ভর্তি পরীক্ষা ও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা


পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবার শুনে নাও।

আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা একজন শিক্ষার্থীর জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। এই লেখায় থাকছে ভর্তি পরীক্ষায় যারা অংশগ্রহণ করবে তাদের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ যা তাদের এই দুর্গম পথ পাড়ি দিতে অনেকটা সহায়তা করবে।

১) Admission Test -এর গুরুত্ব

শৈশব থেকে লালিত কোনো পেশাজড়িত স্বপ্ন প্রায় সম্পূর্ণই নির্ভর করে এই পরীক্ষার উপর। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হবার স্বপ্নের কথা। এই স্বপ্ন ছোঁয়ার জন্য যথাক্রমে মেডিকেল কলেজ আর ইঞ্জিনিয়ারিং ভার্সিটিতে চান্স পাওয়াটা হলো প্রথম সোপান।

দারুণ সব লেখা পড়তে ও নানা বিষয় সম্পর্কে জানতে ঘুরে এসো আমাদের ব্লগের নতুন পেইজ থেকে!

অনেকেই মনে করে, “সামান্য একটা পরীক্ষাই তো। জীবনে কত পরীক্ষা দিলাম! এ আর নতুন কী!” আর এই চিন্তাটাই হলো হোচট খাওয়ার প্রথম কারণ। জীবনে তুমি অসংখ্য পরীক্ষা দিয়ে থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষাটা আলাদা করে দেখতেই হবে; নিতে হবে যথেষ্ট গুরুত্বের সাথে।

২) লক্ষ্য নির্ধারণ

আমরা ছোটবেলায় ‘My aim in life’ বা ‘আমার জীবনের লক্ষ্য’ রচনায় লিখতাম “A man without a goal is like a ship without a rudder” অর্থাৎ “একজন লক্ষ্যহীন মানুষ একটি বৈঠাহীন নৌকার মতো।” এই কথাটার মর্মার্থ হারে হারে উপলব্ধি করতে শুরু করবে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার সময় থেকে।

যখন তোমার চারপাশে সবাইকে কোনো না কোনো লক্ষ্য নিয়ে ছুটতে দেখবে তখন নিজের মনে প্রশ্ন জাগবে ‘আমার স্বপ্নটা কী? আমার গন্তব্য কোথায়?’  তাই তোমার ভালো লাগার ক্ষেত্রটা আবিষ্কার করো। মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং, আইন, অর্থনীতি কিংবা গণিত, পদার্থবিজ্ঞান- কোন ক্ষেত্রে তোমার আগ্রহ রয়েছে তা ভেবে দেখো। সেই পথেই অগ্রসর হও। সেই বিষয়ে পড়ার সুযোগ অর্জনের জন্য প্রস্তুতি নাও।

তবে যে কথাটি না বললেই নয় তা হলো, তোমার স্বপ্ন যেন কখনোই কোনো একটা ভার্সিটিকেন্দ্রিক না হয়ে বরং বিষয়কেন্দ্রিক হয়। যেমন, এমন অনেকেই আছে যার কেবল বুয়েটে পড়ারই স্বপ্ন অথচ সে কখনোই ইঞ্জিনিয়ার হবার স্বপ্ন দেখেনি। আসলে এটা স্বপ্ন নয়, এটা হচ্ছে একটা মোহ। সেইসব শিক্ষার্থী পরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াশোনার চাপ সামলাতে না পেরে অনেক ক্ষেত্রে বিপথগামী হয়।

সুতরাং, কোনো নির্দিষ্ট ভার্সিটিতে পড়ার ইচ্ছে তোমার থাকতেই পারে তবে সেটার আগে বিবেচনায় প্রাধান্য দিতে হবে “বিষয়”-কে।

৩) ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি

উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ করে একজন শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষার আগে প্রায় চার মাস সময় হাতে পায়। এই চার মাস তার জন্য এক অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই সময়টাতে প্রচুর পড়াশোনা করলে তবেই আসবে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। অন্যসব সময়সাপেক্ষ কাজ-কর্ম বর্জন করতে হবে। অনেকেই প্রশ্ন করে ‘ভর্তি পরীক্ষার আগে দৈনিক কত ঘণ্টা পড়ব?’ এর কোনো নির্দিষ্ট উত্তর নেই। এটি একটি আপেক্ষিক ব্যাপার। তবে কথা হচ্ছে যতক্ষণ না তুমি আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলতে পারবে যে তুমি চান্স পাওয়ার মতো যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়েছো, ততক্ষণ পর্যন্ত পড়তেই হবে।

ভর্তি পরীক্ষার জন্য কোনো অধ্যায় বাদ দিয়ে পড়ার সুযোগ নেই। সব অধ্যায়ই পড়তে হবে। তবে বিগত বছরের প্রশ্ন দেখে অধ্যায়ের গুরুত্ব জানা যাবে। তবে এই ব্যাপারটি ভার্সিটিভিত্তিক। অর্থাৎ একটি ভার্সিটির ভর্তি প্রশ্নে যে অধ্যায় থেকে সচরাচর প্রশ্ন কম আসে তা কেবল ঐ ভার্সিটির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তাই প্রতিটি ভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বুঝা যাবে ঐ ভার্সিটির জন্য কোন অধ্যায় বা টপিক গুরুত্বপূর্ণ।

পড়ার পাশাপাশি প্রচুর প্রশ্ন সমাধান অনুশীলন করতে হবে। এর দ্বারা পড়া আরও ঝালাই হবে। প্রশ্নের সাথে পরিচিতি হবে এবং প্রশ্ন দেখার পর উত্তর মাথায় আনার দক্ষতা অর্জিত হবে।

মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার জন্য মূল পাঠ্যবই খুব ভালোভাবে পড়তে হবে। সব প্রশ্ন একদম বই থেকেই হয় তাই মূল বইয়ের আগে কোনো কিছুকে প্রাধান্য দিলে চলবে না। ইঞ্জিনিয়ারিং ও লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য প্রথমত পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিতের ব্যাসিক শক্তিশালী হতে হবে। এরপর প্রচুর গাণিতিক সমস্যা সমাধানের অনুশীলন করতে হবে।

৪) ভর্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র

এই ভর্তিযুদ্ধের দুইটি বিশেষ অস্ত্রের নাম ‘আত্মবিশ্বাস’ ও ‘দৃঢ় মনোবল’। ভর্তি পরীক্ষার আগের চার মাস তুমি পদে পদে হোঁচট খাবে। বারবার মনে হবে যে তোমাকে দিয়ে হবে না। ভর্তি কোচিং-এর পরীক্ষা কোনোটা ভালো হবে আবার কোনোটা খুব খারাপ হবে। এই স্রোতের ওঠানামার সাথে টিকে থাকাটা কঠিন। মানসিক অবস্থা স্বাভাবিক রাখাটা খুব কঠিন। কিন্তু মনে রাখবে “হোঁচট খাওয়ার মানেই হেরে যাওয়া নয়, জয়ের অনীহা থেকেই পরাজয়ের শুরু হয়।”

আত্মবিশ্বাস রাখতে হবে, তবে সীমার মধ্যে। ‘আমি পারবো’ আর ‘আমি পারবোই’ এর মধ্যে তফাৎ আছে। বারবার পড়ে গিয়েও উঠে দাঁড়িয়ে ছুটে চলা হচ্ছে আত্মবিশ্বাস। আর চেষ্টা করি বা না করি আমি পারবোই- এ ধরনের মানসিকতা হচ্ছে ‘ওভার কনফিডেন্স’ যা মানুষকে অনাকাঙ্ক্ষিত পরাজয় এনে দেয়।

মানসিক অবস্থা দৃঢ় রাখার মূলমন্ত্র হলো অন্যের সাথে নিজেকে তুলনা না করা। এই চার মাস দেখবে অন্যের প্রাপ্ত নম্বর দেখে হতাশ লাগবে। প্রাপ্ত সর্বোচ্চ নম্বর দেখে নিজেকে তুচ্ছ মনে হবে, কিন্তু লড়াইটা করতে হবে নিজের সাথে। তোমার প্রতিযোগী তুমি নিজেই। আজকে পরীক্ষায় যত নম্বর পেলে, পরের পরীক্ষায় নিজেরই সেই নম্বরকে টেক্কা দাও। এভাবে প্রতিদিন ছাড়িয়ে যাও গতকালের তুমিকে। একটা কথা মনে রেখো, ভর্তি পরীক্ষার এই প্রতিযোগিতাটা ‘সুইমিং রেইস’ না না। মানে এমনটা না যে তুমি সাঁতরে সবার আগে ওপারে গেলে তুমি জিতে যাবে। বরং এটা ডুবে না গিয়ে টিকে থাকার লড়াই। তাই অন্যের দিকে না তাকিয়ে, অন্যের সাথে তুলনা না করে নিজের মতো এগিয়ে যাও, নিজের সেরাটা দিতে পারাই মূল কথা।

ইংরেজি শিখ মজার উপায়ে!

তোমার স্বপ্নের পথে পা বাড়ানোর ক্ষেত্রে তোমার ইংরেজির জ্ঞান কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে!

তাই আর দেরি না করে, আজই ঘুরে এস ১০ মিনিট স্কুলের এই এক্সক্লুসিভ প্লে-লিস্টটি থেকে!

১০ মিনিট স্কুলের ইংরেজি ভিডিও সিরিজ

৫) ভর্তি আবেদন সম্পর্কে কিছু কথা

প্রথমত, চেষ্টা করবে যত বেশি সংখ্যক ভার্সিটিতে ভর্তি পরীক্ষা দেয়া সম্ভব তা দেবে। অনেকেই মনে মনে নির্বাচন করে ওমুক ভার্সিটি আমার ভালো লাগে না, ওমুক ভার্সিটি দূরে, এতোদূর যেতে আলসেমি লাগে, পরীক্ষাই দেবো না ইত্যাদি। এসমস্ত চিন্তা মাথা থেকে এখনই ঝেড়ে ফেলো। কারণ ভর্তি পরীক্ষার চিত্রটা তোমার কল্পনার বাইরে। তুমি যত ভালো ছাত্র/ছাত্রীই হও না কেন, অন্তত এখন কোনো ভার্সিটিকেই ছোট করে দেখবে না। কারণ ভর্তি পরীক্ষায় একটা বিরাট ভূমিকা রাখে নিয়তি বা ভাগ্য। এই ভাগ্যের কাছে হেরে গিয়ে অনেক মেধাবী তাদের প্রাপ্য ভার্সিটিতে চান্স পায় না। তাই, অন্তত ভর্তি আবেদন করার ক্ষেত্রে বাছবিচার না করে সবখানে পরীক্ষা দাও।

দ্বিতীয়ত, প্রচণ্ড মানসিক চাপের এই সময়টাতে মাথা ঠিকঠাক কাজ করে না, অনেক কিছুই ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক। এমন ঘটনা অহরহ ঘটে যে, কোনো ভার্সিটির ভর্তি বিজ্ঞপ্তি কবে দিলো, কিংবা কবে আবেদনের শেষ তারিখ চলে গেলো খেয়ালই করলো না। আবার এমনও ঘটতে দেখা যায় যে ফর্ম পূরণ করেছে অথচ টাকা জমা দেবো দেবো করে আর দিতে মনে নেই। ফলে পরীক্ষাই দেয়া হয় না সেসব ভার্সিটিতে। এতো কষ্ট করে প্রস্তুতি নিচ্ছো, যদি এভাবে পরীক্ষাই দিতে না পারো তাহলে তো সেটা মেনে নেয়ার মতো না।

এইসব ভুল থেকে সাবধান থাকতে হবে। সব খোঁজ খবর রেখে ঠিকঠাক ভর্তি আবেদনের দায়িত্বটা তোমারই।

৬) পরীক্ষা চলাকালীন সময়

পরীক্ষা চলাকালীন এক বা দেড় ঘণ্টা সময়টাও অনেক বেশি গুরুত্ব বহন করে। এতো প্রস্তুতি সাধনা ঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারলে কিনা তার উপরই তোমার চূড়ান্ত বিজয় নির্ভর করে। দশ কথার এক কথা হচ্ছে, ঐ সময়টুকুতে মাথা পুরো ঠাণ্ডা রাখতে হবে। উদ্বেগের কারণে মানুষ পারা প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়।

তোমার স্বপ্নের পথে পা বাড়ানোর ক্ষেত্রে তোমার ইংরেজির জ্ঞান কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে! তাই আর দেরি না করে, আজই ঘুরে এসো ১০ মিনিট স্কুলের এই এক্সক্লুসিভ প্লে-লিস্টটি থেকে!

পারো বা না পারো, প্রতিটা প্রশ্নের সাথে সাক্ষাৎ করে আসতে হবে। এজন্য কয়েক ধাপে উত্তর করতে হবে। যেমন ধরো, পরীক্ষায় ১০০টি বহুনির্বাচনী প্রশ্ন আছে। এখন এমনভাবে উত্তর করা যাবে না যে তুমি একেক করে এগিয়ে শেষ প্রশ্নের উত্তর করলে আর তখন সময়ও শেষ হলো। বরং নিজের নির্ধারিত সময়ে প্রথম ধাপে সবগুলো প্রশ্ন পড়ে যাও আর যেগুলো একদম নিশ্চিত সেগুলো উত্তর করো। দ্বিতীয় ধাপে আবার এক থেকে একশ’ ঘুরে আসো, এবার যেগুলো সামান্য চিন্তাভাবনার প্রয়োজন সেগুলোতে সময় দাও। এভাবে কয়েক ধাপে উত্তর করো।

এবার একটি প্রশ্ন। ‘ভর্তি পরীক্ষায় বহুনির্বাচনীর উত্তর আন্দাজে দাগানো কি উচিত নাকি উচিত না?’  আচ্ছা বেশ, উত্তরটা হচ্ছে এটা ক্ষেত্র সাপেক্ষে নির্ভর করে। উদাহরণ হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার কথা ধরি। বহুনির্বাচনী পরীক্ষাগুলোতে সাধারণত প্রতিটি ভুল উত্তরের জন্য প্রাপ্ত নম্বর থেকে ০.২৫ নম্বর কাটা যায়। ধরো পরীক্ষার রুমে বসে তুমি গুনে দেখলে মোটামুটি ৭৫ এর আশেপাশে নম্বর তুমি নিশ্চিতভাবে উত্তর করেছো। তোমার বন্ধু নাফিস ৯০ নিশ্চিত এবং তোমাদের আরেক বন্ধু সাকিব ৬৫ নিশ্চিত। হাতে কিছুক্ষণ সময় বাকি। ধরো প্রতি বছরের গড় ফলাফল হিসেব করলে দেখা যায় ৭০ নম্বর পেয়ে শেষজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পায়। এমন অবস্থায় তোমাদের তিনজনের মধ্যে কার উচিত অনিশ্চিত হয়েও আন্দাজে উত্তর দাগানো?  উত্তরটা হচ্ছে শুধুমাত্র সাকিবের উচিত। বাকি দুজনের মোটেও উচিত নয়। তাহলে এবার বুঝলে তো ব্যাপারটা?

. . .

সবার জন্য অনেক অনেক শুভ কামনা।


১০ মিনিট স্কুলের লাইভ এডমিশন কোচিং ক্লাসগুলো অনুসরণ করতে সরাসরি চলে যেতে পারো এই লিঙ্কে: www.10minuteschool.com/admissions/live/

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: [email protected]

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
Author

Ariful Hasan Shuvo

A simple human being who lives in two universes in parallel. One you see, the other one is inside his head where there's nothing but thoughts and dreams!
Currently a student of Shahjalal University of Science and Technology
Ariful Hasan Shuvo
এই লেখকের অন্যান্য লেখাগুলো পড়তে এখানে ক্লিক করুন
What are you thinking?