এসএসসি বাংলা ১ম পত্র

স্বাধীনতা এ শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো

Supported by Matador Stationary
10 minute school bangla smartbook

স্বাধীনতা এ শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো

লেখক: নির্মলেন্দু গুণ

একটি কবিতা লেখা হবে তার জন্য অপেক্ষার উত্তেজনা নিয়ে
লক্ষ লক্ষ উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা বসে আছে

ভোর থেকে জন সমুদ্রের উদ্যান সৈকতে : ‘কখন আসবে কবি’?

এই শিশু পার্ক সেদিন ছিল না,
এই বৃক্ষে ফুলে শোভিত উদ্যান সেদিন ছিল না,
এই তন্দ্রাচ্ছন্ন বিবর্ণ বিকেল সেদিন ছিল না ।

তাহলে কেমন ছিল শিশু পার্কে, বেঞ্চে, বৃক্ষে, ফুলের বাগানে
ঢেকে দেয়া এই ঢাকার হৃদয় মাঠখানি?

জানি, সেদিনের সব স্মৃতি মুছে দিতে হয়েছে উদ্যত
কালো হাত।
তাই দেখি কবিহীন এই বিমুখ প্রান্তরে আজ
কবির বিরুদ্ধে কবি,
মাঠের বিরুদ্ধে মাঠ,
বিকেলের বিরুদ্ধে বিকেল,
উদ্যানের বিরুদ্ধে উদ্যান,
মার্চের বিরুদ্ধে মার্চ।

হে অনাগত শিশু, হে আগামী দিনের কবি,
শিশু পার্কের রঙিন দোলনায় দোল খেতে খেতে তুমি

একদিন সব জানতে পারবে; আমি তোমাদের কথা ভেবে
লিখে রেখে যাচ্ছি সেই শ্রেষ্ঠ বিকেলের গল্প।

সেদিন এই উদ্যানের রূপ ছিল ভিন্নতর।
না পার্ক না ফুলের বাগান, – এসবের কিছুই ছিল না,
শুধু একখন্ড অখন্ড আকাশ যেরকম, সেরকম দিগন্ত প্লাবিত
শুধু মাঠ ছিল দূর্বাদলে ঢাকা, সবুজে সবুজময়।
আমাদের স্বাধীনতা প্রিয় প্রাণের সবুজ এসে মিশেছিল
এই ধু ধু মাঠের সবুজে।

কপালে কব্জিতে লালসালু বেঁধে
এই মাঠে ছুটে এসেছিল কারখানা থেকে লোহার শ্রমিক,
লাঙল জোয়াল কাঁধে এসেছিল ঝাঁক বেঁধে উলঙ্গ কৃষক,
হাতের মুঠোয় মৃত্যু, চোখে স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল মধ্যবিত্ত,
নিম্নবিত্ত, করুণ কেরানি, নারী, বৃদ্ধ, ভবঘুরে

আর তোমাদের মতো শিশু পাতা- কুড়ানিরা দল বেঁধে।
একটি কবিতা পড়া হবে, তার জন্য কী ব্যাকুল
প্রতীক্ষা মানুষের: ‘কখন আসবে কবি?’ ‘কখন আসবে কবি?’

শত বছরে শত সংগ্রাম শেষে,
রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে
অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।

তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল,
হৃদয়ে লাগিল দোলা, জন সমুদ্রে জাগিল জোয়ার

সকল দুয়ার খোলা। কে রোধে তাঁহার বজ্রকন্ঠ বাণী?
গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর কবিতাখানি:

‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের।

১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রমনা রেসকোর্স ময়দানে লক্ষ লক্ষ মানুষের সামনে বজ্রকণ্ঠে পাকিস্তানি শাসকদের হাত থেকে মুক্তির জন্য স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দেন। বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণের মধ্য দিয়েই আসলে জেগে ওঠে বাঙালী জাতির স্বাধীনতার স্বপ্ন আর বঙ্গবন্ধুর এই আহ্বানের পর পরই মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে দেশের সব স্তরের মানুষ। সেদিন কৃষক, শ্রমিক, মজুর, বুদ্ধিজীবি, শিশু-কিশোর, নারী-পুরুষ, যুবক-বৃদ্ধ সবাই সমবেত হয়েছিল বাঙালির এই মহান নেতার কথা শোনার জন্য। সবাই আকুল হয়ে ছিল নেতার মুখে স্বপ্নের কথা শোনার জন্য, আশার বাণী শোনার জন্য। রমনার রেসকোর্সে যেখানে সেদিনের মঞ্চ তৈরি হয়েছিল এখন সেখানে তার কোনো চিহ্ন নেই। সে জায়গাটিতেই বর্তমানে রয়েছে শিশু পার্ক। কবি নির্মলেন্দু গুণ মনে করেন শিশুদের কাছে এই কথাটি জানিয়ে দেওয়া দরকার যে- এখান থেকেই, এই পার্কের মঞ্চ থেকেই ১৯৭১ সালে বাঙালির প্রিয় শব্দ ‘স্বাধীনতা’ কথাটি উচ্চারিত হয়েছিল। আপামর জনতার সামনে সেদিন এসে দাঁড়িয়েছিলেন বাঙালির খুব প্রিয় মানুষ, বাঙালির শিকড় থেকে জেগে ওঠা এক বিদ্রোহী নেতা। তিনি আর আট-দশ জন রাজনীতিবিদের মত নন। তিনি একজন কবি, একজন রাজনীতির কবি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের বিকেলের পড়ন্ত রোদের ডাক দিয়েছিলেন-
‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,
এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
নির্মলেন্দু গুণ
নির্মলেন্দু গুণ

◈ জন্ম: ১৯৪৫ সালে নেত্রকোনা জেলার কাশবন গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
◈ পিতা: সুখেন্দু প্রকাশ গুণ চৌধুরী, মাতা: বীণাপানি গুণ।
◈ তিনি ১৯৬২ সালে সিকেপি ইন্সটিটিউশন বারহাট্টা থেকে মাধ্যমিক, ১৯৬৪ সালে নেত্রকোনা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাস করেন।
◈ তাঁর কবিতায় প্রতিবাদী চেতনা, সমকালীন সামাজিক-রাজনৈতিক জীবনের ছবি যেমন প্রখর, কবিতা নির্মাণে শিল্প-সৌন্দর্যের প্রতিও তিনি সজাগ।
◈ নির্মলেন্দু গুণ পেশায় সাংবাদিক।
◈ কাব্য সাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, কবি হাসান হাফিজুর রহমান স্মৃতি স্বর্ণপদক, জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হন।
◈ উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ:
কাব্যগ্রন্থ- প্রেমাংশুর রক্ত চাই, বাংলার মাটি বাংলার জল, চাষাভূষার কাব্য, পঞ্চাশ সহস্র বর্ষ
ছোট গল্প- আপন দলের মানুষ
ছোটদের জন্য লেখা উপন্যাস- বাবা যখন ছোট ছিলেন, কালোমেঘের ভেলা।


চলো এবার দিয়ে ফেলি ছোট একটি কুইজ!