এসএসসি বাংলা ১ম পত্র

আমার পরিচয়

Supported by Matador Stationary
10 minute school bangla smartbook
আমার পরিচয়

লেখক: সৈয়দ শামসুল হক

আমি জন্মেছি বাংলায়, আমি বাংলায় কথা বলি,
আমি বাংলার আলপথ দিয়ে, হাজার বছর চলি।
চলি পলিমাটি কোমলে আমার চলার চিহ্ন ফেলে।
তেরশত নদী শুধায় আমাকে, ‘কোথা থেকে তুমি এলে?’
আমি তো এসেছি চর্যাপদের অক্ষরগুলো থেকে।
আমি তো এসেছি সওদাগরের ডিঙার বহর থেকে।
আমি তো এসেছি কৈবর্তের বিদ্রোহী গ্রাম থেকে।
আমি তো এসেছি পালযুগ নামে চিত্রকলার থেকে।

এসেছি বাঙালি পাহাড়পুরের বৌদ্ধবিহার থেকে।

এসেছি বাঙালি জোড়বাংলার মন্দির-বেদি থেকে।
এসেছি বাঙালি বরেন্দ্রভূমে সোনা মসজিদ থেকে।

এসেছি বাঙালি আউল-বাউল মাটির দেউল থেকে।
আমি তো এসেছি সার্বভৌম বারোভূঁইয়ার থেকে।
আমি তো এসেছি ‘কমলার দীঘি’, ‘মহুয়ার পালা’ থেকে।
আমি তো এসেছি তিতুমীর আর হাজী শরিয়ত থেকে।
আমি তো এসেছি গীতাঞ্জলি ও অগ্নিবীণার থেকে।
এসেছি বাঙালি ক্ষুদিরাম আর সূর্য সেনের থেকে
এসেছি বাঙালি জয়নুল আর অবন ঠাকুর থেকে।
এসেছি বাঙালি রাষ্ট্রভাষার লাল রাজপথ থেকে
এসেছি বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর থেকে।

আমি যে এসেছি জয়বাংলার বজ্রকণ্ঠ থেকে।
আমি যে এসেছি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ থেকে।

এসেছি আমার পেছনে হাজার চরণচিহ্ন ফেলে।
শুধাও আমাকে ‘এতদূর তুমি কোন প্রেরণায় এলে?’

তবে তুমি বুঝি বাঙালি জাতির ইতিহাস শোন নাই-
‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।’
একসাথে আছি, একসাথে বাঁচি, আজও একসাথে থাকবই-
সব বিভেদের রেখা মুছে দিয়ে সাম্যের ছবি আঁকবই।

সৈয়দ শামসুল হকের ‘কিশোর কবিতা সমগ্র’ থেকে ‘আমার পরিচয়’ কবিতাটি নেয়া হয়েছে। আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন এই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পেছনে আছে সমৃদ্ধ এক ইতিহাস। কবি গভীর মমত্বের সঙ্গে কবিতার মধ্য দিয়ে সমৃদ্ধ সেই ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির পটভূমির কথা বলেছেন। সহজিয়াপন্থী বৌদ্ধ কবিদের সৃষ্ট চর্যাপদের মধ্যে বাঙালি জাতিসত্তার যে অসাম্প্রদায়িক জীবনবোধের পরিচয় রয়েছে- যুগে যুগে নানা আন্দোলন, বিপ্লব-বিদ্রোহ আর মতাদর্শের বিকাশ হতে হতে আমরা এসে পৌঁছেছি আজকের এই বাংলায়। বিবর্তনের এই বিচিত্র বাঁক ও মোড়কে কবি তুলে ধরেছেন। চাঁদ-সওদাগরের বাণিজ্য যাত্রা, কৈবর্তবিদ্রোহ, পালযুগের চিত্রকলা আন্দোলন, বৌদ্ধবিহারের জ্ঞানচর্চা, মুসলিম ধর্ম ও সাহিত্য সংস্কৃতির বিকাশ, বারোভূঁইয়াদের উত্থান, ময়মনসিংহ গীতিকার জীবন, তিতুমীর আর হাজী শরীয়তের বিদ্রোহ, রবীন্দ্র-নজরুলের কালজয়ী সৃষ্টি, বৃটিশ-বিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন এবং পরিশেষে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীন বাংলাদেশ- ‘আমার পরিচয়’ কবিতার মধ্যে এই বিপুল বাংলাদেশ অনবদ্যরূপ লাভ করেছে।

সৈয়দ শামসুল হক
◈ জন্ম- ২৭শে ডিসেম্বর, ১৯৩৫ সালে কুড়িগ্রাম শহরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।
◈ পিতা- ডা. সৈয়দ সিদ্দিক হুসাইন, মাতা- সৈয়দা হালিমা খাতুন।
◈ তিনি ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে ম্যাট্রিক ও জগন্নাথ কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন।
◈ তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে কিছুদিন পড়াশোনা করেন।
◈ এক সময় পেশা হিসেবে সাংবাদিকতাকে বেছে নিলেও পরবর্তীতে সাহিত্যকর্মে পুরোপুরি নিমগ্ন হন।
◈ কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক এমনকি শিশুতোষ রচনাও তিনি করেছেন।
◈ বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ অনেক সাহিত্য-পুরস্কার লাভ করেন।
◈ উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ- একদা এক রাজ্যে, বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা, অগ্নি ও জলের কবিতা, রাজনৈতিক কবিতা;
গল্প- শীত বিকেল, রক্তগোলাপ, আনন্দের মৃত্যু, জলেশ্বরীর গল্পগুলো;
উপন্যাস- বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ;
শিশুতোষ গ্রন্থ- সীমান্তের সিংহাসন;
নাটক- পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, নূরলদীনের সারাজীবন, ঈর্ষা।
◈ মৃত্যু- ২৭শে সেপ্টেম্বর ২০১৬ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

চলো এবার দিয়ে ফেলি ছোট একটি কুইজ!