এসএসসি: বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়

অর্থনৈতিক নির্দেশকসমূহ ও বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রকৃতি

Supported by Matador Stationary

কোনো দেশের অর্থনীতির অবস্থা জানতে হলে সে দেশের মোট জাতীয় উৎপাদন, মোট অভ্যন্তরীণ বা দেশজ উৎপাদন ও জনগণের মাথাপিছু আয় জানা প্রয়োজন। এগুলোকে বলা হয় অর্থনীতির নির্দেশক। কারণ, এ গুলো অর্থনীতির অবস্থা নির্দেশ করে।

দেশের অর্থনীতি পূর্ববর্তী অবস্থার তুলনায় এগিয়ে যাচ্ছে, পিছিয়ে যাচ্ছে নাকি একই অবস্থায় আছে, তা উক্ত নির্দেশকসমূহের মান দ্বারা বোঝা যায়। এগুলোর সাথে সাথে কৃষি, শিল্প, সেবা এবং অন্যান্য খাতে উৎপাদনের অবস্থা কী, বিদেশ থেকে কর্মজীবী মানুষ যে অর্থ দেশে প্রেরণ করছে তা জাতীয় অর্থনীতে কেমন প্রভাব ফেলছে-এ সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে দেশের অর্থনীতির অবস্থা ও গতিপ্রবাহ জানা সম্ভব।

অর্থনৈতিক নির্দেশক সমূহ

মোট জাতীয় উৎপাদন

কোনো নির্দিষ্ট সময়ে সাধারণত এক বছরে কোনো দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ বা ভূমির উপর সে দেশের মোট শ্রম ও মূলধন নিয়োগ করে যে পরিমাণ বস্তুগত ও অবস্তুগত দ্রব্য ও সেবা উৎপাদিত হয়, তার আর্থিক মূল্যকে ঐ দেশের মোট জাতীয় উৎপাদন বলে।

জাতীয় উৎপাদনের মধ্যে দেশের অভ্যন্তরে বসবাসকারী ও কর্মরত বিদেশি ব্যক্তি ও সংস্থার উৎপাদন/আয় অন্তর্ভূক্ত হবে না। তবে বিদেশে বসবাসকারী ও কর্মরত দেশি নাগরিক, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন/আয় অন্তর্ভুক্ত হবে। মোট জাতীয় উৎপাদনকে তিনটি দিক থেকে বিবেচনা করে পরিমাপ করা যায়।

যে কোনো দেশের অর্থনীতিতে জনগণের প্রয়োজনের ভিত্তিতে নানাবিধ দ্রব্যসামগ্রী ও সেবা উৎপাদন করা হয়। উৎপাদিত দ্রব্যের বিভিন্নতার কারণে যোগ করে এগুলোর মোট পরিমাণ নির্ণয় করা যায় না। তাই মোট জাতীয় উৎপাদনের পরিমাপ নির্ণয় করতে হলে প্রতিটি দ্রব্য ও সেবার মোট উৎপাদনের পরিমাণকে তার বাজার দাম দিয়ে গুণ করতে হয়। এই ভাবে প্রাপ্ত প্রতিটি দ্রব্য ও সেবার আর্থিক মূল্যের সমষ্টিকে মোট জাতীয় উৎপাদন বলে। এই পদ্ধতিতে মোট জাতীয় উৎপাদন নির্ণয় করতে হলে শুধুমাত্র চূড়ান্ত দ্রব্যই গণনা করতে হবে। অনেক দ্রব্যই চূড়ান্ত পর্যায়ে বাজারে আসার আগে প্রাথমিক দ্রব্য ও মাধ্যমিক দ্রব্য হিসাবে একাধিকবার ক্রয়-বিক্রয় হয়। এই ক্রয়-বিক্রয় হয় উৎপাদনকারী ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে। দ্রব্যটি উৎপাদনের চূড়ান্ত পর্যায়ে এটি ভোগকারীরা ক্রয় ও ভোগ করে। ভোগকারীর ক্রয়ের পর এটি আর ক্রয় বিক্রয় হয় না। মোট জাতীয় উৎপাদন নির্ণয়ের জন্য প্রত্যেক ধাপেই দ্রব্যটি হিসাব করা হলে জাতীয় উৎপাদনের পরিমাণ সঠিক হবে না। ত্ইা মোট জাতীয় উৎপাদন নির্ণয়ের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র চূড়ান্ত পর্যায়ের দ্রব্যটিই হিসাব করতে হবে।
একটি উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টি বুঝতে চেষ্টা করা যাক। ধরা যাক, তুলা থেকে সুতা, সুতা থেকে কাপড় এবং কাপড় থেকে শার্ট উৎপাদন করা হলো। এখানে তুলা হচ্ছে প্রাথমিক দ্রব্য,সুতা ও কাপড় মাধ্যমিক দ্রব্য এবং শার্ট চূড়ান্ত দ্রব্য। শার্টের দামের মধ্যেই তুলা, সুতা,ও কাপড়ের দাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাই উৎপাদন পদ্ধতিতে মোট জাতীয় উৎপাদন গণনা বা পরিমাপ করতে হলে শুধুমাত্র চূড়ান্ত পণ্য-য সরাসরি ভোগ করা হয়, তাই হিস্বা করা হয়।

এই পদ্ধতিতে মোট জাতীয় উৎপাদন পরিমাপ করতে হলে উৎপাদনের উপাদানসমূহের মোট আয়ের সমষ্টি নির্ণয় করা হয়। ভূমি,শ্রম,মূলধন ও সংগঠন-উৎপাদনের এই চারটি উপাদানের আয় যথাক্রমে খাজনা,মজুরি, সুদ ও মুনাফা। এক বছরে কোনো দেশের জাতীয় আয় ঐ বছরে উৎপাদনের উপাদানসমূহের অর্জিত মোট খাজনা, মজুরি/বেতন, সুদ ও মুনাফার সমষ্টি।

সমাজের মোট ব্যয়ের ভিত্তিতেও মোট জাতীয় উৎপাদন নির্ণয় করা যায়। এই পদ্ধতি অনুসারে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে দেশের সমস্ত ধরনের ব্যয় যোগ করলে মোট জাতীয় উৎপাদনের আর্থিক মূল্য পাওয়া যায়। কোনো দেশের মোট আয় দু’ভাবে ব্যয়িত হয়-ক) ভোগ্যদ্রব্য ও সেবা কেনার জন্য এবং খ) বিনিয়োগ করার জন্য। ব্যয়কারীদের প্রধানত তিন শ্রেণিতে বিন্যাস করা যায়: দেশের সরকার, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং জনগণ। কোনো নির্দিষ্ট সময়ে, সাধারণত এক বছরে, সরাকারি, প্রাতিষ্ঠানিক এবং বেসরকারি ভোগ ব্যয় ও বিনিয়োগ ব্যয়ের সমষ্টি ঐ সময়ে ঐ দেশের মোট জাতীয় উৎপাদন।

মোট জাতীয় উৎপাদনকে অনেক সময় মোট জাতীয় আয় (GNI) বলা হয়। যে কোনো সরল অর্থনীতিতে মোট জাতীয় উৎপাদন ও মোট জাতীয় আয় একই হতে পারে। আমরা জানি, কোনো নির্দিষ্ট সময়ে কোনো দেশে উৎপাদিত মোট দ্রব্যসামগ্রী ও সেবার আর্থিক মূল্যের সমষ্টিকে মোট জাতীয় উৎপাদন বলে। কিন্তু এর সঙ্গে সমাজের মোট আয় বা মোট ব্যয়ের সমতা নাও হতে পারে। কারণ, উৎপাদন প্রক্রিয়া চালু রাখার জন্য ব্যবহৃত মূলধন সামগ্রী যেমন, কলকারখানা, যন্ত্রপাতি ইত্যাদির ক্ষয়ক্ষতি পূরণের জন্য মোট জাতীয় উৎপাদনের আর্থিক মূল্য থেকে কিছু অংশ পৃথক করে রাখা হয়। উৎপাদনের উপাদানসমূহের আয়ের মধ্যে এই অংশটি অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। তাই মোট জাতীয় উৎপাদননের আর্থিক মূল্য এবং উৎপাদনের উপদানসমূহের আয় (খাজনা, মজুরি, সুদ, ও মুনাফা) বা জাতীয় আয় এক নয়। তবে আলোচনার সুবিধার জন্য অনেক সময়ই মোট জাতীয় উৎপাদন ও মোট জাতীয় আয়কে সমার্থকভাবে ব্যবহার করা হয়।

মোট দেশজ উৎপাদন

মোট দেশজ উৎপাদন হচ্ছে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে, সাধারণত এক বছরে কোনো দেশের অভ্যন্তরে বা ভৌগোলিক সীমানার ভিতরে বসবাসকারী সকল জনগণ কর্তৃক উৎপাদিত চূড়ান্ত পর্যায়ের দ্রব্যসামগ্রী ও সেবাকর্মের অর্থমূল্যের সমষ্টি।

Gross Domestic Product (GDP)

এতে উক্ত সীমানার মধ্যে বসবাসকারী দেশের সকল নাগরিক ও বিদেশি ব্যক্তি, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত চূড়ান্ত পর্যায়ের দ্রব্যসামগ্রী ও সেবকর্মের মূল্য অন্তর্ভুক্ত হবে। তবে বিদেশে অবস্থানকারী ও কর্মরত দেশের নাগরিক/সংস্থা/প্রতিষ্ঠানের আয় অন্তর্ভুক্ত হবে না।

যদি X দ্বারা আমরা বিদেশে অবস্থানরত দেশি জনগণের আয় বুঝাই এবং M দ্বারা দেশে অবস্থানরত বিদেশিদের আয় বুঝাই তাহলে
(GNP)= (GDP)+(X-M)।

মাথাপিছু আয়

মাথাপিছু আয় হলো কোনো নির্দিষ্ট সময়ে কোনো দেশের নাগরিকদের গড় আয়।

মাথাপিছু আয় দুইটি পৃথক মান দ্বারা নির্ধারিত হয়: ১) মোট জাতীয় আয় এবং ২) মোট জনসংখ্যা।

মাথাপিছু আয়কে নিম্নলিখিতভাবে প্রকাশ করা যায়: মোট জাতীয় আয়/মোট জনসংখ্যা

মাথাপিছু আয় ব্যক্তির জীবনযাত্রার মান নির্ধারণ করে। উচ্চ মাথাপিছু আয় উন্নত জীবনমান নিশ্চিত করে। তবে জীবনমান নির্ধারণের উচ্চ মাথাপিছু আয়ের সাথে দ্রব্যমূল্যের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। যদি কোনো বছরে কোনো দেশের জনগণের মাথাপিছু আয় দ্বিগুণ হয়ে যায়, আবার একই সাথে দ্রব্যের মূল্যস্তরও দ্বিগুণ হয়, তাহলে প্রকৃতপক্ষে জীবনযাত্রার মান একই থাকবে। কারণ ঐ দ্বিগুণ আয় দিয়ে ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে একই পরিমাণ দ্রব্য ও সেবা ক্রয় করতে পারবে। অর্থাৎ তার আর্থিক আয় দ্বিগুণ হলেও তার প্রকৃত আয় বৃদ্ধি পায়নি। কারণ, আর্থিক আয় ও দ্রব্যমূল্য একই হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে মূল্যস্তর অপরিবর্তিত থেকে মাথাপিছু আয় বাড়লে জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি পাবে এবং মাথাপিছু আয় কমলে জীবনযাত্রার মান হ্রাস পাবে।

আবার, জাতীয় আয়ের বন্টন যদি সুষম না হয় তাহলে মাথাপিছু আয় বাড়লেও অধিকাংশ জনগণের জীবনমান নিচুই থাকে। কারণ, মাথাপিছু আয় একটি গড় মান। জনগণের একটি ক্ষুদ্র অংশের মাথাপিছু আয় অনেক বেশি অথচ বৃহদাংশের আয় অনেক কম হলেও উভয় অংশের মাথাপিছু আয়ের গড় মান এমন হতে পারে যাতে মনে হয় যে জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে। কিন্তু মোট জাতীয় আয়ের এইরকম অসম বণ্টন হলে বেশির ভাগ মানুষের মাথাপিছু আয় মাথাপিছু জাতীয় আয়ের চেয়ে কম হবে। ফলে এই অধিকাংশ মানুষের জীবনযাত্রাও উন্নত হবে না। তবে যে দেশে জাতীয় আয়ের সুষম বণ্টন আছে, সে সব দেশে মাথাপিছু আয় বাড়লে এবং মূল্যস্তর পরিবর্তিত থাকলে বা আয় বৃদ্ধির চেয়ে কম হারে বৃদ্ধি পেলে জীবন যাত্রার মানও বৃদ্ধি পাবে।

২০১২-১৩ অর্থ বছরে চলতি মূল্যে বাংলাদেশে মাথাপিছু জাতীয় আয় প্রায় ৭৪,৩৮০ টাকা এবং মার্কিন ডলের ৯২৩ ডলার। (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা, ২০১৩ অর্থ মন্ত্রণালয়)।

জাতীয় অর্থনীতির খাতসমূহ ও মোট দেশজ উৎপাদনে এগুলোর অংশ বা অবদান
অর্থনীতির খাত বলতে বোঝায় অর্থনীতির বিভিন্ন অংশ, বিভাগ বা শাখা। বিশ্বের যে কোনো অর্থনীতিকে প্রধান তিনটি খাতে ভাগ করা হয়: কৃষি,শিল্প ও সেবাখাত। ভূমি ও ভূমি থেকে উৎপন্ন সবকিছুই-শস্য ও ফলমূল, শাকসবজি, বনজ সম্পদ, পশু ও মৎস্যসম্পদ কৃষিখাতের অন্তর্গত। বৃহদায়তন ও ক্ষুদ্রায়তন শিল্প, সব ধরনের নির্মাণ, খনিজ দ্রবাদি সংক্রান্ত সকল কাজ শিল্পখাতের অন্তর্গত। অবশিষ্ট সকল কর্মকান্ড যেমন,-শিক্ষা-স্বাথ্য-বিনোদন, ব্যাংক-বীমা, হোটেল-রেস্তোরা, ডাক-তার, যোগাযোগ ও পরিবহন এসব কিছুই সেবা খাতের আওতাধীন। তবে বিভিন্ন দেশে বাজেট বরাদ্দের সুবিধা এবং কাজ করার সুবিধার জন্য এই তিনটি প্রধান খাতের প্রত্যেকটিকে আবার কিছু সংখ্যক খাতে ভাগ করা হয়। যে কোনো দেশের অর্থনীতিকে বেশ কিছু খাতে ভাগ করা যায়। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে মোট ১৫ টি প্রধান খাতে ভাগ করা হয়। এই ১৫ টি খাত হচ্ছে: ১) কৃষি ও বনজ ২) মৎস্য ৩) খনিজ ও খনন ৪) শিল্প ৫) বিদ্যুৎ,গ্যাস ও পানি সম্পদ ৬) নির্মাণ ৭) পাইকারী ও খুচরা বাণিজ্য ৮) হোটেল ও রেস্তোরাঁ ৯) পরিবহন,সংরক্ষণ ও যোগাযোগ ১০) আর্থিক প্রাতিষ্ঠানিক সেবা ১১) রিয়েল এস্টেট, ভাড়া ও অন্যান্য ব্যবসা ১২) লোক প্রশাসন ও প্রতিরক্ষা ১৩) শিক্ষা ১৪) স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা ১৫) কমিউনিটি, সামাজিক ও ব্যক্তিগত সেবা। তবে এই ১৫ টি খাতকে মোট ৫ টি বিস্তৃত খাতে সমন্বিত করা যায়। যেমন: কৃষি,শিল্প, সেবা, ব্যবসা ও সামাজিক সেবা।
#’কৃষি’খাতে রয়েছে’কৃষি ও বনজ’খাত। বৃহত্তর অর্থে’মৎস্য সম্পদ’ও কৃষিখাতের অন্তর্গত।
#‘শিল্পখাতের’মধ্যে রয়েছে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ শিল্প। তবে বৃহত্তর অর্থে’খনিজ ও খনন’’বিদ্যুৎ,গ্যাস ও পানি সম্পদ’এবং’নির্মাণ’-এই খাতগুলোকেও শিল্পখাতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
# হোটেল ও রেস্তোরাঁ; পরিবহন, সংরক্ষণ ও যোগযোগ; আর্থিক প্রাতিষ্ঠানিক (ব্যাক ও বিমা) সেবা ইত্যাদি’সেবা’খাতের অন্তর্ভুক্ত।
#’লোক প্রশাসন ও প্রতিরক্ষা’,‘শিক্ষা’, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা’’কমিউনিটি, সামাজিক ও ব্যক্তিগত’সেবা’এগুলো এ খাতের অন্তর্ভুক্ত।
#’পাইকারী ও খুচরা বাণিজ্য’এবং’রিয়েল এস্টেট, ভাড়াও অন্যান্য ব্যবসা’-এ দু‘টি খাত‘ব্যবসা’খাতের আওতায় পড়ে।
অর্থাৎ দেশের সমগ্র অর্থনীতিকে ১৫ টি খাতে বিন্যস্ত করা হলেও উপরের আলোচনার ভিত্তিতে আমরা এগুলোকে সমন্বিত করে ৫ টি প্রধান খাতে বিন্যস্ত করতে পারি।
২০১১-১২ অর্থবছরের মোট দেশজ উৎপাদনে খাতওয়ারী অংশ বা অবদান হিসাবে উক্ত ৫টি সমন্বিত খাতের মধ্যে সবচেয়ে উপরে রয়েছে’শিল্প’খাত। এর অবদান ৩১.১৩ শতাংশ। এরপরে আসে’ব্যবসা’খাত। এর অবদান ২১. ১০ %। তৃতীয় স্থানে রয়েছে কৃষিখাত। মোট দেশজ উৎপাদন এর অংশ ১৯.৪১ %। চতুর্থ ও পঞ্চম স্থানে রয়েছে যথাক্রমে’সামাজিক সেবা’ও’সেবা’খাত-এদের অংশ যথাক্রমে ১৪.৮০% ও ১৩.৫৮%।
কয়েকটি দেশের জিএনপি, জিডিপি ও মাথাপিছু আয়ের তুলনা
আমরা জানি, যে কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রধান সূচক সে দেশের জনগণের মাথাপিছু আয়। তবে একটি দেশ উন্নত, অনুন্নত নাকি উন্নয়নশীল, তা নির্ধারণের জন্য মাথাপিছু জাতীয় আয় বা মাথাপিছু ছাড়াও আরও বেশ কিছু বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন। যেমন, অর্থনীতির প্রকৃত অর্থাৎ অর্থনীতি কৃষি প্রধান না কি এর শিল্পায়ন ঘটেছে, স্বাক্ষরতা বা শিক্ষার হার, জনগণের কাছে স্বাস্থ্য সেবার প্রাপ্যতা, অর্থনৈতিক অবকাঠামোর ঊর্ধ্বমুখী উন্নয়ন ঘটেছে কিনা অর্থাৎ পরিবহন,যোগাযোগ সুবিধা এবং মূলধন গঠন ও বিনিয়োগের হার ঊর্ধ্বমুখী কিনা এসবও বিবেচ্য বিষয়।
তবে বিশ্বব্যাংক মাথাপিছু মোট জাতীয় আয়ের ভিত্তিতে পৃথিবীর দেশগুলোকে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করেছে। এগুলো হচ্ছে: উচ্চ আয়ের দেশ,মধ্য আয়ের দেশ এবং ননিম্ন আয়ের দেশ। মধ্য আয়ের দেশগুলোকে আবার দুভাগে ভাগ করা হয়েছে: উচ্চ মধ্য আয়ের দেশ এবং ননিম্ন মধ্য আয়ের দেশ। নিচে আয়ভিত্তিক শ্রেণিগুলো দেখানো হলো:
বিশ্বের দেশসমূহের আয়ভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস এবং মাথাপিছু মোট জাতীয় আয়ের ভিত্তিতে কতিপয় দেশের শ্রেণিবিন্যাস অপর পৃষ্ঠায় দেখানো হলো: চিত্র:
উচ্চ আয়ের দেশসমূহ উন্নত দেশ হিসেবে স্বীকৃত। উন্নয়ন প্রক্রিয়া শীর্ষ পার্যায়ে পৌছানোর ফলেই এসব দেশ এই উন্নত অবস্থা অর্জন করেছে। এসব দেশের মাথাপিছু আয় এমন যে জনগণের সকল মৌলিক চাহিদা পূরণের পরও প্রচুর অর্থ উদ্বৃত্ত থাকে-যা সঞ্চয় ও মূলধন গঠনে ব্যয় হয়। এসব দেশ উদ্বৃত্ত অর্থ দিয়ে অধিকতর উন্নয়ন কার্যক্রম চালায় এবং যুক্তরাজ্য, অন্যান্য ইউরোপীয় দেশ, এশীয় দেশসমূহের মধ্যে জাপান, সিংগাপুর”উচ্চ আয়ের দেশ”শ্রেণিভুক্ত। ২০১০ সালে এসব দেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় ছিল ৩৮৫৪০ ডলার থেকে ৮৫৩৮০ ডলারের মধ্যে।
‘মধ্য আয়ের দেশ’সমূহ সাধারণত উন্নয়নশীল দেশ। তবে মধ্য আয়ের ২ টি ভাগের মধ্যে’উচ্চ মধ্য আয়ের দেশ’গুলোর অবস্থান উন্নত।
এসব দেশের জনগণের মৌলিক চাহিদা অনেকটাই পূরণ হয়েছে। দেশগুলো দ্রুত শিল্পায়িত হচ্ছে এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো সামাজিক অবকাঠামোর দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী উন্নয়ন ঘটেছে। তবে উন্নত দেশগুলোর সমপর্যায়ে পৌছাতে এসব দেশকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। উপরের সারণিতে অন্তর্ভুক্ত’উচ্চ মধ্য আয়ের‘র দেশগুলোর জনগণের মাথাপিছু আয় ৪২১০ ডলার থেকে ৯৫০০ ডলার পর্যন্ত। এদেশগুলোর মধ্যে রয়েছে চীন ও ইরান, মালয়েশিয়া, তুরস্ক, থাইল্যান্ড।’মধ্য আয়ের দেশ’শ্রেণির নিচের ধাপে রয়েছে ননিম্ন মধ্য আয়ের দেশ। এগুলোও উন্নয়নশীল দেশ। সারণিতে’ননিম্ন মধ্য আয়ের দেশ’হিসেবে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, মিশর, নাইজেরিয়া এই পাঁচটি এশীয় ও আফ্র্রিকান দেশ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এসব দেশের জনগণের মাথাপিছু আয় ১০৫০ ডলার থেকে ২৩৪০ ডলার পর্যন্ত। মাথাপিছু জাতীয় আয়ভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসের সবচেয়ে নিচে রয়েছে’ননিম্ন আয়ের দেশ’। এ দেশগুলোকে কোনো কোনো সময় উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আখ্যায়িত করা হলেও মূলত এগুলো অনুন্নত দেশ। তবে এসব দেশের অধিকাংশেই উন্নয়নের ধারা শুরু হয়েছে বেশ কিছুকাল থেকেই। পরিকল্পিত অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে দেশগুলো কিছুটা উন্নয়নও অর্জন করেছে। সেজন্য অনেক ক্ষেত্রেই এদেশগুলোকে অনুন্নত না বলে স্বল্পোন্নত দেশ বলা হয়। সারণিতে এই শ্রেণিতে এশীয় দেশের মধ্যে নেপাল, বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া ও আফ্রিকান দেশের মধ্যে কেনিয়া এবং উগান্ডাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এসব দেশের জনগণের মাথাপিছু আয় অত্যন্ত কম। সারণিতে অন্তর্ভুক্ত’ননিম্ন আয়ের দেশ’সমূহের মাথাপিছু আয় ৪৯০ ডলার থেকে ৭৮০ ডলারের মধ্যে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির বৈশিষ্ট্যসমূহ
কোনো দেশের অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য প্রধানত সে দেশের অর্থনীতির প্রকৃতির উপর নির্ভর করে। অর্থনীতির প্রকৃতি আবার দেশের ভূ-প্রকৃতি, প্রাকৃতিক সম্পদ, জনগণের শিক্ষা ও দক্ষতার স্তর এবং তাদের উদ্যম ও উদ্যোগ গ্রহণের মানসিকতা এ সবকিছুর উপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের অর্থনীতি অতি প্রাচীন কাল থেকেই একটি কৃষিপ্রধান বা কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি হিসেবে পরিচিত। এ পাঠে আমরা বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলোর সম্পর্কে জানব।
১. কৃষিপ্রধান অর্থনীতি: অতি প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের অর্থনীতি কৃষিপ্রধান অর্থনীতি হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোত দেশের অর্থনীতিতে শিল্পখাতের গুরুত্ব ক্রমশ: বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনে মৎস্য খাতসহ কৃষিখাতের অবদান প্রায় ২০ শতাংশ। দেশের শ্রমশক্তির মোট ৪৩.৬ শতাংশ কৃষিখাতে নিয়োজিত। দেশের রপ্তানি আয়েও কৃষিখাতের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। খাদ্যশস্য কৃষিখাতের অন্যতম প্রধান উৎপন্ন দ্রব্য। বিগত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন ক্রমবর্ধমান এবং জনসংখ্যাও ক্রমবর্ধমান হওয়া সত্ত্বেও দেশটি ক্রমশ: খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠেছে। এয়াড়া আমাদের শিল্পখাতের অনেক শিল্পের কাঁচামালের যোগান দেয় আমাদের কৃষি খাত। যেমন, পাট শিল্প, চা ও চামড়া শিল্প ইত্যাদি। এসব কারণেই কৃষিখাত এখন পর্যন্ত দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে বিবেচিত।
নিচের সারণিতে বাংলাদেশের ১৯৯০-৯১ থেকে ২০১২-১৩ সাল পর্যন্ত সময়কালে খাদ্যশস্য উৎপাদনের পরিমাণ দেখানো হলো। লক্ষণীয় যে এই উৎপাদন ক্রমবর্ধমান।চিত্র:
২. কৃষিখাতের প্রকৃতি: কৃষিখাতে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ খাত। এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তিস্বরূপ। তবে এত গুরুত্বপূর্ণ হলেও কৃষি উৎপাদন প্রণালি এষনও পর্যন্ত সম্পূর্ণ আধুুনিক হয়ে ওঠেনি। চাষাবাদের আওতাধীন জমির বৃহদাংশে এষনও পর্যন্ত সনাতন পদ্ধতির চাষাবাদ চলছে। এর ফলে কৃষিজমির উৎপাদনশীলতাও কম।
এছাড়া এদেশের কৃষি প্রকৃতিনির্ভর। বৃষ্টিপাতের সময় ও পরিমাণ কৃষি উৎপাদনের উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। যথাসময়ে প্রয়োজনীয় পরিমাণ বৃষ্টিপাত না হলে বা অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হলে উৎপাদন বিপুল পরিমাণে কমে যায়।
কৃষিখাতের আরেকটি বড় ত্রুটি হলো কৃষক বা কৃষি মজুরদের ন্যায্য মজুরি দেওয়া সবক্ষেত্রে নিশ্চিত করা যায় না। এছাড়া পরিবহন সুবিধার অপ্রতুলতা ও বাজার ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে প্রকৃত উৎপাদকেরা অনেক ক্ষেত্রেই উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পায় না। এ বিষয়টি দেশের সমগ্র কৃষি ক্ষেত্রে একটি বিরূপ প্রভাব ফেলে।
৩. শিল্পখাতের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব ও অবদান: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে শিল্পখাতের গুরুত্ব ও অবদান ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৯৮০-৮১ অর্থবছরে স্থির মূল্যে জিডিপিতে শিল্পখাতের অবদান ছিল ১৭.৩১ শতাংশ। ২০১১-১২ অর্থবছরে এ খাতের অবদান ৩১% এর বেশি। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, বৃহৎ শিল্প, খনিজ ওষনন, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানি সরবরাহ এবং নির্মাণ এ খাতগুলোর সমন্বয়ে শিল্পখাত গড়ে উঠেছে।
৪. শিল্পখাতের প্রকৃতি: মোট দেশজ উৎপাদনে শিল্পখাতের অবদান ক্রমবর্ধমান হলেও আমাদের শিল্পখাতে মৌলিক ও ভারী শিল্পের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। সার কারখানা, চিনি ও খাদ্যশিল্প, বস্ত্র শিল্প, পাটশিল্প, চামড়া শিল্প, তৈরি পোশাক শিল্প দেশের প্রধান প্রধান শিল্পের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু অর্থনীতির উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে হলে দ্রুত শিল্পায়ন প্রয়োজন। এজন্য ভারী বা মৌলিক শিল্প যেমন, লৌহ ও ইস্পাত শিল্প, অবকাঠামোর জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি শিল্প ইত্যাদি অত্যাবশ্যক। দেশে ভারী যানবাহন সংযোজন, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও জলযান নির্মাণ এবং মেরামত এসব শিল্প রয়েছে কিন্তু পয়োজনের তুলনায় এগুলোও অপ্রতুল।
৫. জনসংখ্যাধিক্য ও শিক্ষার ননিম্নহার: বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য এর জনসংখ্যাধিক্য। এদেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৫ কোটি। জনবসতির ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি-প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১০১৫ জন। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারও বেশি ১.৩৭ %(আদমশুমারি রিপোর্ট, ২০১১)। তবে বাংলাদেশ জনসংখ্যাধিক্যের দেশ হলেও জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ক্রমহ্রাসনাম। ১৯৯১ ও ২০০১ সালে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল যথাক্রমে ২.১৭% ও ১.৪৮%। এ হার ক্রমশ হ্রাস পেয়ে ২০১১ সালে ১.৩৭ % এ দাঁড়িয়েছে (আদম শুমারি রিপোর্ট, ২০১১)।
তবে বাংলাদেশে জনসংখ্যার ঘনত্ব ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার উভয়ই তার প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে অনেক বেশি। ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট (ওয়াল্ড ব্যাংক, ২০১২) অনুসারে, ভারত, পাকিস্তান, মায়ানমার, মালয়েশিয়া এসব দেশে ২০০৯ সালে জনসংখ্যার ঘনত্ব ছিল প্রতি বর্গকিলোমিটারে যথাক্রমে ৩৮৯, ২২০, ৩২৪, ৭৭ ও ৮৪ জন। আর এ দেশগুলোতে ২০০-১০ সময়কালে জনসংখ্যা বৃদ্ধির বার্ষিক গড় হার ছিল যথাক্রমে ১.৪% ২.৩ %, ০.৯%, ০.৮% ও ১.৮%। জনসংখ্যাকে দেশের সম্পদ হিসেবে বিবেচন করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশে জনসংখ্যা এখন পর্যন্ত একটি সমস্যা। এর কারণ বাংলাদেশে স্বাক্ষরতার হার (৭ বছর +)মাত্র ৫৭.৯ (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৩)। অর্থাৎ ৪৩ শতাংশ জনগণ নিরক্ষর। নিরক্ষর জনগোষ্ঠীকে সাক্ষর করা, প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া, এদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা, কর্মক্ষেত্রে উদ্যোগী করে তোলা, মূলধনের জোগান দেয়া, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা ইত্যাদি রাষ্ট্রের জন্য একটি বড় চাপ সৃষ্টি করেছে।
৬. ব্যাপক বেকারত্ব: জনসংখ্যাধিক্য এবং দ্রুত শিল্পায়নের অভাব দেশে বেকারত্বের জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশে মোট শ্রমশক্তির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বেকার। দেশে মজুরির হার কম বলে দিনমজুরদের অধিকাংশকে অর্ধ বেকার হিসেবে গণ্য করা যায়।
৭. স্বল্প মাথাপিছু আয় ও জীবনযাত্রার ননিম্নমান: মজুরির ননিম্নহার, ব্যাপক বেকারত্ব ও অর্ধবেকারত্বের ফলে জনগণের গড় আয় অর্থাৎ মাথাপিছু আয় কম। বর্তমানে (২০১২-১৩) মাথাপিছু জাতীয় আয় ৯২৩ মার্কিন ডলার। এই আয় প্রতিবেশি দেশগুলোর চেয়েও কম। পাকিস্তান, শ্রীলংকা, ভারতে মাথাপিছু আয় যথাক্রমে ১০৫০, ২২৯০, ১৩৪০ ডলার (ওয়ার্ল্ড ডেভলপমেন্ট রিপোর্ট, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক,২০১২)। ননিম্ন মাথাপিছু আয়ের কারণে জীবনযাত্রার মানও ননিম্ন। দেশের ৩১ শতাংশ অর্থাৎ দুই-পঞ্চমাংশ জনগণের অবস্থান দারিদ্র্য সীমার (ঊর্ধ্বে দারিদ্রসীমার ভিত্তিতে) নিচে। (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা, অর্থমন্ত্রণালয়, ২০১৩)
৮. সঞ্চয়,মূলধন গঠন ও বিনিয়োগের ননিম্নহার: মাথাপিছু আয় ননিম্ন হওয়ায় জনগণের সঞ্চয়ের হার কম (জিডিপির ২৮.৪০%)। তাই মূলধন বা পুঁজি গঠনের এবং উৎপাদনের জন্য বিনিয়োদের হারও কম(জিডিপির ২৬.৮৪%)(বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা, ২০১৩)। আবার বিনিয়োগের ননিম্নহারের কারণে নতুন শিল্প স্থাপনের গতি মন্থর। ফলে নতুন কর্মসংস্থানের হারও কম। বাংলাদেশ এমনই একটি দারিদ্র্র্যের চক্রের মধ্যে আবদ্ধ। তবে এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সরকার পরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
৯. অবকাঠামোর দুর্বলতা: অবকাঠামো প্রধানত দুইভাগে ভাগ করা হয়। সামাজিকও অর্থনৈতিক অবকাঠামো। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিনোদন ইত্যাদি সামাজিক অবকাঠামোর অন্তর্ভুক্ত। যোগাযোগ ব্যবস্থা যেমন ডাক ও টেলিযোগাযোগ, ইলেকট্রনিক যোগাযোগ), পরিবহন (স্থল, পানি ও আকাশপথে), আর্থিক প্রতিষ্ঠান যেমন, ব্যাংক, বীমা, এবং শিল্পের জন্য ঋণদানকারী অন্যান্য প্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎ, পানি ও জ্বালানি সরবরাহ, বাঁধ ও সেচ ব্যবস্থা ইত্যাদি অর্থনৈতিক অবকাঠামোর অন্তর্ভুক্ত।
এই আর্থসামাজিক অবকাঠামো অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তিস্বরূপ। অবকাঠামো উন্নত না হলে উন্নয়ন কর্মকান্ড শুরু করা যায় না। বাংলাদেশে এই অবকাঠামো অনুন্নত ও অপর্যাপ্ত।
১০. বৈদেশিক সাহায্য নির্ভরতা: আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের উপর বাংলাদেশ অতিমাত্রায় নির্ভরশীল ছিল। তবে বিগত প্রায় ১ দশক ধরে বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণের পরিমাণ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আর বৈশ্বিক বিভিন্ন পরিবর্তনজনিত কারণে বৈদেশিক উৎস হতে ঋণ ও অনুদান প্রাপ্তি ক্রমশ কমে আসছে।
১১. বৈদেশিক বাণিজ্য: বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রধানত স্বল্পমূল্যের কৃষিজাত পণ্য, চা, কাঁচাপাট শিল্প পণ্যের মধ্যে তৈরি পোশাক ও নীটওয়্যার, চামড়া, পাটজাত দ্রব্য, সিরামিক দ্রব্যাদি এবং শ্রমিক রপ্তানি করে। কিন্তু বাংলাদেশের আমদানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে উচ্চমূল্যের মূলধন সামগ্রী যেমন, কলকব্জা, যন্ত্রপাতি জ্বালানি ও পেট্রোলিয়াম এবং খাদ্য ও বিলাস দ্রব্য (রঙিন টেলিভিশন, গাড়ি, প্রসাধন সামগ্রী ইত্যাদি)। এর ফলে আন্তর্জাাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে প্রতিকূল অবস্থা বিরাজ করছে। বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরেই রপ্তানি আয় আমদানি ব্যয়ের চেয়ে কম। ফলে বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় ধরে ঘাটতি অব্যাহত রয়েছে।,
১২. প্রাকৃতিক ও মানবসম্পদের অপূর্ণ ব্যবহার: বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে এর অত্যন্ত উর্বর কৃষিজমি, নদ-নদী, প্রাকৃতিক জলাশয় এবং ভূগর্ভস্থ খনিজসম্পদ। খনিজ সম্পদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাস,চুনাপাথর,সিলিকা, বালু, সাদা মাটি, চীনা মাটি,কঠিন শিলা।
প্রধানত যথাযথ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং দক্ষতা ও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি জনগোষ্ঠী মানবসম্পদে রূপান্তিরিত হয়। বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ এষনও শিক্ষাও স্বাস্থ্য সুবিধা বঞ্চিত। ব্যাপকা বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের কারণে জনগণের বৃহত্তর অংশ খাদ্যাভাব ও পুষ্টিহীনতার শিকার। তেমনিভাবে বিজ্ঞান শিক্ষা, কারিগরি ও প্রযুক্তি শিক্ষার বিস্তার ঘটেনি। এনসব কারণে বাংলাদেশের জনগনের বৃহত্তর অংশকেই মানবসম্পদে রূপান্তর করা এখনও সম্ভব হয়নি। এর ফলে প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদের সম্পূর্ণ পরিমাণ জানা ও এগুলোর পূর্ণ ব্যবহারও এখন পর্যন্ত সম্ভব হয়নি।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রসরতার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবন্ধকতাসমূহ
উপরের আলোচনা থেকে আমরা বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে জেনেছি। আমরা দেখিছি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষি একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত, তবে শিল্পখাত ক্রমশ সম্প্রসারিত হচ্ছে। দেশের সামাজিক অর্থনৈতিক অবকাঠানো অপর্যাপ্ত ও অনুন্নত। জনসংখ্যাধিক্য, শিক্ষার ননিম্নহার ও বেকারত্ব দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান সমস্যা। আমরা আরও জেনেছি যে, দেশের ব্যাপক জনগণ দরিদ্র এবং সে কারণে জীবনযাত্রার মান নিচু। এ অবস্থা বা বৈশিষ্ট্যগুলো থেকেই আমরা এ পাঠে অর্থনীতির অগ্রসরতার প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করব।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অনগ্রসরতার মূল কারণ নিহিত রয়েছে আমাদের ইতিহাসের মধ্যে। আমাদের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ যে অর্থনৈতিকভাবে এত অনগ্রসর এবং সমস্যা জর্জরিত, তার দুই শতাব্দীকাল বিস্তৃত একটি পটভূমি রয়েছে। এই পটভূমি রচিত হয়েছে প্রায় দু’শো বছরব্যাপী ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন এবং ২৪ বছরের পাকিস্তানী শাসন আমলে।্
উক্ত চাহিদা পূরণের জন্য সরকারের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন,বিতরণ ও সঞ্চালন আইন সমূহের প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়ন বিভিন্ন ধাপে রয়েছে। বর্তমান পরিকল্পনা অনুসারে ২০১৩ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে প্রায় ১২৯০০ মেগাওয়াট ক্ষমাতার বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে আশা করা যায়।
দেশের ক্রমবর্ধমান গ্যাস চাহিদার কথা বিবেচনা করে মধ্যম ও দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় ২০১৫ সালের শেষে দৈনিক ২৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এছাড়াও ২০১৩ সাল নাগাদ গ্যাস আমদানির পদক্ষেপও গ্রহণ করা হয়েছে।
স্থল, রেল ও নৌপথ উন্নয়ন ও স ম্প্রসারণের লক্ষ্যে সরকারের সংস্কার কার্যক্রম ও বিভিন্ন মেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে।
যোগাযোগের ক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে বাংলাদেশের অর্ধেকেরও বেশি মানুষের মোবাইল আছে। তথ্য প্রযুক্তিতে দেশকে অগ্রগামী করে তুলতে সরকার নানাবিধ উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে আসছে। সরকার দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে তথ্য ও যোগযোগ প্রযুক্তিকে চালিকা শক্তি হিসেবে গণ্য করে”রূপকল্প ২০২১”এর মাধ্যমে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে উন্নীত করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।
সামাজিক অবকাঠামোর দুর্বলতার মধ্যে ব্যাপক জনগণের (৪৩%) নিরক্ষরতা, শিক্ষাক্রমে শিক্ষার্থীদের নানারকম দক্ষতা অর্জনের ব্যবস্থা না থাকা, শ্রমিকদের কারিগরি ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও দক্ষতার অভাব, জনসংখ্যাধিক্য ও এর ফলে সৃষ্ট বেকারত্ব, শিক্ষা ও অন্যান্য সকল সামাজিক ক্ষেত্রে সমাজের পশ্চাৎপদতা এবং তাদের ক্ষমতায়নের অভাব, জনগণের স্বাস্থ্যসেবার অপর্যাপ্ততা ইত্যাদি প্রধান। এসব বাধা অপসারণ করার লক্ষ্যে একটি নীতিগত ভিত্তি গড়ে তোলা হয়েছে।’জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০’,’স্বাস্থ্য, পুুষ্টি ও জনসংখ্যা সেক্টর কর্মসূচি’. এবং’প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচির দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ের বহুমুখী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে:
•প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় ছাত্র ভর্তি ও উপস্থিতির হার বৃদ্ধি এবং ঝরে পড়া রোধে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ।
•নারীর রাজনৈতিক, সামাজিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা।
•নারী শিক্ষা প্রসারের লক্ষ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ছাত্রি উপবৃত্তি প্রদান এবং বেতন মওকুফ সুবিধা প্রদান।
•২০১৪ সালের মধ্যে নিরক্ষরতা দূরীকরণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিদ্যালয়ে ভর্তি, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা, উপবৃত্তি বৃদ্ধির প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দান।
•প্রাথমিক শিক্ষার জন্য উপবৃত্তির সুবিধাভোগীর সংখ্যা ৪৮ লক্ষ থেকে ৭৮ লক্ষে উন্নীত করা।
•বিদ্যালয়বিহীন গ্রামে বিদ্যালয় স্থাপন।
•বিনামূল্যে শিক্ষর্থীদের নতুন পাঠ্যপুস্তক বিতরণ।
•বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষায় নিয়োজিত শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান, স্কুলসমূহে তথ্য প্রযুক্তি শিক্ষা প্রবর্তন ও সম্প্রসারণের ব্যবস্থা।
•কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসারের লক্ষ্যে মাদ্রাসাসহ মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের বিদ্যালসমূহে ভোকেশনাল কোর্সে অন্তর্ভুক্তকরণ।
•মাধ্যমিক শিক্ষাকে জীবন ও কর্মমুখি করার লক্ষ্যে শিক্ষাক্রমে জীবন দক্ষতাসহ বিভিন্ন দক্ষতা অন্তর্ভুক্তকরণ।
• স্বাস্থ্য সেবাকে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌছে দেবার লক্ষ্যে কমিউনিটি ক্লিনিকসমূহে স্বাস্থ্য, পরিবার কল্যাণ ও পুষ্টি সেবা প্রদানের ব্যবস্থা।
•তিন স্তর বিশিষ্ট (কমিউনিটি,ইউনিয়ন ও উপজেলা) উপজেলা স্বাস্থ্য ব্যবস্থা প্রবর্তন এবং একই সাথে জেলা স্বাস্থ্য ব্যবস্থা প্রবর্তন।
৫. প্রকৃতিসৃষ্ট প্রতিবন্ধকতা দূর করার জন্য পদক্ষেপসমূহ:
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য দেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠেছে। সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ বিভাগ,এর অধীনস্থ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ব্যুরো ও আবহাওয়া অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড ইত্যাদি সংস্থা বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস প্রদান করে থাকে। বহুসংখ্যক এনজিও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় কাজ করছে। ত্রাণ ও পুনর্বাসন,খাদ্য,জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরসমূহ, পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সাথে জড়িত। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ বিভানগ’কম্প্রিহেনসিভ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম (সিডিএমপি)’শীর্ষক প্রকল্পের ২য় পর্যায় ২০১০-১৪ মেয়াদে বাস্তবায়ন করছে। এর আওতায় দুর্যোগ সম্পর্কে আগাম সতর্কীকরণ, দুর্যোগের জন্য পূর্ব প্রস্তুতি, ঝুঁকি হ্রাস, দুর্যোগ মোকাবিলায় জনগণের সক্ষমতা বৃদ্ধি ইত্যাদি পদক্ষেপ গৃহীত ও বাস্তবায়িত হচ্ছে। তবে এসকল পদক্ষেপ বাস্তবায়নের জন্য দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন প্রতিষ্ঠা এবং সু-শাসন নিশ্চিত করতে হবে।
উন্নত, অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশ ও এসব দেশের অর্থনীতি
কোনো দেশের অর্থনীতির উন্নত, অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল অবস্থা বুঝতে হলে প্রথমে আমাদের জানতে হবে অর্থনৈতিক উন্নয়ন কাকে বলে।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারণা
উন্নয়ন হচ্ছে অন্তর্নিহিত শক্তির বিকাশ সাধন। উন্নয়ন বলতে আমরা সার্বিক মানোন্নয়নও বুঝি। দেশের সম্পদ ও সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে সার্বিক আর্থসামাজিক সমৃদ্ধি ও বিকাশ সাধনকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বলা যায়। সম্পদ বলতে দেশের প্রাকৃতিক ও মানবসম্পদ উভয়কে বোঝায়। এই উন্নয়ন অর্জনের প্রক্রিয়ায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাহায্য-সহযোগিতা ও সমর্থনেরও প্রয়োজন হয়।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন
অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্বন্ধে সঠিক ধারণা পেতে হলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিষয়টি বুঝতে হবে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এ দুটিকে অনেক সময় একই অর্থে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এ দুটি এক নয়, কিছুটা পার্থক্য আছে।
কোনো দেশের জাতীয় আয়ের বার্ষিক বৃদ্ধির হারকে প্রবৃদ্ধির হার বলা হয়। প্রবৃদ্ধি হার হচ্ছে জাতীয় আয়ের পরিবর্তনের হার। কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নয়ন প্রবৃদ্ধির হারের সাথে জনসংখ্যা ও দ্রব্যমূল্যস্তর বিবেচনায় নেয় এবং প্রকৃত মাথাপিছু আয়ের বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনা করে।
কোনো দেশের প্রবৃদ্ধির হার যদি ২% হয় এবং সে দেশের জনসংখ্যাও যদি ২ % হারে বৃদ্ধি পায়, তাহলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটছে বলা যাবে না। কারণ, প্রবৃদ্ধির হার ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার একই হলে মাথাপিছু আয় একই থাকবে। যদি প্রবৃদ্ধির হার জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারের চেয়ে বেশি হয়, তাহলেই মাথাপিছু আয় বাড়বে এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটছে বলা যাবে। তবে এর সাথে দ্রব্যমূল্যস্তর পরিবর্তনের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
ধরা যাক, কোনো নির্দিষ্ট বছরে কোনো দেশের জনগণের মাথাপিছু আয় ৫% বেড়েছে। একই সময়ে সে দেশের দ্রব্যমূল্যও ৫% পেয়েছে। এক্ষেত্রে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও জনগণ পূর্বাপেক্ষা অধিকতর দ্রব্য ও সেবা ক্রয় করতে পারবে না। অর্থাৎ তাদের আর্থিক আয় বৃদ্ধি পেলেও তাদের প্রকৃত আয় বাড়েনি। এমতাবস্থায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জিত হয়েছে বলা যাবে না। দ্রব্যমূল্য স্থির থেকে যদি মাথাপিছু আয় বাড়ে অথবা বৃদ্ধির হার মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির হার অপেক্ষা কম হয়, তাহলেই প্রকৃত মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পাবে। প্রকৃত মাথাপিছু আয় দীর্ঘ সময় ধরে অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকলে তবেই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটছে বলা যাবে।
কোনো দেশের মোট জাতীয় উৎপাদন বা আয় বৃদ্ধির সাথে দীর্ঘ সময় ধরে মাথাপিছু প্রকৃত আয়ের বৃদ্ধিকে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বলে। এই অব্যাহত প্রকৃত আয় বৃদ্ধি তখনই সম্ভব যখন কোনো দেশের অর্থনৈতির কাঠামোগত এবং প্রকৃতিগত পরিবর্তন ঘটে। অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনের মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক অবকাঠামোর পরিবর্তন এবং উৎপাদন ও বন্টন প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন।
অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনের আওতায় ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণদান কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়, পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নততর হয়। দ্রব্য ও সেবার বিপণন ব্যবস্থায় উন্নয়ন ঘটে। একই সাথে উৎপাদনে উন্নততর প্রযুক্তি ও কৌশল ব্যবহৃত হয়, ফলে শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পেয়ে উৎপাদনের পরিমাণ বেড়ে যায়। উৎপাদিত সম্পদ বা জাতীয় আয় বণ্টনে বৈষম্য বা অসমতা ক্রমশ হ্রাস পেতে থাকে। ফলে উৎপাদনের উপাদানসমূহ বিশেষত শ্রমিক তার ন্যায্য পারিশ্রমিক বা মজুরি লাভ করে। এতে জনগনের সার্বিক কল্যাণ বৃদ্ধি পায়।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ্য দেশের জনগণের সর্বাধিক কল্যাণ। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি ও আয়ের সুষম বণ্টন এই কল্যাণ নিশ্চিত করে।
এছাড়া সামাজিক অবকাঠামোরও পরিবর্তন ঘটে। এর ফলে সুশাসনের সুফ, শিক্ষার সুযোগ এবং স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা সকল জনগণের কাছে পৌছে যায়। এতে জনগণের জীবন মানে উন্নয়ন ঘটে। জনগণ উন্নত জীবনযাত্রার সুবিধা উপলব্ধি করে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমে যায়।
অর্থনৈতিক প্রকৃতিগত পরিবর্তন বলতে কৃষিপ্রধান অবস্থা থেকে শিল্প প্রধান অর্থনীতিতে পরিণত হওয়াকে বোঝায়। এর ফলে দেশ গ্রামীণ অর্থনীতি থেকে শহরভিত্তিক অর্থনীতি ও সমাজ ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয়। জনগণের আয় বৃদ্ধি পায়। সঞ্চয় ও মূলধন গঠনের হার এবং বিনিয়োগও বৃদ্ধি পায়। ফলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায়, বেকারত্ব হ্রাস পায় এবং উৎপাদন আরও বৃদ্ধি পায়। জীবনযাত্রার মানে ক্রামগত উন্নতি হতে থাকে। এই সার্বিক উন্নত অবস্থাকে অবস্থাকে বলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন।
উপরের আলোচনা থেকে আমরা বলতে পারি যে, প্রবৃদ্ধির হারের তুলনায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন একটি গভীরতর, বিস্তৃততর ও বহুমাত্রিক বিষয়।
কোনো দেশের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামোর ক্রমাগত উন্নয়ন ও অর্থনীতির প্রকৃতিগত পরবর্তনের ফলে দীর্ঘ সময় ধরে সে দেশের জনগণের মাথাপিছু প্রকৃত আয় বৃদ্ধি পেতে থাকলে এবং আয়ের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা হলে এই অবস্থাকে বলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন।
উন্নয়নের মাত্রার ভিত্তিতে বিশ্বের দেশসমূহকে তিনটি ভাগে বিন্যস্ত করা হয়: উন্নত দেশ, অনুন্নত দেশ, ও উন্নয়নশীল দেশ।
উন্নত দেশ
অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটেছে এবং এই উন্নয়ন দীর্ঘ মেয়াদে অব্যাহত আছে এমন দেশকে বলে উন্নত দেশ। উন্নত দেশসমূহের জনগণের মাথাপিছু আয় খুব বেশি। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির হারও বেশি এবং সে কারণে জীবনযাত্রা অত্যন্ত উন্নত। এসব দেশে আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো অত্যন্ত উন্নত, শিল্পখাত সম্প্রসারিত, পরিবহন ও যোগযোগ ব্যবস্থা উন্নত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অর্থনীতির অনুকূল। দেশের সকল জনগণের আবাসন, শিক্ষাসুবিধা এবং ব্যবস্থা সেবা নিশ্চিত করা হয়। শিক্ষার প্রসারের ফলে জ্ঞান বিজ্ঞানও দ্রুত প্রসার লাভ করে এবং নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপীয়,দেশসমূহ যেমন, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানী, সুইজারল্যান্ড, নেদারল্যান্ড, সুইডেন, নরওয়ে, এশীয় দেশসমূহের মধ্যে জাপান ইত্যাদি বিশ্বের উন্নত দেশ। এসব দেশের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। যেমন
১. জীবনযাত্রার উচ্চমান: উন্নত দেশসমূহের প্রধান লক্ষণ হলো এসব দেশের জনগণের মাথাপিছু আয় অত্যন্ত বেশি এবং তাদের জীবনযাত্রার মানও অত্যন্ত উঁচু। ২০১০ সালে বিশ্বের প্রধান কয়েকটি উন্নত দেশের জনগণের মাথাপিছু আয় ছিল বার্ষিক ৪০,০০০ মার্কিন ডলার থেকে ৮৫,০০০ মার্কিন ডলারের মধ্যে।
২. শিল্পায়িত অর্থনীতি: উন্নত দেশগুলোর অর্থনীতি শিল্পনির্ভর। দ্রুত শিল্পায়নের ফলেই এসব দেশ উন্নতি অর্জন করেছে। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি থেকে এসব দেশ শিল্পপ্রধান দেশে পরিণত হয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প থেকে এসব দেশে ক্রমে মৌলিক ও বৃহদায়তন শিল্পের প্রসার ঘটেছে।
৩. সঞ্চয়, মূলধন গঠন ও বিনিয়োগের উচ্চ হার: উচ্চ মাথাপিছু আয়ের কারণে ভোগব্যয় করার পরও জনগণের কাছে উদ্বৃত্ত আয় থাকে যা সঞ্চয় হিসাবে জমা হয়। সঞ্চয়ের উচ্চহারের ফলে মূলধন গঠন ও বিনিয়োগের হারও উচ্চ। ফলে উৎপাদনের পরিমাণও ক্রমাগত বৃদ্ধি পায়।
৪. উন্নত উৎপাদন পদ্ধতি ও বন্টন প্রক্রিয়া: উন্নত দেশসমূহ যতই উন্নতির পথে অগ্রসর হয় ততই তাদের উৎপাদন পদ্ধতি ও ব্যবস্থাপনা উন্নত হয়। উন্নত উৎপাদনের একটি বড় কারণ কৃতকৌশল উন্নয়ন। বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠার কারণে উন্নত প্রক্রিয়া উদ্ভাবিত হয় এবং তা প্রয়োগ করে উৎপাদন বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।
৫. উন্নত আর্থসামাজিক অবস্থা: উন্নত দেশসমূহের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এসব দেশের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো অত্যন্ত উন্নত। এর মধ্যে রয়েছে-
* উন্নত ব্যাংক ব্যবস্থা ও ঋণদান ব্যবস্থাপনা
* উন্নত পরিবহন ও যোগযোগ ব্যবস্থা
* বিদ্যুৎ, পানি ও জ্বালানির পর্যাপ্ততা
* শিক্ষার উচ্চহার, সকলের জন্য শিক্ষাসুবিধা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ
* সকলের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা
৬. উন্নত ও আধুনিক কৃষি ব্যবস্থা: উন্নত দেশগুলোতে কৃষি একটি প্রধান খাত। কিন্তু কৃষি উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থা অত্যন্ত উন্নত। উৎপাদনের পরিমাণ ও কৃষিপণ্যের গুণগত মান উভয়ই উচ্চ।
৭. নিয়ন্ত্রিত জনসংখ্যা ও উন্নত মানব সম্পদ: উন্নত দেশসমূহের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রিত। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার প্রবৃদ্ধির হারের চেয়ে কম হওয়ায় মাথাপিছু আয় অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পায়। এছাড়া শিক্ষার উচ্চহার, যথাযথ প্রশিক্ষণ ও উন্নত স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির কারণে জনগণ মানবসম্পদে পরিণত হয়। এই জনসম্পদ দেশের উৎপাদন ও উন্নয়নে প্রভূত অবদান রাখে।
৮. অনুকূল বৈদেশিক বাণিজ্য: কৃষি এবং শিল্পপণ্য উভয়েরই পরিমাণ এবং গুণগতমান উচ্চ হওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এসব দেশ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সাথে অনুকূল বাণিজ্য সম্পর্ক গড়তে পারে। এই সম্পর্কও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সহায়ক হয়।
৯. ব্যাপক নগরায়ণ: কৃষিপ্রধান অবস্থা থেকে ক্রমশ শিল্পায়ন ঘটার ফলে এবং পথ-ঘাট,যোগাযোগ,বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে গ্রামীণ অর্থনীতি শহুরে রূপ লাভ করে। ফলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী শহরে আসতে থাকে এবং গ্রামগুলোও ক্রমশ শহরে রূপান্তরিত হয়।
১০ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা: উন্নত দেশসমূহে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রয়েছে। এখানে প্রশাসনযন্ত্র স্বচ্ছতার সাথে কাজ করে। দুর্নীতির পরিমাণ খুবই কম। রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানসমূহ স্থিতিশীল ও উন্নত। ফলে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সহায়ক পরিবেশ গড়ে উঠে ও তা বজায় থাকে।
অনুন্নত দেশ
প্রধানত মাথাপিছু প্রকৃত আয়ের নিরিখে একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাত্রা নির্ধারিণ করা হয়। যেসব দেশের জনগণের মাথাপিছু প্রকৃত আয় উন্নত দেশ যথা, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং পশ্চিম ইউরোপীয় দেশসমূহের জনগণের মাথাপিছু আয়ের তুলনায় অনেক কম, সেসব দেশকে অনুন্নত দেশ বলা হয়। তবে শুধুমাত্র মাথাপিছু প্রকৃত আয়ের ভিত্তিতে একটি দেশকে অনুন্নত বলা ঠিক নয়। অনুন্নত দেশ বলতে সম্পদের পূর্ণ ব্যবহার করতে সক্ষম নয়, এমন দেশকেও বোঝায়। অনেক অর্থনীতিবিদের মতে, যেসব দেশে প্রচুর জনসংখ্যা এবং অব্যাবহৃত প্রাকৃতিক সম্পদের সহাবস্থান, সেসব অনুন্নত দেশ। অধ্যাপক র্যাগনার নার্কস বলেন, অনুন্নত দেশ হচ্ছে সেইসব দেশ যেগুলোতে জনসংখ্যা ও প্রাকৃতিক সম্পদের তুলনায় পুঁজি বা মূলধন কম।
এসব দেশে প্রাথমিক পেশার প্রাধান্য, পুঁজির স্বল্পতা ও ব্যাপক বেকারত্ব বিদ্যমান। এসব দেশের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য নি¤েœ আলোচনা করা হলো।
১. ননিম্ন মাথাপিছু আয় এবং জীবনযাত্রার ননিম্নমান: অনুন্নত দেশের প্রধান বৈশিষ্ট্য বা লক্ষণ হলো উন্নত দেশের তুলনায় জনগণের অত্যন্ত কম মাথাপিছু আয় এবং জীবনযাত্রার ননিম্নমান। জনগণের বৃহত্তর অংশেরই মৌলিক চাহিদাসমূহ যেমন, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা সুবিধা ইত্যাদি পূরণ করার সামর্থ্য থাকে না।
প্রধান প্রধান উন্নত দেশসমূহে যেখানে মাথাপিছু আয় ৪০,০০০ থেকে ৮৫,০০০ মার্কিন ডলার এর মধ্যে (ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ২০১২), সেখানে অনুন্নত দেশসমূহের মধ্যে এমনকি ২০০ ডলারের কম মাথাপিছু আয়ের দেশও রয়েছে।
২. কৃষির উপর অত্যাধিক নির্ভরশীলতা: অনুন্নত দেশের জনগণের বৃহদংশই খাদ্য, জীবিকা ও অন্যান্য প্রয়োজন পূরণের জন্য কৃষির উপর নির্ভরশীল। কৃষি জাতীয় উৎপাদনের একক বৃহত্তম খাত।
৩. অনুন্নত কৃষি উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থা: এসব দেশে অধিকাংশ জনগণ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির উপর নির্ভরশীল হলেও কৃষি উৎপাদন ও বন্টন ব্যবস্থা অনুন্নত। সনাতন পদ্ধতিতে চাষাবাদ,ত্রুটিপূর্ণ মালিকানা, স্বল্প বিনিয়োগ,কৃষি উপকরণ এবং কৃষির জন্য অবকাঠামো যথা-সার,বীজ ও সেচসুবিধা এবং বিপণন সুবিধা ইত্যাদির অভাব,কৃষির প্রকৃতি নির্ভরতা এই সব কারণে কৃষি অত্যন্ত অনুন্নত।
৪.ক্ষুদ্র ও অনুন্নত শিল্পখাত: পুঁজি এবং দক্ষ জনশক্তির অভাবের কারণে অনুন্নত দেশে শিল্পখাত অত্যন্ত ক্ষুদ্র। এসব দেশে মৌলিক বা ভারী শিল্প নেই। ক্ষুদ্র, মাঝারি ও কুটির শিল্পেরই প্রাধান্য দেখা যায়। সাধারণত মোট জাতীয় উৎপাদনে শিল্পখাতের অবদান মাত্র ৮ থেকে ১০ভাগ।
৫. মূলধন গঠন ও বিনিয়োগের ননিম্নহার এবং ব্যাপক বেকারত্ব:মাথাপিছু আয় কম বলে জনগণের আয়ের সবটাই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী ভোগের জন্য ব্যয় করতে হয়। এ কারণে জনগণের সঞ্চয়ের হার অত্যন্ত কম। ফলে মূলধন বা পুঁজি স্বল্পতা দেখা দেয় এবং বিনিয়োগের হারও অত্যন্ত ননিম্ন। বিনিয়োগ খুব কম বলে নতুন উৎপাদন বা শিল্প স্থাপানের গতি খুব মন্থর। ফলে নতুন কর্মসংস্থান হয় না। বেকারত্ব বেড়ে যায়। মাথাপিছু আয় কম হতে থাকে। এইভাবে দারিদ্রের চক্রে দেশটি আবর্তিত হয়।
৬ প্রাকৃতিক সম্পদ ও জনশক্তির অসম্পূর্ণ ব্যবহার: প্রাকৃতিক সম্পদরে পরিপূর্ণ ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন মূলধন বা পুঁজি এবং দক্ষ জনশক্তি। অনুন্নত দেশে পুঁজি এবং কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ জনশক্তির এতই অভাব যে দীর্ঘকাল ধরেও দেশে কী কী খনিজ সম্পদ কী পরিমানে আছে তা নির্ধারণ করা সম্ভব হয় না। ফলে সম্পদ থাকা সত্ত্বেও এসব দেশ দরিদ্র থেকে যায়।
৭. জনসংখ্যা বৃদ্ধির উচ্চহার এবং অদক্ষ জনশক্তি: অশিক্ষা, কুসংস্কার ্্্্্্এবং যথাযথ নিয়ন্ত্রণের অভাবে অনুন্নত দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার উচ্চ। দেশের পরিশোষণ ক্ষমতার চেয়ে জনসংখ্যার আয়তন বড়। এই জনসংখ্যাকে সাধারণ শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ এবং স্বাস্থ্য সুবিধা সরবরাহের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করার ব্যবস্থাও নগণ্য।
৮. দুর্বল আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো: অনুন্নত দেশের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক উভয় প্রকার অবকাঠামোর দুর্বলতা। কৃষি ও শিল্পে ঋণদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ অপর্যাপ্ত ও এগুলোর ব্যবস্থাপণা দুর্বল। পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থাও অনুন্নত ও অপর্যাপ্ত। জনগনের বৃহত্তর অংশই শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা বঞ্চিত। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ অত্যন্ত অপ্রতুল।
৯. প্রতিকূল বৈদেশিক বাণিজ্য: অনুন্নত দেশগুলো জনগণের মৌলিক চাহিদা এমনকি খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসার চাহিদা পূরণের জন্যও আমদানি নির্ভর। এসব দেশ প্রধনত কৃষিপণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল রপ্তানি করে এবং শিল্পপণ্য আমদানি করে। রপ্তানি আয় সবসময়ই আমদানি ব্যয়ের চেয়ে কম। ফলে এসব দেশের আন্তর্জাতিক লেনদেনের ভারসাম্য সবসময়ই ঘাটতি থাকে।
১০. বৈদেশিক সাহায্য নির্ভরতা: প্রয়োজনের তুলনায় পুঁজির স্বল্পতার কারণে অনুন্নত দেশসমূহ বিনিয়োগের লক্ষ্যে পুঁজি সংগ্রহের জন্য বিদেশি সাহায্যের উপর অত্যধিক নির্ভরশীল থাকে। শুধু পুঁজির যোগান দেওয়ার জন্যই নয়, দুর্যোগ ও আপদকালীন সময়েও প্রয়োজনীয় অর্থ ও অন্যান্য সামগ্রীর জন্য এসব দেশ অতিমাত্রায় বিদেশি সাহয্যের উপর নির্ভরশীল।
১১. উদ্যোগ ও ঝুঁকি গ্রহণের মানসিকতার অভাব: অনুন্নত দেশগুলোতে জনগণের মধ্যে অর্থনৈতিক উন্নয়নে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো জনশক্তির অভাব পরিলক্ষিত হয়। অর্থনৈতিক কার্যাবলির অগ্রগতির যেমন পুঁজির উপর নির্ভরশীল, তেমনি দক্ষ উদ্যোক্তাও এর জন্য অপরিহার্য। এইসব দেশে পুঁজির স্বল্পতা আছে। এছাড়া দুর্বল অবকাঠামো এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে পুঁজিপতিরা বিনিয়োগে আগ্রহী হন না। গতানুগতিক ধারায় বিনিয়োগ শুরু হয়। নতুন উৎপাদন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করার উদ্যোগ ও ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতার অভাব রয়েছে। ফলে অর্থনীতিতে নতুন প্রাণসঞ্চার হয় না এবং অনুন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদি হয়।
উন্নয়নশীল দেশ
বিশ্বের উন্নত ও অনুন্নত দেশসমূহের মধ্যপর্যায়ের আরেক ধরনের দেশ আছে-যেগুলোকে বলা হয় উন্নয়নশীল দেশ। এসব দেশে মাথাপিছু প্রকৃত আয় উন্নত দেশসমূহের তুলনায় অনেক কম। উন্নয়নশীল দেশসমূহে অনুন্নত অর্থনীতির অধিকাংশ বৈশিষ্ট্যই বিদ্যমান। এগুলোর মধ্যে রয়েছে কৃষিখাতের প্রাধান্য, শিল্পখাতের অনগ্রসরতা, ব্যাপক বেকারত্ব, পরিবহন, যোগযোগ ও বিদ্যুতের অপর্যাপ্ততা, শিক্ষার নিম্নহার, মূলধন গঠন ও বিনিয়োগের ননিম্নহার, মূলধন গঠন ও বিনিয়োগের ননিম্নহার, ননিম্ন মাথাপিছু আয় ও দারিদ্র্য, জনসংখ্যা বৃদ্ধির উচ্চহার ইত্যাদি।
তবে অনুন্নত দেশসমূহের সাথে এ দেশগুলোর পার্থক্য এই যে, এসব দেশ পরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ও জনসংখ্যাকে ব্যবহার করে মোট জাতীয় উৎপাদন তথা মাথাপিছু প্রকৃত আয় বৃদ্ধির ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এর ফলে দীর্ঘ সময় ধরে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির একটি প্রবণতা সৃষ্টি হয়েছে।
পরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় এসব দেশ আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন ও দেশের দ্রুত শিল্পায়ন করার প্রচেষ্টা নেয়। ফলে পুঁজিগঠন ও বিনিয়োগের হার বৃদ্ধির প্রবণতাক দেখা দেয়। জনসংখ্যাকে মানব সম্পদে পরিণত করার জন্য শিক্ষার প্রসার ঘটানো হয় এবং সকলের জন্য স্বাস্থ্যসেবার সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এইসব উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা র ফলে অর্থনীতিতে বিরাজমান উন্নয়নের প্রতিবন্ধকতাসমূহ দূর হওয়ার অবস্থা সৃষ্টি হয়।
উন্নয়নশীল দেশসমূহের কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট্য নি¤েœ আলোচনা করা হলো-
১.অর্থনৈতিক অবস্থা বিষয়ে সচেতনতা ও পরিকল্পিত উন্নয়নের উদ্যোগ গ্রহণ: উন্নয়শীল দেশ হচ্ছে সেইসব দেশ যারা নিজেদের অর্থনীতির উন্নয়নের অবস্থা সম্পর্কে সচেতন হয়ে তা পরিবর্তনের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এই পদক্ষেপের সূচনা হয় সার্বিক উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে। উন্নয়নশীল দেশসমূহে এই উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে নানারকম বাধাবিঘœ থাকলেও জনসংখ্যাধিক্য ও সম্পদের স্বল্পতার কারণে পরিকল্পিত কর্মসূচি ছাড়া উন্নয়ন অর্জন করা যায় না।
২. প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাপ্যতা ও উন্নয়নের সম্ভবনা: এসব দেশে প্রাকৃতিক সম্পদ যেমন,ভূমি, খনিজসম্পদ, পানিসম্পদ আছে, জনসংখ্যার আয়তনও বড়। এসব প্রাকৃতিক সম্পদ ও জনসংখ্যাকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।
৩. কৃষির উপর নির্ভরতা হ্রাস ও দ্রুত শিল্পায়ন: কৃষিপ্রধান অবস্থা থেকে ক্রমশ শিল্পপ্রধান দেশে পরিণত হওয়ার ধারা উন্নয়নশীল দেশের লক্ষণ। এ উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত কর্মসূচির মাধ্যমে দেশে মৌলিক শিল্পস্থাপন ও শিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
৪. কৃষির ক্রমোন্নতি: উন্নয়নশীল দেশসমূহে কৃষির আধুনিকায়ন করা হয়। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ, কৃষির অবকাঠামো উন্নয়ন,উন্নতমানের বীজ, সার ও সেচসুবিধার সরবরাহ ইত্যাদির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। ফরে কৃষির উৎপাদনশীলতা বাড়ে এবং কৃষিতে ক্রমোন্নতির সূচনা হয়।
৫. অবকাঠামো উন্নয়ন: কৃষি ও শিল্পের প্রসার ঘটানোর উদ্যোগ নেওয়া হয় বিধায় উন্নয়নশীল দেশে আর্থ-সামাজিক অবকাঠামোর উন্নয়ন অপরিহার্য হয়ে পড়ে। তাই এসব দেশে উন্নয়ন শুরুর পর্যায়ের অর্থনৈতিক অবকাঠামো যেমন, পরিবহন ও যোগযোগব্যবস্থা,মূলধন গঠন ও সরবরাহ এবং সামাজিক অবকাঠামো যেমন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা ইত্যাদি উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এই উন্নয়ন অর্জনের ধারায় ক্রমশ সামাজিক পরিবেশের ও উন্নতি ঘটে।
৬. জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হ্রাস ও মানবসম্পদ উন্নয়ন: উন্নয়নশীল দেশে জনসংখ্যাধিক্য রয়েছে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। এতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ধীরে হলেও হ্রাস পেতে থাকে।
৭.বেকারত্ব হ্রাস ও দারিদ্র্য নিরসন: উন্নয়নশীল দেশেও ব্যাপক বেকারত্ব বিদ্যমান। তবে কৃষিতে আধুনিক পদ্ধতির প্রয়োগ ও দ্রুত শিল্পায়ন এবং নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বেকারত্বের হার কমিয়ে আনার প্রচেষ্টা নেওয়া হয়। সাধারণত উন্নয়ন পরিকল্পনার আওতায় নানারকম প্রকল্পের মাধ্যমে বেকারত্ব হ্রাস করার ও দারিদ্র্য নিরসনের ব্যবস্থা করা হয়।
৮. বৈদেশিক সাহায্য নির্ভরতা হ্রাস: উন্নয়নশীল দেশসমূহে উন্নয়ন পরিকল্পনা ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য প্রচুর অর্থ ও মূলধনের প্রয়োজন হয়। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে তহবিল সংগ্রহ করা সম্ভব না হওয়ায় এসব দেশ বিদেশি ঋণ, সাহায্য ও অনুদানের উপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই নির্ভরশীলতা সাধারণত দীর্ঘদিন চলতে থাকে। তবে উন্নয়ন অর্জনের এক পর্যায়ে এ নির্ভরতা কমে আসে।
৯. জনগণের আর্থিক কল্যাণ নিশ্চিত করা: অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল লক্ষ্য সকল জনগণের সর্বাধিক আর্থিক ও সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করা। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে সাথে আয়ের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে পারলে আর্থিক ও সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত হয়।
কিন্তু উন্নয়নশীল দেশসমূহে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন সূচিত হলেও বণ্টন ব্যবস্থায় ত্রুটি দীর্ঘ সময়ে থেকেই যায়। ফলে আয় বন্টনে দীর্ঘসময় ধরেই বৈষম্য বিরাজ করে।
১০. নগরায়নের হার বৃদ্ধি: উন্নয়নশীল দেশসমূহে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচির মাধ্যমে একটি ক্রমোন্নতির ধারা সৃষ্টি হয়। কোনো কোনো দেশে এই ধারা খুব বেগবান। কোনো কোনো দেশে ততটা নয়। তবে এই উন্নয়ন কার্মকান্ডের ফলে ক্রমশ গ্রামীণ অর্থনীতির আধুনিকায়ন ঘটে, অবকাঠামোর উন্নয়ন ঘটে এবং শিল্পায়নের ফলে কাজের সন্ধানে গ্রাম থেকে জনগণ শহরাভিমুখী হয়। এসব কিছুর ফলে দেশে নগরায়ণ ঘটে।
১১. সামাজিক পরিবেশের উন্নয়ন: উন্নয়নশীল দেশসমূহে ধীরগতিতে হলেও শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বিনোদন ব্যবস্থা, পথঘাট, ও সেতু, পরিবহন ও যোগযোগ ব্যবস্থা,আর্থিক প্রতিষ্ঠান যেমন, ব্যাংক ও বীমা সুবিধা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ইত্যাদি উন্নত ও সম্প্রসারিত হয়। এসব কিছুর ফলে কুসংস্কার ও গোঁড়ামি দূর হয়। উন্নত জীবনযাত্রার সাথে পরিচিত হওয়ার ফলে মানুষ উন্নয়ন অর্জনে আগ্রহী হয়ে উঠে।
১২. মাথাপিছু আয় ও জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি: উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতি প্রধানত পরিকল্পনার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা থাকলেও তা বাস্তবায়নের ফলে উন্নতির একটি প্রবণতা সৃষ্টি হয়। ফলে এসব দেশের জনগণের মাথাপিছু আয় ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং জীবনযাত্রার মানে উন্নয়ন সূচিত হয়।
উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের সাথে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক
আমরা জেনেছি যে, অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাত্রা বা স্তর অনুসারে বিশ্বের দেশগুলোকে উন্নত, উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত বা স্বল্পোন্নত দেশ হিসাবে শ্রেণিবিভাগ করা হয়। এই বিভাজন অনুসারে বাংলাদেশ সর্বশেষ শ্রেণি অর্থ্যাৎ স্বল্পোন্নত দেশের অন্তর্ভুক্ত। তবে অব্যাহত উন্নয়ন প্রচেষ্টা ও কার্যক্রম এবং আর্থসামাজিক কিছু সূচকের (যেমন শিক্ষার জেন্ডার সমতা, শিশু ও মাতৃমৃত্যর হার হ্রাস, প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তির হারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি) উচ্চমানের কারণে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের পর্যায়ভুক্ত হিসাবেও বিবেচনা করা হয়।
আমরা ইত:পূর্বে বেশকিছু উন্নত, উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশ সম্পর্কে জেনেছি। আমরা জানি যে যুক্তরাষ্ট্র,কানাডা এবং ইউরোপের দেশগুলোর অধিকাংশই উন্নত দেশের শ্রেণিভুক্ত। দক্ষিণ এশিয়া এবং সাব-সাহারান অফ্রিকার দেশগুলো প্রধাণত ননিম্ন আয়ের দেশ। এছাড়া পূর্ব ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলো, ল্যাটিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকান দেশগুলো প্রধাণত মধ্য আয়ের দেশ, যার মধ্যে’ননিম্ন মধ্য আয়’ও উচ্চ মধ্য আয়’উভয়ই অন্তর্ভুক্ত।
পৃথিবীতে কোনো দেশই স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক কারণেও প্রতিটি দেশকে প্রতিবেশী দেশসমূহসহ অন্যান্য দেশের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে,বজায় রাখতে ও উন্নয়ন করতে হয়। আমরা এ পাঠে পৃথিবীর উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশসমূহের সাথে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি আলোচনা করব।
অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি আমরা দুটি প্রধান শিরোনামে আলোচনা করতে পারি: ১ .বৈদেশিক বাণিজ্যের সম্পর্ক ২. ঋণ সহায়তা ও অনুদান দেওয়া-নেওয়ার সম্পর্ক।
১. বৈদেশিক বাণিজ্যের সম্পর্ক
বাণিজ্যের দুটি দিক আছে-রপ্তানি ও আমদানি। রপ্তানি হচ্ছে কোনো দেশের আয়ের উৎস আর আমদানি ব্যয়ের খাত। বাংলাদেশের রপ্তানি আয় দীর্ঘ সময় ধরেই আমদানি ব্যয়ের চেয়ে কম। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের লেনদেনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সবসময়ই একটি ঘাটতি দেশ। তবে সাম্প্রতিককালে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি, প্রবাসীদের আয়প্রবাহ বৃদ্ধি ইত্যাদি কারণে ঘাটতি হ্রাস পাচ্ছে।
বাংলাদেশের প্রধান প্রধান রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাকও নীটওয়্যার, কাঁচা পাট, পাটজাত পণ্য, হিমায়িত খাদ্য, চা, চামড়া, কৃষিজাত পণ্য, সিরামিক দ্রব্যদি ইত্যাদি।
দেশভিত্তিক রপ্তানি বাণিজ্যের পর্যালোচনায় দেখা যায় যে বিগত এক দশক যাবত বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। এর পরের অবস্থানে রয়েছে জার্মানি, যুক্তরাজ্য,ফ্রান্স, বেলজিয়াম ইত্যাদি দেশ। এছাড়া ইতালি, নেদারল্যান্ড, কানাডা এসব দেশও আমাদের পণ্য রপ্তানি হয়। অর্থাৎ বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য প্রধাণত উন্নত দেশগুলোতেই বিস্তৃত।
আমাদের রপ্তানির একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো আমরা একটি জনশক্তি রপ্তানিকারক দেশ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমরা অদক্ষ ওআধা দক্ষ শ্রমিক রপ্তানি করি। এসব দেশে নানারকম কর্মসংস্তানের ব্যবস্থা রয়েছে। যেসব দেশে বাংলাদেশি শ্রমিকদের কর্মসংস্থান হয়েছে সেগুলোর মধ্যে প্রধান দেশগুলো হচ্ছে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো যেমন, সৌদি আরব,আরব আমিরাত, কাতার,ওমান, বাহরাইন ও কুয়েত। এছাড়া আফ্রিকা,পূর্ব ইউরো ও ল্যাটিন আমেরিকার দেশসমূহে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানি করার লক্ষ্যে কূটনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
উন্নত দেশসমূহ ছাড়া ঝঅঅজঈ (ঝড়ঁ:য অংরধহ অংংড়পরধ:রড়হ ভড়ৎ জবমরড়হধষ ঈড়ড়ঢ়বৎধ:রড়হ) দেশসমূহের সাথেও বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য সম্পর্ক রয়েছে।
সার্কভুক্ত দেশসমূহের মধ্যে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমান সর্বোচ্চ। ২০১০-১১ অর্থবছরে ভারতে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানির পরিমাণ সার্কভুক্ত সকল দেশে রপ্তানির ৭৮ শতাংশ। উল্লেখ্য সার্কভুক্ত দেশসমূহ থেকে ২০১০-১১ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে রপ্তানি আয়ের পরিমাণ একই সময়ে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের মাত্র ৩ শতাংশ (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১১-১২)
ভারত ছাড়াও সার্কভুক্ত অন্যান্য সকল দেশ যেমন আফগানিস্তান, ভূটান, মালদ্বীপ, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলংকাতেও আমাদের পণ্য রপ্তানি হয়।
আমাদের প্রধান আমদানি পণ্যের তালিকায় আছে মূলধনী যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল, খাদ্যপণ্য, পেট্রোলিয়াম ও পেট্রোলিয়মাজাত পণ্য,তুলা,ভোজ্য তেল, সার,সুতা ইত্যাদি।
দেশওয়ারি আমাদানি পণ্যের পর্যালোচনা থেকে দেখা যায় যে,(২০১১-১২) অর্থবছরে জুলাই-ফেব্রুয়ারী সময়কালে দেশের আমাদানি ক্ষেত্রে চীন এর অবস্থান শীর্ষে। এ সময়ে দেশের মোট আমাদানির শতকরা ১৮.১৩ ভাগ চীন থেকে এসেছে। দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে ভারত(১৩.৩৫ %) সিঙ্গাপুর (৪.৮১ %) ও দক্ষিণ কোরিয়া (৪.৩৪%) (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৩)।
বিগত এক দশকের পরিসংখ্যান পর্যলোচনায় দেখা যায় যে, বাংলাদেশ পণ্য আমদানি করে এমন দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থানে রয়েছে কখনো চীন কখনো ভারত। বাংলাদেশে পণ্য রপ্তানিকারক অন্যান্য দেশের মধ্যে রয়েছে সিঙ্গাপুর, জাপান,হংকং, তাইওয়ান, যুক্তরাষ্ট্র, মালয়েশিয়া।
২. বৈদেশিক ঋণ – সহায়তা ও অনুদান
বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জনের জন্য এ দেশ পরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করে থাকে। এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য প্রচুর অর্থ দরকার হয়। এই অর্থের সবটা অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে যোগান দেওয়া সম্ভব হয় না। উন্নয়ন তহবিল সংগ্রহের জন্য বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে ঋণ সহায়তা ও অনুদান গ্রহণ করে। উন্নয়ন কার্যক্রমে ঋণ সহায়তা ও অনুদান দানকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন-বিশ্ব ব্যাংক, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ড-আইএমএফ) এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক-এডিবি), ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন, জাতিসংঘ সংস্থাসমূহ, আইডিএ (ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এজেন্সী) থেকেও বাংলাদেশ ঋণ ও অনুদান গ্রহণ করে।
বাংলাদেশ যেসব দেশ থেকে বৈদেশিক সাহায্য পায়, সেগুলোর মধ্যে প্রধান হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, জার্মানি,ফ্রান্স, নেদারল্যান্ড,সুইডেন, নরওয়ে, ডেনমার্ক, অষ্ট্র্যেলিয়। ্এশীয় দেশগুলোর মধ্যে সাহায্যদাতা দেশ হিসাবে ্্উল্লেখযোগ্য হচ্ছে জাপান। ভারত থেকে ও কিছু পরিমাণ সাহায্য পাওয়া যায়।