যা চেয়েছিলাম, যা পেয়েছিলাম

পুরোটা পড়ার সময় নেই ? ব্লগটি একবার শুনে নাও

২০১১ সালে যখন নটরডেম কলেজে ভর্তি হলাম, তখন থেকেই অনেকটা স্থির হয়ে গেল নিজের সব স্বপ্ন, এইচএসসি পাশ করে যেভাবেই হোক বুয়েটে ঢুকতে হবে। বুয়েটে কি পড়ায় আর বুয়েট থেকে বের হয়ে কি হব, সেসব সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো জ্ঞান ছিল না। শুধু জানতাম, সাইন্সে পড়া সকল ছাত্রেরই ধ্যান-জ্ঞান বুয়েট। এরা সবাই ইঞ্জিনিয়ার হবে। তারপর অনেকেই বিদেশে পাড়ি জমাবে একটি এমএসসি ডিগ্রির জন্য। এই স্বপ্ন কোনভাবেই হাতছাড়া করা যাবে না।

এই স্বপ্নের ভেলায় ভাসতে ভাসতেই কলেজ জীবন পার করে ফেললাম। কলেজে রেজাল্ট আহামরি কিছু ছিল না। পড়াশোনা মানে সেই পরীক্ষার আগের রাতে পড়ে যতটুক পার হওয়া যায়, ততোটুক। এভাবেই, ভালো-খারাপের মধ্যে দিয়েই প্রায় দুইটা বছর পার করে ফেললাম। এইচএসসির সময় এসে গেল। এবার বুঝলাম, একটু কষ্ট না করলে, স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবেই না।

admission, diary, iba, motivation
স্বপ্নের দিশারী
(নটর ডেম কলেজ, ঢাকা)

২-৩ মাস একটু কষ্ট করলাম যেন রেজাল্ট টা একটু ভালো হয়| আর যা-ই হোক, বুয়েটের পরীক্ষাটা যেন রেজাল্টের কারণে কোনভাবেই মিস না হয়।
এইচএসসির সময় এসে গেল, সব পরীক্ষায় মোটামুটি ভালই করছিলাম। তখন ছিল হরতালের সময়, তাই অনিবার্য কারণে ফিজিক্স প্রথম পত্রের পরীক্ষাটা পিছিয়ে গেল। যেদিন পরীক্ষাটা পড়ল, সেদিন কোনো এক কারণে পরীক্ষার হলে গিয়ে দেড় ঘন্টা পর আর মাথা কাজ করছিল না। যেটাই উত্তর করতে যাই, সেটাতেই আটকে যাচ্ছিলাম। কোনমতে পরীক্ষাটা দিয়ে বের হয়ে এসে কিছুটা ভেঙ্গে পরি। যেই পরীক্ষার জন্যে এত কষ্ট করলাম, সেই পরীক্ষার শেষে এসেই এই অবস্থা হতে হলো।

পরের ২ মাস কাটল অনেক অনিশ্চয়তায়। যদি A+ মিস-ই করে ফেলি ফিজিক্সে, সবাই কী না কী ভাববে। বুয়েটে পরীক্ষাই যদি না দিতে পারি, জীবনটাই হয়ে যাবে বৃথা।

শত অনিশ্চয়তার মাঝেই পড়তে থাকলাম বুয়েট কিংবা ‘আই ইউ টি’-তে টেকার আশায়। হয়ত আমার আশেপাশের অধিকাংশেরই এই স্বপ্ন ছিল দেখে আমিও এই স্বপ্ন দেখেই এগুতে লাগলাম।

১০ মিনিট স্কুলের পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য আয়োজন করা হচ্ছে অনলাইন লাইভ ক্লাসের! তা-ও আবার সম্পূর্ণ বিনামূল্যে!

সম্ভবত ৩ আগস্ট রেজাল্ট দেয়। সেদিন ধরেই নিয়েছিলাম, আমার বুয়েটের আশা আজকে শেষ, কারণ কোনো সাইন্সের বিষয়ে A+ মিস করা মানেই বুয়েটে পরীক্ষা দিতে না পারা। ভয়ে ভয়ে নিজের রেজাল্ট-টা দেখলাম। আল্লাহর অশেষ রহমতে সেবারের জন্যে বেঁচে গেলাম। বিশ্বাস-ই হচ্ছিল না যে এভাবে বেঁচে গেলাম।

চারিদিকে মিষ্টি বিতরণ শুরু হয়ে গেল, অনেক কল আসতে লাগলো, একজন আন্টি বললো, “আমি তো জানতামই বাবা, তুমি গোল্ডেন পাবে, এবার শুধু বুয়েটটা হওয়া বাকি, হয়ে তো যাবেই, চিন্তা নেই।” আমি এসবের ক্ষেত্রে একটু পেসিমিস্টিক ধাঁচের, খুব ইচ্ছা করছিল বলে ফেলতে, “এহ, এত সহজ, বললো আর হয়ে গেল!”

ঘুরে আসুন: সঠিক নিয়মে পড়াশোনার ৭টি টিপস

রেজাল্টের পর কিছুটা হাঁফ ছেড়ে বেঁচে, পড়া শুরু করলাম। উদ্ভাসের সাথে তাল মিলিয়ে এগুতে থাকলাম। সময় যত ঘনিয়ে আসতে থাকলো, নিজের লক্ষ্যটাকে ততো রিয়েলিস্টিক করতে থাকলাম নিজের প্রস্তুতি ও সামর্থ্য অনুযায়ী। ঠিক করলাম, বুয়েটে ৫০০-৬০০ এর মধ্যে থাকতে পারলেই চলবে, তাতে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে পারব। এর পাশাপাশি আই ইউ টি হয়ে গেলে ভালই হয়, যেহেতু ওখানকার প্রশ্ন সবার জন্যে ইংরেজিতে হবে, কিছুটা সুবিধা পাওয়া যাবে, ইংরেজি ভার্সনের ছাত্র হওয়ায়।

অক্টোবরের কোনো এক দিনে এসে আই ইউ টি eligibility list দিল। নিজের রোল পেলাম না। আকাশ থেকে পড়লাম। পরে আবিষ্কার করলাম, যেহেতু এসএসসির বাংলায় A+ মিস করেছিলাম, তাই পরীক্ষা দিতে পারব না। সেদিন আরেকটা বারের জন্য ভেঙ্গে পরলাম। আই ইউ টি-তে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার একটা প্রবল ইচ্ছা ছিল যা আগে কাউকে বলিনি।

হতাশাগ্রস্থ অবস্থায় পড়তে থাকলাম বুয়েটের আশায়। এই দিকে, আব্বু-আম্মু হজ্জ করতে চলে গেল আর নিজের উপর দায়িত্ব বেড়ে গেল। নিজেকে বোঝাতে শুরু করলাম, না পড়লে হবে না কিছুই।

একটি সম্ভাবনার দ্বার বন্ধ হবার মানেই আরেকটি সম্ভাবনার দ্বার খোলা

বুয়েট পরীক্ষার আর ১৬ দিন বাকি,

কোরবানির ঈদের দিন, শরীর অনেক খারাপ হয়ে গেল। বিকালে ঢাকা সিএমএইচে এডমিট হলাম। জানতে পারলাম, শরীরের ‘platelet count’ কমে গিয়েছে। ডেঙ্গুর আভাস। আরেকটি বারের মত ভেঙ্গে পড়লাম। টানা সাত দিন ধরে জ্বর ১০৪ ছুঁই ছুঁই ছিল। এইদিকে আব্বু-আম্মুকে খুব মিস করছিলাম। মনে হচ্ছিল, আব্বু-আম্মুর এতদিনের স্বপ্ন যদি না পূরণ করতে পারি, তাঁরা অনেক কষ্ট পাবেন।

পরীক্ষার ঠিক ৭ দিন আগে বাসায় ফিরতে পারলাম। এতদিনে নিজের confidence level তলানিতে চলে গেল। তাও, জান-প্রাণ দিয়ে চেষ্টা করতে থাকলাম। এমনও দিন গেল, যেদিন মাগরিব থেকে শুরু করে টানা ফজরের সময় পর্যন্ত টানা পড়ে গিয়েছিলাম। শুধু বুয়েটে টিকার আশায়। এভাবেই পরীক্ষার দিন চলে আসলো।

ঘুরে এস জৈব রসায়নের জগৎ থেকে!

জৈব রসায়ন এমন একটি বিষয় যেটি অনেকের কাছেই বিভীষিকা-স্বরূপ। সঠিক পদ্ধতিতে জৈব রসায়নের অধ্যায়গুলো পড়লে বিষয়টি অনেক সহজ হয়ে যায়।

তাই আর দেরি না করে, এই প্লে-লিস্টটিতে চলে যাও সঠিক পদ্ধতিতে জৈব রসায়ন শিখতে! 😀

১০ মিনিট স্কুলের রসায়ন ভিডিও সিরিজ

পরীক্ষা দিলাম, দিয়ে বের হয়েই বুঝলাম, হবার সম্ভাবনা কম। রেজাল্টের দিন দেখলাম, হয় নি বুয়েটে। একেবারেই হতাশ হয়ে গেলাম। এর পর ছিল চুয়েট, রুয়েট এই দুটি পরীক্ষা। বিমর্ষ চিত্তে গেলাম পরীক্ষা দিতে। চুয়েট, রুয়েট দুটাতেই থাকলাম ওয়েটিং লিস্ট-এ।

admission, diary, iba, motivation
যা চেয়েছিলাম (বুয়েট)

এতদিনে আব্বু-আম্মু হজ্জ থেকে চলে এসেছিল। যেদিন রুয়েটের রেজাল্ট দিল আর দেখলাম এখানেও ঠিক মত হলনা, সেদিন রেজাল্ট দেখে চোখের পানি আটকে রাখতে পারলাম না। আম্মুর সামনেই চোখ দিয়ে ছল ছল করে পানি গড়িয়ে পড়ল। নিজের অশ্রুমাখা মুখটা একটু ঢাকার চেষ্টা করলাম। লাভ হলো না, আম্মু ঠিকই বুঝে ফেললো। আম্মু এসে জড়িয়ে ধরল আর আব্বুর সাথে ফোনে মিলিয়ে দিল। আব্বু অফিস থেকে বলল, “আরে বোকা ছেলে, কাঁদছ কেন? তুমি চেষ্টা করতে থাক, ভালো কোথাও তো হবেই। NSU, BRAC আজকাল বেশ ভালো করছে, options তো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে না, তুমি শুধু তোমার মত চেষ্টা করতে থাক।” আম্মু এইদিকে আমার জন্যে নামাজের বিছানায় দোয়া করতে বসে গেল।

আব্বুর সাথে এই কথোপকথনের পর মনটা অনেক ভালো হয়ে গেল। যেই আব্বু আমাকে বলেছিল, “বুয়েটে না টিকলে ধানক্ষেতে পাঠিয়ে দিব, ওখানে গিয়ে হালচাষ করবা।”, সেই আব্বুই কি-না আজকে এই কথা বলল।admission, diary, iba, motivation

সাহস নিয়ে পড়া শুরু করলাম, সামনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ‘ক’ ইউনিটের পরীক্ষা। ৫ দিন সময় পেলাম, অনেক চেষ্টা করলাম। পরীক্ষা দিলাম, দিয়ে বুঝলাম যে মোটামুটি হয়েছে।

পরীক্ষাটা শেষে এম আইএস টি’র জন্য কিছুদিন পড়লাম। ২৯ তারিখ পরীক্ষাটি দিয়ে সে কি ঘুম। সব পরীক্ষা শেষ আমার। নিজেকে ট্রয় নগরীর ট্রোজান যুদ্ধের বিধ্বস্ত একজন সৈন্য মনে হলো। শুধু একটাই পার্থক্য, যুদ্ধে আমি হয়তো হেরেই গিয়েছি।

পরের দিন আব্বু বলল আইবিএ-এর পরীক্ষাটা দিয়েই ফেলতে যেহেতু ফর্ম তুলেছি। নিজের উপর যা গিয়েছিল, তার পর পরীক্ষাটা দেয়ার ইচ্ছা একেবারেই কমে গিয়েছিল। তার উপর, প্রশ্ন কেমন হবে, কী আসবে, কোনো কিছুই জানা ছিল না আমার। চিন্তা করলাম, ইঞ্জিনিয়ারিং-এর জন্যে পড়েও হাবুডুবু খাচ্ছি, এই অবস্থায় আইবিএ-এর স্বপ্ন দেখা তো অস্বাভাবিকতার পর্যায়ে পড়ে যায়। তাও, কি মনে করে জানি একটু পড়তে বসলাম। বিগত বছরের দুটি প্রশ্ন সমাধান করে যখন দেখলাম মার্ক খুব একটা ভালো আসছে না, তখন হাল ছেড়ে দিলাম।

পরীক্ষার আগের দিন কয়েকটা analytical ability-এর প্রশ্ন সমাধান করার চেষ্টা করলাম। পরীক্ষা দিয়ে, অসন্তুষ্ট হয়েই ফিরে আসলাম। এখানে এসে বলে রাখা দরকার, “IBA was a dream that I did not dare of dreaming.”

তাই ডি ইউ ক ইউনিট আর এম আই এস টি’র আশায়-ই বসে ছিলাম। ক ইউনিটের রেজাল্ট দিল। টিকে গেলাম। তবু বুঝতে পারছিলাম যে, পছন্দের কোনো সাবজেক্ট হয়তো পাব না।

ঘুরে আসুন: ছাত্রজীবনের বহুল প্রচলিত ৫টি সমস্যা এবং সমাধান!

এরপর এম আই এস টি‘র রেজাল্ট দিল। মিলিটারি মেরিটে হয়েছিলাম ৪৩। যখন শুনলাম সিএসই নিশ্চিত তখন ঠিক করলাম এখানেই ভর্তি হব।

এইদিকে একটা কথা শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল, “কোটার জোরেই তো টিকলো”। কথাটা সত্য, কোটা না থাকলে সিএসই পেতাম না। টিকতাম কি না, সেটাই সন্দেহ।
এর দুই দিন পর আইবিএ’র লিখিত পরীক্ষার রেজাল্ট প্রকাশ করলো। ফেইসবুকে কয়েকজন বন্ধুর টিকার স্ট্যাটাস পড়ে একটু আফসোস-ই হলো। যদি ইঞ্জিনিয়ারিং-এর জন্যে না পড়ে আইবিএর জন্যে পড়তাম, হয়তো হয়েও যেতে পারতো।

আইবিএ কি? কি কি বিষয়ের উপর পরীক্ষা দিতে হয়? এই সমস্ত কিছু জেনে নাও ১০ মিনিট স্কুলের আইবিএ মডিউল থেকে!

হঠাৎ আব্বু ফোন করে রোল জানতে চাইল। জানি হবে না, তাই বললাম দেখার দরকার নেই। আব্বু জোর করে তা-ও রোল নিল। নিয়ে বললো, হয়ে গেছে। ‘হয়ে গেছে মানে! না পড়ে আবার কেমনে হয়!’- মনে হলো, নিশ্চই আব্বু মজা করছে আর নাহলে রেজাল্টে কোনো গলদ আছে। পরে যখন ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম, আর নিজের চোখে রেজাল্ট দেখলাম, তখন যে কী ভালো লাগলো তা বলে বোঝানো অসম্ভব।

মৌখিক পরীক্ষার জন্যে তৈরী হলাম, টিকেও গেলাম। টেকার পর চিন্তা করে দেখলাম, যদি বুয়েটে কিংবা আইইউটি-তে হয়ে যেত, হয়ত ভুলেও আইবিএ-তে পরীক্ষা দিতাম না। যদি ‘ক’ ইউনিটে পছন্দের বিষয় পেতাম, হয়ত ওই তিনটা প্রশ্নও সমাধান করা হত না, পরীক্ষার জন্য।

দেখতে দেখতে আইবিএ-তে তিনটি বছর কেটে গেলো। হাতে আছে আর মাত্র একটি বছর। যদি গল্পের এই পর্যায়ে এসে কারো মনে প্রশ্নটা রয়েই যায় যে কোনো প্রস্তুতি না নিয়ে টিকে যাওয়া কিভাবে সম্ভব, তাদের জন্য বলে রাখি, আমাদের মাঝে একটি misconception রয়েছে যে, এইচএসসির পরপরই আমরা যা পড়ি, সেটার উপরই আমাদের নিয়তি ঠিক হয়ে যায়। কথাটি ফেলনা নয় কিন্তু পুরোপুরি ঠিকও নয়। ছোটবেলা থেকেই আমাদের সকলের নিয়তির বীজ বোনা শুরু হয়। সেটিকে সময়ের সাথে সাথে সযত্নে লালন করলে একটি পর্যায়ে গিয়ে জীবনের ধাক্কাগুলো সামলে ওঠা সম্ভব।

সামনে হয়ত এরকমই আরো অনেক উত্থান-পতন অপেক্ষা করছে। তবে এটুকু এখনই বলতে পারি, একটি সম্ভাবনার দ্বার বন্ধ হবার মানেই আরেকটি সম্ভাবনার দ্বার খোলা।

নিজেকে যতবারই এখন প্রশ্ন করি, “Am I good enough?” ততবারই নিজেকে ফিরিয়ে নিয়ে যাই ২০১৩-তে। কারণ সেই বছরটি থেকে একটি অসাধারণ শিক্ষা লাভ করেছি:

“The thought that we’re not good enough brings out the desire in us to try and get better.
The thought that we’re good enough makes way for complacency and helps expose our weaknesses.”

admission, diary, iba, motivation
যা পেয়েছিলাম (ব্যবসায়ে প্রশাসন ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়)

১০ মিনিট স্কুলের লাইভ এডমিশন কোচিং ক্লাসগুলো অনুসরণ করতে সরাসরি চলে যেতে পারো এই লিঙ্কে: www.10minuteschool.com/admissions/live/

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: write@10minuteschool.com

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?