এসএসসি বাংলা ১ম পত্র

তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা,

Supported by Matador Stationary
10 minute school bangla smartbook
তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা,

লেখক: শামসুর রাহমান

তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা,
তোমাকে পাওয়ার জন্যে
আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায় ?
আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন ?

তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা,
সাকিনা বিবির কপাল ভাঙল,

সিঁথির সিঁদুর গেল হরিদাসীর।
তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা,
শহরের বুকে জলপাইয়ের রঙের ট্যাঙ্ক এলো
দানবের মত চিৎকার করতে করতে

তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা,
ছাত্রাবাস, বস্তি উজাড হলো। রিকয়েললেস রাইফেল
আর মেশিনগান খই ফোটাল যত্রতত্র।

তুমি আসবে বলে ছাই হলো গ্রামের পর গ্রাম।
তুমি আসবে বলে বিধ্বস্ত পাড়ায় প্রভুর বাস্তুভিটার
ভগ্নস্তূপে দাঁডিয়ে একটানা আর্তনাদ করল একটা কুকুর।

তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা,
অবুঝ শিশু হামাগুডি দিলো পিতা-মাতার লাশের উপর।

তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা, তোমাকে পাওয়ার জন্যে
আর কতবার ভাসতে হবে রক্তগঙ্গায় ?
আর কতবার দেখতে হবে খাণ্ডবদাহন ?
স্বাধীনতা, তোমার জন্যে এক থুত্থুরে বুড়ো
উদাস দাওয়ায় বসে আছেন – তাঁর চোখের নিচে অপরাহ্ণের
দুর্বল আলোর ঝিলিক, বাতাসে নড়ছে চুল।

স্বাধীনতা, তোমার জন্যে
মোল্লাবাডির এক বিধবা দাঁডিয়ে আছে
নড়বড়ে খুঁটি ধরে দগ্ধ ঘরের।

স্বাধীনতা, তোমার জন্যে
হাড্ডিসার এক অনাথ কিশোরী শূন্য থালা হাতে
বসে আছে পথের ধারে।

তোমার জন্যে,
সগীর আলী, শাহবাজপুরের সেই জোয়ান কৃষক,
কেষ্ট দাস, জেলেপাডার সবচেয়ে সাহসী লোকটা,
মতলব মিয়া, মেঘনা নদীর দক্ষ মাঝি,
গাজী গাজী বলে যে নৌকা চালায় উদ্দাম ঝড়ে,

রুস্তম শেখ, ঢাকার রিকশাওয়ালা, যার ফুসফুস
এখন পোকার দখলে

আর রাইফেল কাঁধে বনে জঙ্গলে ঘুরে-বেড়ানো
সেই তেজি তরুণ যার পদভারে
একটি নতুন পৃথিবীর জন্ম হতে চলেছে–
সবাই অধীর প্রতীক্ষা করছে তোমার জন্যে, হে স্বাধীনতা।

পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে জ্বলন্ত
ঘোষণার ধ্বনি-প্রতিধ্বনি তুলে,

নতুন নিশান উড়িয়ে, দামামা বাজিয়ে দিগ্বিদিক
এই বাংলায়
তোমাকে আসতেই হবে, হে স্বাধীনতা।

‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’ কবিতাটি ‘শামসুর রাহমানের শ্রেষ্ঠ কবিতা’ নামক কাব্যগ্রন্থ থেকে নেয়া হয়েছে। এই কবিতাটি মূলত ‘বন্দী শিবির’ নামক কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত। স্বাধীনতার অধিকার ও অনুভব মানুষের জন্মগত। কিন্তু পাকিস্তানিরা এই স্বাধীনতাই কেড়ে নিয়েছিল বাঙালী জাতির কাছ থেকে। এই স্বাধীনতা অর্জনের জন্য আপামর বাঙালী মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে ১৯৭১ সালে। বাঙালির রক্তে রক্তগঙ্গা বইয়ে দেয় পাকিস্তানি যুদ্ধবাজরা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে সাকিনা বিবির মতো গ্রামের নারী যাঁরা রয়েছেন তাঁরা হারিয়েছেন নিজেদের সহায়-সম্বল-সম্ভ্রম সব। হরিদাসীর মত বহু নারী হারিয়েছে নিজের স্বামীকে আর অনেক নবজাতক শিশু হারিয়েছে পিতা-মাতাকে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাঙালীদের ছাত্রাবাসে আক্রমণ করে নির্বিচারে ছাত্রদের হত্যা করে, শহরের বুকে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে গণহত্যা চালায়, পুড়িয়ে দেয় গ্রাম ও শহরের অনেক ঘর-বাড়ি। কুকুরও আর্তনাদ করে ওঠে এর প্রাকৃতিক প্রতিবাদে। মুক্তিযুদ্ধে শ্রমিক, কৃষক, জেলে, রিকশাওয়ালার মত সাধারণ মানুষরা আত্মত্যাগ করে। মুক্তিযুদ্ধের প্রাণস্পন্দন ও আশা জেগে থাকতে দেখে কবি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে দৃঢ়তার সঙ্গে উচ্চারণ করেন – এত আত্মত্যাগ যার উদ্দেশ্যে সেই স্বাধীনতাকে বাঙালি একদিন ছিনিয়ে আনবেই।
শামসুর রাহমান
শামসুর রাহমান

◈ জন্ম- ১৯২৯ সালের ২৪শে অক্টোবর ঢাকায়।
◈ পৈতৃক নিবাস নরসিংদী জেলার রায়পুরা থানার পাড়াতলী গ্রামে।
◈ পিতা মোখলেসুর রহমান চৌধুরী ও মাতা আমেনা খাতুন।
◈ ১৯৪৫ সালে ঢাকার পোগোজ স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন।
◈ ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৪৭ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন।
◈ তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন।
◈ তাঁর পেশা ছিল সাংবাদিকতা।
◈ মধ্যবিত্ত নাগরিক জীবনের প্রত্যাশা, হতাশা, বিচ্ছিন্নতা, বৈরাগ্য ও সংগ্রাম তাঁর কবিতায় সার্থকভাবে ফুটে উঠেছে।
◈ তাছাড়া তাঁর কবিতায় অতি আধুনিক কাব্যধারার বৈশিষ্ট্য সার্থকভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
◈ তাঁর অসাধারণ সব সৃষ্টির জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদকসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হন।
◈ প্রধান কাব্যগ্রন্থ- প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে, রৌদ্র করোটিতে, বিধ্বস্ত নীলিমা, নিরালোকে দিব্যরথ, নিজ বাসভূমে, বন্দী শিবির থেকে, দুঃসময়ের মুখোমুখি, ফিরিয়ে নাও ঘাতক কাঁটা, এক ধরনের অহংকার, আদিগন্ত নগ্ন পদধ্বনি, আমি অনাহারী, বাংলাদেশ স্বপ্ন দ্যাখে, দেশদ্রোহী হতে ইচ্ছে করে, বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়, গৃহযুদ্ধের আগে, হৃদয়ে আমার পৃথিবীর আলো, মানব হৃদয়ে নৈবেদ্য সাজাই, হরিণের হাড় ইত্যাদি।
◈ মৃত্যু- ১৭ই আগস্ট, ২০০৬ সালে।

◈ আমি তারায় তারায় রটিয়ে দেব জেমস এর যেই গানটি রয়েছে এটি শামসুর রাহমান এর লেখা উত্তর কবিতা থেকে নেয়া।
◈ তাঁর কবিতায় সব সময় ফুটে এসেছে আমাদের শহুরে জীবনের কথা।

চলো এবার দিয়ে ফেলি ছোট একটি কুইজ!