চাকরির সিভিতে সহায়ক লিংকড-ইন

পুরোটা পড়ার সময় নেই ? ব্লগটি একবার শুনে নাও ।

সিভি, কভার লেটার তৈরি শেষ? তো এবার তাহলে চলুন, লিংকড-ইনে কিভাবে প্রোফাইল তৈরি করতে হয়, কিভাবে চাকরির আবেদন করতে হয় একটু জেনে নেই।

প্রতিবারের মত আজও একটি উদাহরণ দিয়েই লেখা শুরু করি। আমি মোবাইল ফোন ব্যবহার শুরু করি ২০০৪ সালে। প্রথম যখন ফোন কিনি তখন ভেবেছিলাম আমার তো ফ্যামিলি আর দুই চারজন বন্ধু ছাড়া আর কাউকে প্রয়োজন নেই। শুধু শুধু নম্বর কিভাবে সেভ করে সেটি না শিখে মুখস্ত করে ফেললেই হয়! এভাবে দিন যেতে থাকে, আমিও সবার নম্বর মুখস্ত করতে থাকি। এভাবে ৩০-৪০ টা নম্বর মুখস্ত করলাম। তারপর বুঝলাম কাজটা আর সম্ভব নয়। আমাকে নম্বর সেভ করা শিখতে হবে এবং নম্বর সেভ করেই রাখতে হবে। গল্পটা বলার উদ্দেশ্য যুগের চাহিদা, উন্নয়নকে এড়িয়ে গিয়ে আপনি নিজে এগোতে পারবেন না। ২০১৭ সালে আপনি ইমেইলের পরিবর্তে চিঠি পাঠানোর চিন্তা করলে নিজেই বোকা বনে যাবেন।

উপরের কথাগুলো বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে লিংকড-ইন। বর্তমানে প্রফেশনালদের সবচেয়ে বড় সংযোগস্থল হচ্ছে লিংকড-ইন। আপনি কখনো লিংকড-ইন ব্যবহার করেননি। তাই, লিংকড-ইন ছাড়াই আপনার চলবে, এটা ভাবা বোকার মত হবে। অন্যরা কিন্তু ঠিকই এগিয়ে যাচ্ছে। উইকিপিডিয়া বলছে, ২০১৫ সালে লিংকড-ইনব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৪০০ মিলিয়ন। তাহলে, আপনি পিছিয়ে থাকবেন কেন? চলুন ঘুরে আসি লিংকড-ইনের জগত থেকে, জেনে নেই কিভাবে লিংকড-ইন আপনাকে চাকরির বাজারে এগিয়ে রাখবে। মনে রাখবেন, লিংকড-ইন তৈরির ধাপটি আসবে কেবল মাত্র আপনার সিভি তৈরির পর। কারণ, লিংকড-ইন প্রোফাইল তৈরিতে সিভি তৈরির ৮০ ভাগ দক্ষতাই কাজে লাগে।

লিংকড-ইন কী?

আসুন, সন্ধি বিচ্ছেদ করি। লিংকড-ইন = লিংক+ ইন। “ইন” মানে ভিতরে আর “লিংক” মানে সংযুক্তি বা সংযোগ। তার মানে কী? যার ভেতরে গেলে লিংক পাওয়া যায় তাকেই লিংকড-ইন বলে, নাকি?

জ্বি, একদম ঠিক। লিংকড-ইন অনেকটা ওরকমই। আপনি হয়তো বলবেন, আমার মামা, খালা, চাচারাই তো আমার লিঙ্ক। তাদেরকে বলছি, কাজকে নিজের সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে ধরুন। ৪০০ মিলিয়ন মামা, খালা, চাচারা লিঙ্কডইনে আপনার অপেক্ষায় আছে।

গ্রাফিক্স ডিজাইনিং, পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশান ইত্যাদি স্কিল ডেভেলপমেন্টের জন্য 10 Minute School Skill Development Lab নামে ১০ মিনিট স্কুলের রয়েছে একটি ফেইসবুক গ্রুপ।

লিংকড-ইন অনেকটা ফেসবুকের মতই। ফেসবুকে যেমন কোথায় খাচ্ছেন, ঘুরছেন এসব শেয়ার করা যায়, তেমনি লিংকড-ইন কোথায় কাজ করছেন, কী করছেন, নতুন কী করলেন সেগুলো দেয়া যায়, নোট পাবলিশ করা যায়।  নিজেকে তুলে ধরুন লিংকড-ইনের মাধ্যমে। মনে রাখবেন, নিজের ঢোল নিজেকেই পিটাতে হয়, অন্যকে ঢোল দিলে তা বাজাতে গিয়ে তারা ফাটিয়ে ফেলে।

লিংকড-ইন কেন দরকার? কিভাবে এটি কাজ করে?

১। বর্তমানে প্রফেশনালদের সবচেয়ে বড় সামাজিক মাধ্যম হচ্ছে লিংকড-ইন। পুরো দুনিয়া এগিয়ে যাচ্ছে। আপনি কেন পিছিয়ে থাকবেন? ৪০০ মিলিয়ন মামা, খালা, চাচা এক জায়গায় আর কোথায় পাবেন?

২। লিংকড-ইন একটি বৈশ্বিক যোগাযোগের মাধ্যম। দুনিয়ার যে কোন প্রান্তের যে কোন কোম্পানির যে কোন লোককে পাওয়া সম্ভব লিঙ্কডইন দ্বারা। 

৩। উন্নত দেশগুলোতে লিঙ্কডইনের মাধ্যমে অনেকেই পাচ্ছে মনের মত চাকরি।

৪। ওয়েবসাইটের সাথে সংযুক্ত করার মাধ্যমে চাকরির সব বিজ্ঞপ্তিগুলো আপনি পাবেন লিংকড-ইনে।

৫। লিংকড-ইন আপনাকে বাছাই করে বলে দিবে আপনার আসলে কোন কোন চাকরির জন্য আবেদন করা দরকার।

৬। আপনার ভালো কাজের জন্য আপনাকে আপনার কলিগ বা বস রিকমেন্ড করতে পারে যা কিনা আপনাকে পরবর্তী চাকরি পেতে অনেক সাহায্য করবে।

৭। লিংকড-ইনে আপনার যেকোন পোস্ট কেউ লাইক, শেয়ার বা কমেন্ট করলে সেটা তার প্রোফাইলেও যারা যুক্ত আছে তাদের হোমপেজে চলে যাবে। অনেকের মধ্যে নিজের ভালো কাজের খবর ছড়িয়ে দিতে লিংকড-ইনের জুড়ি নেই।

৮। লিংকড-ইন ব্যবহার করে আপনি সরাসরি আবেদন করতে পারবেন অনেক বহুজাতিক কোম্পানিতে।

৯। দেশী ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর পেজ বা গ্রুপ ফলো করলে পাবেন তাদের আপডেটগুলো।

১০। কোথাও আবেদন করার সময় ওই কোম্পানি কেমন, কারা ওই কোম্পানিতে চাকরি করছেন ইত্যাদি নানা তথ্য পাবেন লিংকড-ইনে।

কিভাবে তৈরি করবেন আকর্ষণীয় লিংকড-ইন?

ধরে নিলাম আপনার সিভি লেখা শেষ, এবার সিভিতে আপনার পার্সোনাল তথ্যগুলো যেভাবে বসিয়েছেন ঠিক একই ভাবে লিংকড-ইনেও বসান। প্রফেশনাল ছবি দিন। চলুন, স্টেপ বাই স্টেপ এগিয়ে যাইঃ

১। সারাংশঃ  

লিংকড-ইন প্রথমেই আপনার সম্পর্কে জানতে চাইবে। নিজেকে কৃতকর্মের মাধ্যমে পরিচিত করান এবং কী কী কাজ জানেন বা কী করতে চান তুলে ধরুন। মিশন ও ভিশন স্টেটমেন্ট লিখুন। লিংকড-ইন আপনাকে দিচ্ছে আপনার যে কোন ভিডিও ব্লগ, ডকুমেন্ট, প্রেজেন্টেশন আপলোড করার সুযোগ। নিজের সিভিটি এখানে আপলোড করে রাখতে পারেন।

২। এক্সপেরিয়েন্সঃ

ঠিক যেমন তৈরি করেছেন সিভিতে। কপি পেস্ট করে বসিয়ে দিন, কনট্রোল সি আর কনট্রোল ভি এর ব্যাপার! এক্ষেত্রেও লিংকড-ইন আপনাকে ডকুমেন্ট, ইমেজ, ভিডিও, যুক্ত করার সুযোগ দিয়েছে। কোন কোম্পানির গোপনীয় কোন তথ্য দেওয়া যাবে না। কিন্তু মনে করুন, আপনি একটি ট্রেনিং করেছেন বা করিয়েছেন, আপনি প্রেজেন্টেশন দিয়েছেন কিংবা আপনার কোম্পানিতে কোন পাবলিশ হওয়া লেখা, ভিডিও বা ফিচার রয়েছে সেগুলো এখানে আপলোড করুন। সিভিতে এই সুযোগ নেই। একাধিক কোম্পানিতে চাকরির অভিজ্ঞতা থাকলে প্রতি ক্ষেত্রে একই পন্থা অবলম্বন করুন।

যারা ফ্রেশার তারা ইন্টার্নশিপ, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ভিজিট, মেম্বারশিপের মাধ্যমে অভিজ্ঞতার ঘরটি পূরণ করুন। কো-কারিকুলাম অ্যাক্টিভিটিজের মাধ্যমে আপনি কোন কোন কাজে অভিজ্ঞ ফুটিয়ে তুলুন। কোন কাজে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে ছিলেন বা কোন কোম্পানির প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন অল্প কিছু দিনের জন্য। সেটাও বসানোর সুযোগ আছে লিংকড-ইনে।

বেরিয়ে এসো নিজের খোলস থেকে!

প্রেজেন্টেশন দিতে গেলে প্রায়ই আমরা নার্ভাস হয়ে পড়ি, তারপর জঘন্য প্রেজেন্টেশন দিয়ে ডিপ্রেশনে ভুগি। এ সমস্যার সমাধানের জন্যে রয়েছে দারুণ কিছু বুদ্ধি!
আরও জানতে নিজেই ঘুরে এসো ১০ মিনিট স্কুলের এক্সক্লুসিভ এই প্লে-লিস্টটি থেকে।

৩। এন্ডোর্সমেন্টঃ

ব্যাপারটা অনেকটা ভোটের মত। আপনি এখানে আপনার ৫০টি স্কিলের নাম বলবেন। আপনার সবচেয়ে ভালো ১০টি স্কিল লিংকড-ইন দেখাবে। আপনার সাথে যারা কানেক্টেড হবেন তারাই বলে দিবেন যে আপনি আসলেই যে দক্ষতাটি উল্লেখ করেছেন আসলে আপনি ওই ব্যাপারে কতটা দক্ষ। অবশ্যই লিংকড-ইনে এন্ডোর্সমেন্ট বাড়াবেন যাতে অন্যরা আপনার প্রোফাইল দেখে আপনার দক্ষতা সম্পর্কে ধারণা পায়। ধরুন, আমি ট্রেইনার; এখন আপনি যদি আমাকে এন্ডোর্স করেন ট্রেইনার হিসেবে, তাহলে অন্য কেউ যখন আমার প্রোফাইল দেখবেন, তখন উনি ধারণা পাবেন যে আমি ট্রেইনার। কারণ, আপনি আমাকে ট্রেইনার হিসেবে সার্টিফাই বা এন্ডোর্স করেছেন।

৪। শিক্ষাগত যোগ্যতাঃ

সিভি থেকে এক এক করে সবগুলো বসিয়ে নিন। সার্টিফিকেট চাইলে স্ক্যান করে যুক্ত করে দিতে পারেন। প্রফেশনাল সার্টিফিকেট যুক্ত করা ভালো।

৫। প্রকাশনাঃ

কারো কোন লেখা, কোন জার্নাল ছাপা হয়ে থাকলে লিংকসহ সেটিও দিয়ে দিন। মজার বিষয় হচ্ছে, আপনি যখন প্রোফাইল সাজাবেন তখন লিংকড-ইন নিজেই আপনাকে অনেক নির্দেশনা দিবে।

৬। ট্রেনিংঃ

সিভি থেকে এক এক করে ট্রেনিং গুলো তুলে নিন। কোন কোর্স করা থাকলে সেটি অ্যাড করুন।

৭। টেস্ট স্কোরঃ

জিআরই, আই ই এল টি এস, টোফেল পরীক্ষার স্কোর দিতে পারেন। যুক্ত করতে পারেন সার্টিফিকেটও।

৮। পুরস্কারঃ

আপনি হয়তো চাকরির পাশাপাশি কোন কাজের জন্য পুরস্কৃত হয়েছেন। কোন সমাজসেবামূলক কাজ, কোন খেলাধুলা, স্কাউট, বিতর্ক ইত্যাদি। সেগুলো উল্লেখ করতে পারেন। চাকরিতে পাওয়া পুরস্কারের কথা এক্সপেরিয়েন্স অংশে লেখাই ভালো।

৯। প্রজেক্টঃ

আপনি হয়তো কোন প্রোডাক্ট লঞ্চ করেছেন, কোন নতুন মেশিন বসিয়েছেন কোম্পানিতে, কোন ইভেন্ট অ্যারেঞ্জ করেছেন। এগুলোর প্রত্যেকটিই প্রজেক্ট। এগুলো সাবলীলভাবে উল্লেখ করুন। মনে রাখবেন, নিত্যদিনের কাজগুলো কিন্তু প্রজেক্ট না। প্রজেক্টের শুরু আছে, শেষ আছে। প্রজেক্ট ইউনিক।

১০। সার্টিফিকেশনঃ

ধরুন আপনি কোন ক্লাবের মেম্বার, কোন দলের সভাপতি। সেই সার্টিফিকেটগুলো এখানে তুলে ধরতে পারেন।

১১। পেটেন্টঃ

আপনার কোন নতুন আইডিয়া যা কিনা আপনার নিজের বা কোম্পানির জন্য বিরাট সাফল্য বয়ে এনেছিলো, এখানে সেগুলো উল্লেখ করুন। আপনি হয়তো কোম্পানিতে কোন একটা পলিসি তৈরি করে দিয়ে এসেছেন, যেটা আগে ছিলো না।

কেউ রেফারেন্স হিসেবে চাইলে “Niaz Ahmed” লিখে আমার লিংকড-ইন প্রোফাইল দেখতে পারেন। যদিও আমি বলবো না যে আমারটিই সেরা। সিভি তৈরি ছাড়া লিংকড-ইন তৈরি অসম্ভব। প্রথমে সিভি তৈরি করুন, তারপর লিংকড-ইন, তারপর জব পোর্টালে সিভি আপলোড দিন। লিংকড-ইন প্রোফাইল পাবলিক করে রাখুন। কাজ করেছেন, সেটা লোকে জানুক, ক্ষতি নেই তো!

চাকরি দাও, চাকরি দাও বলে নিজে নিজে চিৎকার না করে নিজের কাজ গুলোকে আকর্ষণীয় ভাবে ফুটিয়ে তুলুন। আপনার কাজই আপনার হয়ে সুপারিশ করবে। সময়ের অগ্রযাত্রা ও যুগের চাহিদাকে চ্যালেঞ্জ করবেন না, ফেঁসে যাবেন। সকলকে ধন্যবাদ ধৈর্য্য সহকারে লেখাটা পড়ার জন্য।


১০ মিনিট স্কুলের লাইভ এডমিশন কোচিং ক্লাসগুলো অনুসরণ করতে সরাসরি চলে যেতে পারো এই লিঙ্কে: www.10minuteschool.com/admissions/live/

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: [email protected]

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?