এসএসসি: বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়

বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও নির্বাচন

Supported by Matador Stationary

সাকিব বয়সে অনেক ছোট। তার বড় বোনকে গণতন্ত্র নিয়ে পড়তে শুনে তার বাবার কাছে বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন করে। তাই, সাকিবের বাবা তাদের দুজন কে ডেকে বলে-
বর্তমান বিশ্বের সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য সরকার ব্যবস্থা হলো গনতন্ত্র। বিশ্বের প্রায় প্রত্যেকটি দেশেই গণতন্ত্র ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। সাধারণভাবে গণতন্ত্র বলতে বোঝায়,যে শাসন ব্যবস্থায় শাসন ক্ষমতা মুষ্টিমেয় লোকের হাতে না থেকে রাষ্ট্রের সব জনসাধারণের উপর ন্যস্ত থাকে এবং জনগণই তাদের সরকারকে গঠন করে। গণতন্ত্র হলো এমন এক রাজনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে মেয়াদ শেষে সরকার পরিবর্তনের লক্ষ্যে সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যবস্থা ও প্রাপ্ত বয়স্কদের সর্বজনীন ভোটাধিকার,এশাধিক রাজনৈতিক দল এবং রাজনৈতিক কর্মকান্ডে জনগণের অংশগ্রহণ,জনগণের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে শাসনকার্য পরিচালনা এবং রাষ্ট্রের কার্যক্রম জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে তাদের স্বাধীনতা সংরক্ষণ ও কল্যাণ বৃদ্ধির ব্যবস্থা রয়েছে।

 

গণতন্ত্রের ধারণা:
আমেরিকার বিখ্যাত প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন গণতন্ত্রের সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে“ গণতন্ত্র হচ্ছে জনগণের ,জনগণের জন্য ও জনগণ দ্বারা নির্বাচিত সরকার ব্যবস্থা।” অধ্যাপক গেটেলের মতে,“ যে শাসন ব্যবস্থায় জনগণ সার্বভৌম ক্ষমতার প্রয়োগে অংশ নেয়ার অধিকারী তাই গণতন্ত্র”। সাধারণ অর্থে,গণতন্ত্র হচেছ মূলত সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বার্থে গঠিত ও পরিচালিত সরকার। এর অর্থ এই নয় যে,গণতন্ত্র সংখ্যালঘুর মতামত ও স্বার্থকে উপেক্ষা করবে,বরং গণতন্ত্রের আইনের দৃষ্টিতে সকলেই সমান। সুতরাং গণতন্ত্র বিশ শতকের একটি জনপ্রিয় ধারণা ,যা বর্তমানে সরকার পরিচালনার সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ কারণেই গণতন্ত্র অধ্যয়নযোগ্য বিষয়াবলীর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ।

গণতন্ত্র সাধারণত দুটি পদ্ধতিতে কার্যকর হয়।

 

গণতন্ত্রের দোষগুণ

বাংলাদেশের গণতন্ত্র

১৯৭১ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর পাকিস্তানে পার্লামেন্টারী শাসন ব্যবস্থা গৃহীত হয় । বাংলাদেশ তখন পূর্ব পাকিস্তান নামে পাকিস্তানের অংশ ছিল। পাকিস্তানি গণপরিষদে দেশের সংবিধান প্রণয়ন করতে ৯ বছর সময় লাগে। এ সময় পার্লামেন্টারী শাসনের নামে বস্তুত গভর্নর জেনারেল এবং আমলারাই দেশ শাসন করত। প্রধানমন্ত্রী অথবা আইনসভার মতামতের তোয়াক্কা না করে গভর্নর জেনারেল নিজের পছন্দ অনুযায়ী মন্ত্রিসভা গঠন করতেন। সংবিধান প্রণয়নের আড়াই বছরের মাথায় জেনারেল আইয়ুব খান ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি করেন। এর মধ্যে দিয়ে পাকিস্তানের ভঙ্গুর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবসান ঘটে।
কিন্তু পরবর্তীতে রাজনৈতিক আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে পার্লামেন্টারী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবি সোচ্চার হয়েছে। অবিভক্ত পাকিস্তান রাষ্ট্রে প্রথম জাতীয় পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭০ সালে এবং সেটিই ছিল শেষ নির্বাচন। নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করে। কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক সরকার বঙ্গবন্ধুর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে নিরস্ত্র বাঙালিদের উপর আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এর চূড়ান্ত পরিণতি পাকিস্তানের ভাঙ্গন। ১৯৭১ সালে ৯ মাস ব্যাপী রক্তক্ষয়ী মুুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়।

স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশে তিনটি রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এসেছে। এগুলো হলো:আওয়ামী লীগ. বি.এন.পি ও জাতীয় পার্টি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি সময় কেটেছে সেনা শাসনের অধীনে। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ প্রথম সরকার গঠন করে। পাকিস্তানি অপশাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে বাঙালিরা তাদের দীর্ঘ সংগ্রামের মূর্ত প্রতীক বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই গণতন্ত্র লাভ করেছিল। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন,অবকাঠামো নির্মাণ দেশের বিভিন্ন শিল্পের পুনরুজ্জীবিতকরণ এবং জাতীয়করণ প্রশাসনিক ব্যবস্থার উন্নয়নসহ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে আওয়ামী লীগ সরকার। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করে, যেমন- পার্লামেন্টারি পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থার প্রবর্তন, স্বাধীনতার ১০ মাসের মধ্যে বাংলাদেশের জন্য একটি গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল সংবিধান প্রণয়ন (নভেম্বর ,১৯৭২ ) , নতুন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্য ১৪০ টি দেশের স্বীকৃতি লাভ ও জাতিসংঘ এবং ওধাইসিসহ আন্তর্জাতিক সংস্থা ও সংগঠনের সদস্যপদ প্রাপ্তি এবং নতুন সংবিধান অনুসারে ১৯৭৩ সালের ৭ই মার্চ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান ইত্যাদি।

১৯৭৫ এর ১৫ ই আগষ্ট একদল বিপথগামী সেনা সদস্যদের হাতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু, তাঁর পরিবারের উপস্থিত সকল সদস্য, জাতীয় চার নেতা এদের নির্মম হত্যাকান্ডের মাধ্যমে শুরু হয় বাংলাদেশের উল্টোপথে যাত্রা, যা নব্বই এর গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। ৭৫ -পরবর্তী ১৫ বছর দেশ ছিল সেনা শাসনের অধীনে। এ সময় জনগণের ভোটধিকার হরণ করা হয়। বিভিন্ন দল ভেঙ্গে বা নেতাদের ভাগিয়ে এনে সেনা-সমর্থক দল গঠন করা হয়। নির্বাচনের নামে ক্ষমতাসীনদের কর্তৃক ভোটকেন্দ্র দখল করা হয়। তথাকথিত নির্বাচনের নামে সিট ভাগাভাগি হয়। নির্বাচন কমিশন বলতে গেলে অকার্যকর ও অসহায় হয়ে পড়ে। নব্বই এর গণ অভ্যুত্থান এবং বিচারপতি সাহবুদ্দিন আহাম্মদের নেতৃত্বে তত্ত¡াবধায়ক সরকার গঠন ও ২৭ ফেব্রæয়ারি , ১৯৯১ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিবর্তন এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়ের সূচনা করে।

১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করে বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদী (বি.এন.পি ) সরকার গঠন করে। নির্বাচনের পর পর জাতীয় সংসদে সকল দলের ঐকমেত্যের ভিত্তিতে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৯১ সালে ৬ ই আগষ্ট মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকার ব্যবস্থা পুর্নপ্রবর্তিত হয়। অবশ্য সরকারি ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে এরূপ পারস্পরিক সমঝোতা দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়নি। ঢাকার মিরপুর (১৯৯৩) এবং মাগুরার (১৯৯৪) উপনির্বচনকে কেন্দ্র করে অচিরেই তাদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয় এবং এক ধরনের আশঙ্কা তৈরি হয় যে, দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনই অবাধ ও সুষ্ঠু হবে না। অতএব সরকারের কাছে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তত্ত¡াবধায়ক সরকারের সদস্যরা সংসদ অধিবেশন বর্জন করেন। এক পর্যায়ে ১৪৭ জন সদস্য জাতীয় সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন। আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াত ইসলামি নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত¡বধায়ক সরকার গঠনের জন্য রাজপথে আন্দোলন শুরু করে এবং ক্রমাগত হরতাল আহবান করে। বি.এন. পি সরকার এই দাবি উপেক্ষা করে ১৫ ই ফেব্রæয়ারি ১৯৯৬ জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করে। তবে আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য দলগুলো এই নির্বাচন পুরোপুরি প্রত্যাখান করে। প্রায় ভোটারবিহীন পরিবেশে তথাকথিত এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিরোধী দলগুলো বর্জন করায় এই নির্বাচন গুরুত্ব ও বৈধতা হারায়। তবু নির্বাচনের পর প্রতিষ্ঠিত ৪ দিন স্থায়ী ৬ষ্ঠ জাতীয় সংসদে তত্ত¡াবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার বিল ,ত্রয়োদশ সংশোধনী গৃহীত হয় এবং তত্ত¡াবধায়ক সরকারের অধীনে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সাংবিধানিক ব্যবস্থা করা হয়।

১৯৯৬ সালের ১২ ই জুনের সপ্তম জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করে। আওয়ামী লীগ গণতন্ত্র শক্তিশালীকরণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়। যেমন- বিভিন্ন সংসদীয় কমিটি গঠনের মাধ্যমে সংসদকে শক্তিশালী করা, প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব প্রবর্তন, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তিচুক্তি সম্পাদন, ইউনিয়ন পরিষদ এবং অন্যান্য স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে নারীদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বচিত হওয়ার পথ উন্মোচন ইত্যাদি।

২০০১ সালের ১লা অক্টোবর অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বি.এন .পি -জামাত সমর্থিত চারদলীয় জোট সরকার গঠন করে। এ সময় দলীয় স্বার্থে ,উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা ২ বছর বাড়িয়ে ৬৫ থেকে ৬৭ করে পরবর্তী তত্ত¡াবধায়ক সরকারের সম্ভাব্য প্রধান উপদেষ্টা এবং নির্বাচন কমিশনারের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। দেশে চরম সাংঘর্ষিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে। ২০০৭ সালে সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল মঈন উ আহমেদ এর নেতৃত্বে রাজনীতিতে পরোক্ষভাবে সেনা হস্তক্ষে ঘটে। তৎকালীন তত্ত¡াবধায়ক সরকারের প্রধান ড. ফখরুদ্দিন আহমদের নেতৃত্বাধীন সেনা সমর্থিত তথাকথিত সরকার ২ বছর ধরে ক্ষমতাসীন থাকে। এ সময়ে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের নেত্রীকে গ্রেপ্তার , তাঁদের বিচারে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তথাকথিত গণতান্ত্রিক সংস্কার এবং একের পর এক অধ্যাদেশ জারি ইত্যাদি পদক্ষেপ গ্রহণ করে অসাংবিধানিক পন্থায় ক্ষমতাস্থায়ী করণে সচেষ্ট হয়। ২ বছর পর তত্তবধায়ক সরকার নির্বাচন দিতে বাধ্য হয় এবং ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় । নবম এ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট বিপুল বিজয় অর্জন করে সরকার গঠন করে।