মহাত্মা গান্ধী: সারা বিশ্বের জন্য এক আলোকবর্তিকা

পৃথিবীতে যুগে যুগে কিছু মানুষ আসেন যাদের নেতৃত্ব, দর্শন পাল্টে দেয় গোটা দুনিয়াকে। যারা অন্ধকারে হাজির হন আলোর মশাল হাতে। যারা নিজের জীবনের সবটুকু দিয়ে রচনা করে যান মানবকল্যাণের বাণী। ঠিক এমনই একজন মানুষ হলেন মহাত্মা গান্ধী। শান্তির স্বপক্ষে দাঁড়িয়ে, তিনি পৃথিবীতে স্থাপন করে গেছেন অন্যরকম এক দৃষ্টান্ত।

তিনি ছিলেন অহিংস মতবাদ ও সত্যাগ্রহ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা। অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে তিনি পুরো ভারতবর্ষকে করেছিলেন ঐক্যবদ্ধ, স্বৈরশাসনের  বিরুদ্ধে মানুষের চেতনাকে করেছিলেন জাগ্রত। আর সেই সাথে মানুষকে নিয়ে গিয়েছিলেন সত্য ও ন্যায়ের দিকে, গণতন্ত্র ও মানবতার দিকে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের মহান নায়ক তিনি। তিনি ভারতের জাতির জনক।

দারুণ সব লেখা পড়তে ও নানা বিষয় সম্পর্কে জানতে ঘুরে এসো

আমাদের ব্লগের পেইজ থেকে! The 10-Minute Blog!

সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের অন্যতম প্রেরণার উৎস ছিলেন গান্ধী। পৃথিবীর যেখানেই নির্যাতিত, নিপীড়িত মানুষের কান্না শুনেছেন, সেখানেই ছুটে গিয়েছেন তিনি। শুধু আফ্রিকাই নয়, কলকাতা, নোয়াখালী সর্বত্রই তিনি ছিলেন শান্তিকামী মানুষের পথ-প্রদশর্ক। আজকের লেখাটি সেই কিংবদন্তি মহাত্মা গান্ধীকে নিয়েই লেখা।

১৮৬৯ সালের ২রা অক্টোবর গুজরাটের পোরবন্দরে এক হিন্দু মোধ পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর আসল নাম মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। যদিও মহাত্মা গান্ধী নামেই তিনি বেশি পরিচিত। তাঁর বাবা করমচাঁদ গান্ধী ছিলেন পোরবন্দরের দেওয়ান আর মা পুতলিবা ছিলেন প্রণামী বৈষ্ণব গোষ্ঠীর মেয়ে। জন্মের পর ছোটবেলায় গান্ধী বড় হয়েছেন তাঁর জন্মস্থান পোরবন্দরেই। আর সেখানেই শুরু হয় তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা। মায়ের আদর্শ আর গুজরাটের জৈন প্রভাবিত পরিবেশ থেকে তিনি তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠতম শিক্ষা লাভ করেন। জীবের প্রতি অহিংসা, নিরামিষ ভোজন, আত্মশুদ্ধির জন্য উপবাসে থাকা, বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী ও সম্প্রদায়ের পারস্পরিক সহিষ্ণুতা এইসব বিষয় তাই তিনি আত্মস্থ করেছিলেন অনেক আগেই।

১৮৮৩ সালে, তাঁর বয়স যখন মাত্র ১৩ বছর তখন হঠাৎ করেই বাবা মায়ের পছন্দ করা ১৪ বছর বয়সী মেয়ে কাস্তুবাইকে বিয়ে করেন তিনি। তাঁর কাছে অবশ্য সেসময় বিয়ে মানে বিশেষ কিছু ছিল না, তাঁর জীবনসঙ্গী কাস্তুবাই তখন ছিল শুধুই তাঁর খেলার সাথী। পরবর্তীতে বৈবাহিক জীবনে গান্ধী ও কাস্তুবাই চার ছেলে সন্তানের জন্ম দেন।

ছাত্র হিসেবে মহাত্মা গান্ধী খুব একটা মেধাবী ছিলেন না। ছাত্রজীবনের অনেকটা সময় তিনি পার করেন পোরবন্দর আর রাজকোটে। রাজকোটের স্থানীয় এক স্কুল থেকে ইতিহাস, ভূগোল ও গণিতের প্রাথমিক শিক্ষা পান তিনি। তারপর কোনো রকমে গুজরাটের ভবনগরের সামালদাস কলেজ থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তারপরেই বিলাতে গিয়ে ব্যারিস্টারি পড়ার প্রবল ইচ্ছা হয় গান্ধীর।

কিন্তু তাঁর পরিবারের সকলে নিরামিষভোজী এবং রক্ষণশীল মনোভাবের হওয়ায় ছেলে বিলাতে গিয়ে বংশের নিয়মকানুন সম্পূর্ণভাবে ভুলে যেতে পারে সেই চিন্তা করে শুরুতে কেউ তাঁকে বিলাতে যাওয়ার অনুমতি দিতে রাজি হননি। পরবর্তীতে তাঁর বড় ভাই তাঁকে ব্যারিস্টারি পড়ার অনুমতি দিলে, ১৮৮৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ১৮ বছর বয়সে ব্যারিস্টারি পড়ার জন্য ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে চলে যান মহাত্মা গান্ধী।

নিজের জীবনকে করে তোলো সহজতর!

 

লন্ডনে যাওয়ার আগেই গান্ধী তাঁর মা আর স্ত্রীকে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন সেখানে গিয়ে মাংস, মদ আর মেয়েমানুষ থেকে দূরে থাকার। পরবর্তীতে লন্ডনে গিয়ে তাঁর জীবনযাপন ছিল ভারতে থাকতে তাদের কাছে করা শপথ প্রভাবিত। তবে সেখানে গিয়ে তিনি নিজেকে কোনো রকম গুণের চর্চা থেকে বিরত রাখেননি। ব্যারিস্টারি পড়ার পাশাপাশি তিনি নিজেকে নাচের শিক্ষায় পারদর্শী করে তুলেন। লন্ডনে থাকাকালীন সময়ে তিনি আমিষভোজি খাবার এড়িয়ে যেতেন।

এই নিরামিষভোজন যে শুধু মায়ের কথা অনুসারে তা নয়, নিরামিষভোজি জীবনযাপন বিষয়ে পর্যাপ্ত পড়াশোনা করে একান্ত আগ্রহী হয়েই তিনি নিরামিষভোজন গ্রহণ করেন। তারপর একটা সময় পরে তিনি নিরামিষভোজি সংঘেও যোগ দেন এবং সেখানে কার্যকরী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর সংস্থাটির স্থানীয় শাখাও প্রচলন করেন। তাঁর এই অভিজ্ঞতা পরবর্তী জীবনে সাংগঠনিক কার্যক্রমে অনেকভাবে কাজে লাগে।

তারপর মহাত্মা গান্ধী লন্ডন থেকে দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফেরার পর আইনজীবী হিসেবে কাজ পেতে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল গান্ধীর। তারপর ১৮৯৩ সালে দাদা আব্দুল্লাহ এর আমন্ত্রণে আইনজীবী হিসেবে কাজ করতে দক্ষিণ আফ্রিকা যান তিনি। দক্ষিণ আফ্রিকা গান্ধীর জীবনকে নাটকীয়ভাবে পরিবর্তন করে দেয়। সেখানে যাওয়ার পর তিনি ভারতীয় ও কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি সাধারণভাবে প্রচলিত বৈষম্যের শিকার হন। প্রথম শ্রেণীর বৈধ টিকিট থাকা স্বত্ত্বেও একদিন তাঁকে পিটার ম্যারিজবার্গের একটি ট্রেনের প্রথম শ্রেণির কামরা থেকে তৃতীয় শ্রেণির কামরায় যেতে বাধ্য করা হয় শুধু তিনি ভারতীয় বলে।

এছাড়াও স্টেজকোচে ভ্রমণের সময় একজন চালক তাঁকে প্রহার করে কারণ তিনি এক ইউরোপীয় যাত্রীকে জায়গা দিতে ফুট বোর্ডে চড়তে রাজি হননি সেজন্য। যাত্রাপথে তাঁকে আরও অনেক কষ্ট করতে হয়, হোটেল থেকে পর্যন্ত বহিষ্কার করা হয় তাঁকে। এই ঘটনাগুলোই পরবর্তীতে সামাজিক কার্যকলাপের মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার পেছনে মুখ্য ভূমিকা রাখে। ভারতীয়দের বিরুদ্ধে বর্ণবাদ, কুসংস্কার এবং অবিচার দূরীকরণের আন্দোলনে সহায়তা করে।

দক্ষিণ আফ্রিকায় তখন ভারতীয়দের ভোটাধিকার পর্যন্ত ছিল না। এই অধিকার আদায়ের বিল উত্থাপনের জন্য তিনি আরও কিছুদিন দেশটিতে থেকে যান। বিলের উদ্দেশ্য সাধন না হলেও এই আন্দোলনই তখন সেদেশের ভারতীয়দের অধিকার সচেতন করে তুলেছিল। তারপর ১৮৯৪ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন নাটাল ইন্ডিয়ান কংগ্রেস। এই সংগঠনের মাধ্যমে তিনি সেখানকার ভারতীয়দের রাজনৈতিকভাবে সংঘবদ্ধ করেন।

১৮৯৭ সালের জানুয়ারিতে ভারতে এক সংক্ষিপ্ত সফর শেষে ফিরে আসার পর এক শ্বেতাঙ্গ মব তাঁকে প্রাণে মেরে ফেলার চেষ্টা করে। কিন্তু তারপরও গান্ধী তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করেননি। তারপর দীর্ঘদিন আফ্রিকায় বঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য লড়ে ১৯১৫ সালের ৯ই জানুয়ারী তিনি ভারতে ফিরে আসেন।

গ্রাফিক্স ডিজাইনিং, পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশান ইত্যাদি স্কিল ডেভেলপমেন্টের জন্য 10 Minute School Skill Development Lab নামে ১০ মিনিট স্কুলের রয়েছে একটি ফেইসবুক গ্রুপ। গ্রুপে জয়েন করুন!

গান্ধীর জীবনে প্রথম অর্জন আসে ১৯১৮ সালের চম্পারন বিক্ষোভ এবং খেদা সত্যাগ্রহের মাধ্যমে। ব্রিটিশরা সেসময় মারাত্মক দুর্ভিক্ষের মাঝে একটি শোষণমূলক কর চালু করে এবং তা বাড়ানোর চেষ্টা করে। এতে করে তখন পরিস্থিতি প্রচণ্ড অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। ঠিক তখনই স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের জড়ো করে গ্রামবাসীদের জন্য তিনি আশ্রম তৈরি করেন আর এর কিছুদিন পরেই প্রতিষ্ঠা করেন হাসপাতাল ও স্কুল। পরবর্তীতে তিনি জমিদারদের বিরুদ্ধে সুসংগঠিত বিক্ষোভ এবং আন্দোলনে নেতৃত্ব দান করেন। তখন তারা রেভিনিউ এর হার বৃদ্ধি বর্জন এবং দুর্ভিক্ষ শেষ হবার আগ পর্যন্ত তা সংগ্রহ করা স্থগিত করে। এই বিক্ষোভ চলাকালীন সময়েই জনগণ খুশী হয়ে গান্ধীকে বাপু (পিতা) এবং মহাত্মা (মহৎ হৃদয়) উপাধি দান করে।

১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে মহাত্মা গান্ধী ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নির্বাহী দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। তাঁর নেতৃত্বে কংগ্রেস স্বরাজের লক্ষ্যকে সামনে রেখে নতুন সংবিধান গ্রহণ করেন। অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবসময়ই গান্ধীর অস্ত্র ছিল শান্তিপূর্ণ প্রতিরোধ আর অসহযোগ আন্দোলন। তাঁর এই আন্দোলন সেসময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল এবং এতে অংশগ্রহণ করেছিল সমাজের সকল স্তরের মানুষ। পরবর্তীতে ১৯২২ সালের ১০ মার্চ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে তাঁকে ছয় বছরের কারাদণ্ড দেয়া হলেও শাস্তির দুই বছরের মাথায়ই তিনি মুক্তি পেয়ে যান।

গান্ধীর একতাবদ্ধ ব্যক্তিত্যের অভাবে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ভিতরে ফাটল ধরে। হিন্দু-মুসলিমের অহিংস আন্দোলন চলাকালীন সৌহার্দ্যের ভাঙন ধরে। এসব বিরোধ মিটিয়ে তুলতে তিনি সেতুবন্ধের কাজ করার চেষ্টা করেন এবং এজন্য ১৯২৪ সালের শরৎকালে তিনি তিন সপ্তাহের অনশন করেন।

১৯২৮ সালের ডিসেম্বরে গান্ধী কলকাতা কংগ্রেসে ব্রিটিশ সরকারের প্রতি ভারতকে ডোমিনিয়নের মর্যাদা দেওয়ার দাবি জানান, অন্যথায় নতুন অহিংস নীতির পাশাপাশি পূর্ণ স্বাধীনতার হুমকি দেন। এরপর তিনি লবণের উপর কর আরোপের বিরুদ্ধে নতুন সত্যাগ্রহ অভিযান শুরু করেন। ১৯৩০ সালের মার্চে এই কারণে তিনি ডাণ্ডির উদ্দেশ্যে লবণ হাঁটা আয়োজন করেন এবং ৭৮ জন সহচর নিয়ে ১২ই মার্চ থেকে ৬ই এপ্রিল পর্যন্ত ৪০০ কিলোমিটার হেঁটে এলাহাবাদ থেকে ডাণ্ডিতে পৌঁছান নিজের হাতে লবণ তৈরির জন্য। এ যাত্রায় তাঁর সঙ্গী হয় হাজার হাজার ভারতীয়। ব্রিটিশরা এর বদলা নিতে ৬০ হাজার ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে। তবে এটি ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর অন্যতম সফল আন্দোলন। এই আন্দোলনের ফলে পরবর্তীতে ১৯৩১ সালে গান্ধী-আরউইন চুক্তি হয়। গান্ধীকে গোল টেবিল বৈঠকের জন্য লণ্ডনে আমন্ত্রণ জাননো হয়। সেখানে তিনি একাই কংগ্রেসের প্রতিনিধিত্ব করেন।

১৯৪২ সালে ইংরেজ শাসকদের প্রতি সরাসরি ভারত ছাড় আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটান মহাত্মা গান্ধী। একই বছরের ৯ আগস্ট তাঁকে আবারো গ্রেফতার করা হয় এবং পুনের আগা খাঁ প্যালেসে আটকে রাখা হয়। ১৯৪৩ এর শেষের দিকে যখন ব্রিটিশরা ভারতের স্বাধীকার প্রদানের অঙ্গীকার করে তখন থামে এই আন্দোলনটি। পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার দেখা পায় ভারত।

স্বাধীনতার পরে দেখা যায়, প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় প্রার্থনা সভা করতেন মহাত্মা গান্ধী। সেখানে সব ধর্মের কথা বলা হতো, যাতে অংশ নিতেন কয়েকশ’ মানুষ। প্রতিদিনের মতো ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি, সেদিনও সন্ধ্যার প্রার্থনা সভার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন গান্ধী। ঠিক সেই মূহুর্তেই নাথুরাম গডসে খুব কাছ থেকে পিস্তলের তিনটি গুলি ছোড়েন তাঁর বুক লক্ষ্য করে, গডসের করা সেদিনের গুলিতেই মৃত্যু হয় মহাত্মা গান্ধীর। তাঁর মৃত্যুর এতবছর পেরিয়ে গেলেও পুরো বিশ্ববাসী এখনো শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন মহান এই নেতাকে।

তথ্যসূত্র:

* উইকিপিডিয়া

* বাংলাদেশ প্রতিদিন

সহজেই মহাত্মা গান্ধীর আত্মজীবনী বই পেতে পারেন 

মহাত্মা গান্ধি তার জীবনে অনেক বই লিখেছিলেন। তার লেখা জনপ্রিয় বই সমূহ পেতে পারেন রকমারি ডট কম এ

আরও আত্মজীবনী মুলক বই পরতে পারেন এখানে


১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: [email protected]

 

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?