পর্ব ২ – সংখ্যার খেলা!

পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবার শুনে নাও।

এই লেখাটি “আদর্শ” থেকে প্রকাশিত এবং চমক হাসান রচিত গ্রন্থ গণিতের রঙ্গে হাসিখুশি গণিত বই থেকে নেয়া হয়েছে।

অধ্যায়: ২

এ অধ্যায়ে আমরা যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করব তা  হচ্ছে সংখ্যা। সংখ্যা হচ্ছে আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে আদরের বস্তু, সবচেয়ে আদরের বিষয়। অবশ্য এটা আমার পৃথিবীতে! সংখ্যা নিয়ে বলতে গেলে আবারো যে মানুষটির কথা স্মরণ করতে হয় তিনি হলেন পিথাগোরাস। আগেই বলেছি তিনি হচ্ছেন আমার গুরু। সেই পিথাগোরাস, যিনি সবসময় সংখ্যা নিয়ে চিন্তা করতেন, সবকিছুকেই সংখ্যার মতো করে দেখতেন। শুরুর দিকে যখন আমার গণিতের সেই মহান গুরু পিথাগোরাস সম্পর্কে একটু আধটু খোঁজ নিতে, জানতে শুরু করি, তখন তার জীবনের একটি কালো অধ্যায়ের গল্প শুনেছিলাম। এখন আমি সেই গল্পটাই শোনাব।

জানিয়ে রাখি, পিথাগোরাস মনে করতেন এই পৃথিবীতে সব সংখ্যাকেই পূর্ণসংখ্যার যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ দিয়ে বানানো যায়। কী রকম? ধরা যাক— কেউ হয়তো বলল ১.৩। গুরু বলবেন, ‘এ আর এমন   কী— ।’ আমরা জানি পূর্ণসংখ্যা যোগ, বিয়োগ আর গুণ করলে  পূর্ণসংখ্যাই থাকে। যদি ঝামেলা হয়ই, সেটা হতে পারে ভাগ নিয়ে। এ কারণে ভাগ আর বিভাজ্যতা সংখ্যাতত্ত্বে খুব গুরুত্বপূর্ণ। তো, যদি কোনো সংখ্যাকে দুটো পূর্ণসংখ্যার ভাগফল হিসাবে দেখানো যায়, তাদেরকে বলে মূলদ সংখ্যা (rational numbers)। পিথাগোরাস মনে করতেন সব সংখ্যাই মূলদ। এই মনে করাতেই ঝামেলা ছিল। আসলে সবকিছুই মূলদ না। যেমন ২ এর বর্গমূলকে (অর্থাৎ ২) কখনই দুইটা পূর্ণসংখ্যার ভাগফল হিসাবে প্রকাশ করা যায় না। এটা একটা অমূলদ সংখ্যা। এই কথাটাই প্রথমে যিনি বলেছিলেন তিনি হলেন হিপ্পাসাস (Hippasus), পিথাগোরাসের একজন শিষ্য। তাকে নিয়ে যে গল্পটা আমি শুনেছিলাম সেটা এমন— একদিন তিনি এসে পিথাগোরাসকে বললেন,

‘গুরু, ও গুরু, আপনি যে বলেছেন সবকিছুই মূলদ সংখ্যা— তাহলে তো আপনার উপপাদ্যটা ভুল!’

  • ‘কী বলিস তুই! সারা জীবন এই একটাই উপপাদ্য দিলাম, এটাও ভুল হবে? এ কিছুতেই হতে পারে না! না না না!’
  • ‘না মানে দেখেন, আমি আপনাকে ঠিক ওভাবে বলিনি। আপনি বলেছেন, সমকোণী ত্রিভুজে অতিভুজ= লম্ব+ ভূমি। এখন দেখেন যদি লম্ব হয় ১ এবং ভূমি হয় ১ তাহলে অতিভুজ= ১+ ১। এখন অতিভুজ= ২। সুতরাং, অতিভুজ = ২ এর বর্গমূল। গুরু! এটা কিন্তু কখনোই পূর্ণসংখ্যার ভাগফল হিসেবে প্রকাশ করা যায় না।’ এটা বলে হিপ্পাসাস দেখালেন, একটা বর্গক্ষেত্রের বাহু এবং কর্ণ একইসাথে মূলদ হওয়া সম্ভব না। তারপর বললেন,
  • ‘দেখলেন তো গুরু, এটা মূলদ সংখ্যা না!’
  • ‘কী বললি তুই??’
  • ‘গুরু এটা তো মূলদ সংখ্যা না।’
  • ‘কী বললি???’

এরপর কী করা হয় জানেন? হিপ্পাসাসকে মেরেই ফেলা হয়! পিথাগোরাস নিজের হাতে মারেননি। কিন্তু তার শিষ্যরা তার পরের দিনই তাকে ঘুমন্ত অবস্থায় স্বপ্নের ভেতর জাহাজ থেকে ফেলে দিয়েছিল। এবং হিপ্পাসাস মারা যান। হিপ্পাসাসকে বলা যায় গণিতের ইতিহাসে প্রথম শহীদ! যিনি সংখ্যার জন্য জীবন দিয়েছিলেন। হিপ্পাসাসকে বলা হয় অমূলদ সংখ্যার আবিষ্কারক।

তো এই হচ্ছে পিথাগোরাসের জীবনের কালো অধ্যায়ের গল্প। এটি নিছক একটা গল্পই। এখন একটু বড় হয়েছি, লেখাপড়ার পরিধি একটু বেড়েছে, এখন জানি, হিপ্পাসাসের সময়টা ছিল পিথাগোরাসের ১০০ বছর পর! তাই বলে এই গল্পটা একেবারে আকাশ থেকে পাওয়া না— এটা গণিত মহলে বেশ পরিচিত। যতদূর জানা যায় হিপ্পাসাস জাহাজডুবিতে মারা গিয়েছিলেন। এরপর পিথাগোরাসের গোঁড়া ভক্তরা রটিয়ে দিয়েছিল— ও অমূলদ সংখ্যার মতো অপবিত্র জিনিস তৈরি করেছে, সে জন্যে দেবতারা রেগে গিয়ে ডুবিয়ে দিয়েছে জাহাজ! তবে অমূলদ সংখ্যা আবিষ্কারের কৃতিত্ব এখনও হিপ্পাসাসকে দেয়া হয়।

হিপ্পাসাস সাগরতলে ঘুমাক, আমরা সংখ্যার কথা বলি। পূর্ণ সংখ্যার মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় সংখ্যা হচ্ছে ১১। কেন ১১ প্রিয়? সেটা বলতে পারব না। অনেক ভালো লাগে এজন্যই প্রিয়। (তত্ত্বের কথা বলি— শুনুন, প্রিয় হবার ভিতরে  কারণ খুঁজতে যাবেন না কখনো!) তবে এই ১১-এর কিছু বৈশিষ্ট্য অসাধারণ। যেমন ১১ সংখ্যাটা খাঁটি বাংলা ভাষায় কথা বলতে পারে। এই যে আমি আজকে যতগুলো কথা বলছি সবকিছু হয়তো অনুবাদ করে ফেলা যাবে। কিন্তু এখন আমি ১১ কে দিয়ে যে কথাগুলো বলাব— সেটা কখনোই অনুবাদ করা যাবে না। এটা শুধু বাংলাতেই সম্ভব! কিন্তু সংখ্যা কিভাবে কথা বলতে পারে?

১-কে যদি আমরা ১১ দিয়ে ভাগ করি, কী পাবো? মনে মনে ভাবুন উপরে ১ নিচে ১১, দিলাম ভাগ! আচ্ছা, আপনিই বলুন, এটা কি কখনো শূন্য হবে? নিশ্চয়ই না। কারণ ভাগের ক্ষেত্রে উপরে শূন্য না থাকলে কখনো শূন্য হয় না। ১-কে ১১ দিয়ে ভাগ করলে যেটা পাওয়া যায় সেটা হচ্ছে = ০.০৯০৯০৯০৯০৯০৯০৯০৯০৯… তাকিয়ে দেখুন সে কিন্তু সত্যি কথা বলেছে। ১-কে ১১ দিয়ে ভাগ করলে শূন্য হয় না। সে ঠিক সেই কথাই বলছে। সে বলছে তে যেটা হয়— সেটা কিন্তু ‘শূন্য নয় শূন্য নয় শূন্য নয়…’ , সে সারা জীবন ধরে এমন করে বলতে থাকে— এটা কিন্তু শূন্য নয়! তাই আমি বলি হলো একটি সত্যবাদী সংখ্যা। এবার পরের সংখ্যাটিতে যাই।

আচ্ছা, ২-কে যদি ১১ দিয়ে ভাগ করা যায় তাহলে কী পাওয়া যাবে? তখন পাওয়া যাবে বাংলা ভাষার সবচেয়ে লোভী সংখ্যা! কেন? দেখা যাক! = ০.১৮১৮১৮১৮১৮১৮১৮১৮… এখন পড়ুন এক আট এক আট এক আট…। এভাবে ধীরে ধীরে পড়লে এটা যে লোভী তা বোঝা যাবে না। সুতরাং একটু জোরে জোরে পড়ুন, দেখুন কী বলে। এক আট-অ্যাকাট-অ্যাকা ট্যাকা, ট্যাকা, ট্যাকা, ট্যাকা, ট্যাকা…। দেখেছেন কী বদমাশ! ১১ এর মধ্যে মাত্র ২, এইটুকু বয়সে এখানে সে কিনা এসে ট্যাকা, ট্যাকা করছে। এ জন্যই এটা হচ্ছে বাংলা ভাষায় সবচেয়ে লোভী সংখ্যা!

এরকম কথা বলার সংখ্যা আরো আছে। যেমন ১১-কে যদি আমরা ৩০৩ দিয়ে গুণ করি তখন পাওয়া যাবে ৩৩৩৩। (১১×৩০৩ = ৩৩৩৩)। এই ৩৩৩৩ এটাকে নিচে রাখলাম আর উপরে থাকলো ১১২৩। এখন ১১২৩-কে যদি আমরা ৩৩৩৩ দিয়ে ভাগ করি তখন যে সংখ্যা পাওয়া যায় এটা হচ্ছে বাংলা ভাষার অন্যতম মিথ্যাবাদী একটা সংখ্যা। কেন?

দেখা  যাক! ভাগ করলে = .৩৩৬৯৩৩৬৯৩৩৬৯৩৩৬৯… খেয়াল করুন। আপনিই বলুন, ৩ আর ৩ কত হয়? নিশ্চয়ই বলবেন ৬ হয় (যোগের কথা ভাবছি আপাতত, গুণ ভাবলে ৯-ও হতে পারে)।তো,   আমরা সারা জীবন জেনেছি ৩ আর ৩ মিলে ৬ হয়। অথচ এই ব্যাটা বলে কি না তিন তিন ছয় নয়, তিন তিন ছয় নয়, তিন তিন ছয় নয়! এটা একটা পাক্কা মিথ্যাবাদী। ১১২৩ দিয়ে ৩৩৩৩-কে ভাগ করলে একটা মিথ্যাবাদী সংখ্যা [প্রিয় পাঠক, আপনিও কি এমন কথা বলা সংখ্যা খুঁজে বের করতে পারেন? পারলে আমাকে জানাবেন।

দুইটি অংকের যোগফল ১০-এর কম, এমন যে কোনো দুই অংকের সংখ্যাকে ১১ দিয়ে গুণ দেয়া খুব সোজা। ওই অংক দুটিকে দুপাশে সরিয়ে দিন, মাঝে বসিয়ে দিন অংক দুটির যোগফল।

আমরা কথা বলার সংখ্যা দেখলাম। ১১ দিয়ে আরো মজার মজার জিনিস করা যায়। যেমন ১১ দিয়ে গুণ করা খুব মজা। আমাকে যদি বলা হয় বলো তো ৩৪×১১ কত হবে? মুখে মুখে ধুম করে বলে দিতে পারি ৩৭৪। ৪৫×১১ কত হয়? ৪৯৫। ৫২×১১ কত হবে? ৫৭২। কিভাবে হলো সেটা একটু বলি, আপনারাও পেরে যাবেন একবারেই। এটা খুবই সহজ একটা নিয়ম। আমি বলেছি ৩৪×১১ = ৩৭৪। দেখুন ৩৪ এর মধ্যে কী কী ছিল? ৩ আর ৪। এই ৩ আর ৪-কে দুই পাশে সরিয়ে ফেলুন। এবার অঙ্কদুটোর যোগফল ৭-কে মাঝে ঢুকিয়ে দিন। তাহলে কত হলো? ৩৭৪। এটাই উত্তর। সব জায়গায় এটা সত্যি! যে রকম ৪৫×১১ = ৪৯৫। ৪ আর ৫-কে দু’পাশে ছড়িয়ে দিন এবং ৪ ও ৫-কে যোগ করলে হয় ৯। সুতরাং একে মাঝে বসিয়ে দিন। ব্যস! হয়ে গেল ৪৯৫ ।

তবে এমন শর্টকাট কিছু শিখলে অবশ্যই নিজেকে প্রশ্ন করবেন কেন এমন হলো— কেন হলো সেটা না জানলে এটা কোনো জ্ঞানই হবে না! যেমন এই যে নিয়মটা বললাম— এটা আসলে খুব সাধারণ একটা বিষয়। দেখুন ৪৫-কে যদি ১১ দিয়ে গুণ করতে হয়, তাহলে আমরা স্বাভাবিকভাবেই ১ দিয়ে ৪৫-কে গুণ করব— তাতে ৪৫ হবে। এভাবেই ডান দিকে একঘর ছেড়ে আবারো ৪৫। তাহলে কি হবে উপরের ডান দিক থেকে ৫ নেমে আসবে এবং বাঁ দিক থেকে ৪ নেমে আসবে, তারপর মাঝখানে ৪ ও ৫ মিলে ৯ বসে যাবে। সুতরাং হয়ে গেল ৪৯৫। এটাই হওয়ার কথা ছিল। হয়েছেও তাই।

আচ্ছা এবার চিন্তা করুন তো, যদি অংক দুইটার যোগফল ১০-এর চেয়ে বেশি হয়ে যায়! কী রকম? ধরা যাক ৭৫–১১ বের করতে চাই (চিত্র ২.২)। এখন ৭ আর ৫ আমরা দু পাশে সরিয়ে ফেললাম। তো ৭ আর ৫ এ হয় ১২। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে মাঝখানে ঘর আছে একটা। তাহলে ৭ ও ৫ এর যোগফল ১২ এর ২ রেখে দিলাম আমরা এবং পাশে যে ১ আছে তাকে ৭ এর সাথে যোগ করে দিলাম, হয়ে গেল ৮। এভাবেই ৭৫–১১ = ৮২৫ হয়। এভাবে আমরা কোনো সংখ্যাকে খুব সহজে ১১ দিয়ে গুণ করে ফেলতে পারি। ১১ নিয়ে আজকের অংশটা এই পর্যন্তই।

[চিন্তার কথা: গুণ করার নিয়মটা অমন কেন? কেন আমরা একটা ক্রসচিহ্ন দিয়ে বাম পাশে সরে যাই?]

এখন আমরা যাব আমার আরেকটা প্রিয় সংখ্যা ৫ এর কাছে।

৫ নিয়ে বলার আগে কটা খেলার কথা একটু কল্পনা করা যাক। মনে করুন, বাংলাদেশ আর অস্ট্রেলিয়ার একটি একদিনের ক্রিকেট ম্যাচ। বাংলাদেশ প্রথমে ব্যাট করতে নেমেছে। ব্যাট করতে নেমে ৫০ ওভার শেষে কোনো উইকেট না হারিয়ে বাংলাদেশের সংগ্রহ ৪৩২। বিশাল রান। আমরা একটা স্বপ্ন দেখছি, বাংলাদেশ জিতবে আজকে। অস্ট্রেলিয়া বুঝতেই পারছে যে আজ তাদের জেতার কোনো সম্ভাবনাই নেই। তো ওই বেচারারা যখন জিততে পারবেই না তখন আসুন আমরা ওদের একটু প্রয়োজনীয় (required) রান রেটের হিসাব করে দেই। যদি বাংলাদেশ ৪৩২ রান করে, তাহলে জিততে হলে তাদের লাগবে ৪৩৩ রান। তো এখন রিকোয়ার্ড রান রেটটা কত হবে? আমরা জানি, মোট যে রানটা আছে তাকে আমরা মোট ওভার ৫০ দিয়ে ভাগ করলেই পেয়ে যাব রিকোয়ার্ড রান রেট। তবে এই যে ৫০ দিয়ে ভাগ করাটা— এটা খুব দ্রুত মাথার মধ্যে করে ফেলা যায়। সেটা কিভাবে তা শিখিয়ে দিচ্ছি। আমাদের কাছে আছে ৪৩৩, তাকে আমরা ভাগ দিচ্ছি ৫০ দিয়ে। এটা করতে হলে প্রথমে ৪৩৩-কে দ্বিগুণ করতে হবে, পাবো ৮৬৬। এখন এই ৮৬৬ এর শেষ থেকে (.) দশমিককে দুই ঘর বামে সরিয়ে নেব। তাহলে হয় ৮.৬৬। আর এটাই হচ্ছে রিকোয়ার্ড রান রেট। সবসময়ের জন্যই এটা সত্যি! বিশ্বাস হচ্ছে না?

চলুন আরেকটা খেলা কল্পনা করি। মনে করুন, খেলা হচ্ছে বাংলাদেশের সাথে দক্ষিণ আফ্রিকার। দক্ষিণ আফ্রিকা প্রথমেই ব্যাট করতে নেমেছিল। প্রথমে ব্যাট করতে নেমে ওরা ৫০ ওভার শেষে ১২৪ রান করেছে। তাহলে এখন বাংলাদেশের রিকোয়ার্ড রান রেট কত হবে? (বাংলাদেশ এবারও জিতবে!) দক্ষিণ আফ্রিকা করেছে ১২৪ রান। তাহলে বাংলাদেশকে করতে হবে ১২৫। তাই ১২৫-কে আমাদের ৫০ দিয়ে ভাগ করতে হবে। তাহলে আমি কী বলেছিলাম? ১২৫-কে দ্বিগুণ করে ফেলুন। ১২৫-কে ডাবল করলে ২৫০। তাহলে এখন ডান দিক থেকে বামের দিকে দশমিক (.) দুই ঘর সরিয়ে ফেলুন। তাহলে কি হল? ২.৫০। তো এটাই হচ্ছে রিকোয়ার্ড রান রেট। আমরা মুখে মুখে এটা করে ফেলতে পারি।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এটা কেন এরকম কাজ করল? এমন কেন হলো এটা। কারণটা খুব সোজা। ঘটনা হচ্ছে এই যে, আমরা যখন ৫০ দিয়ে কাউকে ভাগ করছি, আমরা আসলে ২ দিয়ে গুণ করে ১০০ দিয়ে ভাগ করছি!

আর ১০০ দিয়ে ভাগ করলেই তো দশমিকটা (.) দুই ঘর সরে আসে। এ কথাটাই আমি বলেছিলাম। আমরা এখন ৫০ দিয়ে ভাগ করার ব্যাপারটা জানি। সেটা জানলে ৫ দিয়ে গুণ করাটাও চিন্তা করতে পারি। একই রকম! তখন আমাদের ১০ দিয়ে গুণ করে ২ দিয়ে  ভাগ করতে হবে। এই যে ৫ দিয়ে গুণ করার ব্যাপারটা বললাম, এটা খুব সহজ নিয়ম, সব শর্টকাট হিসাবের বইয়ের ভেতরেই পাওয়া যায় নিয়মটা।

আমি কিন্তু কোনো বই পড়ে এটা শিখিনি! আমি কোত্থেকে শিখেছিলাম? আমি আসলে এটা শিখেছি একজন  রিকশাওয়ালার কাছ থেকে। এখানে তার প্রতি সশ্রদ্ধ কৃতজ্ঞতা স্বীকার করছি। আমার দেশের বাড়ি কুষ্টিয়াতে। সেখানে একদিন দেখি এক রিকশাওয়ালা টাকা গুনছে বেশ বুদ্ধি করে। দেখলাম তার কাছে ১৪ টা ৫ টাকার নোট আছে। সে কিন্তু জানে না ‘পাঁচ চৌদ্দং সত্তুর’ (৫×১৪ = ৭০)। আমি দেখলাম, সে পাঁচ টাকার নোটগুলো জোড়া বানিয়ে বানিয়ে গুনছে! কতগুলো জোড়া হলো তার কাছে? ১৪টা নোট থেকে ৭টা জোড়া হলো। এবার সে ভাবছে, ৫ টাকার নোটের একটা জোড়ায় তো হয় ১০ টাকা। তাহলে ৭টা জোড়ায় হলো ১০×৭ = ৭০ টাকা। কী সহজে গুণে ফেলল ৭০ টাকা! তাহলে তার বুদ্ধিটা কী? জোড়া করো তারপর ১০ দিয়ে গুণ দাও! আমার মাথায় এলো আরে এটাতো খুব দারুণ একটা আইডিয়া!

আমাকে যদি কেউ বলে যে ২৪৪-কে ৫ দিয়ে গুণ কর, তখন আমি দেখবো যে ২৪৪-কে কতগুলো জোড়া করা যায়। ২৪৪ ভাগ ২ টা, মানে ১২২টা। এটাকে ১০ দিয়ে গুণ দিলেই হবে! ১২২-কে ১০ দিয়ে গুণ করলে পাবো (১২২×১০ = ১২২০) শেষে শুধুমাত্র একটা শূন্য বসবে। এখন আমি মুখে মুখে ৫ দিয়ে গুণ করতে পারি। ২৪৪×৫, হ্যাঁ, এটা ১২২০ হয়। সংখ্যাটা আরো বড় হলেও কোনো অসুবিধা নাই! যেমন ৮৬৪৮×৫ = কত? তাহলে ৮৬৪৮-কে আমরা অর্ধেক করে নেব। যেমন ৮৬৪৮-কে অর্ধেক করলে পাবো ৪৩২৪। এবার ৪৩২৪ এর শেষে একটা ০ বসিয়ে দেব, তাহলেই গুণফলটা বের হয়ে যাবে। পাবো ৪৩২৪০। [চিন্তার কথা: বিজোড় হলে কী করা যায় ভাবুন তো!]

এ অধ্যায় শেষ করব আমার কিছু কথা দিয়ে। এই যে আমি গণিতের নানান কথা বলছি— এসব  আমার কাছে গণিতের জগতে ভ্রমণ করার মতো মনে হয়। আমার মনে হয় আমি যেন ঘুরে বেড়াচ্ছি। এখন আপনারা চিন্তা করুন, আমি আপনাদেরকে একটা ভ্রমণকাহিনী শোনাচ্ছি। আমি বলছি, আমি অমুক অমুক জায়গায় গিয়েছিলাম। সেই জায়গাগুলোর বর্ণনা আপনাদের দিচ্ছি। বর্ণনা শুনে হয়তো আপনারা খুশি হচ্ছেন।

কিন্তু ভেবে দেখুন তো যে মানুষটা ভ্রমণকাহিনী শোনে আর যে নিজে ভ্রমণ করে তাদের মধ্যে কে বেশি আনন্দ পায়? নিঃসন্দেহে যে ভ্রমণ করে সে-ই বেশি আনন্দ পায়। তার আনন্দ অনেক বেশি। গণিত নিয়ে ছোটবেলায় যখন এই চিন্তাগুলো করতাম, সে সময় যে আনন্দটা পেতাম, তার সাথে আসলে পৃথিবীর কোনো কিছুরই তুলনা হয় না আমার কাছে।

আসলে নিজে ভ্রমণ করলে যে আনন্দটা পাওয়া যায় সেটার আনন্দ অনেক অনেক গুণ বেশি, ভ্রমণকাহিনী শোনার থেকে বেশি তো বটেই। আরেকটা ব্যাপার হলো, যেখানে যেতে চান, সেই গন্তব্যের থেকে যাওয়ার রাস্তাটাই অনেকক্ষেত্রে আরো অনেক বেশি সুন্দর হয়। এখানে যখন আমি আপনাদেরকে গল্প শোনাচ্ছি, রাস্তাগুলোর কথা কিন্তু বলছি না। আমি শুধু ভ্রমণের কিছু বর্ণনা দিচ্ছি। আসলে রাস্তাটাও অনেক সুন্দর। এই জন্য আমি আপনাদেরকে অনুপ্রাণিত করতে চাই— আপনারা নিজেই ভ্রমণ করুন। নিজে অনুভব করার চেষ্টা করুন। এটা অনেক জরুরি। শুধু আমার কাছ থেকে কিছু শিখলেন, আর এটুকুতেই শেষ হয়ে গেল, এটা যেন কখনো না হয়! আপনারা ভ্রমণ করুন গণিতের দুনিয়ায়। আপনাদের ভ্রমণ শুভ হোক।

চমক হাসানকে ফলো করতে পারো ফেসবুক পেইজেও!


১০ মিনিট স্কুলের লাইভ এডমিশন কোচিং ক্লাসগুলো অনুসরণ করতে সরাসরি চলে যেতে পারো এই লিঙ্কে: www.10minuteschool.com/admissions/live/

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: [email protected]

Author

Chamok Hasan

চমক হাসান একজন অনলাইন শিক্ষক।পিএইচডি করেছেন তড়িৎকৌশলে, কাজ করছেন গবেষণা ও উন্নয়ন প্রকৌশলী হিসেবে। ভালোবাসেন গণিত।অবসরে গণিতের উপর ভিডিও তৈরি করেন, বই লেখেন- গণিতের আনন্দ মানুষের কাছে ছড়িয়ে দিতে।
Chamok Hasan
এই লেখকের অন্যান্য লেখাগুলো পড়তে এখানে ক্লিক করুন
What are you thinking?