কোকোস আইল্যান্ড: সত্যিকারের গুপ্তধনের খনি

জলদস্যু! গুপ্তধন! ছোটবেলায় অ্যাডভেঞ্চারের গল্পগুলো পড়তে পড়তে অনেকেরই গুপ্তধন খোঁজার অভিযানে বের হতে ইচ্ছে হতো। জলদস্যুদের সাথে লড়াই করার স্বপ্নও দেখেছি কেউ কেউ। আজকে একটা সত্যিকারের গুপ্তধনের খনির গল্প শোনাবো। সে এমন এক জায়গা, ধারণা করা হয়, কুখ্যাত সব জলদস্যুরা কোন না-কোন সময়ে এসে, ওই দ্বীপে তাদের লুট-করা ধনরত্ন লুকিয়ে রেখেছে। দ্বীপটির নাম কোকোস আইল্যান্ড! কোস্টারিকার মূল ভূখণ্ড থেকে সাড়ে চারশাে মাইল দূরে।

চলো যাই গুপ্তধন খুঁজতে!

প্রথমেই প্রশ্ন উঠতে পারে, কেন জলদস্যুরা গুপ্তধন লুকানোর জন্য এই দ্বীপকেই বেছে নিয়েছিলো। সমুদ্রে সাধারণত যেসব খাঁড়ি দেখা যায়, এখানে তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এই দ্বীপটিতে খাঁড়ি অনেকটাই ভেতরের দিকে ।


কোকোস আইল্যান্ড

তাই এখানে টহল দেওয়া কোনাে যুদ্ধ জাহাজের চোখে পড়ার ঝুঁকি কম।খাঁড়ির ভেতরে জাহাজ ঢুকিয়ে ধন-দৌলত মাটির তলায় লুকিয়ে রাখার সুযোগও বেশি।


এখানে গুপ্তধন লুকিয়ে রাখা বেশ সহজ!

এই দ্বীপে জোয়ারের সময় উপকূলের অনেকটা ডুবে যায়। জলদস্যুরা ভাটার সময় মাটির তলায় গুপ্তধন পুঁতে রাখতো, লুকিয়ে রাখার দায়িত্ব সমুদ্র নিজেই নিয়েছিলো। এই দ্বীপে গভীর জঙ্গল, পাহাড়, শত শত গুহা- যে কোন ধরণের জিনিসপত্র লুকিয়ে রাখার জন্য মোক্ষম জায়গা।

গ্রাফিক্স ডিজাইনিং, পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশান ইত্যাদি স্কিল ডেভেলপমেন্টের জন্য 10 Minute School Skill Development Lab নামে ১০ মিনিট স্কুলের রয়েছে একটি ফেইসবুক গ্রুপ। গ্রুপে জয়েন করুন!

কেউ যদি গুপ্তধন খুঁজতে চায়, তাহলে জোয়ার ভাটা মাঝামাঝি সময়ে প্রথমে ঠিক জায়গাটি খুঁজে বের করতে হবে, এরপর খোঁড়াখুঁড়ি। এখানে গুপ্তধন খোঁজার প্রধান সমস্যা হলো জায়গা খুঁজে বের করলেও জোয়ারের সময় তা ভেসে যায়, ভাটার সময় তার কোনাে চিহ্নই থাকে।

পৃথিবী বিখ্যাত পেরুর নেতা সিমন বলিভার তুমুল আক্রমণ চালিয়ে ১৮১৯ সাল নাগাদ ভেনেজুয়েলা ও কলম্বিয়ার দখল নেন। এরপর আর্জেন্টাইন নেতা জোসে ডি সান মার্টিনের সঙ্গে জোট করে স্পেনের হাত থেকে পেরুকে মুক্ত করেন বলিভার।


জোসে ডি সান মার্টিন

বিদ্রোহীরা তাদের স্বাধীন প্রজাতন্ত্র গঠনের পর যাত্রা করল লিমা অভিমুখে। তারা শহরের কাছাকাছি পৌঁছলে, ধনী পেরুবাসীরা এবং ক্যাথলিক পুরোহিত সম্প্রদায় তাদের অগাধ ধনসম্পদ লুকিয়ে ফেলার পরিকল্পনা করেন। তাদের সবার সোনা দানা, গির্জার ধন সম্পদের তখনকার মূল্য ছিল কয়েকশো কোটি ডলার। লিমাকে তখন বলা হতো ’দ্য গোল্ডেন জুয়েল অব দ্যা ওয়েস্ট’।

নিরাপত্তার জন্য সবাই দুর্গে জমা দিল তাদের ধন-সম্পদ। দক্ষিণ আমেরিকার মুক্তিযুদ্ধের সময় চীনের নৌবাহিনীর কমান্ডার ছিলেন ডোনাল্ড। তাঁর মতে, ১৮৮১ সালের ১৯ আগস্ট লিমা এবং তার আশেপাশে সমস্ত ধনরত্ন জমা পড়েছিল ওই দুর্গে।

জোসে ডি সান মার্টিন মুক্তিবাহিনী নিয়ে আরও এগিয়ে গেলেন।সবাই বুঝতে পারল দুর্গ রক্ষীরা এই আক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারবে না। তাই সঞ্চিত ধনসম্পদের অনেকটাই শহরের বাইরে নিয়ে পাহাড়ে গভীর গর্ত করে লুকিয়ে রাখা হলো। এদিকে প্রায় ত্রিশ কোটি ডলার মূল্যের ধন-সম্পদ নিয়ে যাবার জন্য ভাড়া করা হলো একটি ব্রিটিশ জাহাজ। জাহাজের নাম ‘মেরি ডিয়ার’। ক্যাপ্টেন ছিলেন টমসন। তিনি সততার জন্য বিখ্যাত ছিলেন।

কিন্তু হায়! বন্দর ছাড়বার পরেই টমসন এবং তার নাবিকেরা গুপ্তধনের লোভে জলদস্যু বনে গেল। স্পেনের যে ক’জন সশস্ত্র প্রহরী ওই জাহাজে ছিল তাদের হত্যা করলো সবাই মিলে। তারপর জাহাজ নিয়ে তারা পালিয়ে গেলে কোকোস আইল্যান্ডে। ওখানে ওয়েফার উপসাগরে কোন এক জায়গায় মাটির তলায় পুঁতে রাখল লুটের মাল।

স্প্যানিয়র্ডরা পরে মেরি ডিয়ার জাহাজকে বন্দি করেছিল। টমসন আর ফার্স্ট মেট ছাড়া সবাইকে ফাঁসি দেওয়া হলো। তারা দু‘জন কথা দিয়েছিল, গুপ্তধনের সন্ধান দেবে। তাই বাঁচিয়ে রাখা হলো তাদের ।

কিন্তু জাহাজ কোকোস দ্বীপে নােঙর করা মাত্র ওরা ঝাপ দিল সমুদ্রে। তারপর সাঁতরে এগিয়ে চলল তীরের দিকে। তাদের হত্যা করার জন্য জাহাজ থেকে বন্দুকের গুলি ছােঁড়া হলো। পানিতে ছিলো শত শত হাঙ্গর।

সবকিছু থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে আশ্চর্যজনকভাবে ওরা পৌঁছে গেল দ্বীপে। গা-ঢাকা দিল গভীর জঙ্গলে। স্প্যানিয়ার্ডরা জাহাজ থেকে নেমে ওদের এবং গুপ্তধনের সন্ধানে তন্নতন্ন করে তল্লাশি চালাল, কিন্তু কোনােটারই খোঁজ পাওয়া গেল না।

শােনা যায়, টমসন ফার্স্ট মেটকে খুন করে ওই দ্বীপ থেকে নােভা স্কটিয়ায় পালিয়ে গিয়েছিলো। মতশয্যায় সে নাকি তার নিকটতম আত্মীয়ের হাতে তুলে দিয়েছিল গুপ্তধনের একটা নকশা। পরবর্তীকালে তার এক বংশধর জেমস এ. ফরবস কোকোস দ্বীপে লিমার সেই লুষ্ঠিত গুপ্তধনের আশায় কয়েকবার অভিযান চালিয়েছিল।


গুপ্তধনের নকশা

শেষবার ফরবস মেটাল ডিটেকটর এবং মাটি সরাবার ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে গিয়েছিল। | দুমাস অক্লান্ত পরিশ্রমের পর খালি হাতে ফিরতে হয়েছিল তাদের। অবশ্য তারা দাবি করেছিলো, ওই অভিযানে নকশা অনুযায়ী কূল ঘেষে মেটাল ডিটেকটর ধাতব বস্তুর ইঙ্গিত পেয়েছিল।

 

কিন্তু খোঁড়াখুঁড়ির কাজে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলো বালি আর সমুদ্রের পানি। ওগুলাে সরিয়ে গুপ্তধন উদ্ধার করা যায়নি কিছুতেই। | ফরবসের বিশ্বাস ছিলো নকশার চিহ্নমতাে স্থান সে খুঁজে পেয়েছে । ক্যাপ্টেন টমসনের লুট করা ত্রিশ কোটি ডলার মূল্যের ধনসম্পদ ওই দ্বীপে আছে—এটা আজও অনেকের দৃঢ় বিশ্বাস।

টমসনের মূল নকশা নিয়ে আরো অনেকেই ওই দ্বীপে অভিযান চালিয়েছিলেন। ১৯০৪ সালে লর্ড উইলিয়ামস ও আর্নল্ড গ্রে – দুজনেই একই সময়ে অভিযাত্রী দল নিয়ে গুপ্তধন খুঁজতে গিয়েছিলো। দু’জনের কাছে টমসনের নকশার অনুলিপি ছিল। দু’দলের মধ্যে প্রথমে কিছুটা ঝামেলাই হয়েছিলো, পরে সিদ্ধান্ত হলো গুপ্তধনের সন্ধান পেলে তারা ভাগ করে নিবেন। কিন্তু দুই দলকেই খালি হাতে ফিরতে হয়েছিলো।

১৯২৫ সালে বিখ্যাত স্পোর্টসম্যান, মোটর-দৌড়ে বিশ্ববিজয়ী ক্যাপ্টেন ম্যালকম ক্যাম্বেল গুপ্তধনের নেশায় বুঁদ হয়ে জীবনের মূল্যবান একটি বছর নষ্ট করলেন।টমসনের নকশার কত অনুলিপি যে পৃথিবীতে ছড়িয়ে আছে তার সংখ্যা জানা যায় না।  


ক্যাপ্টেন ম্যালকম ক্যাম্বেল

টমসন কোকোস দ্বীপ থেকে পালিয়ে কোথায় গিয়েছিলেন তার ব্যাপারে ও নির্ভুল তথ্য জানা যায়নি। অনেকের ধারণা তিনি ইংল্যান্ডে ফিরে গিয়েছিলেন, আবার কেউ কেউ বিশ্বাস করেন তিনি নোভা স্কটিয়ায় বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিয়েছিলেন। আবার অনেকের মতে, স্প্যানিয়ার্ডরা তাকে বন্দী করে পেরু নিয়ে গিয়েছিল এবং সেখানে তার ফাঁসি হয়েছিল।

আবার এমন কথা শোনা যায় যে ফার্স্ট মেট নয়, তিনিই ওই দ্বীপে মারা গিয়েছিলেন। ফার্স্ট মেট তাকে হত্যা করে তার পরিচয় ফিরে এসেছিল।

১৬৮৩ সাল থেকে ১৭০২- এই সুদীর্ঘ উনিশ বছর  এডওয়ার্ড ডেভিস নামের এক কুখ্যাত জলদস্যুর ছিল অগাধ প্রতিপত্তি। সমুদ্রে তার রাজত্ব। প্রচুর লুট করে থাকলেও তার ধনসম্পদের কোন হদিস পাওয়া যায়নি আজ পর্যন্ত।

ডেভিস প্রায়ই কোকোস দ্বীপে যেতেন। ধারণা করা হয়, আজও হয়তো চোখের আড়ালে রয়ে গেছে সব লুটের মাল।  লেখক ওয়েকার (যে নিজেও আগে জলদস্যু ছিলেন) তার বইয়ে লিখেছেন, ডেভিস সাতটি নৌকাভর্তি লুটের মাল নিয়ে গিয়েছিলো ওই দ্বীপে।

১৮১৪ সালে এসেছিল স্পেনের একটি প্রাইভেটিয়ার জাহাজের ক্যাপ্টেন ছিলেন বেনিটো বনিটো।পরবর্তীতে কুখ্যাত জলদস্যুর জীবন বেছে নিয়েছিলেন তিনি। রিও থেকে নিউইয়র্ক যাতায়াতকারী কোন জাহাজ তার হাত থেকে পালিয়ে বাঁচতে পারতো না।

কোন একটা বাণিজ্য জাহাজ নাগালের মধ্যে এলেই সেটা লুট করে ডুবিয়ে দিতেন তিনি। পেরুর উপকূলবর্তী সকল এলাকায় তিনি হানা দিতেন। একবার স্পেনের এক জাহাজ লুট করেন। জানা যায়, পেরুর সৈন্যদের জন্য সোনাদানা ও টাকা পয়সা নিয়ে যাচ্ছিল জাহাজটি।

লুটের মাল জাহাজে ভরে উঠলে বেনিটো ওগুলো লুকিয়ে রাখার জন্য চলে আসতেন কোকোস দ্বীপে। গবেষকদের মতে, তার সম্পদের মূল্য পঁচিশ কোটি ডলারের বেশি হবে।

১৮৮৬ সালের সম্রাট সম্রাট তৃতীয় চার্লসের নাম খোদাই করা মোহর পাওয়া গিয়েছিল ওই দ্বীপে। মোহরে চার্লসের মুখের ছাপ ছিল আর ১৭৮৭ সাল খোদাই করা ছিলো। ওগুলো বেনিটোর লুটের মাল বলে মনে করা হয়। এ থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়, ওই দ্বীপে জলদস্যুরা ধন সম্পদ লুকিয়ে রেখেছিলো।

জার্মানির অগাস্ট গিসলার কোকোস দ্বীপে গুপ্তধন সন্ধান করতে গিয়েছিলেন।তিনি কোস্টারিকা সরকারের সাথে চুক্তি করেছিলেন যে, ওই নির্জন দ্বীপে বসবাস করবেন ও গুপ্তধন খুঁজবেন।যদি তিনি গুপ্তধনের সন্ধান পান, তবে তার একটা অংশ সরকারকে দিয়ে দিবেন। রবিনসন ক্রুসোর মতোই তিনিও দীর্ঘকাল একাকী থেকেছিলেন ওই দ্বীপে। তাকে বলা হতো কোকোস দ্বীপের গভর্নর।

অগাস্ট গিসলার

গিসলারের মতে, বেনিটো এগারােটি নৌকো বােঝাই করে ধনরত্ন নিয়ে গিয়েছিলো। ভাটার সময় একটা উচু পাহাড়ের চূড়ায় ওগুলাে বয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেই দুর্গম জঙ্গল কেটে পথ করেছিল জলদস্যুরা। চুড়ােয় পৌঁছে বড়-বড় কাঠের খণ্ড আর জাহাজের দড়ির সাহায্যে ধনরত্ন তােলা হয়েছিল, তারপর লুকিয়ে রাখা হয়েছিল গভীর ফাটলে। গিসলারের বক্তব্য, একটা ধস নামায় চুড়াের সেই দিকটা ঢাকা পড়ে গেছে।

আজ পর্যন্ত কয়েকশাে জাহাজ জলদস্যুদের লুকোনাে গুপ্তধন উদ্ধারের আশায় ওই দ্বীপে অভিযান চালিয়েছে। কিন্তু সরকারিভাবে কোনাে সাফল্যের ঘোষণা পাওয়া যায়নি কখনো। বহু বছর গবেষণা চালিয়ে গিসলার বেশ জোর দিয়েই বলেছেন, একাধিক নয়, অন্তত বারােজন জলদস্যু ওই দ্বীপে লুকিয়ে রেখেছে তাদের ধনসম্পদ।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডি রুজভেল্ট আমেরিকার যুদ্ধ জাহাজ হাউস্টনে চেপে কোকোস দ্বীপে গিয়েছিলেন। বেনিটো বোনিটো, টমসন, ক্যাপ্টেন জন কুক, স্যার ফ্রান্সিস ডেক-সহ আরও কত জলদস্যুর ধনসম্পদ যে কোকোস দ্বীপে লুকিয়ে আছে তা আজও জানা যায়নি।

গুপ্তধনের সন্ধানে সম্ভাব্য স্থানগুলােতে মাটি সরাবার ভারি যন্ত্রপাতি ও ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেওয়ার ফলে ওই দ্বীপের অবস্থা এখন খুবই খারাপ। তবুও আজও সত্যিকারের গুপ্তধনের খনি হিসেবে কোকোস আইল্যান্ডই পৃথিবীতে বিখ্যাত হয়ে রয়েছে।

তথ্যসূত্র:

  1. https://en.wikipedia.org/wiki/Cocos_Island
  2. https://www.theguardian.com/environment/2014/may/08/cocos-islands-rich-pirate-history
  3. https://www.underseahunter.com/b165/cocos-island-history.html#.XHFY_7j-vIU
  4. রত্নদ্বীপ আজও আছে- কিশোর আনন্দ ১৩
  5.  

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: [email protected]

  1.  
লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?