এসএসসি বাংলা ১ম পত্র

মানুষ

Supported by Matador Stationary
10 minute school bangla smartbook
মানুষ

লেখক: কাজী নজরুল ইসলাম

গাহি সাম্যের গান-
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান,

নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি,
সব দেশে, সব কালে, ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।
‘পূজারী, দুয়ার খোলো,
ক্ষুধার ঠাকুর দাঁড়ায়ে দুয়ারে পূজার সময় হলো!’
স্বপন দেখিয়া আকুল পূজারী খুলিল ভজনালয়,
দেবতার বরে আজ রাজা-টাজা হ’য়ে যাবে নিশ্চয়!

জীর্ণ-বস্ত্র শীর্ণ-গাত্র, ক্ষুধায় কন্ঠ ক্ষীণ–
ডাকিল পান্থ, ‘দ্বার খোলো বাবা, খাইনি তো সাত দিন!’
সহসা বন্ধহলো মন্দির, ভুখারি ফিরিয়া চলে,
তিমিররাত্রি, পথ জুড়ে তার ক্ষুধার মানিক জ্বলে!

ভুখারি ফুকারি’ কয়,
‘ঐ মন্দির পূজারীর, হায় দেবতা, তোমার নয়!’
মসজিদে কাল শিরনি আছিল,– অঢেল গোস্ত রুটি
বাঁচিয়া গিয়াছে, মোল্লা সাহেব হেসে তাই কুটি কুটি,

এমন সময় এলো মুসাফির গায়ে আজারির চিন
বলে, ‘বাবা, আমি ভুখা ফাকা আছি আজ নিয়ে সাত দিন!’
তেরিয়া হইয়া হাঁকিল মোল্লা – ‘ভ্যালা হলো দেখি লেঠা,

ভুখা আছ মর গো-ভাগাড়ে গিয়ে! নামাজ পড়িস বেটা?’
ভুখারি কহিল, ‘না বাবা!’ মোল্লা হাঁকিল – ‘তা হলে শালা
সোজা পথ দেখ!’ গোস্ত-রুটি নিয়া মসজিদে দিল তালা।

ভুখারি ফিরিয়া চলে,
চলিতে চলিতে বলে-
‘আশিটা বছর কেটে গেল, আমি ডাকিনি তোমায় কভু,
আমার ক্ষুধার অন্ন তা বলে বন্ধ করনি প্রভু।

তব মসজিদ মন্দিরে প্রভু নাই মানুষের দাবি।
মোল্লা পুরুত লাগায়েছে তার সকল দুয়ারে চাবি!’

কোথা চেঙ্গিস, গজনি মামুদ, কোথায় কালাপাহাড়?
ভেঙে ফেল ঐ ভজনালয়ের যত তালা-দেওয়া দ্বার!

খোদার ঘরে কে কপাট লাগায়, কে দেয় সেখানে তালা?
সব দ্বার এর খোলা রবে, চালা হাতুড়ি শাবল চালা!

হায় রে ভজনালয়,
তোমার মিনারে চড়িয়া ভণ্ড গাহে স্বার্থের জয়!

কাজী নজরুল ইসলামের ‘সাম্যবাদী’ কাব্যগ্রন্থ থেকে মানুষ কবিতাটি নেয়া হয়েছে। নানা ধর্ম, বর্ণ, গোত্রের মানুষ নিয়েই আমাদের এই পৃথিবী। ভিন্ন ধর্মগ্রন্থের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ধর্মগ্রন্থ রয়েছে এবং প্রতিটি ধার্মিক মানুষই নিজ ধর্মগ্রন্থকে অনেক ভালোবাসে। কিন্তু ধর্মের প্রতি ভালোবাসা থাকা সত্ত্বেও অনেক সময়ই দেখা যায় মন্দিরের পুরোহিত বা মসজিদের মোল্লাসাহেবের মত ধার্মিক মানুষরাও একজন ক্ষুধার্ত মানুষকে খাবার দিয়ে সাহায্য করতে অস্বীকৃতি জানান। ধর্ম কখনোই এমন হৃদয়হীন কাজকে সমর্থন করে না। মানুষের চেয়ে যে বড় কিছু হতে পারেনা, ধর্মও সে কথাই বলে।
কাজী নজরুল ইসলাম
◈ জন্ম- ২৪শে মে, ১৮৯৯ ( ১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৩০৬) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে।
◈ ছেলেবেলায় লেটো গানের দলে যোগ দেন।
◈ বর্ধমানে ও ময়মনসিংহের ত্রিশাল থানার দরিরামপুর হাই স্কুলে পড়াশোনা করেন।
◈ ১৯১৭ সালে সেনাবাহিনীর বাঙালী পল্টনে যোগ দিয়ে তিনি করাচি যান এবং সেখানেই তাঁর সাহিত্য জীবনের শুরু হয়।
◈ তাঁর লেখায় তিনি সামাজিক অবিচার ও বিরুদ্ধে তিনি সবসময় সোচ্চার ছিলেন । এজন্য তাঁকে ‘বিদ্রোহী কবি’ বলা হয়।
◈ কবিতা, উপন্যাস, নাটক, ছোটগল্প, প্রবন্ধ সাহিত্যের সব শাখায় তিনি প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন।
◈ তিনি গজল, খেয়াল ও রাগপ্রধান গান রচনা করে খ্যাতি অর্জন করেন।
◈ মাত্র ৪০ বছর বয়সে দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন।
◈ তাঁর অসাধারণ সব সাহিত্য-কীর্তির জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডি. লিট উপাধি প্রদান করে।
◈ অগ্নি-বীণা, বিষের বাঁশি, ছায়ানট, প্রলয়শিখা, চক্রবাক, সিন্ধুহিন্দোল তাঁর রচিত কাব্যগুলোর মধ্যে অন্যতম ব্যথার দান, রিক্তের বেদন, শিউলিমালা, মৃত্যুক্ষুধা, কুহেলিকা ইত্যাদি তাঁর রচিত গল্প ও উপন্যাস।
◈ যুগবাণী, দুর্দিনের যাত্রী ও রাজবন্দির জবানবন্দী তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধগ্রন্থ।
◈ মৃত্যু- ১৯৭৬ সালের ২৯শে আগস্ট তিনি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।
◈ শাহবাগ থেকে চারুকলার দিকে যেতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যেই বড় মসজিদটি দেখতে পাই আমরা, তাঁর ঠিক পাশেই কিন্তু চিরশান্তিতে ঘুমিয়ে আছেন আমাদের অসম্ভব রকম প্রিয় এই মানুষটি।

চলো এবার দিয়ে ফেলি ছোট একটি কুইজ!