স্থানাঙ্ক জ্যামিতি

স্থানাঙ্ক জ্যামিতি


আচ্ছা, তোমরা তো অনেক সময়ই অসুস্থ থাকো। একবার হয়েছে কি, ফরাসি বিজ্ঞানি রেনে ডেকার্তে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। অসুস্থ মানে ভয়ানক অসুস্থ, বিছানা ছেড়েই উঠতে পারেন না এ অবস্থা। তো উনি শুয়ে থাকতে থাকতে খেয়াল করলেন একটা মাছি উড়ে বেড়াচ্ছে ছাদের কাছাকাছি তে । ছাদ টা বর্গাকার টাইলস দিয়ে বানানো ছিল । একটা টাইল এর মধ্যেই মাছি টা ঘুরছিল, এদেখে ডেকার্তের ভাবেন উনি কি কোনোভাবে মাছির একটা সময়ে নির্দিষ্ট অবস্থান কে কোনোভাবে প্রকাশ করতে পারবেন নাকি। আর এর থেকেই আসলে তিনি কোন সমতলে কোনো বস্তুর অবস্থান কে কিভাবে দেখানো যায় তা বের করে।

কার্তেসীয় স্থানাঙ্ক ব্যবস্থায় আসলে আমরা কি করি? দুইটি পরস্পরছেদী রেখা থেকে একটা বিন্দু কতটা দূরে তা নির্ণয় করি । একটা খাতা নিয়ে তোমার মতো করে একটা রেখা আঁকো। এরপর ঐ রেখার একটা লম্ব রেখা আঁকো। এবার চোখ বন্ধ করে পেন্সিল দিয়ে ঐ খাতায় একটা বিন্দু দাও। এবার দেখো, তুমি কি বলতে পারো না, ঐ বিন্দুটি প্রথম রেখা থেকে এত দূরে, এবং দ্বিতীয় রেখা থেকে এত দূরে? এই দুটো মান কে সুন্দর করে পাশাপাশি লিখে যা পাই, তাই আসলে কার্তেসীয় স্থানাঙ্ক ব্যবস্থা।

এখানে প্রথম যে রেখাটি সেটা যদি X অক্ষ ধরি। এরপর যে লম্ব রেখাটি আঁকবো সেটা হলো Y অক্ষ। দুটোর ছেদবিন্দু হলো O বিন্দু যাকে মূলবিন্দু বা Origin বলা হয়।

এই চিত্রে কিভাবে আমি P কে কার্তেসিয়ান স্থানাঙ্কে প্রকাশ করতে পারি? সেজন্য চলো নিচের gif টা দেখে নিই । আমরা প্রথমে মূলবিন্দু থেকে শুরু করে X অক্ষ বরাবর আগাতে থাকবো। এক্ষেত্রে আমরা 5 ঘর X অক্ষ বরাবর যাওয়ার পর 3 ঘর Y অক্ষ বরাবর গিয়েই আমরা P বিন্দুকে পেয়েছি। তাই P বিন্দুর স্থানাঙ্ক হবে (5,3)।

এই যে (5,3) বলছি আমরা এখানে 5 দ্বারা বুঝানো হচ্ছে Y অক্ষ থেকে [লম্ব দূরত্ব]1 যাকে ভুজ দ্বারা প্রকাশ করা হয় এবং 3 দ্বারা বুঝাচ্ছে X অক্ষ থেকে লম্ব দূরত্ব যাকে কোটি দ্বারা প্রকাশ করা হয়। এই ভুজ আর কোটি দিয়েই আমরা স্থানাঙ্ক সম্পর্কে পুরো ধারণা টাই পেয়ে যাবো।

 

 

তাহলে আমি যদি বলি (-3,4) দিয়ে কি বোঝায় তাহলে কি বলবে তুমি? মুলবিন্দু থেকে X অক্ষ বরাবর 3 ঘর বামে গিয়ে 4 ঘর উপরে যে বিন্দুটি পাবো সে বিন্দুটিকে বোঝায়।

 

আমরা এখানে বিন্দুগুলো কে সঠিক ভাবে মার্ক করতে পারি কিনা একটা গেম এর মাধ্যমে দেখে নিই।

চতুর্ভাগ

আমরা যদি বিন্দুগুলো সঠিক ভাবে বসিয়ে থাকি তাহলে আমরা সবসময় দেখবো নির্দিস্ট চতুর্ভাগ এ চিহ্ন সবসময় একই থাকে । এখন চতুর্ভাগ জিনিসটাই বা কি ? আমরা যখন পরস্পরছেদী দুটি রেখা আকি তখনই আমরা দেখি চারটি আলাদা ভাগে পুরো জায়গা কে ভাগ হয়ে গেছে । এই চতুর্ভাগ গুলো নাম দেওয়া হয় counterclockwise সিস্টেমে ১ম , ২য় , ৩য় , ৪র্থ চতুর্ভাগ নামে ।

 

ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে

 

 

দুইটি বিন্দুর মধ্যবর্তী দূরত্ব

দুটো বিন্দুর স্থানাঙ্ক যদি তুমি জানো তাহলে খুব সহজেই বিন্দু দুটোর মধ্যকার দূরত্ব বের করা যায়। যদি বিন্দু দুটোর স্থানাঙ্ক ( (x1, y1) এবং(x2, y2) হয়, এবং এদের মধ্যকার দূরত্ব d হলে,

Try it yourself

 

 

 

সমস্যা ১: দেখাও যে, A(-5,0) , B(5,0) , C(5,5) ও D(-5,5) একটি আয়তক্ষেত্রের চারটি শীর্ষবিন্দু ।

সমাধান:

আমাদের যা করতে হবে , তা হলো , ABCD চতুর্ভুজের চারটি বাহুর দৈর্ঘ্য বের করতে হবে । বিপরীত বাহুগুলো সমান হওয়ার অর্থ চতুর্ভুজ টি আয়ত ।

তাহলে এরা আয়ত টা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

 

 

সমস্যা ২ : A(10,5) , B(7,6) , C(-3,5) , P(3,-2) হলো চারটির বিন্দুর স্থানাঙ্ক ।

সমাধান:

ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল বের করার বিভিন্ন পদ্ধতি আছে। আমরা একটা একটা করে স্টেপ দেখতে থাকি।

যদি আমরা কোনো ত্রিভুজের তিনটি বাহুর মান জানি , তাহলে এ সুত্রটি ব্যবহার করা হয়, যেখানে  

এখানে বিন্দুগুলো চেঞ্জ করে দেখি কিভাবে ক্ষেত্রফল পরিবর্তিত হচ্ছে – দেখ

 

 

সমস্যা ৩:  ABC ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল নির্ণয় কর, যেখানে A(2,3) , B(5,6) , C(-1,4)

সমাধান:

প্রথমে আমাকে তিনটি বাহুর দৈর্ঘ্য বের করতে হবে।

দেখো এখানে কোনো বাহুই একে অপরের সমান নয়। তাই এটি বিষমবাহু ত্রিভুজ ।

 

 

আমাদের কিছু প্রশ্ন আসতে পারে কখন আমরা বুঝবো কোনটি কোন ধরণের ত্রিভুজ অথবা চতুর্ভুজ , অথবা কোনো কোণ সমকোণ কিনা । এগুলো বুঝার জন্য নিচের কার্ড গুলোর দিকে মনোযোগ দিই।

 

ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল নির্ণয়ের আরো পদ্বতি আছে। এটা আসলে শুধু ত্রিভুজ না, যেকোনো বহুভুজের ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা যায়।

এক্ষেত্রে

 

এক্ষেত্রে খেয়াল করো, বিন্দুগুলো অবশ্যই ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে নিতে হবে।  ত্রিভুজের ক্ষেত্রে প্রথমে তিনবার তিনটি বিন্দু নিয়ে এরপর প্রথম বিন্দুটি আবার নিতে হবে; চতুর্ভুজ, পঞ্চভুজ সবগুলোর ক্ষেত্রেও একই নিয়ম। একই ভাবে প্রথমে সবগুলোর বিন্দুর জন্য (অবশ্যই ঘড়ির কাঁটার বিপরীতক্রমে) নিয়ে শেষে একবার প্রথম বিন্দুর জন্য নিতে হবে। এই সুত্রের প্রমাণ টা তোমাদের বই এ খুব সুন্দর করেই দেওয়া আছে, অবশ্যই দেখে নিবে ।

একটি চতুর্ভুজের চারটি বিন্দু A(x1,y1) , B(x2,y2) , C(x3, y3) , D(x4,y4) হলে ক্ষেত্রফল হবে

নিচে চতুর্ভুজের ক্ষেত্রে কিভাবে বিন্দু চেঞ্জ করে তুমি সুত্রের ব্যবহার করে ক্ষেত্রফল পাচ্ছো দেখে নাও । এখানে আমরা যে সুত্র পড়েছি তাই লেখা হয়েছে কিন্তু সোজা করে, ভয় পেয়ে যেও না।

চতুর্ভুজের ক্ষেত্রে বিন্দু

 

 

সমস্যা ৪: A (2 ,3) , B (5,6) , C (-1,4) শীর্ষবিশিস্ট ABC ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল কত?

সমাধান:

আমরা গ্রাফে রাফের মতো করে বসিয়ে দেখে নিবো A , B , C বিন্দু তিনটি ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে আছে কিনা । না থাকলে আমাদের এমন ভাবে নিতে হবে যাতে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে বিন্দুগুলো থাকে।

 

 

 

সমস্যা ৫: তিনটি বিন্দুর স্থানাঙ্ক যথাক্রমে A (-2,1) , B(10,6) , C(a,-6) । AB = BC হলে a এর সম্ভাব্য মানসমূহ নির্ণয় কর । a এর মানের সাহায্যে যে ত্রিভুজ গঠিত হয় তার ক্ষেত্রফল নির্ণয় কর।

সমাধান:

একটি বাহুর দুটি প্রান্তবিন্দুর স্থানাঙ্ক দেওয়া থাকলে আমরা সেখান থেকে বাহুটির দৈর্ঘ্য পেতে পারি । এভাবে AB ও BC বাহুর দৈর্ঘ্য বের করে এদের মধ্যকার সম্পর্কের মাধ্যমে a এর মান পেয়ে যাবো।

A এর মান পেয়ে গেলে এবার আমরা একটি ত্রিভুজের তিনটি প্রান্তবিন্দুর স্থানাঙ্কই জানি । এখান থেকে এবার আমরা যেকোনো একটি পদ্ধতি ব্যবহার করে ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল বের করতে পারি। নিজেরা করে দেখো পারো কিনা।

 

 

সমস্যা ৬: A(1,4) , B(-4,3) , C(1,-2) এবং D(4,0) শীর্ষবিশিস্ট চতুর্ভুজ ABCD এর ক্ষেত্রফল নির্ণয় কর ।

সমাধান :

 

সরলরেখার ঢাল

সরলরেখার ঢাল বলতে সেটা কতটা খাড়া বা ঢালু সেটাই বুঝায় । চিন্তা কর একটা মই মাটিতে পড়ে আছে । তুমি সেটাকে ব্যবহার করে একতলা বাসার ছাদে উঠবে । একটু বাকা করে মই টা কে রেখে তুমি এবার ছাদের উপর উঠে গেলে । এই যে মই কে বাকা করে রাখলে সেটা কতটুকু ঢালু করে রেখেছিলে সেটাই ঢাল ।

 

একটা সরলরেখার ঢাল সবসময় একই ই থাকে।

 

খেয়াল করি, ঢাল কে আমরা ইচ্ছা করলে ঐ রেখা টি ভূমি তথা x অক্ষের সাথে যে কোণ তৈরি করে তার সাপেক্ষে প্রকাশ করতে পারি। যেমন নিচের চিত্রে AB রেখাটি x অক্ষের সাথে কোণ তৈরি করেছে, তাই AB রেখার ঢাল, m = tanθ

একটা সাইকেল চালক মনে করো নিচের মতো করে গাড়ি চালাচ্ছে ।

নিচে নামার সময় ঢাল ঋনাত্মক হয়। তখন স্থুলকোণ হয়।

ভূমির সাথে সমান্তরাল ভাবে চলার সময় ঢাল হয় শুণ্য।

ভুমির সাথে লম্বভাবে হলে তার ঢাল অনির্ণেয় হয়। কেননা x অক্ষ বরাবর লম্ব রেখা আর ঢালু নেই এবং x অক্ষের সাথে ৯০ ডিগ্রি কোণ তৈরি করে ফেলেছে আর tan 90 = অনির্ণেয় ।

দুটো রেখার ঢাল একই হয় যখন –

  • রেখাদ্বয় সমরেখ হবে ( একই সরলরেখার অংশ হবে )
  • রেখাদ্বয় সমান্তরাল হবে ।

 

সমস্যা ৭:  A(1,-1) , B(2,2) , C(4,t) বিন্দু তিনটি সমরেখ হলে t এর মান কত  ?

সমাধান :

সমরেখ হওয়ায় AB ও BC রেখার ঢাল একই হবে। তাই –

সুতরাং t এর মান 8।

 

 
সরলরেখার সমীকরণ

কার্তেসীয় স্থানাঙ্কে প্রতিটি সরলরেখা কে সমীকরণ দিয়ে আলাদা ভাবে প্রকাশ করা যায়। আমরা এখানে একবিন্দুগামী এবং দুইবিন্দুগামী সরলরেখার সমীকরণ বের কিভাবে করবো তা দেখবো। নিচের কার্ড গুলো খেয়াল করি –

 

সমস্যা ৮- একটি সরলরেখার ঢাল 3 এবং রেখাটি (-2 ,-3) বিন্দুগামী । রেখাটির সমীকরন নির্ণয় কর ।

সমাধান –

এখানে m = 3   (x1,y1) (-2,-3)

রেখাটির সমীকরণ ,

 y – y1 = m (x -x1)

y +3 = 3 (x +2)

y = 3x + 3

সরলরেখার সমীকরণ y = 3x + 3

এই আকার কে আসলে y = mx + c আকারে লেখা যায়। যেখানে m হলো রেখাটির ঢাল এবং c হলো y অক্ষের ছেদকাংশ।

 

খেয়াল করো,

ঢাল ধনাত্মক হলে তথা m ধনাত্মক চিহ্ন এর হলে সরলরেখা x অক্ষের সাথে সূক্ষ্মকোণ তৈরি করে, আর ঋণাত্মক হলে x অক্ষের সাথে স্থুলকোণ তৈরি করে থাকে।

 

X অক্ষের সমীকরণ, y =0

X অক্ষের সমান্তরাল রেখার সমীকরণ, y = a

Y অক্ষের সমীকরণ, x =0

Y অক্ষের সমান্তরাল রেখার সমীকরণ, x = b

 

 

 

 

সমস্যা ৯:  y = x +5 , y = -x +5 , y =2 একটি ত্রিভুজের তিনটি বাহু নির্দেশ করে । ত্রিভুজটি আকো এবং ক্ষেত্রফল নির্ণয় কর ।

সমাধান –

y= x + 5 রেখাটির ঢাল 1 এবং ধনাত্মক তাই এটি উপরের দিকে যাবে এবং y অক্ষকে 5 বিন্দুতে ছেদ করবে ।

 

[এক্ষেত্রে আমরা একটা ছোট্ট নিয়ম শিখে নিই যা তোমাদের এখনো শিখানো না হলেও কলেজে গেলেই শিখানো হবে । সরলরেখার সমীকরণ কে x/a + y/b = 1 আকারে প্রকাশ করা গেলে a হবে x অক্ষের ছেদাংশ এবং b হবে y অক্ষের ছেদাংশ।

 

 y = x + 5

x -y = -5

x/-5y/5 = 1

x/-5 + y/5 = 1

 

অর্থাৎ রেখাটি x অক্ষকে (-5,0) বিন্দুতে এবং y অক্ষকে (0,5) বিন্দুতে ছেদ করবে। ]

একই ভাবে আমরা y = -x+5 একে ফেলি। এবং y =2 আমরা জানি x অক্ষের সমান্তরাল এবং y অক্ষকে (0,2) বিন্দুতে ছেদকরা রেখা ।

 

এখান থেকে প্রাপ্ত ত্রিভুজ হলো ABC .

যার A বিন্দু হবে AB , AC রেখার সমাধান করে প্রাপ্ত x ও y এর মান।

তাহলে AB রেখার জন্য y =x +5 —— (1)

AC রেখার জন্য , y = -x + 5 x + 5 = -x +5 x = 0

  1. হতে, y = 0 + 5 = 5

সুতরাং A বিন্দুর স্থানাঙ্ক হবে (0,5)

একইভাবে পাব B(-3,2) এবং C(3,2)

 

তাহলে ক্ষেত্রফল হবে = 9 বর্গএকক ( পদ্বতি ১ অথবা ২ দুটোই ব্যবহার করতে পারো )