেবীর মূর্তি বানানোর ঐতিহ্য বেশ পুরনো।
তবে পালযুগে তালপাতার পুঁথিতে দেশীয় রঙ দিয়ে যেসব ছবি আঁকা হয়েছে তার প্রশংসা আধুনিক বিশ্বের শিল্পরসিকদের কাছ থেকেও পাওয়া যাচ্ছে। হাজার বছর পরেও ছবিগুলাে চমৎকার। ঝকঝকে রয়েছে। পুঁথিগুলাে ছিল বৌদ্ধ ধর্মশাস্ত্রের।

বাংলার তাঁতশিল্পের সুনাম বহুকালের। প্রাচীন বাংলার দুকূল কাপড়ের বেশ খ্যাতি ছিল। কৌটিল্য বলেছেন, প্রদেশের (উত্তরবঙ্গ) দুকুল শ্যামবর্ণ এবং মণির মতাে মসৃণ । দুল ছিল খুব মিহি আর ক্ষৌমৰস্তু একটু মােটা । পলাের্ণ নামে এন্ডি বা মুগা জাতীয় সিঙ্ক তৈরি হতে মগধ ও পুণ্ডে। সেকালে এদেশের দুই কুল, পত্রোর্ণ, স্লিম ও কার্পাস কাপড় বিদেশে রপ্তানি হতাে। বাংলায় বিভিন্ন সময় যেসব কাপড় উৎপন্ন হতো তার মধ্যে উল্লেখযােগ্য হলাে খাসা, এলাচি, হমায়। চৌতা, ইউনি, সুসিজ, কোষা মলমল দুরিয়া চিরকাল ইত্যাদি বাংলার বিখ্যাত মসলিন কাপড়। এতই সূক্ষ্ম ও উন্নতমানের ছিল যে এ কাপড় নিয়ে বহু কাহিনী এবং কিংবদন্তির সৃষ্টি হয়েছিল। বাংলার নাতি খ্যাতিও সকালে সিমলানিখাল যালিল, পারদ ইত্যাদি এখনও সুপরিচিত

বাংলায় বিভিন্ন সময় যেসব কাপড় উৎপন্ন হতাে তার মধ্যে উল্লেখযােগ্য হলাে খাসা, এলাচি, হামাম, চৌতা, উনি, সুসি, কোসা, মলমল, দুরিয়া, শিরবান্দ ইত্যাদি। বাংলার বিখ্যাত মসলিন কাপড় এতই সূক্ষ্ম ও উন্নতমানের ছিল যে এ কাপড় নিয়ে বহু কাহিনি বা কিংবদন্তির সৃষ্টি হয়েছিল। বাংলার শাড়ির খ্যাতিও বহুকালের- সিল্ক, জামদানি, টাঙ্গাইল, মসলিন, গরদ ইত্যাদি এখনও সুপরিচিত। সুলতানি আমল থেকে বাংলার স্থাপত্যশিল্পে ইরানি প্রভাব পড়তে শুরু করে। গম্বুজ ও খিলানসহ মসজিদ তাে নির্মিত হয়েছেই, অনেক দপ্তর ও বাড়িঘরও তৈরি হয়েছে এই রীতিতে। ছােট সােনা মসজিদ, নবাব কাটরা, ঢাকার লালবাগের কুঠি এ সময়ের স্থাপত্য নিদর্শন।। বাংলার নকশিকাঁথার কথা না বললেই নয়। গ্রামীণ মহিলারা ঘরে ঘরে কাঁথা সেলাই করে তাতে আশ্চর্য নিপুণতায় গল্পকাহিনি ও ছবি ফুটিয়ে তুলেছেন। এখনও গ্রামীণ সমাজের দরিদ্র নারীরা এই শিল্পকর্মটি টিকিয়ে রেখেছেন।

এছাড়া কাঠের কাজ বা কারুশিল্প, শঙ্খের কাজ, বাঁশ-বেত ও শশালার কাজেও বাংলার মানুষ যেমন দক্ষতা দেখিয়েছেন তেমনি তাদের সৃজনশীল মনের প্রকাশ ঘটিয়েছেন।

সাহিত্য
বাঙালির প্রথম যে সাহিত্যকর্মের সন্ধান পাওয়া যায় তা চর্যাপদ নামে পরিচিত। পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী প্রথম নেপালের রাজ দরবার থেকে এগুলাে আবিষ্কার করেন। পরে ভাষাবিদ ড. | মুহম্মদ শহীদুল্লাহ চর্যাপদের কাল নির্ণয় করেন। তিনি গবেষণা করে জানান প্রায় বারশাে বছর আগে বৌদ্ধ সাধকরা এগুলাে লিখেছেন। এখন হয়ত আমাদের পক্ষে এগুলাে বােঝা কঠিন হবে। তাছাড়া শাব্দিক অর্থ ছাড়াও এগুলাের ভাবার্থও বুঝতে হয়। এগুলােই হলাে আদি বাংলা সাহিত্যের নমুনা। চর্যাগীতির বিখ্যাত রচয়িতাদের মধ্যে ছিলেন লুইপা এবং কাহ্নপা প্রমুখ। আমরা নিচে চর্যাপদের একটি নমুনা ও তার অনুবাদের সঙ্গে পরিচিত হবো।
লুই পা লিখেছেন,
ক আ তরুবর পাঞ্চ বি ডাল।
চঞ্চল চীএ পইঠা কাল ।
বাংলায় এর শাব্দিক অর্থ হলাে,
শ্রেষ্ঠ তরু এই শরীর, পাঁচটি তার ডাল। চঞ্চল চিত্তে কাল (ধ্বংসের প্রতীক) প্রবেশ করে । এর ভাবার্থ হলাে- শরীরের পাঁচটি ইন্দ্রিয় পাঁচটি ভাল স্বরূপ। এই পঞ্চেন্দ্রিয় দিয়ে বাইরের জগতের সঙ্গে জানাশােনা চলে । এতে বেশি আকৃষ্ট হলে রঙ জগতকেই মানুষ চরম ও পুরম, জ্ঞান করে ক্ষতির সম্মুখীন হয়।
সুলতানি আমলে ছেতনের বৈষ্ণব ভাবধারার প্রভাবে বাংলায় কীর্তন গান শচনার জোয়ার আসে। শ্রীক ও বাধার কাহিনি নিয়ে এসব আবেগপূর্ণ গান রচিত হয়েছে। এগুলাে বৈষ্ণব লুনাবলী নামে পরিচিতি। বৈষ্ণব সময়বাবস্থায় হিন্দু-মুসলমানে এতই মনি ভাব ছিল যে অনেক মসলমান করি। পদাবলী রচনা করেছেন।

দেশীয় দেৰদেবিকে নিয়েও নানা কাব্যকাহিনি রচিত হয়েছে এক সময়। এগুলাে মঙ্গলকাব্য নামে পরিচিত। মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গল, ঘনরামের ধর্মমঙ্গল, বিজয়গুপ্তের মনসামঙ্গল এক্ষেত্রে বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে। এছাড়া ভারতচন্দ্রের অন্নদামঙ্গলে সেকালের বাংলার সমাজচিত্র পাওয়া যায়। মুসলমান সমাজে পুঁথি সাহিত্যের ব্যাপক কদর ছিল। পারস্য থেকে পাওয়া নানা কল্পকাহিনি এবং রােমান্টিক আখ্যান নিয়ে এগুলাে রচিত হতাে। সেকালে বাড়ি বাড়ি পুঁথি পাঠের আসর বসত, আবার পুঁথি নকল করে সংরক্ষণ করা হতাে। ইউসুফ-জুলেখা, লায়লি-মজনু, সয়ফুল মুলক বদিউজ্জামাল, জঙ্গনামা ইত্যাদি বিখ্যাত সৰ পুথির নাম। আলাওল রচিত পঞ্জাবতী বাংলা সাহিত্যের। ইতিহাসে বিশেষভাবে আলােচিত। ইংরেজ আমলে উনিশ শতকে অামাদের দেশে বাংলা গদ্যের সূচনা হয়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ভিত গড়েছেন, বঙ্কিমচন্দ্র ও সমসাময়িক সাহিত্যিক যার উপর সৌধ তুলেছেন আর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাকে শােভন ও সুন্দর করে পূর্ণতা দিয়েছেন। কাজী নজরুল ইসলাম মাইকেল মধুসূদন দত্ত, মীর মশাররফ হােসেন, দীনবন্ধু মিত্র প্রমুখ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের বিকাশে ভূমিকা রেখেছেন।

 

চলো এবার ঝটপট এই সহজ কুইজটি দিয়ে আসা যাক!