৬টি ইউটিউব চ্যানেল যা তোমাকে বিজ্ঞান শিখাবে

সত্যি করে বলো তো, বিজ্ঞান পড়তে কেমন লাগে? কারো উত্তর হবে খুব ভালো লাগে। বেশ আগ্রহের সাথে বিজ্ঞান পড়ি। আবার কেউ কেউ জবাব দেবে, “পড়া লাগে তাই পড়ি!” পরীক্ষায় পাশ করার জন্য যতটুকু না পড়লেই নয়, ততোটুকু পড়ি। অন্যদিকে ফেসবুক, ইউটিউব বা অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া বেশ আগ্রহ জাগায় আমাদের।

মূল বিষয় হলো বিজ্ঞান শিক্ষা আমাদের কারো কাছে ভালো লাগে আবার কারো কাছে এটা চরম বিরক্তিকর একটি বিষয়। না পড়ে উপায় নেই, তাই পড়তে হচ্ছে। কিন্তু যদি বলি বিজ্ঞান বিষয়টি সবার কাছেই আনন্দের লাগবে যদি এর উপস্থাপন এবং ব্যবহারটি সঠিক হয়? ব্যাপারটা আসলেই তাই। বিজ্ঞান তোমার কাছে কেমন লাগবে তা নির্ভর করে এর উপস্থাপনা কেমন হচ্ছে তার উপর।

আর বিজ্ঞান যে কেবল পাঠ্যবইয়ে থাকা গুটি কয়েক অধ্যায়ের মাঝেই সীমাবদ্ধ তা কিন্তু না। বিজ্ঞানের পরিসীমা বিশাল। এখন নিশ্চয়ই প্রশ্ন করবে যে, বইয়ের পড়া পড়েই কুল পাই না, আবার এতো বিশাল পরিসীমার বিজ্ঞান শিখবো কখন? ঐ যে, আগেই বলেছি। বিজ্ঞান তোমার কাছে কেমন লাগবে তা নির্ভর করে এর উপস্থাপনার উপর। একথা সত্য যে আমাদের দেশের স্কুল এবং কলেজগুলোতে যেভাবে বিজ্ঞান শিক্ষা দেয়া হয়, তা মোটেও আদর্শ বিজ্ঞান শিক্ষার ধারে কাছেও যায় না। এখানে যেভাবে বিজ্ঞান শিক্ষা দেয়া হয়, তাতে প্রকৃত বিজ্ঞানের এক বিশাল অংশ শিক্ষার্থীদের জানার বাহিরে থেকে যায়। যেহেতু শিক্ষার্থীরা তা জানে না, তাই তারা এগুলো নিয়ে প্রশ্নও তুলে না। আর কেউ যদি প্রশ্ন তুলেও থাকে, দেখা যায় শিক্ষকের কাছে সে প্রশ্নের কোনো উত্তর থাকে না। তাই বিজ্ঞানের প্রকৃত শিক্ষাটা আর হয়ে উঠে না।

এখন বিজ্ঞান যদি শিখতেই হয়, তাহলে সমাধান কী? সমাধান আছে ইউটিউবে! আমরা প্রায় সবাই দিনের একটা বড় অংশ ইউটিউব ভিডিও দেখে কাটিয়ে দেই। কেমন হয় যদি ইউটিউবে কাটানো এই সময়টা বিজ্ঞান শিখে কাটানো যায়? বিজ্ঞান শিখতে তো আর বয়সের বাধা নেই। এই লেখায় আমরা এমন ৬টি ইউটিউব চ্যানলের সাথে তোমাদের পরিচয় করিয়ে দেবো যেখান থেকে তোমরা মজার সাথে বিজ্ঞান শিখতে পারো। আর বিজ্ঞানের অন্যতম একটি উপকরণ চিন্তা করার গুণটিও পেতে পারো এই ইউটিউবারদের কাছ থেকে। এখানে ইউটিউব চ্যানেলগুলোর নাম, লিঙ্ক, লেখাটি তৈরি করার সময় তাদের সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা এবং সেই সাথে চ্যানেলগুলোর ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করবো।

 
টুইন বেবির রহস্য!
টুইন বেবির নাম জানলেও এটি নিয়ে পরিষ্কার ধারণা আছে ক'জনের? টুইন বেবি আর তার ডিএনএ এর সাতসতেরো জানতে দেখে নাও এই ভিডিওটি!  

Vsauce – Subscribed by 14,377,548

বিজ্ঞান নিয়ে কতোভাবে চিন্তা করা যায়? পৃথিবী, মহাশূন্য, গণিত, পদার্থ বিজ্ঞান, মানুষের মন আরও কতো কী! এর সবকিছু নিয়ে যতো প্রশ্ন, তার উত্তর তুমি পেয়ে যাবে এই চ্যানেলটিতে। একবার চিন্তা করো তো, কী হতো যদি পৃথিবীর সবাই একসাথে লাফ দিতো? কী হতো যদি হঠাৎ করে আমাদের সৌরজগতের সূর্যটি গায়েব হয়ে যেতো? আমাদের পৃথিবী কি আসলেই গোল নাকি চ্যাপ্টা আকৃতির? এরকম নানা প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবে তুমি এই চ্যানেলটিতে।

Vsauce এর উপস্থাপক মাইকেল; ছবিসূত্র – Promolta Blog

এই চ্যানেলের আরও ২টি শাখা চ্যানেল আছে। Vsauce2 এবং Vsauce3। ৩টি চ্যানেলেই উপস্থাপকদের কথা বলার ধরন, তাদের বিজ্ঞানভিত্তিক সকল উদাহরণ তোমাকে অন্য এক জগতে নিয়ে যাবে। এই চ্যানেলগুলোতে মূলত বিজ্ঞানের বিভিন্ন বড় বড় তত্ত্ব এবং ধারণা নিয়ে আলোচনা করা হয়। এখানে যেভাবে আলোচনা করা হয়, তা তোমাকে বিজ্ঞান নিয়ে নতুনভাবে ভাবানোর জন্য যথেষ্ট।

AsapSCIENCE – Subscribed by 8,583,644

As soon as possible Science। চ্যানেলটির নাম ভেঙ্গে বললে এটিই দাঁড়ায়। অর্থাৎ খুবই অল্প সময়ের মধ্যে তোমাকে বিজ্ঞান শিখিয়ে দিবে এই ইউটিউব চ্যানেলটি। সেটিও আবার গড়ে মাত্র ৫ থেকে ৬ মিনিটের মধ্যে। চ্যানেলটির বেশিরভাগ ভিডিও ৩ থেকে ৪ মিনিট লম্বা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা ১০ মিনিটও পেরিয়ে যায়। তবে চ্যানেলটির মূল আকর্ষণ হলো এর উপস্থাপনা। কীভাবে অল্প কথায় কোনো জটিল একটি বিষয়কে সহজেই বুঝিয়ে দেয়া যায় তা বাস্তবায়ন করতে সক্ষম এই ইউটিউব চ্যানেলটি। আরেকটি বিষয় হলো, এই চ্যানেলের বেশিরভাগ ভিডিও তৈরি হয়েছে কার্টুন অ্যানিমেশনের মাধ্যমে। ব্যাপারটি যেমন কোনো বিষয় দেখতে আকর্ষনীয় করে তুলে আবার যেকোনো কঠিন বিষয়কে করে তুলে সহজবোধ্য।

AsapSCIENCE এর দুই উপস্থাপক; ছবিসূত্র – The Ontarion

minutephysics – Subscribed by 4,656,452

না, এই চ্যানেল তোমাকে এক মিনিটেই ফিজিক্স শিখিয়ে দিবে না। অল্প একটু বেশি সময় নিবে। তবে তা মিনিটের ঘরেই। তবে বেশ কিছু ভিডিওতে তারা সত্যিই এক মিনিটের মাঝেই তোমাকে ফিজিক্স শিখিয়ে দিতে পারবে। আগের চ্যানেলটির মতোই এদের উপস্থাপনার জন্য বেশ সুন্দর একটি মাধ্যম হলো অ্যানিমেশন। কীভাবে অল্প কথায় কোনো বিষয় সহজবোধ্য করে তোলা যায়, তা পাওয়া যাবে এই ইউটিউব চ্যানেলটিতে।

minutephysics চ্যানেলের বিহাইন্ড দ্যা সিন; ছবিসূত্র – YouTube

তবে এক মিনিটে ফিজিক্স শিখে পরীক্ষার খাতায় ঝড় তুলে দিবে এই আশা রেখো না। এই চ্যানেলটিতে ফিজিক্সের মৌলিক এবং বেশ আকর্ষণীয় কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। এই চ্যানেলটির মূল উদ্দেশ্য হলো, ফিজিক্স যে অনেক মজার হতে পারে তা সবার সামনে তুলে ধরা। চ্যানেলটির About এ গিয়ে দেখলে আলবার্ট আইনস্টাইনের একটি উক্তি পাওয়া যায়। “If you can’t explain it simply, you don’t understand it well enough.” বুঝতেই পারছো, সহজেই ফিজিক্সের ভাষা উপস্থাপনের জন্য তারা কেনো এতো আগ্রহী।

Khan Academy – Subscribed by 4,848,039

খান একাডেমি হলো একটি অলাভজনক অনলাইন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তোমরা যারা কলেজে অর্থাৎ একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণীতে বিজ্ঞান নিয়ে পড়ছো, তাদের পড়ালেখা সহজ করে তোলার জন্য একদম আদর্শ হলো এই চ্যানেলটি। ম্যাথ, ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, ইতিহাস, ফিন্যান্স, গ্রামার সবকিছুর ব্যাপারে সুন্দরমতো ভিডিও পাবে এই চ্যানেলটিতে। সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইট khanacademy.org -এ ভিজিট করেও তুমি এই ভিডিওগুলো দেখতে পারো এবং সেই সাথে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর তাদের তৈরি করা প্রশ্নে উত্তর দিতে পারো। সেখানে তোমার উত্তরের জন্য তোমাকে আলাদা মার্কিং করা হবে। হেডিং-এ দেয়া চ্যানেলটি হলো তাদের মূল চ্যানেল। এছাড়াও বায়োলজি, কেমিস্ট্রি, ক্যারিয়ার ডেভলপমেন্ট এসবের জন্যও তাদের পৃথক পৃথক ইউটিউব চ্যানেল রয়েছে।

Khan Academy এর প্রতিষ্ঠাতা সালমান খান; ছবিসূত্র – YouTube

সবচেয়ে মজার ব্যাপার কী জানো? এই খান একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা সালমান খান হলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকান নাগরিক। তুমি যদি তাদের সাইটে গিয়ে নিজের গুগল কিংবা ফেইসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে লগ ইন করো, তাহলে তাদের সবকয়টি ভিডিও তোমার জন্য বাংলায় রূপান্তর করে দেয়া হবে। অর্থাৎ তাদের যেই ভিডিওগুলো ইউটিউবে ইংরেজিতে বোঝানো হয়েছে, সেই ভিডিওগুলো তুমি চাইলেই বাংলায় দেখে বুঝতে পারবে।

Meet Arnold – Subscribed by 2,324,491

আমাদের সবার বন্ধু মহলেই এমন একজন থাকে যাকে সব ক্ষেত্রে গিনিপিগ বানানো হয়। যতো ঝামেলা আছে সব ফেলা হয় এর ঘাড়ে। ক্লাসে টিচারের ধমক থেকে শুরু করে রেস্টুরেন্টে খাবারের বিল সবকিছুর ঝড় যায় এই বন্ধুর উপর দিয়ে। তবে আর যাই হোক, কারো উপর ঝড় তুফান চালিয়ে দিয়ে তো বিজ্ঞান শিখা যায় না।

আমাদের সবার বন্ধু আর্নল্ড; ছবিসূত্র – YouTube

তবে এমন একজন আছে যার উপর বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে তুমি যতোই ঝড় তুফান চালিয়ে দাও না কেনো, বেচারা কিছুই মনে করবে না। বরঞ্চ তার জন্মই যেনো হয়েছে গিনিপিগ হয়ে থাকার জন্য। Meet our friend Arnold! আচ্ছা, কেমন হবে যদি তোমাকে জীবন্ত কবর দিয়ে দেয়া হয়? কিংবা তুমি যদি ১০০০ বছর বেঁচে থাকো? অথবা কী হবে তুমি যদি আলোর গতিবেগে দৌড়াতে থাকো? তোমাকে যদি সূর্যে পাঠিয়ে দেয়া হয় তাহলে কী হবে? নিজে গিনিপিগ হয়ে তো আর এসব করা সম্ভব না। তাই আমাদের আর্নল্ড রয়েছে। সে আমাদের জন্য বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে এই সব কাজ করতে রাজি। তাকে সমুদ্রের তলদেশ থেকে মহাশূন্য হয়ে সূর্য যেখানে ইচ্ছা পাঠিয়ে দাও, সে আমাদের বিজ্ঞান শিখিয়েই ছাড়বে।

এতো কষ্টের পর বেচারা আমাদের কী বলতে চায় জানো?

Is anybody here?

Hey!

It’s Arnold.

Help me!

Please, help me!

বেচারা বোধ হয় ভালোই কষ্টে আছে!

Brilliant.org – Subscribed by 14,699

সবশেষে যেই চ্যানেলটি নিয়ে কথা বলবো তাদের সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা খুব বেশি না হলেও, ম্যাথ ও লজিক শিখার জন্য এটি হলো আদর্শ একটি স্থান। ইউটিউব চ্যানেলের চেয়ে তাদের মেইন ওয়েবসাইট brilliant.org তেই মানুষের সমাগম বেশি। সুন্দর বেশকিছু উদাহরণের মাধ্যমে তারা কোনো একটি বিষয় নিয়ে সহজ থেকে কঠিনের দিকে গিয়েছে। বিভিন্ন ধাপে ধাপে তাদের সাইটে পরীক্ষার ব্যবস্থাও আছে। সেখানে পরীক্ষা দিয়ে যে কেউ তার মেধা যাচাই করে নিতে পারে। যাচাইয়ের পর যারা যারা পরীক্ষা দিয়েছে, তাদের সবাইকে নিয়ে একটি সম্মিলিত মেধা তালিকা তারা প্রকাশ করে।

ম্যাথ শিখার মজার একটি জায়গা হলো ব্রিলিয়ান্ট; ছবিসূত্র – programmingasap.wordpress.com

এগুলো হলো এমন কিছু ইউটিউব চ্যানেলের রিভিউ যেখান থেকে তুমি চাইলে সহজেই বিজ্ঞানের নানা সমস্যার সমাধান খুঁজে নিতে পারো। সহজে বিজ্ঞান শিখার এমন সুযোগ সব জায়গায় তো আর পাওয়া যায় না। তাই সবার সাথে নিজের জ্ঞান ভাগ করে নেয়ার এক সহজ মাধ্যম হলো ইউটিউব। এসকল চ্যানেলের মাঝে বেশ কিছু চ্যানেল স্পন্সরের মাধ্যমে তাদের ভিডিও বানিয়ে থাকে। চাইলে তুমিও একটি ইউটিউব চ্যানেল খুলে তোমার কথা সবার সাথে ভাগ করে নিতে পারো।  

রেফারেন্স –

১. http://mediakix.com/2017/09/best-science-youtube-channels/#gs.9lpbxn

২. https://medium.com/machine-learning-world/best-popular-science-youtube-channels-767a73add30a

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
Author

Nahiyan Siyam

আমি নাহিয়ান সিয়াম। রমজান মাসে জন্ম বলে মা পছন্দ করে আমার এই নাম রাখেন। লিখতে ভালো লাগে তাই লেখালেখির কাজ পেলেই তা হাতে নেয়ার চেষ্টা করি।
Nahiyan Siyam
এই লেখকের অন্যান্য লেখাগুলো পড়তে এখানে ক্লিক করুন
What are you thinking?