এসএসসি হিসাববিজ্ঞান

রেওয়ামিল

Supported by Matador Stationary

ব্যবসায়ের লাভ ক্ষতি ও আর্থিক অবস্থা নির্ণয়ের পূর্বে লিপিবদ্ধকৃত হিসাবের নির্ভুলতা যাচাই করা একান্ত প্রয়োজন। গাণিতিক শুদ্ধতা যাচাই না করেই যদি আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত করা হয়, তবে প্রস্তুতকৃত বিবরণী সঠিক তথ্য নাও প্রকাশ করতে পারে। হিসাব সংরক্ষণে যে সকল ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তা সতর্কতার সহিত বিবেচনা করে খতিয়ানের উদ্বৃত্ত দ্বারা রেওয়ামিল প্রস্তুত করা হয়। খতিয়ানের ডেবিট উদ্বৃত্তসমূহের যোগফল ক্রেডিট উদ্বৃত্তসমূহের যোগফলের সমান হলে ধরে নেয়া হয় হিসাব গাণিতিকভাবে নির্ভুল হয়েছে। রেওয়ামিল প্রস্তুতের ফলে সহজেই ভুল উদঘাটিত হয় এবং ভুল সংশোধনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়।

রেওয়ামিলের ধারণা

খতিয়ানের হিসাবগুলোর গাণিতিক নির্ভুলতা যাচাই করার জন্য কোন নির্দিষ্ট দিনে একখানা আলাদা খাতায় বা কাগজে সকল হিসাবের উদ্বৃত্ত গুলোকে ডেবিট ও ক্রেডিটএই দুই ভাগে বিভক্ত করে যে বিবরণী প্রস্তুত করা হয় তাহাকেই রেওয়ামিল বলে। রেওয়ামিলের ডেবিট দিকের যোগফল ক্রেডিট দিকের যোগফলের সমান হলে সাধারণত ধরে নেয়া হয় যে, খতিয়ানে কোন গাণিতিক ভুল নেই। অপর পক্ষে দুই দিকের যোগফল সমান না হলে বুঝতে হবে দু’তরফা দাখিলা অনুসারে হিসাব সংরক্ষণে কোন ভুল-ত্রুটি  আছে।

রেওয়ামিলের উদ্দেশ্যসমূহ নিন্মরূপ:

১। জাবেদা ও খতিয়ানে লেনদেন গুলো সাঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে কিনা তা যাচাই করা রেওয়ামিলের একটি মূখ্য উদ্দেশ্য।
২। আর্থিক বিবরণী তথা বিশদ আয় বিবরণী ও আর্থিক অবস্থার বিবরণী প্রস্তুত সহজতর করা।
৩। জাবেদা ও খতিয়ানে কোন ভুলত্র“টি থাকলে তা উৎঘাটন ও সংশোধন করা।
৪। দু’তরফা দাখিলা পদ্ধতি মোতাবেক জাবেদা ও খতিয়ানে লেনদেন লিপিবদ্ধ হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য রেওয়ামিল প্রস্তুত করা হয়।
৫। খতিয়ানের সকল জের এক সাথে থাকে বলে আর্থিক বিবরণী প্রস্তুতে সময় ও শ্রমের অপচয় রোধ হয়।
৬। রেওয়ামিলের সাহায্যে কারবারের আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

রেওয়ামিল প্রস্তুত প্রণালী:

লেনদেন চিহ্নিত করার পর প্রাথমিকভাবে সেগুলোকে জাবেদায় তারিখের ক্রমানুসারে লিপিবদ্ধ করা হয়। পরবর্তীতে প্রত্যেকটি হিসাবের আলাদা আলাদা শিরোনামের মাধ্যমে পাকাপাকি ভাবে খতিয়ানে স্থানান্তর করে উদ্বৃত্ত নির্ণয় করা হয়। জাবেদা না করেও সরাসরি হিসাবগুলোকে খতিয়ানে স্থানান্তরের মাধ্যমে উদ্বৃত্ত নির্ণয় করা যায়। খতিয়ানের সকল হিসাবের উদ্বৃত্ত নির্ণয় করার পর ডেবিট উদ্বৃত্তগুলোকে ডেবিট দিকে এবং ক্রেডিট উদ্বৃত্ত গুলোকে ক্রেডিট দিকে একটি আলাদা কাগজে বা খাতায় লিপিবদ্ধ করে রেওয়ামিল প্রস্তুত করা হয়। এখানে উলে−খ্য যে সাধারণত সমাপনী মজুদপণ্য রেওয়ামিলে অন্তর্ভুক্ত হয় না। কিন্তু প্রারম্ভিক মজুদপণ্য রেওয়ামিলে অন্তর্ভুক্ত করে উভয় দিকের যোগফল নির্ণয় করা হয়। যদি উভয় দিকে যোগফল মিলে যায় তবে প্রাথমিকভাবে ধরে নেয়া হয় হিসাবের গাণিতিক শুদ্ধতা সাঠিক আছে।

নিম্নে রেওয়ামিলের ছকের বিভিন্ন ঘরের বর্ণনা দেওয়া হলো:

১।ক্রমিক/কোড নং: যদি হিসাবের কোন কোড নং থাকে তবে হিসাবের বিপরীতে সেই কোড নং, হিসাবের কোড নং না থাকলে ধারাবাকিভাবে ক্রমিক নং বসাতে হয়। যেমন- ১, ২, ৩ ইত্যাদি।
২। হিসাবের শিরোনাম: খতিয়ান থেকে যে সমস্ত হিসাবের উদ্বৃত্ত আনা হয় সেগুলোর শিরোনাম বসাতে হয়। যেমন- মূলধন হিসাব, আসবাবপত্র হিসাব, বেতন হিসাব ইত্যাদি।
৩। খতিয়ান পৃষ্ঠা: খতিয়ানের যে পৃষ্ঠা হতে হিসাবের উদ্বৃত্ত রেওয়ামিলে স্থানান্তর করা হয়েছে, এইঘরে সেই পৃষ্ঠা নং লিখতে হয়। ফলে ভুলত্র“টি হলে খুব সহজেই উদঘাটন করা যায়।
৪। ডেবিট উদ্বৃত্ত টাকা: খতিয়ানের বিভিনড়ব হিসাবের ডেবিট উদ্বৃত্তগুলোর টাকার পরিমান এ ঘরে লিখতে হয়।
৫। ক্রেডিট উদ্বৃত্ত টাকা: খতিয়ানের বিভিনড়ব হিসাবের ক্রেডিট উদ্বৃত্তগুলোর টাকার পরিমান এ ঘরে লিখতে হয়।

রেওয়ামিল প্রস্তুতকরণে বিবেচ্য বিষয়সমূহ:

রেওয়ামিল তৈরির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে হিসাবের গাণিতিক শুদ্ধতা যাচাই করা। সে লক্ষ্যেই প্রতিটি উদ্বৃত্ত যাতে করে সঠিকভাবে রেওয়ামিলে অন্তর্ভুক্ত হয় তার জন্য রেওয়ামিল প্রস্তুতের পূর্বে বিশেষ সতর্কতা এবং কিছু বিষয় বিবেচনা করে রেওয়ামিল প্রস্তুত করা হয়। কারবারের স্বার্থেই রেওয়ামিল প্রস্তুত করার পূর্বে নিন্মলিখিত বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হয়।

১। মজুদপণ্য লিপিবদ্ধকরণে সতর্কতা অবলম্বন করতে হয়। প্রারম্ভিক মজুদ পণ্য ও সমাপনী মজুদ পণ্য দুটি দেয়া থাকলে সাধারণত প্রারম্ভিক মজুদপণ্য রেওয়ামিলে আসবে। সমাপনী মজুদপণ্য সাধারণত হিসাব কাল শেষ হওয়ার পর গণনা করা হয়। তাই সমাপনী মজুদপণ্য খতিয়ানে থাকে না।

২। প্রারম্ভিক হাতে নগদ এবং প্রারম্ভিক ব্যাংক জমা রেওয়ামিলে আসবে না। কারণ সমাপনী হাতে নগদ ও সমাপনী ব্যাংক জমার মধ্যেই প্রারম্ভিক জের অন্তর্ভুক্ত থাকে। আমরা যে তারিখের রেওয়ামিল প্রস্তুত করি সেই তারিখের জেরই দেখানো হয়।

৩। ঐ সমস্ত হিসাব যেগুলোতে প্রদত্ত না প্রাপ্ত উলে−খ থাকে না, সেক্ষেত্রে উক্ত হিসাব গুলোকে প্রদত্ত ধরে রেওয়ামিলের ডেবিট দিকে লিখতে হবে। যেমন  ভাড়া, বাট্রা, কমিশন, সুদ ইত্যাদি।

৪। রেওয়ামিলে যদি গড়মিল হয় এবং উক্ত গড়মিলের ফলে যদি ক্রেডিট পাশ ছোট হয় এবং ক্রেডিট পাশে যদি মূলধন দেয়া না থাকে তবে উক্ত গরমিল উদ্বৃত্তকে অনিশ্চিত হিসাব না লিখে মূলধন হিসাবে লেখা যেতে পারে। কারণ প্রতিটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেই মূলধন থাকে।

৫। বিক্রয় খাতিয়ানের উদ্বৃত্তকে দেনাদার হিসাব ধরে ডেবিট করতে হবে।

৬। ক্রয় খতিয়ানের উদ্বৃত্তকে পাওনাদার হিসাব ধরে ক্রেডিটকরতে হবে।

৭। সাধারণত শিক্ষানবিশ ভাতা প্রতিষ্ঠান প্রদান করে থাকে বলে একে ডেবিট করতে হবে।এবং শিক্ষানবিশ সেলামী প্রতিষ্ঠান পেয়ে থাকে বলে এটিকে আয় ধরে ক্রেডিট করতে হয়।

৮। সম্ভাব্য দায় ও সম্ভাব্য সম্পদ রেওয়ামিলের ভিতরে আসবে না। কারণ এগুলো নিশ্চিত দায় বা সম্পদ নয় সম্ভাব্য দায়
ও সম্পদকে পাদটীকা হিসাবে রেওয়ামিলের নিচে দেখাতে হবে।

সকল প্রকার সর্তকতামূলক ব্যবস্থা নেয়ার পরও যদি রেওয়ামিলের দুই পােেশ না মিলে সেক্ষেত্রে সাময়িক সময়ের জন্য গরমিলের পরিমাণকে অনিশ্চিত হিসাব (Suspense Account) ধরে রেওয়ামিলের উভয় পার্শ্ব সমান করা হয়।

 

 

রেওয়ামিলে যে সমস্ত ভুল ধরা পড়ে:

সকল ধরনের সতর্কতা মূলক ব্যবস্থা নেয়ার পরও অনিচ্ছাকৃতভাবে কিছু ভুল ঘটে যেতে পারে যে সমস্ত ভুলের কারণে রেওয়ামিল অমিল হয়। সে সমস্ত ভুলগুলো খুব সহজেই খুজে বের করে রেওয়ামিল সংশোধন করা যায়। ধরা পড়া ভুলগুলো হচ্ছে নিন্মরূপ:

 

অসমতা

রেওয়ামিলের উভয় দিক মিলে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে, হিসাব শতভাগ নির্ভুল। সাধারণত রেওয়ামিল মিলে গেলে ধরে নেয়া হয় যে, হিসাবের গাণিতিক শুদ্ধতা ঠিক আছে। কিন্তু হিসাবের মধ্যে এমন কিছু ভুল থেকে যায় যেগুলো রেওয়ামিলের মাধ্যমে ধরা পড়ে না। এই ধরনের ভুলকে প্রধানত দু’ভাগে ভাগ করা যায় ।
নিম্নে ভূলের প্রকারভেদের বর্ণনা করা হলো:

১। করণিক ভুল:

২। নীতিগত ভুল:

হিসাববিজ্ঞান জ্ঞানের অজ্ঞতার কারণে অথবা হিসাববিজ্ঞানের স্বীকৃত রীতি নীতি লংঘনের মাধ্যমে যে ভুল সংঘটিত হয়ে থাকে তাকেই নীতিগত ভুল বলে । নীতিগত ভুল নিন্মোক্তভাবে হতে পারে। যেমনÑ মূলধন জাতীয় ব্যয়কে মুনাফাজাতীয় এবং মুনাফাজাতীয় ব্যয়কে মূলধন জাতীয় ব্যয় হিসাবে লিপিবদ্ধকরণের মাধ্যমে নীতিগত ভুল হয় এবং এই ভুলের কারণে রেওয়ামিল মিলে যাবে কিন্তু কিছু ভুল থেকে যাবে। কারণ যে কোন প্রকার খরচেরই ডেবিট উদ্ধৃত্ত হয়ে থাকে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়
ক) কলকব্জা ক্রয় ৫০,০০০ টাকা ভুলবশত: কলকব্জা ডেবিট না করে ক্রয় হিসাব ডেবিট করা হয়েছে।
খ) কলকজ্বা মেরামত খরচ  ৫,০০০ টাকা ভুলবশত মেরামত খরচ ডেবিট না করে কলকব্জা হিসাবকে ডেবিট করা হয়েছে।

 

অশুদ্ধ রেওয়ামিল শুদ্ধ করার উপায়:

একটি গরমিল বা অশুদ্ধ রেওয়ামিল শুদ্ধ করার কোন স্বতঃসিদ্ধ নিয়ম নেই। রেওয়ামিলের উভয় পার্শ্ব গরমিল হলে বুঝতে হবে রেওয়ামিলে কোন ভুল আছে। সুতরাং ভুল ত্রুটি খুজে বের করে রেওয়ামিল সংশোধন করার জন্য নিমেড়বাক্ত ব্যবস্থা গ্রহন করা যেতে পারে ।

১। সর্বপ্রম রেওয়ামিলের উভয়দিকের যোগফল তথা ডেবিট ও ক্রেডিট পার্শ্বের যোগফল ঠিক আছে কিনা পরীক্ষা করে দেখতে হবে।
২। খতিয়ানের প্রতিটি হিসাবের জের রেওয়ামিলের তোলা হয়েছে কিনা দেখতে হবে।
৩। হিসাবের ডেবিট ও ক্রেডিট উদ্বৃত্তগুলো যথাক্রমে রেওয়ামিলের ডেবিট ও ক্রেডিট দিকে লেখা হয়েছে কিনা দেখতে হবে।
৪। জাবেদা হতে লেনদেনগুলো খতিয়ানের সংশ্লিষ্ট হিসাবে ঠিকমত তোলা হয়েছে কিনা পরীক্ষা করে দেখতে হবে।
৫। খতিয়ানের যে কোন হিসাবের উদ্বৃত্ত রেওয়ামিলে ভুল অঙ্কে ভুল ঘরে তোলা হয়েছে কিনা পরীক্ষা করে দেখতে হবে।
৬। রেওয়ামিলের ডেবিট ও ক্রেডিট পার্থক্য রাশিটাকে ২ দুই দ্বারা ভাগ করে অতঃপর নির্ণীত রাশির কোন উদ্বৃত্ত থাকলে তা সঠিক ঘরে আছে কিনা দেখতে হবে। যদি না থাকে তবে বুঝতে হবে ভুল ঘরে লেখার দরূন পার্থক্যটি দ্বিগুণ হয়েছে।
৭। পূর্ববতী বছরের হিসাবের জের সমূহ চলতি বছরে খতিয়ানে ঠিকমত তোলা হয়েছে কিনা তা মিলিয়ে দেখতে হবে। উপর্যুক্ত উপায়ে প্রচেষ্টা চালাবার পরও যদি ভুল ধরা না পড়ে তাহলে অনিশ্চিত হিসাব খুলে সাময়িকভাবে রেওয়ামিল মিলিয়ে সমাপ্ত করতে হবে তবে পরবর্তীতে ভুল সংশোধন করে অবশ্যই অনিশ্চিত হিসাব বন্ধ করতে হবে।

অনিশ্চিত হিসাব:

সাধারণত: রেওয়ামিলের দুইপার্শ্ব সমান করার জন্য সাময়িক সময়ের জন্য যে হিসাব খোলা হয় তাকেই অনিশ্চিত হিসাব বলে। হিসাবের গাণিতিক শুদ্ধতা যাচাই করণের উদ্দেশ্যেই সাধারণত রেওয়ামিল প্রস্তুত করা হয়। লেনদেনগুলো জাবেদা থেকে খতিয়ানে এবং খতিয়ান থেকে রেওয়ামিলে স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় কোন ধরনের ভুলত্র“টি থাকলে তা সংশোধন করে প্রতিষ্ঠানের অর্থিক বিবরণী প্রস্তুত করে প্রকৃত চিত্র প্রকাশ করা হয়।

কিন্তু রেওয়ামিলের ভুল খুজে বের না করতে পারার কারণে আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত বিলম্বিত হতে পারে বিধায় সাময়িক সময়ের জন্য অনিশ্চিত হিসাবের মাধ্যমে রেওয়ামিলের দুই পার্শ্বে মিল করা হয় যাতে করে আর্থিক বিবরণী যথাসময়ে প্রস্তুত করা যায়। রেওয়ামিলের ডেবিট দিকের যোগফল যদি ক্রেডিট দিকের যোগফল অপেক্ষা বেশি হয় তাহলে ক্রেডিট দিকে অনিশ্চিত হিসাব প্রদর্শন করতে হয়। অন্যদিকে রেওয়ামিলের ক্রেডিট দিকের যোগফল যদি ডেবিট দিকের যোগফল অপেক্ষা বেশি হয় তাহলে ডেবিট দিকে অনিশ্চিত হিসাব প্রদর্শন করা হয়। পরবর্তীতে যদি ভুল উদঘাটিত হয় তবে সংশোধনী জাবেদার মাধ্যমে ভুল সংশোধন করে হিসাব বন্ধ করতে হয়।

চলো দেখি এবার কি কি শিখলে তোমরা!