পর্ব ৪ – ৩টি মেয়ের অংক গল্প!

পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবার শুনে নাও।

এই লেখাটি “আদর্শ” থেকে প্রকাশিত এবং চমক হাসান রচিত গ্রন্থ গণিতের রঙ্গে হাসিখুশি গণিত বই থেকে নেয়া হয়েছে।

৩টি মেয়ে!

পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ গণিতবিদদের একজন, যাকে বলা হয় গণিতের রাজপুত্র— তিনি হচ্ছেন, জার্মান গণিতবিদ ‘কার্ল ফ্রেডরিখ গাউস’। এই যে গাউস, ছোটবেলা থেকে তিনি গণিতে অসম্ভব রকম প্রতিভাধর ছিলেন। কী রকম? তখন তার বয়স মাত্র ৩ বছর। তার বাবা বসে বসে বিশাল লিস্ট ধরে যোগ করছেন। যেই যোগ করা শেষ, কোত্থেকে পিচ্চি গাউস এসে একবার চোখ বুলিয়ে বলল, ‘ও আব্বা, তুমি তো ভুল করেছ। ওটাতো এইটা হবে’।

বাবা তখন হিসাব মিলিয়ে দেখেন আসলে তাই তো! তার ছেলেটা কিভাবে বলল? চিন্তা করুন, তখন বয়স মাত্র ৩ বছর! গাউস গণিত নিয়ে কী পরিমাণ পাগল ছিলেন সেটার কথা বলি। গাউসের স্ত্রী মৃত্যুশয্যায়। তার সহকারী এসে তাকে খবর দিলেন, ‘গাউস ভাই, আপনার স্ত্রী তো মৃত্যুশয্যায়, আপনি কি অংকটা রেখে একটু স্ত্রীর কাছে যাবেন?’ তখন গাউসের উত্তর ছিল, ‘ভাই, ওকে আর কিছুক্ষণ একটু দেরি করতে বলতে পারবে?’ কী ভয়ঙ্কর চিন্তা! বলুন তো!

গাউসকে নিয়ে সবচেয়ে বিখ্যাত যে গল্পটা সেটা হচ্ছে তার প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময়কার। তার একজন খুব কড়া টিচার ছিলেন ‘মিস্টার বাটনার’। বাটনার সাহেব ক্লাসে ঢুকে দেখেন ছেলেপেলে অনেক চ্যাঁচামেচি করছে। তাই দেখে, ওদেরকে কাজ দিলেন, ‘এই তোরা ১ থেকে শুরু করে ১০০ পর্যন্ত সবগুলো যোগ কর। ১ যোগ, ২ যোগ, ৩ যোগ, ৪ এমন করে করে সবগুলো যোগ করতে থাক। আমি একটু রেস্ট নিয়ে নেই।’ তো নিয়ম ছিল যে, যার আগে হয়ে যাবে সে তার স্লেটটা এনে জমা দিয়ে দিবে। তো বাটনার সাহেবের কথা মুখ থেকে মাটিতেও পড়েনি তার আগেই গাউস তার স্লেট নিয়ে হাজির।

— ‘স্যার, এই যে, ৫০৫০।’

    • ‘মানে! তুই কিভাবে পারলি?’

 

    • ‘স্যার এটাতো খুব সোজা’

 

    • ‘সোজা এটা? তাহলে ব্যাখ্যা কর।’

 

  • ‘স্যার এটাতো কোনো ব্যাপারই না। মনে করেন ১+২+৩+ …

এমন করতে করতে ৯৮, ৯৯, ১০০ এগুলোই তো যোগ করতে হবে, তাই না?

    • ‘হ্যাঁ।’

 

  • ‘দেখুন স্যার, আমি সামনের একটার সাথে পিছনের একটা নিয়ে নিয়ে যোগ করব। দেখুন, ১ আর ১০০ যোগ করলে কত হয়, ১০১। ২ আর ৯৯ যোগ করলে কত হয়, ১০১। ৩ আর ৯৮ যোগ করলে কত হয়, ১০১। এমন করে ৪ আর ৯৭ যোগ করলে ১০১। ৫ আর ৯৬ যোগ করলে ১০১। এমন করে করে কতগুলো জোড়া বানানো যাবে চিন্তা করেন। ১০০টা সংখ্যা আছে। তাহলে জোড়া বানানো যাবে   মানে ৫০টা। প্রত্যেকটা জোড়ার মানই হবে ১০১ করে। তাহলে যোগফল হবে ৫০–১০১। মানে ৫০৫০। স্যার, হয়ে গেছে।’

এই যে চিন্তাটা সেটা এতটাই অসাধারণ ছিল যে এখন পর্যন্ত আমরা সেটা ব্যবহার করি। আমরা এখন ১ থেকে n পর্যন্ত সংখ্যাগুলোর যোগফল কী হবে সেটা বোঝার জন্য এই আইডিয়াটা ব্যবহার করতে পারি। ধরা যাক, ১+২+৩+… এমন করে করে n পর্যন্ত যোগ করতে হবে। উপরের মতো করে চিন্তা করা যাক। সবার প্রথমে যে সংখ্যাটা আছে সেটা হলো ১, আর সবার শেষে আছে n।

এখন 1-এর সাথে n যোগ করলে হবে (n+1)। ১ এর পরেরটা মানে ২ আর n এর আগেরটা মানে (n-1) যোগ করলে হবে (n+1)। এমন করে, ৩ আর (n-2) যোগ করলে হবে (n+1)। প্রত্যেকটাই হবে (n+1)। কতগুলো (n+1)  থাকবে? যেহেতু n সংখ্যক সংখ্যা আছে, তাহলে জোড়া বানানো যাবে টা। টা জোড়া, প্রত্যেকটা জোড়ার মান (n+1)। তাহলে আমরা যোগফল পাচ্ছি (n+1)। অর্থাৎ এটাই হচ্ছে ১ থেকে n পর্যন্ত যোগফল।

এটাকে এখন আমরা অনুভব করতে পারি গাউসের আইডিয়া থেকে। [চিন্তার বিষয়: আচ্ছা, যদি n বিজোড় হয়, তখন কী হবে? সামনের ১ বা শেষের n কি সরিয়ে আলাদা করে নিয়ে জোড়া বানানো যাবে? পরে না হয় আবার যোগ করে দেব!]

এই যে অনুভব করতে পারা, এটা খুবই জরুরি একটা ব্যাপার। একটা জিনিস জানা আর অনুভব করা— কক্ষনো এক না।

অন্য একটা ব্যাপার বলি। আমরা ছোটবেলা থেকে জানি— মাইনাসে মাইনাসে প্লাস হয়। কেন হয়? একটা পিচ্চিকে প্রশ্ন করেছিলাম। সে বলল, ভাইয়া, এটাতো খুব সোজা। এই যে একটা মাইনাস, এই যে একটা মাইনাস, এই মাইনাসটা এইটার উপরে খাড়া হয়ে এসে প্লাস হয়ে যায়।

নিশ্চয়ই ব্যাপারটা এ রকম না। তাহলে ব্যাপারটা কী রকম? একটু চিন্তা করলেই সেটা বুঝে ফেলা যায়! আচ্ছা, মাইনাস মাইনাস কী করলে প্লাস হয়? আসলে গুণ করলে প্লাস হয়। আরও ঠিক করে বললে, মাইনাস ১ আর মাইনাস ১ গুণ করলে প্লাস ১ হয়। কেন হয়?

আগে দেখি কোনো সংখ্যাকে মাইনাস ১ দিয়ে গুণ করলে কী ঘটে? আমরা জানি, যদি ১০-কে মাইনাস ১ দ্বারা গুণ করি, তাহলে হয় -১০, এটা আসলে কী বোঝায়? উদাহরণ দিয়ে ভাবি। আমি বললাম, আজকে আমি ব্যবসায় -১০ টাকা লাভ করেছি। এটার মানে কী? মানে আমি আসলে ১০ টাকা লস করেছি, ক্ষতি হয়েছে ১০ টাকা। আমি বললাম, আজকে আমি উত্তর দিকে মাইনাস ১০ মিটার হেঁটেছি। এটার মানে হচ্ছে আমি আসলে দক্ষিণ দিকে ১০ মিটার হেঁটেছি। আরেকবার চিন্তা করুন, উত্তর দিকে মাইনাস ১০ মিটার বলা মানে দক্ষিণ দিকে যাওয়া। তাহলে মাইনাসের কাজ হচ্ছে আসলে সব কিছু উল্টে দেওয়া। আরো গাণিতিকভাবে চিন্তা করলে, মাইনাস আসলে কী করছে? ঘুরিয়ে দিচ্ছে।

আগে তো উত্তরে ছিলাম, এখন আমাকে সে কত ডিগ্রি ঘুরিয়ে দিল চিন্তা করুন তো! সে আমাকে ঘুরিয়ে দিল ১৮০ ডিগ্রি। উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে ১৮০ ডিগ্রি। অর্থাৎ আমরা ভাবতে পারি -১ দিয়ে কাউকে গুণ করার মানে হচ্ছে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে দেওয়া। এটা আরো ভালো করে বোঝা যাবে সংখ্যারেখা থেকে। ধরা যাক, একটি সংখ্যারেখা আছে। এই সংখ্যারেখায় একটা সংখ্যা আছে ২। এই ২কে যদি -১ দিয়ে গুণ করি তাহলে তো মাইনাস (-২) হবে। ২-কে যদি -১ দিয়ে গুণ করা যায় দেখুন সে আসলে ১৮০ ডিগ্রী ঘুরে যায়। অর্থাৎ ২ থেকে মাইনাস (-২) তে চলে গেল ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে। তাহলে এই মাইনাস (-২) কে আবারো যদি -১ দিয়ে গুণ করি তাহলে কী হবে? আবারো সে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরবে, মানে সে আবার আগের জায়গায় ফিরে যাবে প্লাস (+২)-তে।

এজন্যই মাইনাস মাইনাসে প্লাস হয়ে যাচ্ছে। দু’বার ১৮০ ঘুরে আবার আগের জায়গায় ফিরে যাচ্ছে। এরকম ছোটবেলা থেকে আমরা আরো একটা সূত্র (formula) খুব বেশি করে শিখি, (a+b)**2। এটাতো আমাদের খুবই পরিচিত একটি সূত্র। আমরা আমাদের ছোটবেলা থেকেই শিখে এসেছি (a+b)**2 = a**2+2ab+b**2। সারা জীবন মুখস্থ করে এসেছি। এই যে মুখস্ত সূত্রটা এটি কি আসলে অনুভব করা যায়?

প্রাচীন গ্রীসের মানুষেরা কিন্তু অনুভব করতে পারত। তারা কিভাবে অনুভব করত সেটা বলি। তারা চিন্তা করত বর্গক্ষেত্র দিয়ে। আমরা জানি, কোনো বর্গক্ষেত্রের একবাহুর দৈর্ঘ্য যদি হয় ৩, তাহলে ক্ষেত্রফল হবে ৩২, মানে ৯। যদি বর্গক্ষেত্রের বাহু হয় x, ক্ষেত্রফল হবে x2। তো, যদি বর্গক্ষেত্রের বাহু যদি হয় (a+b) তখন ক্ষেত্রফল কত হবে? (a+b)²। এবার একটা বর্গক্ষেত্রABCD আঁকি, যার AB = BC = CD = DA = (a+b)

E, F, G আর H বিন্দুগুলো বাহুগুলোকে a আর b অংশে ভাগ করেছে। এখন ৪টা ছোট ছোট চতুর্ভুজ দেখা যাচ্ছে বর্গক্ষেত্রটার মধ্যে। এই ৪টা ভাগ খেয়াল করি।

এখন এই যে   বড় ভাগটা (DGKH) এটার ক্ষেত্রফল কত? এর প্রতিটা বাহুর দৈর্ঘ্য যেহেতু a, তাহলে এটার ক্ষেত্রফল a²। এই যে পিচ্চি অংশটা (BFKE) এটার ক্ষেত্রফল কত? এটা একটা পিচ্চি বর্গ যার বাহু b। এর ক্ষেত্রফল তাহলে b²। এই যে উপরে ডানদিকে যে আয়তক্ষেত্র (KFCE) তার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ হলো a আর b। তাহলে ক্ষেত্রফল হবে ab। আবার বামপাশে নিচে যে আয়তক্ষেত্রটা তারও ক্ষেত্রফল ab। তাহলে ধন কতবার পাওয়া গেল? এখানে দুইটা ab আছে মানে 2ab। তাহলে দেখুন (a+b)² এই বর্গের ভেতরে আছে একটা a², একটা b²,  আর দুইটা ab। (a+b)² = a²+2ab+b², যা আমরা চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি! কোনো কিছু জানা, আর কোনো কিছু দেখতে পাওয়া এক ব্যাপার নয়। দেখতে পাওয়ার মধ্যে অনেক বেশি আনন্দ আছে।

এবার আরেকটি বিষয় বলি। আমরা সবসময় বলি, কোনো সংখ্যার পাওয়ার শূন্য হলে তার মান হয় ১ (আসলে এটা পুরোপুরি সত্যি নয়, শূন্য এর পাওয়ার শূন্য হলে তার মান কত হয় কেউ জানে না, এটা একটা অনির্ণেয় আকার)। পাওয়ার শূন্য হলে মান ১ হয় কেন? এর মানেটা কী? এটা জানার আগে পাওয়ার বা সূচক ব্যাপারটা একবার দেখে নিই। সূচক বিষয়টা কী রকম? ২অর্থাৎ (২ টু দি পাওয়ার অব ৩) মানে হচ্ছে ২ – ২ – ২ মানে ৩ বার ২-কে গুণ করা হয়েছে। ২মানে হচ্ছে ৪ বার ২-কে গুণ করা হয়েছে। তাহলে ২ মানে কী? কোনো ২-কেই গুণ করা হয়নি। মানে কোনো ২ নেই। এটার গুণফল কত? খুবই অদ্ভুত একটা ব্যাপার। এই জিনিসটাকে গণিতে বলে শূন্যতার গুণফল (Empty product বা null product)

তো এখন ভাবি, এইযে কোনো ২ নেই তার গুণফল আসলে কত হবে? এটাকে ভাগের ধারণা থেকে সহজে একভাবে চিন্তা করা যায়। ধরা যাক আমাদের কাছে ২৫ আছে অর্থাৎ ৫টা ২ গুণ আকারে আছে। এটাকে ২৩ দিয়ে ভাগ করতে চাই, । এখন উপরের এই ৫টা ২-কে আমি যদি আমি নিচের ৩টা ২ দিয়ে ভাগ করি, তাহলে নিচের ৩টা ২, উপরের ৩টা ২ এর সাথে কাটাকাটি হয়ে যাবে। উপরে থাকবে মাত্র ২টা ২। অর্থাৎ ব্যাপারটা হচ্ছে যে, উপরে ৫টা ছিল, তার মধ্যে ৩টাকে সে নিষ্ক্রিয় করে দিল। থাকল দুইটা। এজন্যই আমরা লিখি = ২৫-৩ =২২।

এবার দেখা যাক ২-কে কিভাবে চিন্তা করা যায়। পাওয়ার শূন্য মানে হলো, যতগুলো ২ উপরে ছিল ততগুলোই আসলে আমাকে ভাগ করতে হয়েছে। ফলে সবগুলো নিষ্ক্রিয় হয়ে আর কিছুই নাই। ধরা যাক ২-কে আমি লিখলাম ২৩-৩ বা মানে হচ্ছে, উপরে আছে ৩টা ২ গুণ আকারে আর নিচেও আছে ৩টা ২, গুণ আকারে। তাহলে উপরে আর নিচে যদি একই জিনিস থাকে, ভাগ করলে পাবো ১। তার মানে  ২=১। ২ না হয়ে অন্য সংখ্যা হলেও একই ঘটনা, সবাই কাটাকাটি হয়ে ১ থাকবে। তাই পাওয়ার শূন্য হলে মান হয় ১।

এটা একটা ব্যাখ্যা। কিন্তু এর থেকে সুন্দর করে ব্যাপারটাকে চিন্তা করা যায়। সরাসরি Empty product এর ধারণা থেকে। ধরা যাক, আমাদের কাছে একটা ঘর আছে। এই ঘরটা হচ্ছে গুণের ঘর। পৃথিবীতে যত গুণ চিহ্ন আছে সব কিছু তুলে আমি এই গুণনঘরে নিয়ে এসেছি। এর মানে কী? কেউ যদি আমাকে বলে ভাই, ৩×৪ কত হয়? আমি বলব, ‘দাঁড়াও এই ঘর থেকে ঘুরে আসি’। এই ঘরের বাইরে আর কোথাও কোনো গুণ নাই, ৩×৪-ও নাই। তাহলে এই ঘরটা নিয়েই এখন আমাদের চিন্তা করতে হবে। এবার এই ঘরটা কিভাবে কাজ করে সেটা বোঝানোর চেষ্টা করছি।

এই ঘরটার একটা জানালা আছে। এই জানালার ভেতরে কিছু একটা সংখ্যা থাকে। আমি যদি বাইরে থেকে পেছনের দরজা দিয়ে কোনো কিছু এই ঘরের মধ্যে প্রবেশ করাই, তাহলে এই জানালাতে গুণফলটা দেখা যায়। তার মানে এই ঘরটা গুণ করতে পারে। কী রকম? ভাবুন, যদি এই ঘরে আগে থাকে ২, তারপর আমি ৪ এনে দিলাম। তাহলে জানালায় ৮ দেখাবে। আমি এখন যদি ৩ এনে দেই, জানালায় দেখাবে ২৪। আমি যদি ২ এনে দেই, এরকম ভাবে ৪৮ দেখাতে থাকবে। এখন কথা হচ্ছে, কেন? সবসময় আগে থেকে কিছু একটা থাকতে হবে কেন?

 
Sunk Cost এর ব্যাপারে জেনে নাও এখান থেকে!

 

কারণ গুণ জিনিসটা আসলে সবসময় দুই জনকে নিয়ে হয়। ৩ গুণ ৪। ৫ গুণ ৬। এটাকে বলে বাইনারি অপারেশন (Binary Operation)। দু’জন না হলে গুণ হয় না। এজন্য আগে থেকে একজনকে থাকতে হবে, যার পরে একজন আসবে। এখন এই ঘরের সাহায্যে আমি যদি ৩ × ৪ এটার হিসাব করতে চাই, আমি কিভাবে হিসাব করব? হ্যাঁ, ঘরে ৩ ছিল, আমি ৪ এনে দিলাম। তবে কথা হলো, সবসময় কি আগে থেকে ঘরে ৩ ই থাকবে? একদম শুরুর কথাটা চিন্তা করুন। একেবারে শুরুতে, যখন কোনো গুণের কাজ শুরু হয়নি, তখন এই ঘরে কত থাকতে হবে? যেহেতু কিছুই শুরু হয়নি, তাহলে এই গুণ অংকের গুণের ঘরে কি ০ থাকবে? আচ্ছা ০-কে রাখলাম। যেহেতু কেউ নাই এই ঘরে, ০ আছে। এবার আমি ৩-কে আনলাম। কিন্তু ভেতরে ঢুকে সে হয়ে গেল ০, কারণ ৩ × ০ = ০। এবার ৪-কে নিয়ে আসলাম। ৪ ও ভেতরে ০’র সাথে মিলে ০ হলো। অতএব ০’র সাথে ৩ আর ৪ এর গুণফল শূন্য। এটা কি ঠিক হলো? হয়নি। যদি এ ঘরে আগে থেকেই ৫ থাকতো, তাহলে আমি ৩-কে নিয়ে এলাম, তিন পাঁচে পনেরো, ১৫। এবার ৪-কে আনলাম, ৪ ও ১৫ গুণ করে হলো ৬০। তাহলে পেলাম ৩ ও ৪ এ ৬০। এটাও কি ঠিক হলো? হলো না। তাহলে এই গুণ অংককে যদি ঠিক হতে হয়, আগে থেকে আমাকে কত থাকতেই হবে? সেটা হচ্ছে ১। একদম শুরুতে, যখন কেউ নেই এই গুণের ঘরে, তখন থাকতে হবে ১-কে। যদি ১ থাকে, তাহলে ৩-কে আনলে পাওয়া যাবে ৩, ৪-কে আনলে ১২। অর্থাৎ ৩ ও ৪ এ ১২। তার মানে এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি এই গুণফলটা ঠিক হচ্ছে। অর্থাৎ গুণফল ঠিক হবে, যদি একেবারে শুরুতে, যখন গুণের ঘরে কেউই নেই, তখন যদি ১ থাকে। এটাই Empty product, ২০ = ১। অর্থাৎ যখন কোনো ২ নেই, গুণফল কত হবে, ১। যখন কোনো ৫ নেই, গুণফল কত হবে, ১। পৃথিবী০ কত? ১। সবকিছুরই পাওয়ার ০ হলে ফলাফল ১ হবে। তবে সাবধান!!! যদি ০০ হয়, এবং ইনফিনিটি ০ হয়, তখন কত হবে এটা আমরা বলতে পারি না। কারণ এটা একটা অনির্ণেয় আকার।

যাই হোক, এই অধ্যায়ের আলোচনা শেষ করব একটা সমস্যা দিয়ে। আমার খুব প্রিয় একটা সমস্যা। একজন মহিলার ৩টি মেয়ে ছিল। একদিন তার বাসায় গেলেন একজন আদমশুমারির লোক। মানে, বাড়ি বাড়ি গিয়ে লোক গণনা করে বেড়ান, তথ্য যোগাড় করে বেড়ান, এরকম একজন লোক। তিনি মহিলার বাড়ি গিয়ে দরজায় টোকা দিলেন। ঠক! ঠক! ঠক! মহিলা দরজা খুলে দিলেন। লোকটা বলল, আপা, আপনার বাসায় কে কে আছে, এবং তাদের বয়সটা কি আমাকে একটু বলবেন? তখন মহিলা বললেন, আমার তিন মেয়ে। তিন মেয়ের বয়সের গুণফল ৩৬।

মহিলা ছিলেন গণিতবিদ, তার কথা শুনে লোকটার তো মাথা খারাপ। ‘হায় হায়!! এরকম তো কখনো শুনি নি। জিজ্ঞাসা করলাম বয়স। আর উনি বলে, গুণফল ৩৬।’ লোকটারও গণিত নিয়ে আগ্রহ ছিল। তিনি বললেন, ‘আপা, দেখেন গুণফল তো অনেকভাবেই ৩৬ হতে পারে, প্লিজ আরেকটা ক্লু (Clue) দিন!’ এবার মহিলা দ্বিতীয় ক্লুটা দিলেন, বললেন, ‘হ্যাঁ, আমি যদি আপনাকে ওদের ৩ জনের বয়সের যোগফল বলে দেই, আপনি তাহলেও বের করতে পারবেন না।’ এটা কী বললেন আপা, যদি যোগফল বললেও বের করতে না পারি তাহলে এ কথাটা বলার কী দরকার ছিল! মহিলা বললেন, ‘না, এটাই একটা ক্লু যে, আমি যদি আপনাকে যোগফল বলেও দেই, তাহলেও আপনি বের করতে পারবেন না!’ লোকটা হতাশ হয়ে বলল, ‘আপা, তাহলে ভালো কিছু একটা বলুন। অন্ততপক্ষে একটা ভালো ক্লু দেন।’ মহিলা তখন বললেন সবচেয়ে অদ্ভুত কথাটা— ‘আমার সবচেয়ে বড় মেয়েটা কুকুর পুষতে পছন্দ করে!’

মজার ব্যাপার হচ্ছে, এটা শুনে আদমশুমারিকারী এবার সত্যি সত্যি বের করে ফেললেন ৩ মেয়ের বয়স। (৩টাই আমরা পূর্ণসংখ্যা দিয়ে চিন্তা করি।) আপনাদের এখন কাজ হচ্ছে এই ৩টা বয়স হিসাব করে চিন্তা করা। যদি কেউ আগে থেকেই সমস্যাটা জানেন তাদের জন্য বলছি— তারা ৩৬ এর জায়গায় ৭২ নিয়ে চিন্তা করে দেখবেন। এটাও খুব মজার সমস্যা। এবং আপনারা এটাও চিন্তা করবেন ৩৬ ও ৭২ ছাড়া আর কী কী সংখ্যার জন্য এমন সমস্যা তৈরি করা যায়।

(আপনারা খুঁজে বের করতে পারলে এমনকি না পারলেও নিচের লিংকে গিয়ে কমেন্ট করে জানাতে ভুলবেন না—  https://youtu.be/QssNj0UZWLs)

চমক হাসানকে ফলো করতে পারো ফেসবুক পেইজেও!


১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: [email protected]

 

Author

Chamok Hasan

চমক হাসান একজন অনলাইন শিক্ষক।পিএইচডি করেছেন তড়িৎকৌশলে, কাজ করছেন গবেষণা ও উন্নয়ন প্রকৌশলী হিসেবে। ভালোবাসেন গণিত।অবসরে গণিতের উপর ভিডিও তৈরি করেন, বই লেখেন- গণিতের আনন্দ মানুষের কাছে ছড়িয়ে দিতে।
Chamok Hasan
এই লেখকের অন্যান্য লেখাগুলো পড়তে এখানে ক্লিক করুন
What are you thinking?