অষ্টম শ্রেণি: তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির গুরুত্ব

Importance of ICT

রাজীব তাঁর বড় ভাইকে কম্পিউটারে অ্যাসাইনমেন্টের কাজ করতে দেখে চিন্তা করলো, আমাদের প্রতিদিনের জীবনে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি কতরকমভাবেই না ব্যবহৃত হয়। যে কোনো জায়গায় যোগাযোগ করতে, যে কোনো চিকিৎসা সেবায়, গবেষণায় সব কাজেই তো রয়েছে এর ব্যবহার। এগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জানার জন্য রাজীব ঢুঁ মারলো 10 Minute School এর JSC ICT SmartBook সেকশনে। চলো বন্ধুরা, আমরাও বিস্তারিত জেনে আসি এগুলো নিয়ে।

কর্মসৃজন ও কর্মপ্রাপ্তিতে

বাঙালি শিক্ষাবিদ ও বর্তমানে আমেরিকার ম্যাসাচুস্টেস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (MIT) অধ্যাপক ড. ইকবাল কাদির এর মতে “সংযুক্তিই উৎপাদনশীলতা” অর্থাৎ প্রযুক্তিতে জনগণের সংযুক্তি বাড়লে তাদের উৎপাদনশীলতা বাড়ে। ফলে তৈরী হয় নতুন নতুন কর্মসংস্থান। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে একজন কর্মী অনেক বেশি দক্ষ হয়ে ওঠে। ফলে, অনেক প্রতিষ্ঠানই সল্প কর্মী দিয়ে বেশি কাজ করিয়ে নিতে পারে। চলো তাহলে দেখে আসা যাক, কীভাবে তা সম্ভব হয়।

  • বিভিন্ন কারখানার বিপজ্জনক কাজগুলো মানুষের পরিবর্তে রোবট কিংবা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন করা যেতে পারে।
  • কর্মস্থলে কর্মীদের উপস্থিতির সময়কাল, তাদের বেতন-ভাতাদি ইত্যাদি হিসাব করার জন্য বেশ কিছু কর্মীর প্রয়োজন হয়। কিন্তু স্বয়ংক্রিয় উপস্থিতি যন্ত্র, বেতন-ভাতাদি হিসাবের সফটয়্যার ইত্যাদির ব্যবহারের মাধ্যমে এ সকল কাজ সম্পন্ন করা যায়।
  • বিভিন্ন গুদামে মালামাল সুসজ্জিত করার কাজ স্বয়ংক্রিয় ভাবে করা যায়।
  • টেলিফোন এক্সচেঞ্জ কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল ব্যবস্থার কারণে পৃথক জনবলের প্রয়োজন হয় না।
  • স্বয়ংক্রিয় ইন্টারেকটিভ ভয়েস প্রযুক্তি ব্যবহার করে দিন-রাত যেকোন সময় গ্রাহকের নির্দিষ্ট প্রশ্নের জবাব দেওয়া যায়।
  • ব্যাংকের এটিএম এর মাধ্যমে যেকোন সময় নগদ অর্থ তোলা যায়।

অন্যদিকে আইসিটির কারণে অনেক কাজের ধরন প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে-

  • পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকার জন্য নিজেকে ক্রমাগত দক্ষ করে তুলতে হয়। ফলে দক্ষতা উন্নয়নের কর্মসূচিতে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন সাধিত হচ্ছে।
  • কম্পিউটারের সাহায্যে অনেক ধরনের কাজ ঘরে বসেই করা সম্ভব হচ্ছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে পূর্বে বিশেষ দক্ষতা না থাকলে যে কাজ সম্পন্ন করা যেত না, এরুপ অনেক কাজ কম্পিউটারের সহায়তায় সহজে সম্পন্ন করা যাচ্ছে। যেমন: ফটোগ্রাফি বা ভিডিও এডিটিং।
  • অনেকে ঘরে বসে কাজ করছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠানই এখন ভার্চুয়াল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এ সকল প্রতিষ্ঠানে সহায়ক কর্মীর সংখ্যা যেমন কমেছে, তেমনি তাদের কাজের ধরনও পাল্টে গেছে।
  • স্বয়ংক্রিয় ভাবে মনিটরিং করা সম্ভব হওয়াতে কর্মীদের কাজে ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে।

বাংলাদেশে মোবাইল ফোনের বিস্তার ও নতুন কর্মসৃজন

জাতীয় রাজস্ব আয় বৃদ্ধি ছাড়াও কেবল মোবাইল ফোনের বিকাশের ফলে বাংলাদেশে অনেক সেক্টরে বিপুল পরিমাণ নতুন কর্মের সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো-


ঘরে বসে আয়ের সুযোগ

ইন্টারনেটের বিকাশের ফলে বর্তমানে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর জন্য ঘরে বসে অন্য দেশের কাজ করে দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের নিজেদের অনেক কাজ অন্য দেশের কর্মীর মাধ্যমে সম্পন্ন করে থাকে। এটিকে বলা হয় আউটসোর্সিং।

ইন্টারনেট সংযোগ থাকলে যে কেউ এ ধরনের কাজের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। এক্ষেত্রে কাজের পাশাপাশি ভাষা দক্ষতাও সমানভাবে প্রয়োজন হয়। এই সকল কাজ ইন্টারনেটে অনেক সাইটে পাওয়া যায়। বাংলাদেশের মুক্ত পেশাজীবীগণ এই সকল সাইট ব্যবহার করে আত্মকর্মসংস্থানে সক্ষম হচ্ছে। আউটসোর্সিং এর মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগও ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

যোগাযোগ

১৯৭১ সালের ১৫ই আগষ্ট দিবাগত রাত ২টা ১৫ মিনিটে প্রচন্ড বিস্ফোরণের শব্দে পুরো চট্টগ্রাম বন্দর কেঁপে উঠেছিল। সেই রাতে মুক্তিযোদ্ধা নৌ কমান্ডোদের একটি দল পাকিস্তানি সেনাবাহীর সতর্ক পাহারা ফাঁকি দিয়ে বন্দরের অসংখ্য জাহজে মাইন লাগিয়ে ডুবিয়ে দিয়েছিলেন। জাহাজগুলো ডুবে বন্দরে ঢোকার রাস্তা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাই তখন বিদেশি কোনো জাহাজই আর আসতে পারছিল না। মুক্তিযুদ্ধের এটি ছিল অনেক বীরত্বপূর্ণ একটি অভিযান।

কিন্তু তোমরা জানো, নৌ কমান্ডোর এই দুঃসাহসিক দলটিকে সে অভিযানে দিনক্ষণটি কেমন করে জানানো হয়েছিল? তাদের সাথে যেহেতু যোগাযোগের কোনো উপায়ই ছিলো না,তাই মুক্তিযোদ্ধাদের অনুরোধে আকাশবাণী রেডিও থেকে ১৩ই আগষ্ট বেজে উঠে বিখ্যাত গায়ক পঙ্কজ মল্লিকের গাওয়া একটি গান “আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলাম গান”! সেই গানটি ছিল একটি সংকেত, সেটি শুনে নৌ কমান্ডোরা বুঝতে পেরেছিল তাদের এখন আঘাত হানার সময় এসেছে।

এতদিন পরে তোমাদের কাছে এ ঘটনাটি নিশ্চয়ই অবিশ্বাস্য মনে হয়। এখন আমরা কত সহজেই না একজন আরেকজনের সাথে যোগাযোগ করতে পারি। আর আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা শুধু যোগাযোগ করার জন্য কতই না কষ্ট করেছিলেন।

যোগাযোগ করার পদ্ধতিকে মোটামুটি দুই ভাগে ভাগ করা যায়- একমুখী ও দ্বিমুখী।

যখন একজন ব্যক্তি বা একটি প্রতিষ্ঠান অনেকের সাথে যোগাযোগ করে সে পদ্ধতিটি হলো একমুখী

রেডিও টেলিভিশন তার সবচেয়ে সহজ উদাহরণ-যেখানে রেডিও বা টিভি স্টেশন থেকে সবার জন্য অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়। যাদের জন্য অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়, তারা কিন্তু পাল্টা যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া হয়- যেখানে লক্ষ লক্ষ শ্রোতাদের মধ্যে দু-একজন যোগাযোগ করতে পারে, কাজেই এটি আসলে একমুখী ব্রডকাস্টই থেকে যায়। তথ্যপ্রযুক্তির যুগান্তকারী উন্নয়নের জন্য আজকাল রেডিও বা টেলিভিশনের অনুষ্ঠানেও একটা বিশাল পরিবর্তন হয়েছে। টেলিভিশনের দু-একটি চ্যানেলের পরিবর্তে এখন শত শত চ্যানেল দেখা সম্ভব। বাংলাদেশে বসেই একজন সারা পৃথিবীর অনেক টেরিভিশন চ্যানেল দেখতে পারে। শুধু যে আমরা অসংখ্য চ্যানেল দেখতে পারি তা নয় – সারা পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে ঘটে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো কিছুক্ষণের মধ্যে চ্যানেলগুলো দেখাতে পারে।

ব্রডকাস্ট পদ্ধতির যোগাযোগের আরও উদাহরণ হচ্ছে খবরের কাগজ এবং ম্যাগাজিন। যতই দিন যাচ্ছে ততই অনলাইন পত্রিকা বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা দেখার জন্য শুধু যে কম্পিউটার লাগে তা নয়, স্মার্ট মোবাইল ফোনেও দেখা সম্ভব।

দ্বিমুখী যোগাযোগের সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হচ্ছে টেলিফোন। টেলিফোনে দুজন একই সাথে পরস্পরের সাথে যোগাযোগ করতে পারে। মাত্র একযুগ আগেও বাংলাদেশে শুধু সচ্ছল ও ক্ষমতাবান মানুষদের কাছে টেলিফোন ছিল। এখন এদেশে যেকোনো মানুষ মোবাইল ফোনে একে অন্যের সাথে যোগাযোগ করতে পারে এবং এটি সম্ভব হয়েছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নয়নের জন্য।

বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠী দেশের বাইরে কাজ করে আমাদের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে। এখন তাদের আত্মীয়স্বজন ইচ্ছে করলেই তাদের সাথে যোগাযোগ করে কথা শুনতে পারে কিংবা দেখতে পারে। আর এখন এ কাজটি করা সম্ভব হচ্ছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে।


আরো বিভিন্ন ক্ষেত্রে আইসিটির গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে চলে যাও পরবর্তী পৃষ্ঠায়।