ক্রপ সার্কেল : এলিয়েনদের জ্যামিতিক ক্লাস

পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবার শুনে নাও।
আমাদের স্কুলগুলোতে গণিত ক্লাস হয় চারদেয়ালের কোন কক্ষে। সেই সব কক্ষে বসে তুমি পিথাগোরাসের উপপাদ্য পড়লেও পিথাগোরাস কিন্তু মোটেও এরকম ঘরবদ্ধ শিক্ষার পক্ষে ছিলেন না। বিখ্যাত গণিতবিদ পিথাগোরাস বলেছিলেন সংখ্যা বা জ্যামিতির জ্ঞান কখনো ঘরের মধ্যে হয়না। সারা পৃথিবীতে থাকা সবকিছুই হলো সংখ্যা বা জ্যামিতির একেকটা প্যাটার্ন। পিথাগোরাসের মজার উক্তির মধ্যে একটা হলো “পৃথিবীর সব কিছুই একেকটা সংখ্যা। আমরা মানুষেরাও আসলে সংখ্যাই।”  তাই পুরো পৃথিবীই যেন জ্যামিতির এক ক্লাসরুম। পিথাগোরাসের কথা আমরা মানুষেরা না মানলেও ভিনগ্রহের বুদ্ধিমান এলিয়েনরা কিন্তু ঠিকই মেনে নিলো। এরকম ধারণাই রয়েছে অনেক বিজ্ঞানীর মাঝে।  তারা নাকি জ্যামিতির ক্লাস করতে মাঝেমধ্যেই দিব্যি নেমে আসে পৃথিবীর শস্যক্ষেতে। আর জ্যামিতির ব্যবহারিক ক্লাসে তৈরী করে বসে অসাধারণ সব জিনিস। ক্লাস শেষ হয়ে গেলেও তাদের তৈরী সেসব জ্যামিতিক আকৃতির কিন্তু কিছুই মুছে যায়না। আর এসব জ্যামিতিক প্যাটার্নের নামই দেয়া হয়েছে ক্রপ সার্কেল।
 
আমার মত গণিতের ভয় হয়তো তোমার মাঝেও আছে। তাই তুমি ভাবতে পারো এটা মনে হয় গণিতের কোন বিদঘুটে সমীকরণ অথবা অগোছালো ভাবে জ্যামিতির অসংখ্য বৃত্তচাপ। কিন্তু বিষয়টা কিন্তু তা নয়; বরং খুব ইন্টারেস্টিং!
 
ঈদ অথবা অন্যান্য ভ্যাকেশনে নিজেকে রিফ্রেশ করতে নিশ্চয়ই গ্রামে একটা ট্যুর দিয়ে আসা তোমার কাছে স্বাভাবিক ব্যাপার। গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য তুমি ঘুরে বেড়াও দৃষ্টি সমান বড় শস্যখেতে। কিন্তু হঠাৎ একদিন তুমি লক্ষ্য করলে খেতের মাঝে বিশাল সাইজের জ্যামিতিক কিছু জটিল প্যাটার্ন নিপুণ হাতে তৈরি করে রেখেছে। যদিও গতকাল তোমার চোখে এমন কিছুই পড়েনি। এক দিনে কিভাবে এত জটিল নকশা করা সম্ভব!
গ্রাফিক্স ডিজাইনিং, পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশান ইত্যাদি স্কিল ডেভেলপমেন্টের জন্য 10 Minute School Skill Development Lab নামে ১০ মিনিট স্কুলের রয়েছে একটি ফেইসবুক গ্রুপ।
এসব শুনে তুমি হয়তো ভাবছো, এটা আবার হয় নাকি? কিন্তু কোন সকালে শস্যক্ষেতে হাঁটতে গিয়ে তুমি যদি এরকম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হও তবে কিন্তু অবাক হবার কিছু নেই। কারণ আজ থেকে প্রায় চার শতাধিক বছর আগেই এরকম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে পৃথিবীর নানা প্রান্তের অসংখ্য মানুষ।
 
ব্যাপারটা কি এখনো বেশ ঘোলাটে লাগছে? চলো জেনে নেয়া যাক ক্রপ সার্কেলের জীবন বৃত্তান্ত।
 

ক্রপ সার্কেল কী?

ব্রিটিশ একটি পত্রিকা ‘মোয়িং ডেভিল’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সময়টা তখন ১৬৭৮।  সেখানে দেখা যায় শস্য কেটে এক ধরণের নকশা তৈরি করার ছবি। যদিও বেশিরভাগ মানুষ এটাকে আসল ক্রপ সার্কেল বলে মানতে নারাজ। সেই প্রতিবেদনে একটি যবক্ষেতে খুব সাবধানভাবে বৃত্ত আকৃতি তৈরি করতে দেখা যায়। বেশীরভাগ মানুষ এটিকে মানব তৈরি বলে উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করে। তবে কিছু বুদ্ধিমান মানুষ এটিতে রহস্যের কিছু দেখতে পেয়েছিলেন। পৃথিবীর মানুষের কাছে এই বিষয়টার প্রমাণ হতে অপেক্ষা করতে হয়েছিলো পাক্কা আরো দুইশো বছর।
 
আশির দশকে হঠাৎ এই বিষয়টা আবার পৃথিবী জুড়ে আলোচনায় আসে। তখন তো আর ইন্টারনেটভিত্তিক সোশ্যাল মিডিয়া ছিলোনা যে চাইলেই কেউ কোন অপ্রয়োজনীয় ইস্যু বা কোন গুজব ভাইরাল করে সবার মাঝে ছড়িয়ে দেবে। সুতরাং তখন যে কোন কিছু আলোচনায় আসা মানে তার অকাট্য প্রমাণ হাতে থাকা। হ্যাঁ, তেমনটাই হয়েছিলো। আশির দশকের শেষের দিকে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকে খবর আসতে শুরু করে যে, তারা একাধিক শস্যক্ষেতে আপনাআপনিই বিভিন্ন নকশা তৈরি হতে দেখেছেন। তখনও কিছু মানুষ রহস্য শব্দটাকে তেমন মূল্য না দিয়ে বিষয়টাকে এড়িয়ে যাওয়া শুরু করে। কিন্তু এই ব্যাপারটা সবার মাঝে একদম সিরিয়াস পর্যায়ে এসেছিলো আধুনিক যুগে উনিশ শতকের প্রায় শুরুর দিকে।
 
আধুনিক যুগে সর্বপ্রথম ১৯৩২ সালে ইংল্যান্ডের ক্রপ সার্কেল দেখতে পাওয়া যায়। এসব অদ্ভুত নকশার সাথে এন্ড্রু কলিন নামের কোন এক ভদ্রলোক ক্রপ সার্কেল নামটার সাথে প্রথম পরিচয় করিয়ে দেন।
ক্রপ সার্কেল মূলত শস্যক্ষেতে বানানো জ্যামিতিক বিভিন্ন প্যাটার্ন। প্রথমদিকে শস্য দিয়ে বৃত্তের মাধ্যমে বিভিন্ন সাধারণ নকশা দেখা যেতো। এজন্য এর নামকরণ করা হয় ‘ক্রপ সার্কেল’। কিন্তু দিন যেতে যেতেই যেন এসব নকশার অদৃশ্য তৈরিকারকদের কাজে আমূল উন্নতি হতে থাকে। বৃত্তের গন্ডি থেকে বেরিয়ে নকশার পরিবর্তন আসতে শুরু করে। যা ধীরে ধীরে সরল থেকে অধিক জটিল হয়ে উঠে। এগুলো কোন মানুষের তৈরি নয়। বেশিরভাগ সময়ই ক্ষেত মালিকেরা সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজেদের ক্ষেতে এসব নকশা আবিস্কার করতেন। ক্রপ সার্কেল যারা তৈরি করেন, সেই অজানা তাদেরকে ক্রপ সার্কেল হোক্সার বলে আখ্যায়িত করা হয়।
 

জোচ্চুরি!

এত বড় একটা বিষয় নিয়ে জনগণ যখন হুমড়ি খেয়ে পড়েছে তখন এটা নিয়ে কোন জোচ্চুরি হবে না তা কি হয়! ক্রপ সার্কেল নিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জোচ্চুরিটি করেন ডুগ বাওয়ার এবং ডেভ কেরলি নামের দুজন ইংলিশ কমেডিয়ান। উনিশ শতকের শেষের দিকে ১৯৯১ সালে তারা নিজেরা দুইশো’র বেশি ক্রপ সার্কেল তৈরি করেছেন বলে দাবী করেন। তাদের দাবীমতে ১৯৭৮ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত ইংল্যান্ডে তারা এসব ক্রপ সার্কেলগুলো নিজেরাই বানিয়েছেন। তারা নিজের দাবী প্রমাণের জন্য ক্রপ সার্কেল তৈরিও করে দেখান। কিন্তু তাদের বানানো ক্রপ সার্কেলের সাথে অন্য ক্রপ সার্কেলের বিশাল তফাৎ দেখা যায় গবেষকদের রিপোর্টে। বিশ্বব্যাপী সাধারণ মানুষ এমনকি সমালোচকেরাও আবার নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হন।
 
তিনশো বছর ধরে ক্রপ সার্কেল নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা হলেও এর স্রষ্টা ছিলো একদমই অজানা। তবে ঠিক যেন হঠাৎ করেই এখানে ভিনগ্রহের বুদ্ধিমান কোন প্রাণির হস্তক্ষেপ আছে বলে গুঞ্জন উঠে। গবেষকরাও প্রথম দিক থেকেই দাবী করে আসছিলেন এত নিখুঁত ভাবে কোন নকশা তৈরি করা মানুষের পক্ষে অসম্ভবই বটে!
 
যখন ক্রপ সার্কেল নিয়ে রহস্য ঘনীভূত হচ্ছে ঠিক তখন উড়ে এসে জুড়ে বসা এলিয়েন তত্ত্বই যেন পুরো বিষয়টাকে আরো নাড়িয়ে দেয়। বেশ কিছু জটিল এবং বিস্ময়কর কারণে অনেকে ভাবতে বাধ্য হয় যে এটি মূলত বুদ্ধিমান এলিয়েনদেরই কাজ। যদি তুমি আমি যদি সেটি বিশ্বাস নাও করি, তবুও এসব কারণে প্রমাণিত হয়ে যায় যে ক্রপ সার্কেল কোন মানুষের তৈরি নয়। অনেকেই ভাবতে থাকেন এগুলো এলিয়েনদের জ্যামিতি ক্লাসের কাজ। বিষয়টা মজার হলেও কিন্তু একেবারেই ফেলে দেয়ার মত কিছু নয়। চলো দেখে আসা যাক এলিয়েনদের জ্যামিতিক ক্লাসের নমুনা।

কীটপতঙ্গের অস্বাভাবিক মৃত্যু :

ক্রপ সার্কেলগুলোর আশেপাশে এমন কিছু ঘটনা ঘটতো যার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যেত যে নিশ্চয়ই পাশেই যবক্ষেতে তৈরি হয়েছে নিপুণ হাতের জটিল কোন নকশা। তার মধ্যে একটি হলো পুরো জায়গা জুড়ে কীটপতঙ্গের কারণহীন মৃত্যু। শুধু পোকামাকড় বা ছোট প্রাণী নয়; বরং দিনেদিনে যেন এর শক্তি বৃদ্ধিও পাচ্ছিলো।
 
গবেষকরা বেশ কয়েকটা ক্রপ সার্কেল নিয়ে গবেষনা করে দেখতে পান যে ক্রপ সার্কেল তৈরি হবার পর পূর্বেই ওখানে থাকা কোন কীটপতঙ্গ আর জীবন্ত থাকেনা। কয়েকবার এটাও ঘটেছে যে, শস্যের গায়ে মাছি যেভাবে বসে থাকে ঠিক সেভাবেই বসে আছে। কিন্তু সে মৃত। জমে বরফ হয়ে গেছে। সবচেয়ে অবাক করা ঘটনাটি ঘটে একবিংশ শতাব্দীতেই। ২০১৩ সালে একটি শস্যক্ষেতে শ’খানেকের বেশি বিশেষ প্রজাতির হরিণ মৃত হিসেবে পাওয়া যায়। মজার ব্যাপার হলো খোঁজ নিতে গিয়ে গবেষকরা ঠিক তার পাশেই একটি বড় ধরণের ক্রপ সার্কেল আবিস্কার করে। অবাক করা বিষয় হচ্ছে চিকিৎসকদের দেয়া রিপোর্টে দেখা যায় মৃত হরিণগুলোর শরীরে কোন রোগ বা ভাইরাসের চিহ্ন পর্যন্ত ছিলোনা। তবে কিভাবে এতগুলো হরিণ একসাথে মারা পড়েছিলো? কারো কাছে কি তার কোন যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা আদৌ আছে?
 

জটিল বিকিরণ :

উপরের অস্বাভাবিক প্রাণী মৃত্যুর ঘটনাটি কিন্তু একভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। তোমরা যারা বিজ্ঞানের ছাত্র তারা বিকিরণ শব্দটার সাথে বেশ ভালোই পরিচিত। উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা হয়তো রসায়নের পরমাণুর বিকিরণ নিয়ে আমার মত বেশ চিন্তিত। তবে একটু মাথা খাটিয়ে আমরা কিন্তু বিকিরণ দিয়ে এই বিষয়টার মোটামুটি একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারি।
 
ধরা যাক যেখানে অস্বাভাবিক ভাবে প্রাণী মৃত্যুর ঘটনাটি ঘটেছে, ঠিক সেখানে যদি এমন কোন বিকরণ ঘটানো যায় যা সেসব প্রাণীদের শরীরে সহ্য করা সম্ভব না তবে কিন্তু ব্যাপারটা ঘটতে পারে। তবে এই ব্যাখ্যাটা কিন্তু মোটেও ফেলনা নয়। কারণ বিজ্ঞানীরা ঠিক এই কথাটারই প্রমাণ পান সেই ১৯৯১ সালেই। পরমাণুর উপর অভিজ্ঞ কজন বিজ্ঞানী মারশাল ডাডলি ও তার দল সেসময় ক্রপ সার্কেলের স্থানে আধুনিক বিকিরণ সনাক্তকরণ যন্ত্র দ্বারা সেখানকার মাটির রেডিয়েশনের পরীক্ষা চালান। এবং তারা অবাক হয়ে লক্ষ্য করেন যে, ক্রপ সার্কেলের মাটির বিকরণের মাত্রাও আশেপাশের স্বাভাবিক মাটির তুলনায় প্রায় তিনগুণ। তাহলে কে সেই যবখেতে এরকম অধিক শক্তির বিকিরণ ঘটিয়েছিলো? প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়।

সমীকরণ ও কোডিং বৃত্তান্ত :

প্রথম থেকেই ‘এলিয়েনেদর জ্যামিতিক ক্লাস’ কথাটা বলেই যাচ্ছি। হয়তো তুমি ভ্রু কুঁচকে তোমার আপত্তির বহি:প্রকাশ ঘটাচ্ছো। কিন্তু ক্রপ সার্কেলকে এলিয়েনিদের জ্যামিতিক ক্লাস বলার পেছনে কিন্তু আমার কাছে শক্ত যুক্তি রয়েছে। দাঁড়াও তোমাকে বলছি।
ক্রপ সার্কেল যে শুধু নকশা নয় তা অনেক আগেই মানুষের নজরে আসে। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে অনেক প্রোগ্রামারদের দাবী রয়েছে ক্রপ সার্কেলের মধ্যে নাকি সূক্ষ্মভাবে লুকিয়ে আছে কোড! এলিয়েনদের জ্যামিতিক ক্লাস বলার কারণটা মুলত এ কারণেই।
অয়লারস আইডেন্টিটির নাম শুনেছো তোমরা? এটা একটা গাণিতিক সমীকরণের নাম। ২০১০ সালের মে মাসে উইল্টশায়ার নামের একটি স্থানের ক্রপ সার্কেলে গবেষকরা এই সমীকরণ খুঁজে পান। এখন হয়তো তুমি ভাবছো যেটার নামই কখনো শুনিনি, সেটা দেখা গেলেই কি বা না গেলেই কি!
 
ঠিক আছে উপরের সমীকরণ সম্পর্কে না জানলেও ‘পাই’ সম্পর্কে তো তোমরা নিশ্চয়ই জানো। ওই যে যার মান ৩.১৪১৬ আর কি! কী বললে? পাই এর মান শুধু ৩.১৪১৬ না? আরো অনেকগুলো ডিজিট আছে? হ্যাঁ তা আমরা জানি। একজন তো দশমিকের পর কয়েক হাজার ডিজিট মুখস্থ করে বিশ্ব রেকর্ডের চকচকে সার্টিফিকেট শোকেসে সাজিয়ে রেখেছেন। কিন্তু জানোই তো পাইয়ের মান পুরো লিখতে গেলে (যদিও পুরো মান এখনো আবিস্কৃত হয়নি) আমাদের ব্লগের জায়গা ফুরিয়ে যাবে কিন্তু ক্রপ সার্কেল নিয়ে আর জানা হবেনা।
 
তো যাইহোক, উপরের ঘটনার আরো দু’বছর আগে অর্থাৎ ২০০৮ সালে উইল্টশায়ারের খুব কাছেই আরেকটি স্থানে নতুন একটি ক্রপ সার্কেল আবিস্কৃত হয়। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, আমেরিকান এস্ট্রোফিজিস্টদের মতে সেখানে গাণিতিক ধ্রুবক ‘পাই’ এর বিশাল মানের প্রথম দশটি অংক বেশ ভালোভাবেই চিত্রায়ন করা হয়েছিলো।
 
ক্রপ সার্কেল নিয়ে পোষ্ট মডেম রিপোর্ট তো অনেক হলো। চলো এবার ঘুরে আসা যাক এমন কিছু গল্পের মাঝে যা তৎকালীন সময়ে ক্রপ সার্কেলকে রহস্যময় করতে বেশ সাহায্য করেছিলো। যদিও এর বেশিরভাগ গল্পই মুখরোচক এবং ভিত্তিহীন। কিন্তু প্রাসঙ্গিক বিষয়ে যে কোন গল্প জানা যেতেই পারে।
 

১. মানুষের অবয়ব :

 ক্রপ সার্কেল জনপ্রিয় হবার পর থেকেই এ নিয়ে নানা মুখরোচক গল্প পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। তার মধ্যে জনপ্রিয় ছিলো তারকাদের মুখের অবয়ব। বিভিন্ন জায়গায় ক্রপ সার্কেলের মধ্য থেকে আমেরিকান তারকাদের মুখের অবয়ব ফুটে উঠতে থাকে বলে শোনা যায়।
 
তবে কোন কিছুই সম্পূর্ণ কল্পনাপ্রসূত হয়না। বাস্তব থেকেই গল্প তৈরি হয়। এখানেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। মানুষের অবয়ব নিয়ে তৈরীকৃত ক্রপ সার্কেলের সত্যতা পাওয়া যেতে থাকে। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই আমেরিকায় এসব ক্রপ সার্কেলের খোঁজ পাওয়া যায়। স্থানীয়রা এর নাম দেন ‘স্টার পিপল’। তাদের মনে একটা কুসংস্কার জন্মে যে, এগুলো মুলত প্রয়াত সেসব তারকাদেত অবয়ব যারা পৃথিবীর মধ্যে তাদের ভক্তদের কিছু বলতে চান। অথবা ভক্তদের কাছে তাদের কৃতজ্ঞতা জানাতে চান ওপারে থেকে।
 
তবে সর্বশেষ মানব অবয়ব সহ ক্রপ সার্কেলের দেখা পাওয়া যায় চি চিবলনের অবজারভেটরির পাশের মাঠে। সময়টা ২০০১। এটি দেখতে পান এলাকার প্রায় সবাই। এর পর আর কখনোই কোন ক্রপ সার্কেলে কারো অবয়ব দেখা দেয়নি।

২. সংকেত আদান-প্রদান

বিষয়টা একটু জটিল হলেও প্রায় অবিশ্বাস্য। ঘটনাটা ঘটে ২০০১ সালেরই এক যবক্ষেতে। ক্রপ সার্কেল থেকে পাওয়া যায় অবিশ্বাস্য এক সংকেত। পুরোটা বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে বেশ কয়েক বছর আগে।
 
আমাদের দেশের স্বাধীনতা অর্জনের কয়েক বছর পর ১৯৭৪ সালে বিশ্ববিখ্যাত কার্ল সেগানের নেতৃত্বে একদল বিজ্ঞানী একটা অদ্ভুত কাজ করেন। তারা মানুষের জেনেটিক কিছু তথ্য ও সৌরজগত সম্পর্কিত মানুষের জানা কিছু তথ্য কোডে রূপান্তর করে মহাকাশে প্রেরণ করেন। এটির নাম দেয়া হয়েছিলো ‘এ্যারেসিবো ম্যাসেজ’। অনেকের মতে এটা ছিলো এলিয়েনের অস্তিত্ব পরীক্ষাও বটে।
 
মহাকাশ বিজ্ঞানীরা আশা করেছিলেন যে এই কোড দুনিয়া থেকে ২৫ আলোকবর্ষ দূরে এমন এক তারকাপুঞ্জির কাছে পৌছবে যার নাম ‘এম-১৩’। এতে করে ওখানে যদি আদৌ কোন বুদ্ধিমান প্রাণী থেকে থাকে তবে সেই কোড তারা বুঝতে পারবে। আর যদি তারা এই কোডের প্রতি উত্তর পৃথিবীতে পাঠায় তবেই এলিয়েন নিয়ে সব জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটবে।
 
ফিরে আসি আবার সেই ২০০১ সালে আবিস্কৃত ক্রপ সার্কেলের কাছে। সেই ক্রপ সার্কেলের মধ্যে এ্যারেসিবো ম্যাসেজের একটি রেপ্লিকা পাওয়া যায়। তবে বিস্ময়ের মাত্র শুরু। বিজ্ঞানীরা আবিস্কার করেন কার্ল সেগানের দলের পাঠানো সেই এ্যারেসিবো ম্যাসেজের প্রতিউত্তর ছিলো সিগনালটিতে। আজ পর্যন্ত সেই অদ্ভুত প্রতি উত্তরের সিগনালটির সম্পূর্ণ পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু এর মধ্যে অচেনা এক প্রাণীর জেনেটিক তথ্য গবেষকরা দেখতে পান।

৩. আলো এবং ছায়াপথ

অনেকের মধ্যেই একটা প্রশ্ন ছিলো কোন প্রক্রিয়ায় আসলে ক্রপ সার্কেল তৈরি হয়। পৃথিবীতে অনেক ক্রপ সার্কেল আবিস্কৃত হলেও মূলত কিভাবে তৈরি হয় তা কেউ স্বচক্ষে দেখেনি। যদিও অনেক ঘটনা প্রচলিত ছিলো কিন্তু বেশিরভাগই মিথ্যে। তবে এই প্রশ্নের অবসান ঘটে যখন আমেরিকান এক কৃষক নিজে ক্রপ সার্কেল তৈরি হতে দেখেছেন বলে দাবী করেন। তার বর্ণনাও ছিলো বেশ অদ্ভুত। ছোট ছোট গোলক আকৃতির আলো ভূমি থেকে ১/২ মিটার উপরে ঘুরে বেড়াতে থাকে। এবং এক সময় আপনা আপনিই তা উধাও হয়ে যায়।
আর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ক্রপ সার্কেলের দেখা মেলে ২০১২ সালে ইংল্যান্ডের উইল্টশায়ারে। সবচেয়ে বড় থাকায় এর নাম দেয়া হয় গ্যালাক্সি বা ছায়াপথ। গ্যালাক্সি ক্রপ সার্কেলের আয়তন ছিলো প্রায় ৫০০ মিটার বিস্তৃত। অনেক গবেষকেরা একে ‘মনস্টার ক্রপ সার্কেল’ নামেও আখ্যায়িত করেছিলেন।
 
এমন অসংখ্য ব্যখ্যাতীত ঘটনার বর্ণনা করা যাবে। আগ্রহীরা খোঁজও নিতে পারো। এমনকি এত বছর পর এখনও আমেরিকার ক্যামব্রিজ এলাকায় বিটিএল নামের একটি গবেষণা সংস্থা ক্রপ সার্কেল নিয়ে এখনো গবেষণা করে যাচ্ছে। আমাদের রহস্যের চাদরে ঘেরা পৃথিবীর অমীমাংসিত রহস্যের এটি একটি। ক্রপ সার্কেলগুলো শনাক্ত করতে হলে অনেক উপর থেকে দেখতে হয়। নিচ থেকে অথবা সামান্য উপর থেকেও ব্যাপারটা তেমন দৃষ্টিগোচর হয়না। এজন্যই গবেষকরা মনে করেন ক্রপ সার্কেল আরো অনেক পুরনো। কিন্তু মানুষ আকাশে উড়তে না পারায় কেউই এটা দেখতে পায়নি।
 
ভাবো তো! কতই তো শস্যক্ষেতে দৌড়ে বেড়িয়েছো। ছোটাছুটি করে অনেক এসব জায়গায়। এমন কি হতে পারেনা যে, তোমার পায়ে মাড়িয়ে যাওয়া আঁকাবাঁকা শস্যগুলোও ছিলো অদৃশ্য হোক্সারদের তৈরি কোন এক ক্রপ সার্কেল!

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: [email protected]

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?