পর্ব ৩- হায়রে শূন্য!

এই লেখাটি “আদর্শ” থেকে প্রকাশিত এবং চমক হাসান রচিত গ্রন্থ গণিতের রঙ্গে হাসিখুশি গণিত বই থেকে নেয়া হয়েছে।

হায়রে শূন্য!

পৃথিবীর যেকোন সংখ্যাকে যেকোন সংখ্যা দিয়ে ভাগ করা যায়— শুধুমাত্র শূন্য দিয়ে কাউকে ভাগ করা যায় না। কেন? কী অন্যায় করেছিল এই শূন্য? এই তো সেই শূন্য, যেটিকে প্রথম ব্যবহার করেছিল সেই ব্যাবিলনের মানুষ— আজ থেকে প্রায় ২৭০০ বছর আগে। কিন্তু ওরা শূন্যকে সংখ্যার মর্যাদা দিতে জানেনি। (ব্যাবিলন কোথায়? ব্যাবিলন হচ্ছে বর্তমান ইরাকে, ঐ যে কারবালা প্রান্তরের নাম শুনেছেন না, সেখান থেকে ২৫ মাইল দূরে আর সাদ্দামের বাগদাদ থেকে মাত্র   ৫৫ মাইল দূরে)। যাহোক, ওরাতো সংখ্যার মর্যাদা দিতে পারেনি— শূন্যকে যারা সংখ্যা মর্যাদা দিয়ে তিলে তিলে বড় করে তুলেছিলেন তারা হচ্ছেন আমাদের এই উপমহাদেশের গণিতবিদগণ।

প্রথমে এই সংখ্যা নিয়ে যিনি কাজ করেছেন বলে জানা যায় তিনি হলেন ‘আর্যভট্ট’। আর্যভট্টের একটি বই হচ্ছে ‘আর্যভট্টম’। এখানে বলে রাখি, সেই সময়কার গণিতবিদগণ তাদের সমস্ত গণিতকে এখনকার মতো প্রতীকী (symbolic) কায়দায় লিখে রাখতেন না। তারা লিখে রাখতেন কাব্যে কাব্যে, ছন্দে ছন্দে, আর পদে পদে। আর সেই আর্যভট্টের বইটির ৪টি ভাগ ছিল। গীতিকাপদ, গণিতপদ, কালক্রিয়াপদ ও গোলপদ।

মহান আর্যভট্ট ছন্দে ছন্দে লিখেছিলেন ‘স্থানম স্থানম দশ গুণম’। এর মানে হচ্ছে স্থানে স্থানে দশ ঘর করে গুণ হয়। আমরা এখন যে একক, দশক, শতক, সহস্র এগুলো করি অর্থাৎ প্রত্যেক জায়গায় দশ দশ করে গুণ হয়ে যায়, আসলে তিনি সেই কথাই বলতে চেয়েছিলেন। আর এর মাঝখানে নিঃসন্দেহে লুকিয়ে ছিল শূন্য (০)। কিন্তু হ্যাঁ! এখানেও শূন্য ‘লুকিয়ে’ই ছিল। প্রথমবারের মতো আমাদের সামনে ০-কে যিনি সংখ্যা হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি হলেন ‘ব্রহ্মগুপ্ত’। ব্রহ্মগুপ্তের একটা বিখ্যাত বই ছিল ‘ব্রহ্মাষ্ফূটসিদ্ধান্ত’। এটা ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়েছিল।

সেই ব্রহ্মাষ্ফূটসিদ্ধান্ত বইটির মধ্যে প্রথমবারের মতো শূন্যকে সংখ্যার মর্যাদা দিয়ে দেখানো হয়। শূন্য (০) দিয়ে কোনো সংখ্যাকে গুণ, যোগ ও বিয়োগ করলে কী হয় সেই কথাগুলো সেখানে খুব সুন্দর করে বলে দেওয়া আছে এবং ঠিকভাবে বলে দেওয়া আছে (ভাগ করলে কী হয়, সেটাও বলা ছিল, তবে ওটা ভুল ছিল)। এরপরে যারা শূন্য নিয়ে কাজ করেছেন তার মধ্যে ছিলেন মহাবীর এবং ভাস্কর। কিন্তু এদের মধ্যে কেউই কোনো সংখ্যাকে শূন্য দিয়ে ভাগ করলে কী হয় সেই ব্যাপারে নিশ্চিত করে, ঠিক করে কিছু বলে যেতে পারেননি।

হায়রে শূন্য ! যুগে যুগে কত মানুষই-না এই শূন্য নিয়ে গবেষণা করে গেল। সেই ব্যাবিলনের মানুষ থেকে শুরু করে ‘ব্রহ্মগুপ্ত’।  ‘‘ব্রহ্মগুপ্ত’’ থেকে শুরু করে আজকের আইয়ুব বাচ্চু পর্যন্ত কতবার শূন্য নিয়ে ভেবেছেন। কে?? কেন শোনেননি, আইয়ুব বাচ্চু তার ‘সেই তুমি’ গানটার ভিতরে গেয়েছেন, শূন্যতায় ডুবে গেছি আমি, আমাকে তুমি ফিরিয়ে নাও’! হ্যাঁ ! আজকে আমিও এই শূন্যতার মাঝে হারিয়ে গেছি। নিয়ে যাব আপনাদেরকেও!

শূন্য দিয়ে একটা সংখ্যাকে ভাগ করলে কী হয় সেটা বোঝার আগে দেখে নেই শূন্য দিয়ে ভাগের ঝামেলাটা কোথায়। মনে করি, y = x (চিত্র ৩.১)। ধরে নিলাম আর কী! তাহলে আমি বলতে পারি xy = x**2। উভয়পক্ষে x গুণ করে। দুপাশ থেকে y2 বাদ দিলে লেখা যায় xy-y**2 = x**2-y**2। এবার বামপক্ষ থেকে y কমন নেয়া যাক। তাহলে থাকবে y(x-y), আর ডান পাশ থেকে ছেলেবেলার x**2-y**2-এর সূত্র থেকে পাবো (x+y)(x- y)। এখন দেখি দুই পাশেই আছে (x-y)। এই (x-y) এবং (x-y) মুকাবালা। থাকলো y = (x+y)। আমরা তো আগেই ধরে রেখেছিলাম x = y পরস্পর সমান। তাহলে এখন y এর জায়গায় x লিখতে পারি। পাচ্ছি x = x+x। অথবা x = 2x

উভয়পক্ষ থেকে আবারো x, x মুকাবালা। থাকলো ১=২। আমরা প্রমাণ করে ফেলেছি ১ এবং ২ পরস্পর সমান। ব্যাপারটাকে আরো মজাদার করার জন্য উভয়পক্ষে আরো ৫১ করে যোগ করি। তাহলে আমরা পেয়ে যাব ১+৫২ = ২+৫১ বা ৫২ =৫৩।

বাংলায় একটা প্রবাদ পড়েছি যে, ‘যাহাই বাহান্ন তাহাই তেপান্ন।’ এই নিন, গাণিতিকভাবে প্রমাণিত! আমরা প্রমাণ করে ফেলেছি যে বাহান্ন এবং তেপান্ন পরস্পর সমান। অর্থাৎ কারো কাছ থেকে ৫৩ টাকা ধার নিয়ে ৫২ টাকা ফেরত দেব!! কথা হচ্ছে, বিচারটা কি ঠিক হলো? হলো না। তার মানে এখানে ভুল হয়েছে।

কোথায় ভুলটা হয়েছে? চতুর্থ লাইনে আমরা যখন মুকাবালা করেছিলাম (x-y) এবং (x-y), আসলে ঝামেলাটা তখনই হয়েছে। মনে আছে, আমরা ধরে নিয়েছিলাম x = y? তাহলে, y কে বামপাশে নিয়ে গেলে পাবো x-y = 0, তার মানে x-y এর মান কিন্তু শূন্য। অথচ আমরা দুই পাশে (x-y) কে কাটাকাটি করছি। আমরা আসলে শূন্য দিয়ে ভাগ করছি। এখানেই ঘটেছে দুর্ঘটনা! শূন্য দিয়ে ভাগ করলে এই ধরনের উদ্ভট সমস্যা হতেই পারে।

ব্যাপারটাকে আরো সহজ করে দেখানো যায়। শূন্য আর শূন্যকে যদি আমরা পরস্পর সমান ধরি— (ধরার কী আছে,

আমরা তো জানিই যে শূন্য আর শূন্য সমান) তবে এখন একপাশে ০ সমান লিখলাম ১–০ আর অন্য পাশে ০ সমান ১০০–০ (চিত্র ৩.২)। লেখাই যায়। এখন তাহলে উভয়পাশকে ০ দিয়ে ভাগ করি। ০, ০ মুকাবালা। পেলাম ১ সমান সমান ১০০। এটা কি ঠিক হবে? হবে না। তার মানে, আসলে আমি ০ দিয়ে ভাগ করতে পারছি না।

এখন বোঝানো যাক যে, ০ দিয়ে ভাগ করলে আসলে সমস্যাটা কী হয়। প্রথমে বলি, ভাগের সংজ্ঞা দেয়া হয় গুণ দিয়ে। সংজ্ঞাটা এমন: a÷b=a×b-1a কে b দিয়ে ভাগ দেয়া মানে হলো a কে b এর উল্টা (গুণাত্মক বিপরীত বা multiplicative inverse) মানে b-1 দিয়ে গুণ দেয়া। b এর গুণাত্মক বিপরীত হলো সেই সংখ্যা যার সাথে b কে গুণ দিলে ১ পাওয়া যাবে।

তার মানে ০ দিয়ে ভাগ করা মানে ০-১ দিয়ে গুণ করা। আমরা যদি বের করতে পারি ০ এর উল্টা বা কত হয়, তাহলেই খেল খতম! এটা বের করার জন্যে আমরা একটা ফাংশন নিয়ে ভাবব।

ফাংশন হলো একটা মেশিনের মতো, কিছু একটা দিলে, কিছু একটা পাওয়া যাবে। যেটা দেয়া হবে সেটা ইনপুট (input), যা পাওয়া যাবে তাকে বলে আউটপুট (output)। ধরা যাক আমাদের কাছে একটা ফাংশন আছে, যেটা দেখতে এমন (x)= । এই মেশিনটার কাজ হচ্ছে, ও যাকে পায় তাকে ধরে উল্টে দেয়। মানে কী? ২ দিলে । ৩  দিলে , ৪ দিলে

এরকম যাকে পায় তাকে ধরে উল্টে দেয়। এমন করে দিলে আমরা পাবো ২। এখন আমি এই মেশিনের মধ্যে ০ দিয়ে দেখতে চাই যে কত আসে। ০ ইনপুট দিলে মেশিন আমাদের যা আউটপুট দেবে সেটাই । এটা দেখার জন্য একটা কাজ করা যাক। আমরা দুইটা সংখ্যারেখা চিন্তা করি (চিত্র ৩.৩)। সংখ্যারেখা দু’টো কেন? কারণ একটাতে আমরা ইনপুট দিবো আর অন্যটিতে আউটপুট দেখতে পাবো। আমরা উপরেরটায় দেখবো ‘কী দিলাম’ আর নিচেরটায় দেখবো ‘কী পেলাম।’

এবার দেখা যাক, সংখ্যারেখার মধ্যে কী আছে। সংখ্যারেখার মধ্যে আছে ০, এরপর ১, ২, ৩, ৪। এরকম করতে করতে একেবারে শেষ মাথায় কী আছে চিন্তা করুন। সংখ্যার তো আর কোনো শেষ নেই, এর কোনো সীমা নেই। শেষ মাথায় আছে আসলে অসীম। কোন অসীম? অসীম আবার দুইদিকেই আছে: একদিকে ধনাত্মক অসীম (+ ∞), আর অন্যদিকে হচ্ছে ঋণাত্মক অসীম (− ∞)।

০ থেকে ডানদিকে ধনাত্মক দিকে যেতে থাকলে শেষ মাথায় আছে ধনাত্মক অসীম আর উল্টোদিকে শেষ মাথায় আছে ঋণাত্মক অসীম। ঠিক একই জিনিস নিচেরটাতেও। এবার আমরা এক কাজ করি। আমরা ঐ উল্টো-মেশিনের মধ্যে ৪ দেই। কত পাবো? =০.২৫। এবার আমি দিলাম ৩, তাহলে কত পাবো? =০.৩৩। এরপর দিলাম ২, পাবো কত? = ০.৫০।

আমার আসলে ধান্ধাটা কি জানেন? আমি চাচ্ছি, ৪, ৩, ২ এমন করে কমতে কমতে ০-তে যাব। আমি দেখতে চাই আউটপুটটা কোথায় যায়। হ্যাঁ, ০-তে কত হয় আসলে আমি সেটাই দেখতে চাই। খেয়াল করুন, আমার ইনপুট ৪, ৩, ২ এমন করে যতই বামে শূন্যের দিকে আগাচ্ছে বা কমে যাচ্ছে, আমার আউটপুট কিন্তু  ততই বিপরীত দিকে মানে ডানদিকে সরে যাচ্ছে বা বেড়ে যাচ্ছে। ৪ > ৩ > ২ কিন্তু < <। আবার শুরু করি। আমি দিলাম ১, পেলাম = ১।

এখন আমি বামদিকে আগালাম, আউটপুট সরে গেল ডানদিকে। আমি দিলাম ( ) পাওয়া গেল ২। আমি দিলাম ( ) পাওয়া গেল ৩। আমি দিলাম , পাওয়া গেল ১০। আমি দিলাম , পাওয়া গেল ১০০, আমি দিলাম , পাওয়া গেল ১০০০০০০০। দেখছেন আমি যতই বামদিকে ০’র কাছাকাছি আসছি, ও ততই দ্রুত ঐ ডানদিকে সরে যাচ্ছে। এমন করতে করতে করতে করতে আমি ঠিক যখন ০-তে পৌঁছাবো, ও তখন ওদিকে ডানে সরতে সরতে সরতে সরতে এই রাস্তার শেষ মাথায় পৌঁছাবে, আর এই রাস্তার শেষ মাথায় আছে ধনাত্মক অসীম। অর্থাৎ আমি যখন ০ তে পৌঁছাবো তখন এই মেশিন আমাকে দেবে ধনাত্মক অসীম। সুতরাং আমি এই মেশিন থেকে চিন্তা করে বুঝে গেলাম মানে হচ্ছে + অসীম। এই পর্যন্ত হলে কোনো অসুবিধা ছিল না।

এখন সমস্যা হচ্ছে একজন গণিতবিদ যদি বলেন, কেন তুমি শুধুমাত্র এইপাশ থেকে ৪, ৩, ২ করে ০-এর দিকে আগালে? কেন তুমি অন্যদিক থেকে ৪,-৩,-২ করে আগালে না? এটা বললেই আমি বিপদে পড়ে যাব! আচ্ছা ঠিক আছে। এবার ঐদিক থেকে আগানো যাক। -৪ দিলাম। -৪ দিলে পাওয়া যাবে । মাইনাস -৩ দিলে। মাইনাস -২ দিলে । এবার খেয়াল করে দেখুন, আমি যতই ডানে ০’র দিকে আগাচ্ছি আমার আউটপুট কিন্তু ততই বামদিকে সরে যাচ্ছে।

এমন করতে করতে আমি যখন ০ তে গিয়ে পৌঁছাবো, আউটপুট সাহেব তখন বামদিকে সরতে সরতে এই রাস্তার শেষ মাথায় পৌঁছাবেন, যেখানে আছে ঋণাত্মক অসীম। তাহলে আমরা পেয়ে গেলাম -এর মান হচ্ছে ঋণাত্মক অসীম।

ঝামেলা হয়ে গেল না? একটু আগে পেলাম ধনাত্মক অসীম, এখন আবার পেলাম ঋণাত্মক অসীম। তাহলে -এর আসল মান কত? ধরুন একজন প্রশ্ন করছে, ভাই -টা কোনো দিকে? আপনি একসাথে দুদিকেই হাত মেলে দেখালেন ও—-ও-ই দিকে।

এটা তো হলো না। আপনি এক -কে কয় দিকে দেখাবেন? -কে বলা হয় ‘অসংজ্ঞায়িত’। কেন? একটা ফাংশনকে কিংবা অপারেশনকে সুসংজ্ঞায়িত তখনই বলা হয় যখন সেটা নিয়ে কোনো ধরনের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব না থাকে। বাস্তব সংখ্যার গুণাবলি বলে যে দুটো সংখ্যা গুণ বা ভাগ করলে একটাই উত্তর পাওয়া যাবে! কিন্তু আমরা এখানে দেখতে পাচ্ছি -এর দুই রকম মান পাওয়া যাচ্ছে— ধনাত্মক অসীম এবং  ঋণাত্মক অসীম। সোজা কথায় আমি বলি, -এর কোনো মান নেই! তাহলে আমাদের যদি কেউ প্রশ্ন করে সমান কত? আমরা বলব— এটা আমরা বলতে পারি না!!!। ০ দিয়ে ভাগ করলে কী হয় সেটা ভাগের সংজ্ঞায় নেই। এটা অসংজ্ঞায়িত।

তবে হ্যাঁ, এই যে ধনাত্মক এবং ঋণাত্মক অসীম এরা হচ্ছে শূন্য দিয়ে ভাগের দুইটা সীমান্তিক মান (Limiting Value)। গণিতের একটা আলাদা বিষয়ই আছে লিমিট বা সীমা। সেখানে এই বিষয়গুলো ব্যবহার করা হয়। লিমিটের মজা হচ্ছে, ঠিক ০-তে পৌঁছালে কী হবে, সেটা নিয়ে লিমিট কাজ করে না। ০ এর ‘কাছে’ যেতে থাকলে, ফাংশন কোন দিকে যাবে সেটার কথা বলে লিমিট। যেমন আমি যদি ধনাত্মক দিক থেকে কমতে কমতে ০ এর ‘কাছে’ যেতে থাকি, তাহলে ধনাত্মক অসীমের ‘দিকে’ যাবে। আর যদি ঋণাত্মক দিক থেকে বাড়তে বাড়তে আমি ০ এর কাছে আসি, আমি ঋণাত্মক অসীমের ‘দিকে’ যাবে। আমি কিন্তু বলছি না, ঠিক ০-তে এর মান কত হবে। ০-তে কত হবে,

সেটা কেউ বলতে পারে না। আমি আবারো বলছি, এটা আসলে ‘অসংজ্ঞায়িত’, এর কোনো মান নেই। একইভাবে , এমন সবাই ‘অসংজ্ঞায়িত’।

একটা ক্ষেত্রে শুধু একটু বিশেষ ব্যাপার আছে। সেটা হচ্ছে ০/০। এটাও অসংজ্ঞায়িত, তবে একটু স্কেশাল। এই ব্যাপারটা আরো মজার। একদল লোক বলবে কেন? উপরে ০ থাকলে আমরা জানি যে  সবসময় ০ হয়। =০, = ০, = ০ তাহলে = হবে ০। আরেকদল বলল না, আপনি একটু আগে শিখিয়েছেন নিচে ০ থাকলে অসংজ্ঞায়িত হয়, আর সীমান্তিক মান (Limiting Value) থাকে দুইটা— ধনাত্মক আর ঋণাত্মক অসীম। তাহলে এটাও হবে অসংজ্ঞায়িত আর ধনাত্মক ঋণাত্মক অসীম হবে সীমান্তিক মান।

আরেকদল বলল, না, ভাগের ব্যাপারটাকে এভাবে চিন্তা করুন— ১৫-কে ৩ দিয়ে ভাগ করার মানে হচ্ছে ৩ এর সাথে কত গুণ করলে ১৫ হবে। কত গুণ করলে? ৫ গুণ করলে। তার মানে = ৫। ১৬-কে ২ দিয়ে ভাগ করার মানে হচ্ছে ২ এর সাথে কত গুণ করলে ১৬ হয়। কত গুণ করলে ১৬ হয়? ৮ গুণ করলে। তার মানে = ৮। তাহলে এর মানে হচ্ছে ০ এর সাথে কত গুণ করলে ০ হবে। ০ এর সাথে কত গুণ করলে ০ হয়? ১ গুণ করলেও ০ হয়, ২ গুণ করলেও হয়, ৩ গুণ করলেও ০ হয়। তার মানে হচ্ছে এটার মান ২, ৩, ৪, ৫ সবই হতে পারে।

আরেকজন বলল অতকিছু আমি বুঝি না, উপরে ০ নিচে ০। ০, ০ মোকাবেলা (কাটাকাটি)। তাহলে -এর মান  আসলে কত?  তারা তখন দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করলেন আমরা আমরা নির্ণয় করতে পারি না। কবি আব্দুল হাকিমের ভাষায় বলতে হয়— ‘নির্ণয় ন’ জানি’। তারা এটার নাম দিলেন ‘অনির্ণেয়’। Analysis বা বিশ্লেষণী গণিতে -কে বলা হয় ‘অনির্ণেয় আকৃতি’ (indeterminate form)। তাহলে  কি ‘অসংজ্ঞায়িত’? উত্তর হচ্ছে, অবশ্যই ‘অসংজ্ঞায়িত’। কেন হবে না, কারণ এটাতো বিভ্রান্তি তৈরি করছে আমাদের ভেতর। যারা এমন বিভ্রান্তি তৈরি করে তারা সবাই ‘অসংজ্ঞায়িত’। তাহলে কি ‘অসংজ্ঞায়িত’ আবার ‘অনির্ণেয়’ও? অবশ্যই।

আসলে যত রকম অনির্ণেয় আকার আছে তারা প্রত্যেকেই অসংজ্ঞায়িত। অসংজ্ঞায়িত আকারগুলোর মধ্যে একটা বিশেষ ক্ষেত্র হচ্ছে ‘অনির্ণেয়’। এরকম করে বলা যেতে পারে— সকল অনির্ণেয় আকারই অসংজ্ঞায়িত কিন্তু সকল অসংজ্ঞায়িত আকারই অনির্ণেয় নয়।

এ আলোচনাটি শেষ করব আমার নিজের কিছু কথা দিয়ে। এই যে শূন্য, প্রথম সংখ্যা হিসেবে এটার ব্যবহার শুরু হয়েছিল আমাদের এই উপমহাদেশে। সংখ্যা নিয়ে আমাদের এ উপমহাদেশে যে পরিমাণ কাজ হয়েছে সেটা আসলেই বিশাল, অনেক অনেক বড়। আমাদের এখানে এই ‘স্থানীয় মান’ পদ্ধতি নিয়ে কাজ হয়েছে। এই যে আমরা এখন একক, দশক, শতক এই বিষয়গুলো আমরা বলি, সারা পৃথিবীতে এই পদ্ধতিটাই ব্যবহূত হয়। অথচ আমরা আজকে আসলে গণিতে অনেক বেশি পিছিয়ে গেছি। কিন্তু আমরা চাইলেই পারি— এই উপমহাদেশেই জন্ম নিয়েছিলেন ‘শ্রীনিবাস রামানুজন’-এর মতো গণিতবিদ।

আমরা চাইলেই আবারো আমাদের সেই হারানো ঐতিহ্যকে ফিরে পেতে পারি। আমার এই আলোচনায় যদি একজন মানুষও গণিতে অনুপ্রাণিত হয় সেটা হবে আমার অনেক বড় পাওয়া। গণিতের প্রেমময় শুভেচ্ছা।

চমক হাসানকে ফলো করতে পারো ফেসবুক পেইজেও!


১০ মিনিট স্কুলের লাইভ এডমিশন কোচিং ক্লাসগুলো অনুসরণ করতে সরাসরি চলে যেতে পারো এই লিঙ্কে: www.10minuteschool.com/admissions/live/

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: write@10minuteschool.com

 

Author

Chamok Hasan

চমক হাসান একজন অনলাইন শিক্ষক।পিএইচডি করেছেন তড়িৎকৌশলে, কাজ করছেন গবেষণা ও উন্নয়ন প্রকৌশলী হিসেবে। ভালোবাসেন গণিত।অবসরে গণিতের উপর ভিডিও তৈরি করেন, বই লেখেন- গণিতের আনন্দ মানুষের কাছে ছড়িয়ে দিতে।
Chamok Hasan
এই লেখকের অন্যান্য লেখাগুলো পড়তে এখানে ক্লিক করুন
What are you thinking?