পূর্ব বাংলার আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদেও উত্থান(১৯৪৭-১৯৭০)

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট রাতে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হয়। জন্ম নেয় ভারত এবং পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র। শুরু থেকেই পাকিস্তানের শাসনভার পশ্চিম পাকিস্তানের ধনিক গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রিভূত হওয়ায় পূর্ব বাংলার সংস্কৃতি, অর্থনীতি,রাজনীতি ও সমাজ ব্যবস্থাকে পাবিস্তানের শাসকগোষ্ঠী নিজেদের করায়ত্ত করতে শুরু করে। এর বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার জনগণ প্রতিবাদ ও আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তোলে। মাতৃভাষা বাংলাকে রক্ষা করার জন্যে ভাষা আন্দোলন শুরু হয় তার পর নানামূখী আন্দোলন মাধ্যমে সংগ্রাম এগিয়ে যেতে থাকে এবং নয়মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয় স্বাধীন সার্বভৌম আমাদের প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশ। এ অধ্যায়ে আমরা পূর্ব বাংলার আন্দোলন ও জাতীয়বাদের উত্থান সম্পর্কে জানতে পারবে।

 

বাঙালি জাতীয়তাবাদে ও বিকাশে ভাষা আন্দোলন

এ সব হত্যা কান্ড পূর্ববাংলার জনগণের মনের উপর বড় ধরনের প্রতিক্রয়া সৃষ্টিকরে।আব্দুল গাফফার চৌধুরী রচনা করেন, আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো ২১ শে ফেব্রুয়ারী, আমি কি ভুলিতে পারি’ সঙগীতশিল্পী আব্দুল লতিফ রচনা ও সুর করেন ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়।এ ছাড়া তোরা ঢাকা শহর রক্তে ভাসাইলির মতো সঙগীত। ড. মুনীর চোধুরী জেলে বসে রচনা করেন কবর নাটক, জহির রায়হান রচনা করেন আরেক ফাল্গুন উপন্যাসটি। ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র কওে পূর্ব বাংলায় শিল্প,সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চায় পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরোদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় উঠে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারা একটি গুরুত্বপূর্ন স্থান দখল করে। ১৯৪৭ সালে সুচিত রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সালে প্রতিবাদ ও রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে রুপ লাভ করে। ফলে পাকিস্তান সরকার বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংবিধানে বাংলা ভাষাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। নিজের ইতিহাস ,ঐতিহ্য,ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে পূর্ব বাংলার বাঙালি এবং অন্যান্য জনগোষ্ঠীর মাথা উচু কওে দাড়ানোর সাহস ও আত্মপ্রত্যয় খুজে পায়। ভাষা আন্দোলনে পরবর্তীকালে সকল রাজনৈতিক আন্দোলনের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। এ আন্দোলন এ দেশের মানুষকে তাদেও অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। এ আন্দোলন বাঙালিদের মধ্যে ঐক্য ও স্বাধীনতার চেতনা জাগিয়ে তোলে। পাকিস্তানি শাসনপর্বে এটি তাদেও জাতীয় মুক্তির প্রথম আন্দোরন।

জাতীয়তাবাদের উন্মোষ

বাঙালির জাতীয়তাবাদেও বিকাশে ভাষা আন্দোলন সকলকে ঐক্যবদ্ধ করে। পাকিস্তানের প্রতি আগে যে মোহ ছিল তা দ্রæত কেটে যেতে থাকে। নিজস্ব জাতিসত্তা সৃষ্টিতে ভাষা ও সংস্কৃতির সম্পর্ক এবং গুরুত্ব পূর্ব বাংলার মানুষের কাছে অধিকতর স্পষ্ট হয়ে উঠে। বাঙালি হিসেবে নিজেদেও আতœপরিচয় রাজনীতি, অর্থনীতি,শিক্ষা, সংস্কৃতি গড়ে তোলার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে থাকে। ভাষাকেন্দ্রিক এই ঐক্যই জাতীয়তাবাদেও মূল ভিত্তি রচনা করে,যা পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভ‚মিকা রাখে।

 

শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস

১৯৫৩ সাল থেকে ২১ ফেব্রæয়ারি শহিদ দিবস হিসেবে দেশব্যাপী পালিত হয়ে আসছে। প্রতি বছর ২১ ফেব্রæয়ারি শহিদ মিনারে নগ্নপায়ে হেঁটে ফুল অর্পণ করে আমরা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। বাঙালি জাতির কাছে দিনটি একটি শোকের চেতনায় উজ্জীবিত হওয়ার দিন। কানাডা প্রবাসী কয়েকজন বাঙালির উদ্যোগ ও বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ সরকাররের কুটনৈতিক তৎপরতার ফলে ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর জাতিসংঘের শিক্ষা,বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ইউনেস্কো বাংলাদেশের ২১ ফেব্রæয়ারির শহিদ দিবসকে‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ’ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। পৃথিবীতে ৬০০০ এর বেশি ভাষা রয়েছে। এ সব ভাষার মানুষ সেই থেকে বাংলাদেশের শহিদ দিবসের গুরুত্ব উপলব্ধি করে নিজেদের ভাষার মর্ম নতুন ভাবে বুঝতে শিখেছে। আমাদের দেশেও বাংলা ভাষার পাশাপাশি বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর ভাষা রয়েছে। আমরা । ঐসব  নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতির সংরক্ষণ এবং উন্নয়নে সচেষ্ট হব।

বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশে রাজনৈতিক আন্দোলনের ভ‚মিকা

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব বাংলার জনগন পাকিস্তা রাষ্ট্রের রাজনৈতিক চরিত্র এবং একই সঙ্গে দ্বিজাতিতত্তে¡র ভুলগুলো বুঝতে পারে। পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৬ শতাংশ বাঙালি হওয়ার পরও রাষ্ট্র পরিচালনা ,প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন,অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক  অধিকার ভোগসহ সর্বক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী কর্তৃত্ব শুরু করে। বাঙালি তথা পূর্ব বাংলার সাধারন মানুষ সর্বক্ষেত্রে বি ত হতে থাকে। তখন রাজনৈতিক দল ও নেতৃত্বের মধ্যে তিনটি ধারা লক্ষ করা যায়। এগুলো হচ্ছে:১. পাকিস্তানের প্রতি অনুগত রাজনৈতিক দল যেমন,মুসলিম লীগ ও ইসলাম নামধারী দলসমূহ জামাতে ইসলাম ও নেজামে ইসলাম।২.পূর্ব বাংলার স্বার্থ রক্ষার জন্যে সোচ্চার রাজনৈতিক দল। যেমন,আওয়ামী লীগ,ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ন্যাপ,৩.সাম্যবাদী আদর্শের রাজনৈতিক ধারা।

আওয়মী মুসলিম লীগ গঠন

মুসলিম লীগের দ্বিজাতিতাত্তি¡ক ধ্যান-ধারনা থেকে বের হয়ে অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল বাঙালি রাজনৈতিক নেতৃত্ব ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার রোজগার্ডেনে এক সম্মেলনের মাধ্যমে‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ ’গঠন করে। সভাপতির দায়িত্ব গ্রহন করেন মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী,সাধারন সম্পাদক টাঙ্গাইলের শামসুল হক এবং যুগ্ন সম্পাদক হন শেখ মুজিবর রহমান ও খন্দকার মোশতাক আহমেদ। শুরুতেই দলটি বাঙালিদের স্বার্থে একটি বিস্তৃত কর্মসূচি গ্রহন করে। এর মধ্যে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ,জনগণের সার্বভৌমত্ব,বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দান,পাট ও চা শিল্প জাতীয়করণ ,বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি ব্যবস্থা উচ্ছেদ,কৃষকদের মধ্যে ভূমি বন্টন, সমবায় ভিত্তিক চাষাবাদ ইত্যাদি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ সব দাবি উত্থাপনের কারণে দলটি দ্রæত পূর্ব বাংলার জনগণের কাছে প্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করে। মওলানা ভাসানী,শামসুল হক এবং শেখ মুজিবুর রহমানা পাকিস্তানি শাসকের রোষানলে পড়েন। শেখ মুজিবকে ১৯৪৯ সালে কারাগারে প্রেরণ করা হয়।

তিনি  ১৫৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত বন্দী জীবন কাটান। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট গঠনের মূল উদ্যোগ ছিল আওয়ামী লীগের। ১৯৫৫ সালে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক আদর্শ ধারণ করে দলের নাম ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ’ নামকরণ করা হয়। ফলে ধর্ম পরিচয় নির্বিশেষে সকল বাঙালি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহ জাতীয়তাবাদের ধারায় অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। এই সময়ে দলটি পূর্ব বাংলার জনগণের রাজনৈতিক,অর্থনৈতিকসহ সকল স্বার্থ রক্ষায় এক দিকে আন্দোলন-সংগ্রাম অব্যাহত রাখে,অন্যদিকে সংসদ ও প্রাদেশিক সরকারের সদস্যগণ সর্বত্র সোচ্চার হতে থাকেন।

যুক্তফ্রন্ট গঠন, নির্বাচন ও সরকার

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর শাসক দল মুসলিম লীগ দীর্ঘদিন নির্বাচনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকার গঠনের কোনো উদ্যোগ গ্রহন করেনি। এছাড়া প্রাদেশিক সরকার নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের টালবাহানা পূর্ব বাংলার জনগণের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠে। পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে মুসলিম লীগের শোচনীয় পরাজয় ঘটানোর লক্ষ্যে ১৯৫৩ সালের নভেম্বর আওয়মী লীগ যুক্তফ্রন্ট গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ২১ দফা প্রণয়ন শেষে ৪টি দল নিয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়। দল ৪টি হলো: আওয়ামী লীগ,কৃষক শ্রমিক পার্টি,নেজামে ইসলাম এবং গণতন্ত্রী দল। ১৯৫৪ সালের মার্চ মাসে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে জনগণ যুক্তফ্রন্টের ২১-দফাকে তাদের স্বার্থ রক্ষায় সনদ বলে বিবেচন করে। পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক পরিষদের ২৩৭ টি মুসলিম আসনের মধ্যে মুসলিম লীগ মাত্র ৯টি লাভ করে। বাকি আসন অন্যরা পায়। এই নির্বাচনে পূর্ববাংলার জনগণ পাকিস্তানের রাষ্ট্র ক্ষমতায় পশ্চিম পাকিস্তানের কর্তৃত্ব ও প্রভাব থেকে মুক্ত হওয়ার রায় প্রদান করে।পূর্ব বাংলায় বাঙালিদের শাসন দেখতে তারা যে আগ্রহী,তা প্রকাশিত হয়। যুক্তফ্রন্ট প্রাদেশিক সরকার গঠনের রায় লাভ করে। জনগণই যে ‘ সকল ক্ষমতার উৎস’-এই নির্বাচন তা প্রমাণ করে জনগণ এ নির্বাচনে মুসলিম লীগকে প্রত্যাখ্যান করে এবং পূর্ব বাংলায় মুসলিগ লীগের শাসনের অবসান ঘটায়।

১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা

  • বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা হবে।
  • বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ,সকল প্রকার মধ্যস্বত্ব ও সার্টিফিকেট প্রথা বাতিল করা হবে।
  • পাট ব্যবসাকে জাতীয়করণ,পাটের ন্যায্যমূল্য প্রদান এবং পাট কেলেঙ্কারির সাথে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।
  • সমবায় কৃষি ব্যবস্থার প্রবর্তন, কুটির ও হস্তশিল্পের উন্নতি সাধন করা হবে।
  • পূর্ব বাংলার লবণ শিল্পের সম্প্রসারণ ও লবণ কেলেঙ্কারির সাথে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।
  • বাস্তুহারাদের পুনর্বাসন করা হবে।
  • সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন,বন্যানিয়ন্ত্রণ ও দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধের ব্যবস্থা করা হবে।
  • পূর্ব বাংলাকে শিল্পায়িত ও শ্রমিকের ন্যায় সঙ্গত অধিকার রক্ষা করা হবে।
  • অবৈতনিক বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তন করা হবে। শিক্ষকদের ন্যায় সঙ্গত বেতন ও ভাতার ব্যবস্থা করা হবে।
  • বাংলাকে শিক্ষার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হবে।
  • ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন ও সকল প্রকার কালাকানুন বাতিল করা হবে।
  • প্রশাসনিক ব্যয় সংকোচন,উচ্চ ও নিম্ন বেতনভুক্ত কর্মচারীদের মধ্যে বেতন বৈষম্য হ্রাস করা হবে।
  • সকল প্রকার দুর্নীতি নির্মূল করা হবে।
  • রাজবন্দিদের মুক্তিদান,বাকস্বাধীনতা ,সভাসমিতি ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে।
  • শাসন বিভাগ হতে বিচার বিভাগকে প্রথক করা হবে।
  • ‘বর্ধমান হাউস’কে আপাতত ছাত্রাবাস ও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের গবেষণাগার করা হবে।
  • বাংলা ভাষার শহিদদের স্মরণে শহিদ মিনার নির্মাণ করা হবে।
  • একুশে ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস ও সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করা হবে।
  • ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী পূর্ব বাংলার পূর্ণ বাংলার পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান করা হবে।
  • নিয়মিত ও অবাধ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে।
  • পরপর তিনটি উপনির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট পরজিত হলে মন্ত্রিসভা স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করবে।

যুক্তফ্রন্ট সরকার

১৯৫৪ সালের ৩ এপ্রিল যুক্তফ্রন্টভুক্ত কৃষক-শ্রমিক পার্টির নেতা  এ কে ফজলুল হক মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। যুক্তফ্রন্ট সরকার মাত্র ৫৬ দিন ক্ষমতায় ছিল। পাকিস্তান সরকার পূর্ব বাংলার যুক্তফ্রন্ট সরকারকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে পারেনি।তারা ষড়যন্ত্রের পথ বেছে নেয়। আদমজি পাটকল ও কর্ণফুলী কাগজ কলে বাঙালি -অবাঙালি দাঙ্গাকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়ে পাকিস্তানের গভর্ণনর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ ১৯৫৪ সালের ৩০ মে যুক্তফ্রন্ট সরকারকে বরখাস্ত করে। উল্লেখ্য পাকিস্তান সরকারের ইন্ধনে ঐ দাঙ্গা হয়েছিল। শেরে বাংলাকে গৃহবন্দি করা হয়,শেখ মুজিবসহ তিন হাজার নেতা কর্মীকে  গ্রেফতার করা হয়।এর মাধ্যমে পূর্ব বাংলার প্রতি পাকিস্তান শাসক গোষ্ঠীর চরম বৈরী মনোভাব প্রকাশ পায়। পূর্ব- বাংলায় পাকিস্তানের অরাজক শাসনের পর্ব শুরু হয়। কেন্দ্র এবং প্রদেশে ঘন ঘন সরকার পরিবর্তন হতে থাকে। অবশেষে ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি করে সংকট ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। গণতন্ত্র থেকে বিচ্যুত হয়ে সামরিক শাসন জারি করে পাকিস্তান রক্ষার শেষ চেষ্টা করা হয়।

সামরিক শাসন ও পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহ

পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে নস্যাৎ করার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানভিত্তিক সামরিক -বেসামরিক শাসক গোষ্ঠী তৎপরতা চালিয়ে যেতে থাকে। ফলে সংসদ ও সরকার কার্যকর ভ‚মিকক রাখতে পারেনি। কেন্দ্রে এবং প্রদেশে ঘন ঘন সরকারের পরিবর্তন ঘটতে থাকে। ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠী ক্ষমতা দখলের সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক পরিষদের পরস্পর বিরোধী এমএলএদের মধ্যে মারামারির মতো এক অপ্রীতিকর ঘটনায় ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী গুরুতর আহত হয়ে পরবর্তীকালে হাসপাতালে মারা যান। এরই সুযোগ নিয়ে ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মীর্জা সামরিক আইন জারি করেন। তিনি দায়িত্ব নিয়ে যে সব পদক্ষেপ গ্রহন করেন তা হচ্ছে :১. ১৯৫৬ সালের সংবিধান বাতিল,২. কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ ভেঙ্গে দেওয়া,৩. রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা,৪. শেখ মুজিবসহ বেশ ক‘জন নেতাকে জেলে প্রেরণ ও ৫, সকল মৌলিক অধিকার কেড়ে নেয়।

আইয়ুব খানের ক্ষমতা দখল

১৯৫৮ সালের ২৭ অক্টোবর জেনারেল আইয়ুব খান ইস্কান্দার মীর্জাকে উৎখাত ও দেশত্যাগে বাধ্য করে ক্ষমতা দখল এবং নিজেকে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পদে অধিষ্ঠিত করেন। তিনি উক্ত পদে বসে যে সব পদক্ষেপ নেন তা হলো: ১.নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ঘোষণা, ২. পূর্ব ঘোষিত ১৯৫৯ সালে অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বচান স্থগিত করা  ৩. দুর্নীতি ও চোরাচালানি দূর করার অঙ্গীকার ব্যক্ত ও ৪. রাজনৈতিক দলের উপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা।

সামরিক শাসনকে দীর্ঘস্থায়ী করার লক্ষ্যে আইয়ুব খান মৌলিক গণতন্ত্র নামে একটি ব্যবস্থা চালু করেন। এই ব্যবস্থায় পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে মোট ৮০ হাজার নির্বাচিত ইউনিয়ন কাউন্সিল সদস্য নিয়ে নির্বাচকমন্ডলী গঠন হবে। তাদের ভোটেই রাষ্ট্রপতি,জাতীয় পরিষদ ও প্রাদেশিক  পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার বিধান রাখা হয়। এটি ছিল পরোক্ষ নির্বাচন পদ্ধতি। ১৯৬৫ সালে ৮০ হাজার মেম্বারের ভোটে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। সামরিক শাসনের ফলে সকল ক্ষমতা কেন্দ্রীভ‚ত হয় পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের হাতে। পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি সকল ক্ষেত্রে বৈষম্য চরম আকার ধারণ করতে থাকে।

পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি বৈষম্যসমূহ

পাকিস্তান সৃষ্টির আগে পূর্ব বাংলা অর্থনৈতিক ,সামাজিক ,শিক্ষাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানের চাইতে অগ্রসর ছিল। কিন্তু ১৯৪৭ সালে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসন-শোষণ প্রতিষ্ঠার ফলে পূর্ব পাকিস্তান দ্রুত পিছিয়ে যেতে থাকে । বৃদ্ধি পেতে থাকে দুই অ লের মধ্যকার বৈষম্য।

অর্থনৈতিক বৈষম্য:

পাকিস্তান সরকারের বৈষম্যমূলক নীতির কারণে পূর্ব বাংলার চাইতে পশ্চিম পাকিস্তান অনেক বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। যেমন ১৯৫৫-৫৬ সাল থেকে ১৯৫৯-৬০ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান লাভ করেছিল মোট বাজেট বরাদ্দের ১১৩ কোটি ৩ লাভ ৮০ হাজার টাকা ,অপরদিকে পশ্চিম পাকিস্তান তখন পেয়েছিল ৫০০ কোটি টাকা। একইভাবে ১৯৬০-৬১ থেকে ১৯৬৪-৬৫ সাল পর্যন্ত পূর্ব  পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ ছিল ৬,৪৮০ মিলিয়ন টাকা আর পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষেত্রে তা ছিল ২২,২৩০ মিলিয়ন টাকা। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য,শিল্প উৎপাদন,কৃষিসহ অর্থনীতির সকল ক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তানের চাইতে কয়েকগুণ পিছিয়ে পড়ে।

প্রশাসনিক বৈষম্য:

পাকিস্তানের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় পূর্ব পাকিস্তানের ভ‚মিকা অতি নগণ্য। প্রশাসনিক ক্ষেত্রে বৈষম্য ছিল ব্যাপক। ১৯৬৬ সালে পাকিস্তান প্রশাসনের চিত্র ছিল নিম্নরুপ।

সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন:

আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ১৯৬১ সালেই পূর্ব পাকিস্তানে আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৬২ সালের জানুয়ারি মাসে বাঙালিদের প্রিয় নেতা  ও পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহিদ সোহরাওয়র্দীকে গ্রেপ্তার করা হলে আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠে। এর পর ফেব্রুয়ারি মাসে শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করা হলে রাজবন্দীদের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন আরও বেগবান হয়। ১৯৬২ সালে আইয়ুবের প্রস্তাবিত  শাসনতন্ত্রের বিরুদ্ধে ছাত্র সামজ প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠে। ঐ সময় ছাত্র সমাজ ১৫ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। শিক্ষানীতি বিষয় আন্দোলনে বিভিন্ন পেশাজীবিরাও অংশগ্রহণ করে।এই সঙ্গে সাংবিধানিক শাসন পুনপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট (এনডিএফ) গঠিত হয়ভ এই সংগঠন আইয়ুব খানের সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলে ১৯৬৫ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন উপলক্ষে রাজনৈতিক দলগুলো সামরিক শাসন বিরোধী বক্তব্য নিয়ে জনগণের  কাছে যাওয়ার সুযোগ পায়।

নির্বাচনের গুরুত্ব

১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতীয় এবং প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। ফলে ৬ দফা ও ১১ দফার  প্রতি জনগণের অকুন্ঠ সমর্থনের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়। বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক বিজয় ঘটে। অন্যদিকে ,পাকিস্তানের সরকার ও স্বার্থন্বেষী মহলের জন্য এটি ছিল বিরাট পরাজয়। তারা বাঙালির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিরোধিতা এবং ষড়যন্ত্র করতে থাকে। পূবৃ পাকিস্তানের জনগণ পশ্চিম পাকিস্তানের কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে অবস্থান গ্রহণ করে। ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের পিছনে এই নির্বাচনের অপরিসীম গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে উঠে। এই নির্বাচন বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক অগ্রযাত্রাকে মুক্তিযুদ্ধের চরিত্র দানে বিশাল ভ‚মিকা রাখে। পরিণতিতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে।

চলো এবার ঝটপট এই সহজ কুইজটি দিয়ে ফেলা যাক!