পর্ব ৫ – মাথার চুল কয়টি?

পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবার শুনে নাও।

এই লেখাটি “আদর্শ” থেকে প্রকাশিত এবং চমক হাসান রচিত গ্রন্থ গণিতের রঙ্গে হাসিখুশি গণিত বই থেকে নেয়া হয়েছে।

মাথায় চুল কয়টি

বলুন দেখি মানুষের মাথায় চুলের সংখ্যা কত? আমি সঠিক সংখ্যাটা বলতে বলছি না। তবে একটা অনুমান চাইছি। আমরা আমাদের এ অধ্যায়ে এরকম কিছু অনুমান নিয়েই কাজ করব। তো বলে ফেলি যে মানুষের মাথায়, যাদের মাথায় কালো চুল আছে— তাদের মাথার চুলের সংখ্যা মোটামুটি ১ লক্ষ ৮ হাজারের মতো। ১ লক্ষ ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার। যাদের মাথায় লাল চুল, তাদের কিছুটা কম থাকে— ৮০ হাজারের মতো। আর যাদের সোনালি চুল, তাদের থাকে মোটামুটি ১ লক্ষ ৫০ হাজারের মতো।

এই তথ্য থেকে বলে দেওয়া যায়, ঢাকা শহরে যত মানুষ আছে তার মধ্যে অন্ততপক্ষে ৮০ জন মানুষ পাওয়া যাবেই, যাদের মাথায় চুলের সংখ্যা ঠিক ঠিক সমান!! এটা অবশ্য খুব সোজা করেই প্রমাণ করা যায়, মাথায় টাক আছে এরকম ৮০ জন মানুষ তো পাওয়া যাবেই যাদের প্রত্যেকের মাথায় ০টি করে চুল আছে। তাহলে তো সমান হয়েই গেল। যাই হোক, এ ছাড়া যদি ধনাত্মক চুল বিশিষ্ট মানুষের কথাও ধরা যায়— যাদের মাথায় ০ থেকেও বেশি চুল আছে তাদের জন্যও এ কথাটা আসলে সত্যি। [চিন্তাসূত্র: যারা প্রমাণটা চিন্তা করতে চান, তাদের জন্য জন্য জানিয়ে দিই, এটা প্রমাণের জন্য কবুতর খোপ নীতি মানে (pigeon hole principle) লাগবে! আগ্রহী মানুষেরা এবার নিজ দায়িত্বে খুঁজে নিন!]

২০১১-১২ সালের বাজেট অনুসারে আমাদের বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব আয় হওয়ার কথা ১,১৮,৩৮৫ কোটি টাকা। এটা হচ্ছে বাংলাদেশের সারা বছরের আয়। আর বিল গেটস? তার সম্পদের পরিমাণ হচ্ছে মোটামুটি ৪,৭২,০০০ কোটি টাকার মতো। যা বাংলাদেশের সারা বছরের আয়ের ৪ গুণ। তো এই টাকাটা কত? এটা অনুমান করার চেষ্টা করি আমরা। আমার হিসাব মতে এটা হচ্ছে এ রকম— আমরা যদি ২০ ফুট × ২০ ফুট × ১০ ফুট (দৈর্ঘ্য × প্রস্থ × উচ্চতা) একটা ঘর চিন্তা করি—এমন ঘর মোটামুটি ১৭৩টার মতো লাগবে, যদি আমরা ১ টাকার কয়েন দিয়ে ঘরগুলো ভরার চেষ্টা করি!

তার থেকেও অনেক বড় সংখ্যার কথা আমরা চিন্তা করতে পারি। কী রকম? এই সারা পৃথিবীতে বালুর সংখ্যা কত? এই যে পৃথিবীতে যত সমুদ্র-সৈকত আছে, তাতে কী পরিমাণ বালু আছে। সেটা কি মাপা যায়? বিজ্ঞানীরা এটাও মোটামুটি মেপে ফেলেছেন। একটা অনুমান করতে পেরেছেন। এর অনুমানটা হচ্ছে মোটামুটি ৭.৫১০**১৮। মানে হচ্ছে ৭৫ হাজার কোটির কোটিটা বালু কণা এ পৃথিবীতে আছে। [চিন্তাসূত্র: কিভাবে মাপা যাবে? একটা ১ সেন্টিমিটার রেখার উপরে কতগুলো বালুকণা আঁটে সেটা গোণা যায়। ওখান থেকে ১ বর্গসেন্টিমিটার এলাকায় কতগুলো আঁটে মাপা যেতে পারে। সারা পৃথিবীর সমুদ্রসৈকতগুলোর আয়তন স্যাটেলাইটের সাহায্যে মেপে ফেলা গেছে, সেটা ইন্টারনেটে খুঁজলে পাওয়া যাওয়ার কথা!]

আচ্ছা মহাবিশ্বের তারার সংখ্যা কি রকম? এটা কি বালুকণার চাইতে বেশি? হ্যাঁ, এটা আসলেই বেশি। এটার পরিসর (Range) মোটামুটি ১০**২২ থেকে ১০**২৪ এর মধ্যে। মানে হচ্ছে ১ এর পরে আমি যদি মোটামুটি ২২টা শূন্য বসাই তাহলে যতগুলো হবে ততগুলো তারা হতে পারে। পৃথিবীতে অণুর সংখ্যা কত? মানে যত যত কিছু আছে সবকিছু মিলিয়ে কতগুলো অণু হতে পারে। এটার মোটামুটি মাপ হচ্ছে ১.৩৩ × ১০৫০ এর মতো। অর্থাৎ ১ এর পরে যদি ৫০টা ০ বসানো যায়। আসলে এভাবে না বলে, বলা যায় যে ১৩৩-এর পরে আমরা যদি ৪৮টা ০ দিয়ে যাই তাহলে যত বড় একটা সংখ্যা হবে তাহলে ততগুলো হচ্ছে এই পৃথিবীতে অণুর সংখ্যা! ১০৫০ আসলে অনেক বড় একটি সংখ্যা।
একটা সংখ্যা আছে যাকে বলে গুগল। ১০**১০০ হচ্ছে ১ গুগল। [এই গুগোলের ইংরেজি বানান হলো Googol, সার্চ ইঞ্জিন Google এর থেকে একটু আলাদা। মজার কথা হলো বিশ্বখ্যাত Google এর প্রতিষ্ঠাতারা কোম্পানির নাম Googol-ই রাখতে চেয়েছিলেন, বানান ভুল করে Google রেখে ফেলেছেন!] এক গুগল (১০**১০০) কত বড়? এটা এতই বড় যে এই পৃথিবীর কোনো কিছু দিয়েই সেটাকে আসলে মাপা যাবে না।

আমি যদি সারা পৃথিবীতে, সারা মহাবিশ্বের প্রতিটা অণু-পরমাণুকে গণনা করা শুরু করি, তাহলেও সেটা ১০১০০ এর সমান হবে না। চিন্তা করে দেখুন, ১ এর পরে মাত্র ১০০টা সংখ্যা আমরা যদি লিখে ফেলি, এটা আসলে এত বড় একটা সংখ্যা হয়ে যাবে যে যার সমান কোনো কিছুই আমাদের পাশে নেই।

এখন আরো কিছু অনুমানের কথা আমরা চিন্তা করি। যেমন আমরা প্রায়ই বলি, এক ইঞ্চি, দুই ইঞ্চি, তিন ইঞ্চি। এক ইঞ্চি কতটুক সবারই ধারণা আছে একটু। আমি এভাবে মনে রাখি যে, আমাদের হাতের মাঝখানের আঙুলটার দুই করের মাঝখানের যে অংশটুকু এটাই হচ্ছে মোটামুটি ১ ইঞ্চি! আপনি দেখবেন আপনার হাতেরও এ অংশটুকু মোটামুটি এক ইঞ্চির মতোই। তাই বলে ঐ যে একটা বাচ্চা শিশু, যে সদ্য জন্মগ্রহণ করেছে তার হাতের আঙুল দিয়ে আবার চিন্তা করবেন না! যাহোক হাতের আঙুলের কথা যখন চলেই এল তখন অন্য একটা প্রসঙ্গে না বলে পারছি না।

হাতের আঙুল দিয়ে খুব সহজে নামতা শেখানো যায়। ৯ ঘরের নামতা। কিভাবে? দুটো হাত দশ আঙুল ছড়িয়ে মুখের সামনে ধরলাম। পরপর দশটা আঙুলকে এক থেকে দশ পর্যন্ত নাম দিলাম। ৩–৯ কত হয়? তখন ৩ নম্বর আঙুলটা আমি বন্ধ করব। ৩ নম্বর আঙুলটা বন্ধ করলাম।

দেখুন তিন নং সাতাশ, দেখা যাচ্ছে। কোথায়? সেটা এখান থেকে দেখা যাচ্ছে। বন্ধ আঙুলটার এই পাশে আছে ২টা আঙুল আর ঐপাশে আছে ৭টা আঙুল— দুই, সাত মানে ২৭। আবার দেখেন ৭–৯ কত হয়?
৭ নম্বর আঙুল ভাঁজ করলাম। এই যে ভাঙা আঙুলের একপাশে ৬, আর অন্যপাশে আছে ৩। তার মানে ৬৩। এভাবেই ৯ ঘরের নামতা করা যায়। [প্রিয় পাঠক/পাঠিকা, আপনি যেহেতু এই বইটি পড়ছেন, আপনার উপর আমার বিশ্বাস আছে, আপনি ৯ এর ঘরের নামতা জানেন! এটা বাচ্চাদেরকে শেখাতে ব্যবহার করতে পারেন! তাছাড়া চেনা জিনিস নতুন করে দেখতেও তো মজা, তাই না?

এক টুকরো চিন্তা: কেন এভাবে করলে ৯ এর নামতার সাথে মিলে যায়? দেখুন তো— ১৮ এর ১ আর ৮, ২৭ এর ২ আর ৭, ৩৬ এর ৩ আর ৬— নিজেদের মধ্যে যোগ করলে কোনো মজার কিছু চোখে পড়ে?]

এখন আরেকটা জিনিসের কথা আমরা বলি। ১ মিটার কতটুকু। আমরা প্রায়ই বলি— ১ মিটার, ১ মিটার। কতটুকু হলে ১ মিটার হয়। আমি চিন্তা করি যে, মাটি থেকে আমার কোমর পর্যন্ত ১ মিটার। আমার উচ্চতা হলো ১.৭২ মিটার। কোমর পর্যন্ত এক মিটার অনুমানটা খারাপ না। অন্যভাবেও ভাবা যায়, দুই হাত কাঁধ বরাবর বিস্তৃত করি। ডানহাত মুষ্টিবদ্ধ রাখি। বাম কাঁধের জোড়া থেকে শুরু করে ডান হাতের মুষ্টি পর্যন্ত প্রায় ১ মিটার হয়। তো এক মিটার যদি আমরা জানি, তাহলে ১ বর্গমিটার কতটুক সেটা সম্পর্কে আমাদের ধারণা করা যাবে এটাকে বাহু ধরে একটা বর্গ তৈরি করলেই। এক মিটারের কথা বলতে গিয়ে এইচএসসির বলবিদ্যা বইয়ের কথা মনে পড়ে গেল। সেখানে গতিবিদ্যার একটা অংক ছিল— ‘একটা বন্দুকের নল ১০ মিটার লম্বা। দাঁড়ান!!! একটু বোঝার চেষ্টা করি। ১০ মিটার লম্বা মানে আপনি ধারণা করতে পারছেন? ঘরবাড়িতে ১ তলা হয় মোটামুটি ৩ মিটার। ১০ মিটার মানে হচ্ছে মোটামুটি ৩ তলার সমান। ১টা বন্দুকের নলই যদি হয় ৩ তলার সমান। সে বন্দুকটায় ঠিক আঙুল দিয়ে গুলি করা যাবে না, ট্রিগার চাপতে গেলে পুরো বাহু মনে হয় ঢুকিয়ে দিতে হবে! বুঝতেই পারছেন এটা একটি ভয়াবহ ব্যাপার। অংকের তথ্য যে বাস্তবসম্মত না,এটা উপলব্ধি করা যায়। যাহোক আমরা এমন করে তো ১০ মিটারটা বুঝতে পারলাম।

আপনারা নিশ্চয়ই বলের কথা জানেন। ফুটবল না, পদার্থবিজ্ঞানে আমরা যেই বল (force) পড়েছি, সেই বলের কথা বলছি। আমরা জানি, এই বলের একক হচ্ছে ‘নিউটন’। এখন এক নিউটনে কতটুকু বল? আমি যদি আপনাকে প্রচণ্ড জোরে একটা ঘুষি মেরে জিজ্ঞাসা করি, এটা কত ‘নিউটন’ ছিল? সেটা কী আপনি অনুমান করতে পারবেন?
এক নিউটনের সংজ্ঞাটা হচ্ছে এরকম— এক কেজি ভরের কোনো বস্তুর উপরে যে পরিমাণ বল প্রয়োগ করলে এটি (ms-2) ত্বরণপ্রাপ্ত হয় তাকে বলে ১ নিউটন। এই কথাটা দিয়ে ১ নিউটন সম্পর্কে ধারণা করাটা আসলে খুব সহজ নয়। এটা দিয়ে আসলে অনুভব করা যায় না ১ নিউটন কতটুকু। তার চেয়ে খুব সহজ একটা উপায় বলি। আপনাদের বাড়িতে দেখবেন গুঁড়া মসলা আছে। ১০০ গ্রাম গুঁড়া মসলার প্যাকেট নিন। এই প্যাকেটটা হাতে ধরবেন। হাতে ধরলে যে প্রচণ্ড ওজন আপনি অনুভব করবেন, যার ভরে আপনার হাত ছিঁড়ে যাবার উপক্রম হবে, সেটাই মোটামুটি ১ নিউটন। মজা করছি— আসলে ১০০ গ্রাম ধরলে তেমন কিছু টেরই পাবেন না! ১০০ গ্রাম মানে হচ্ছে ০.১ কেজি। আর ওজনের সূত্র W=mg। g এর মান হচ্ছে 9.8ms-2। ওখান থেকে হিসাব করলে পাওয়া যায়, W=0.98N, তার মানে ১০০ গ্রাম গুঁড়া মসলার ওজন 0.98N যা প্রায় ১ নিউটন। আর যদি মন খুঁতখুঁত করে, একদম এক নিউটন বানাতে চান তাহলে আর দুই একটা গুঁড়া নিয়ে নিতে পারেন, একদম এক নিউটন হয়ে যাবে। ১ নিউটন সম্কর্কে আমাদের তো এখন ধারণা হয়েছে— আসলে এটা খুব অল্প বল। আপনি যদি ঘুষি মারেন, সেটা নিঃসন্দেহে ১ নিউটন থেকে বেশি।

আচ্ছা ১ প্যাসকেল (pascal) চাপ কতটুকু হবে? ১ মিটার কতটুকু সেটা আপনারা এখন জানেন। সেটা থেকে বর্গ বানিয়ে ১ বর্গমিটার কাগজের পাত চিন্তা করুন। এই এক বর্গমিটার কাগজের উপরে ঐ যে ১০০ গ্রাম গুড়া মসলা, সেটা আমরা সমান পরিমাণে ছড়িয়ে দিলাম। এত বড় জায়গাটার ভেতরে ১০০ গ্রাম গুঁড়া মসলা সমান ভাবে ছড়িয়ে দিলাম। এখন এই কাগজটা মসলার বি-শা-ল ওজনের কারণে নিচের দিকে যে পরিমাণ প্রচণ্ড চাপ অনুভব করবে এটাই আসলে ১ প্যাসকেল চাপ। বুঝতেই পারছেন এটা আসলে খুবই ছোট্ট একটা চাপ। ১ বর্গ মিটার জায়গার উপরে যদি ১ নিউটন পরিমাণ বল করা হয় সেটাই হচ্ছে ১ প্যাসকেল চাপ। তাহলে আমরা ১ প্যাসকেল চাপ সম্পর্কেও মোটামুটি ধারণা করতে পেরেছি।
তো এই অনুমান নিয়ে সবচেয়ে যে ব্যাপারটা আমার বেশি অবাক লাগে, সেটা হচ্ছে আজ থেকে প্রায় ২২০০ বছর আগে ‘ইরাটোস্থেনিস’ নামের একজন বিজ্ঞানীর অনুমান। তিনি সারা পৃথিবীর পরিধি প্রায় নিখুঁতভাবে বের করে ফেলতে পেরেছিলেন। অত বছর আগে কিভাবে তিনি এটা পারলেন? তার আগে বলে নেই, তিনি কোথায় থাকতেন। তিনি থাকতেন মিশরের ‘আলেকজান্দ্রিয়াতে’। আলেকজান্দ্রিয়ায় বিখ্যাত একটা লাইব্রেরি ছিল। তিনি ছিলেন সেই লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান। এই লাইব্রেরিটা কী পরিমাণ অসাধারণ ছিল তা হয়ত অন্য কোথাও লেখা যাবে। (আমি শুধু এই লাইব্রেরির উপরেই একটা লেখা লিখতে চাই।) তো সেই লাইব্রেরিতে বসে ইরাটোস্থেনিস একদিন পড়ছেন। পড়তে পড়তে দেখলেন, মিশরে একটা শহর আছে যার নাম সাইন (Syene)। [এটাকে এখন আসোয়ান (Aswan) শহর বলে] সেই শহরে বছরের একটা নির্দিষ্ট দিনে (এখনকার হিসেবে ২১ জুনে) সূর্যটা মধ্য-দুপুরের সময় খাড়া মাথার উপরে থাকে। কী রকম? একটা লাঠি খাড়াভাবে মাটিতে পুঁতে রাখলে তার ছায়া দেখা যায় না। এমনকি কুয়াতেও যদি মানুষ মুখ দেয় তাহলে কুয়ার ভেতরে সূর্য দেখা যায় না। মানে মানুষের মাথার কারণে মাঝের দিকে সূর্যটা দেখা যায় না, এতটাই খাড়া মাথার উপরে থাকে।

বিষয়টি জানার পর তার কাছে খুবই দারুণ লাগলো— বাহ!! এ তো খুব ভালো একটা ব্যাপার। তিনিও তক্কেতক্কে থাকলেন, বছরের ঐ সময়টাতে তিনি আলেকজান্দ্রিয়াতে বসেই পরীক্ষাটা করে দেখবেন। বছরের ঐ দিন তিনি যখন আলেকজান্দ্রিয়াতে এরকম একটা লাঠি পুঁতলেন, তিনি দেখলেন আলেকজান্দ্রিয়াতে ঠিকই লাঠির ছায়া দেখা যাচ্ছে। তিনি খুবই অবাক হলেন! কী ব্যাপার, এ সময় তো ছায়া দেখা যাওয়ার কথা না। সাইন নগরীতে ছায়া পড়ছে না, এখানে কেন ছায়া পড়ছে? তিনি অনেক চিন্তা করে একটা গাণিতিক ব্যাখ্যা দাঁড় করালেন। ব্যাপারটাকে এভাবে চিন্তা করা যেতে পারে— পৃথিবীটাকে তিনি ধরে নিলেন গোলক টাইপের।

পৃথিবীর কোনো জায়গায় যদি কোনো মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে, যেখানেই থাকুক তাদের পা বরাবর আস্তে আস্তে যেতে থাকলে আমরা পৃথিবীর কেন্দ্রে গিয়ে পৌঁছবো। খাড়া একটা লাঠি পুঁতে সেটা বরাবর মাটির ভেতরে যেতে থাকলেও একসময় কেন্দ্রেই পৌঁছাবো।

ধরা যাক মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ার নাম A, আর সাইনের নাম S। তিনি ভাবলেন, সূর্যটা তো অনেক বড়। সূর্য থেকে আলোগুলো এরকম সরাসরি সমান্তরালে আসতে থাকবে। ২১ জুনের কথা ভাবি। সাইন শহরে (S বিন্দুতে) সূর্যের আলো মানে সূর্যরশ্মি সরাসরি এসে লাঠিতে পড়বে, তাই এখানে কোনো ছায়া পড়েনি।

কিন্তু চিন্তা করুন সাইনে ছায়া না পড়লে যে আলেকজান্দ্রিয়ায় (A বিন্দুতে) ছায়া পড়বে না তা কিন্তু না। দেখুন, আলেকজান্দ্রিয়ায় যদি ঠিক একই দিনে চিন্তা করি, তাহলে দেখা যাবে, এই ছোট্ট একটু অংশে কিন্তু ঠিকই ছায়া পড়ছে। তিনি আরও একটা জিনিস খেয়াল করলেন।

সেটা বুঝতে চলুন ঐ জায়গাটা আতশি কাচ (Magnifying glass) দিয়ে একটু বড় করে দেখি। একটু বড় করে এখানে আঁকলাম। লাঠিগুলোকে আস্তে আস্তে পেছন দিকে বাড়াই, তাহলে
সেটাও কিন্তু পৃথিবীর কেন্দ্রে গিয়েই মিশবে। তিনি তখন চিন্তা করলেন যে আচ্ছা, দু’টি সমান্তরাল রেখার ক্ষেত্রে একান্তর কোণগুলো তো পরস্কর সমান হয়।

তাহলে, পৃথিবীর কেন্দ্রের কোণ আর আলেকজান্দ্রিয়ার লাঠি আর সূর্যরশ্মির মাঝের কোণ তো সমান হবে। তার মানে আমি যদি লাঠি আর রশ্মির মাঝখানের কোণটা মাপতে পারি, তাহলে পৃথিবীর কেন্দ্রে যে কোণটা আছে সেটা আমি মেপে ফেলতে পারব। তিনি হিসাব করে দেখলেন যে, কেন্দ্রের কোণটা হচ্ছে মোটামুটি একটা বৃত্তের ৫০ ভাগের ১ ভাগ। একটা পুরো বৃত্ত কেন্দ্রে কোণ তৈরি করে ৩৬০ ডিগ্রি। তারই ৫০ ভাগের ১ ভাগ পাওয়া গেল কেন্দ্রের কোণ ∠SOA বা θ।
ইরাটোস্থিনিস আগে থেকে জানতেন আলেকজান্দ্রিয়া থেকে সাইন-এর দূরত্ব কত (অর্থাৎ ছবিতে দেখানো AS চাপের দৈর্ঘ্য তার জানা ছিল)। এখন যেমন আমরা মাইল, কিলোমিটারে দূরত্ব মাপি, সেই সময় মানুষ দূরত্ব মাপত ‘স্টেডিয়া (Stadia)’র এককে। তিনি দেখলেন যে এটুকু (আলেকজান্দ্রিয়া থেকে সাইন-এর দূরত্ব) হচ্ছে ৫০০০ স্টেডিয়া। তিনি এবার ভাবলেন যে আচ্ছা, তাহলে ঐকিক নিয়ম দিয়েই চিন্তা করা যাক। বৃত্তের ৫০ ভাগের ১ ভাগ কোণের জন্য দূরত্ব হয় ৫০০০ স্টেডিয়া। অতএব পুরো বৃত্তটার জন্য দূরত্ব হবে ৫০০০–৫০ = ২৫০০০০ স্টেডিয়া। এটাই হচ্ছে সারা পৃথিবীর পরিধি। আর এই স্টেডিয়া-কে যদি আমরা এখনকার কিলোমিটারে প্রকাশ করি তাহলে এই দূরত্বটার মান বের হয় মোটামুটি ৩৯৬৯০ কিলোমিটার। এটাই পুরো পৃথিবীর পরিধি! এখনকার যে হিসাবটা আমরা জানি, সে দিক থেকে তার ভুলটা ২ শতাংশেরও কম ছিল! এতটাই ভালো ছিল তার হিসাব। দেখুন, শুধু এতটুকু একটা জ্ঞানের ওপরে ভিত্তি করে তিনি সারা পৃথিবীর পরিধি প্রায় নিখুঁত ভাবে মেপে ফেলতে পেরেছিলেন। কী অসাধারণ একটা ব্যাপার!

যাহোক, আমাদের এই অধ্যায়ের আলোচনা এই পর্যন্তই। আমরা গত অধ্যায় শেষ করেছিলাম একটা সমস্যা দিয়ে। তিনটা মেয়ের সমস্যা। না, এখনই সেটার উত্তর বলব না। এখানে বরং আরো একটা সমস্যা জানিয়ে রাখি। এই সমস্যাটা যত না গাণিতিক তার চেয়ে বেশি যুক্তির। খুব সহজ সমস্যা। আপনি দেখতে পেলেন আপনার সামনে দুইটি রাস্তা। একটা সুখনগরের রাস্তা আর অন্যটা দুঃখনগরের রাস্তা। দুটো রাস্তার সামনে দুইজন দারোয়ান দাঁড়িয়ে আছে। তো আপনি এতটুকু জানেন যে, এদের মধ্যে একজন সবসময় সত্যি কথা বলে। আর আরেকজন সবসময় মিথ্যা কথা বলে। আপনি যেতে চান সুখ নগরে। এদেরকে আপনি ঠিক একটা প্রশ্ন করতে পারবেন। যে কোনো একজনকে যেকোনো একটা প্রশ্ন করতে হবে আপনাকে। এই একটা প্রশ্ন করেই আপনাকে বের করে ফেলতে হবে যে সুখনগরের রাস্তা কোনো দিকে। এই প্রশ্নটা কী হবে সেটাই হচ্ছে আপনাদের জন্য প্রশ্ন!

চমক হাসানকে ফলো করতে পারো ফেসবুক পেইজেও!


১০ মিনিট স্কুলের লাইভ এডমিশন কোচিং ক্লাসগুলো অনুসরণ করতে সরাসরি চলে যেতে পারো এই লিঙ্কে: www.10minuteschool.com/admissions/live/

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: write@10minuteschool.com

Author

Chamok Hasan

চমক হাসান একজন অনলাইন শিক্ষক।পিএইচডি করেছেন তড়িৎকৌশলে, কাজ করছেন গবেষণা ও উন্নয়ন প্রকৌশলী হিসেবে। ভালোবাসেন গণিত।অবসরে গণিতের উপর ভিডিও তৈরি করেন, বই লেখেন- গণিতের আনন্দ মানুষের কাছে ছড়িয়ে দিতে।
Chamok Hasan
এই লেখকের অন্যান্য লেখাগুলো পড়তে এখানে ক্লিক করুন
What are you thinking?