ফোবিয়া: হরেক রকম মানুষের হরেক রকম ভয় (পর্ব ১)

পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবারে শুনে নাও!

 

ফোবিয়া শব্দটির সাথে আমরা প্রায় সবাই কম-বেশি পরিচিত। একটু বইয়ের(!) ভাষায় বললে এর অর্থ দাঁড়ায়, “ফোবিয়া হচ্ছে কোনও বিশেষ বস্তু, বিষয় কিংবা কোনও ঘটনা বা অবস্থায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি মাত্রায় আতঙ্কিত হওয়া, অস্বস্তিবোধ করা বা অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়া অথবা সেই ব্যপারটাকে অহেতুক এড়িয়ে চলার প্রবণতা।”

আমার একটা খুব অদ্ভুত সমস্যা আছে। আমার সামনে যত ধরনের পশু-পাখিই আসুক না কেন, আমি ভয়ে উল্টো দৌড় লাগাই। সেটা কুকুর থেকে শুরু করে ছোট্ট হলুদ রঙের মুরগির বাচ্চাই বা হোক না কেন! যখন একটু বড় হলাম, তখনই মাথার মধ্যে শুধু “কেন আমি পশু-পাখিকে এত ভয় পাই?”- এই প্রশ্নটা ঘুরপাক খেত। গুগলে এই নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে করতে সামনে চলে আসে বেশ কিছু মজার, কিন্তু অদ্ভুত তথ্য। সাইকিয়াট্রিস্টদের ভাষায়, পশু-পাখিকে ভয় পাওয়ার সমস্যাকে Zoophobia বলে।

এরকম অসংখ্য কম-বেশি ফোবিয়ার লক্ষণ আমাদের অনেকের মধ্যেই রয়েছে। তার মধ্যে আমরা অনেকেই সেটা বুঝতে পারি, আবার অনেকেই তা পারি না। Chill! এতে চিন্তার কোনো কারণ নেই। চিন্তা করার বিষয় তখনই হবে, যখন এই ভয় তোমার স্বাভাবিক জীবনের কাজগুলোয় বাধা দেবে।

১০ মিনিট স্কুলের পক্ষ থেকে এ বছর বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি-সহায়ক অনলাইন লাইভ এডমিশন কোচিংয়ের আয়োজন করা হচ্ছে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে!

যেমন: মনে করো তুমি রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছো। আর ১০ মিনিটের মধ্যেই তোমাকে কলেজে যেতে হবে। রাস্তায় চলার সময় হঠাৎ করে দেখলে, তোমার ঠিক ৫ হাত সামনে একটা কুকুর গা এলিয়ে শুয়ে আছে। এখন তুমি কী করবে? কুকুরটাকে পাশ কাটিয়ে আস্তে করে চলে যাবে? কুকুরটা হয়তো তোমাকে কিছু করছে না, কিন্তু তাকে দেখার সাথে সাথেই তুমি দরদর করে ঘামতে শুরু করলে এবং সাতপাঁচ না ভেবে উল্টো  ঘুরে ভোঁ দৌড় লাগালে। এতে করে তুমি কলেজের জন্য বেশ দেরি করে ফেললে। অর্থাৎ এই কুকুরকে দেখে যে ভয় পেলে, এটা তোমার জীবনের স্বাভাবিক কাজকে বাধাগ্রস্ত করছে।

ঘুরে আসুন: সেকেলে ধ্যান-ধারণা বনাম একজন আদর্শ ছাত্র

আতঙ্ক, ভয় বা ফোবিয়া– এই তিনটি শব্দের অর্থ প্রায় একই। ভয় হলো মনের অবচেতন স্তরের একটি বিশেষ মানসিক অবস্থা, যার একটি নির্দিষ্টতা সীমা বা সহ্য করার ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু ভয় যখন নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করে, তখন তাকে ফোবিয়া বা ভীতি রোগ বলে।

বলা হয়, গ্রীক ভাষা হলো বিশ্বের অন্যতম প্রধান সভ্যতা ও সাহিত্যের ধারক ভাষা। শুধু সাহিত্যক্ষেত্রেই নয়, আমাদের পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, বায়োলজির প্রায় সকল শব্দই এই গ্রীক ভাষা থেকে আগত। আর এই ফোবিয়াই বা তার ব্যতিক্রম হতে যাবে কেন? গ্রীক শব্দ Phóbos থেকে Phobia শব্দের উৎপত্তি, যার অর্থ ভয় বা আতঙ্ক।

ফোবিয়ার ইতিহাস :

ফোবিয়ার ইতিহাস কিন্তু খানিকটা আভিজাত্যপূর্ণ। এগুলো জটিল কিন্তু এত বেশি যে সংখ্যায় গোনা যায় না। হাজার হাজার বছর আগের মানুষও ফোবিয়ায় আক্রান্ত হতো, কিন্তু এই ফোবিয়ার ব্যাপারে আমরা জেনেছি মাত্র কিছু বছর হলো। সর্বপ্রথম ফোবিয়ার কথা জানা যায় প্রাচীন গ্রীক দার্শনিক এবং চিকিৎসক হিপোক্রেটিসের (খ্রিষ্টপূর্ব  ৪৭০-৪১০) এক লেখার মাধ্যমে। হিপোক্রেটিস তাঁর রোগী এবং তাদের রোগ নিয়ে অনেক কিছু লিখে গেছেন। তার মধ্যে অনেকের ভেতরেই ফোবিয়ার আলামত দেখা যায়।

ছবি: হিপোক্রেটিস

তাঁর ‘The Seventh Book of Epidemics’-এ তিনি নিকানোর নামের এক ব্যক্তির কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন কোনো এক কারণে নিকানোর বাঁশির শব্দ সহ্য করতে পারতেন না, বিশেষ করে রাতের বেলা। সকাল বেলা তিনি একদম স্বাভাবিক থাকতেন। কিন্তু রাতে বাঁশির শব্দ শুনলেই এক অজানা ভয় তাকে আঁকড়ে ধরতো।

তবে হিপোক্রেটিস সরাসরি ফোবিয়ার কথা বলেননি। কেননা তখনো ফোবিয়া নামের কোনো জিনিস আবিষ্কারই হয়নি!

এরও প্রায় ৫০০ বছর পর, রোমান চিকিৎসক Celsus, হাইড্রোফোবিয়া ( Hydrophobia) শব্দটি ব্যবহার করেন তাদের জন্য, যারা রাবি জাতির ভয়ে পানি পান করা থেকে বিরত থাকে। কিন্তু সেলসাসই বা কীভাবে ‘ফোবিয়া’ শব্দটির খোঁজ পেলেন? এটার জন্য আমাদের একটু গ্রীক পুরাণের দিকে যেতে হবে। গ্রীক পুরাণ মতে ফোবোস (Phobos) ছিলেন এরিয়েস (Aries) এর পুত্রসন্তান, যিনি হলেন যুদ্ধের দেবতা। প্রচলিত আছে, ফোবোস ছিলেন খুবই ভয়ংকর চরিত্রের অধিকারী। যার ফলে সবাই তাকে ভয় পেয়ে চলতো। আর এই কারণেই যোদ্ধারা তাদের ঢালে ফোবোসের ছবি এঁকে রাখতো, যাতে শত্রুপক্ষ সেই ছবি দেখেই পালিয়ে যায়।

“The oldest and strongest emotion of mankind is fear.”
– H.P. Lovecraft

তবে আধুনিক বিশ্বে ১৭৮৬ সালের আগে ‘ফোবিয়া’ শব্দটির প্রচলন ছিল না (অক্সফোর্ড ডিকশনারি অনুসারে)। ১৭৮৬ সালে এক নাম না জানা লেখক কোনো এক কলম্বিয়ান ম্যাগাজিনে ফোবিয়া শব্দটি বিশ্লেষণ করেন এভাবে, “ফোবিয়া হলো কোনো অদৃশ্য অবাস্তব এবং অশুভ কোনো কিছুর প্রতি ভয়।”

তবে এরপরেও তখনো এই শব্দের চল সেইভাবে শুরু হয়নি। কিন্তু ১৮ শতকের পরে, মানুষ হঠাৎ করেই এই শব্দের প্রচলন ব্যাপকভাবে শুরু করে। মেডিকেল সায়েন্টিস্টরা এইসব সাইকোলজিক্যাল সমস্যাগুলো নিয়ে পরিষ্কারভাবে ভাবতে থাকেন এবং এগুলো আলাদা ক্যাটাগরিতে ভাগ করেন।

এখন কেউ যদি আমাদেরকে নিজেদের সম্পর্কে বা অন্য কারো সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, আমরা কি বলতে পারবো না? যেমন তুমি কি অন্তর্মুখী না বহির্মুখী? নিশ্চয়ই পারবো, কেননা আমরা এইসব শব্দ এবং বিষয়ের সাথে পরিচিত। কিন্তু ভাবতে গেলেই অবাক লাগে যে আজ থেকে মাত্র ১০০ বছর আগেও মানুষ এইসব বিষয় সম্পর্কে কিচ্ছু জানতো না। তখন মানুষ ফোবিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পাগল হয়ে গেলেও, তাকে সঠিক চিকিৎসা করার মত মানুষ ছিল না।

মজায় মজায় ইংরেজি শিখ!

তোমার স্বপ্নের পথে পা বাড়ানোর ক্ষেত্রে তোমার ইংরেজির জ্ঞান কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে! তাই আর দেরি না করে, আজই ঘুরে এস ১০ মিনিট স্কুলের এই এক্সক্লুসিভ প্লে-লিস্টটি থেকে!

১০ মিনিট স্কুলের ইংরেজি ভিডিও সিরিজ

ধীরে ধীরে চিকিৎসকেরা এইসব মেডিকেল টার্মগুলো চিনতে শুরু করলেন। এবং লক্ষ্য করে দেখলেন যে, অজস্র সাইকোলজিক্যাল সমস্যা থাকলেও বেশির ভাগ মানুষেরই প্রায় একই ধরণের সমস্যা। যেমন কেউ তাদের পুরোনো বাড়ি ছেড়ে যেতে চান না, কেউ বা লোকজনের সাথে কম মিশতে চান, কেউ আবার সাপের ভয়ে বাগানের দিকে পা বাড়ান না।

১৮৯৫ সালে ভিয়েনার নিউরোলজিস্ট সাইকোএনালাইসিসের জনক সিগমুন্ড ফ্রয়েড ( ১৮৫৬-১৯৯৩), লক্ষ্য করেন যে কিছু কিছু ব্যাপার আছে, যেগুলো সবাই সাধারণভাবে নিতে পারলেও অনেকেই তা পারেন না। তার বেশকিছু বছর পর ফ্রয়েড হান্স নামের এক ছেলের সম্পর্কে লিখেন, যে রাস্তায় ঘোড়া দেখে ভয় পেয়েছিল। আর সেই ভয় এতটাই তীব্র ছিল, যেটা ফোবিয়া হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সমসাময়িক বিশেষজ্ঞরাও বুঝতে পেরেছিলেন যে ফোবিয়া একধরণের মানসিক ব্যাধি। তারা একে ‘মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

‘The Complete Idiot’s Guide to Phobias’ by Greg Korgeski

ফোবিয়ার প্রকারভেদ:

ফোবিয়া বিশেষজ্ঞরা ফোবিয়াকে বেশ কয়েকটি ভাগে ভাগ করেছেন। যেমন: পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার, অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার, ডায়াগনস্টিক এন্ড স্ট্যাটিস্টিক্যাল ম্যানুয়াল অব মেন্টাল ডিজঅর্ডার ইত্যাদি। তবে ফোবিয়া প্রধানত তিন প্রকার। সেগুলো হলো স্পেসিফিক ফোবিয়া, সোশ্যাল ফোবিয়া এবং এগারোফোবিয়া।

সোশ্যাল ফোবিয়া:

আমাদের অনেকের মধ্যেই Social Phobia‘র লক্ষণ কমবেশি দেখা যায়। আমার এক সহপাঠী ছিল, যার মধ্যে সোশ্যাল ফোবিয়ার লক্ষণ ছিল। সে আগের স্কুল থেকে কোনো এক কারণে ট্রান্সফার হয়ে আমার স্কুলে চলে আসে। আমরা সবাই খুব উৎসুক হয়ে তার সাথে কথা বলার চেষ্টা করছি, কিন্তু সে কোনোভাবেই কারো সাথে কথা বলবে না। কয়েকদিন পর দেখা গেল সে নিয়মিত স্কুলেও আসছে না। পরীক্ষা দিতো না বছরের পর বছর।

এক্ষেত্রে দেখা যায় আমরা কারো চোখে চোখ রেখে কথা বলতে ভয় পাই, সবসময় মনে হয় যে সবাই আমার দিকেই তাকিয়ে আছে এবং আমার খুঁটিনাটি সব লক্ষ্য করছে। কিংবা আমার সম্পর্কে খারাপ কিছু ভাবছে। তখন কারো সাথে কথা বলার সময় আমরা অতিরিক্ত সচেতন হতে যেয়ে সব এলোমেলো করে ফেলি। তখন আমরা নার্ভাস হয়ে যাই, তোতলাতে থাকি এবং অনেক বেশি লজ্জা পাই। আমি এমন অনেক মানুষকে দেখেছি, যারা বন্ধুমহলে স্বাভাবিক থাকে, কিন্তু অপরিচিত কারো সামনে যেতে অতিরিক্ত বিব্রতবোধ করে। সেই সাথে ঘেমে-নেয়ে একাকার হয়ে যায়! এই সোশ্যাল ফোবিয়ার কারণেই আমরা অনেকে প্রেজেন্টেশন করতে ভয় পাই। কেননা তখন সবাই বাস্তবিক অর্থেই আমাদের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে!

কথায় বলে, MUN is fun! আসলেই কি তাই? নিজেই দেখে নাও এই প্লে-লিস্ট থেকে।

সোশ্যাল ফোবিয়াকে আরো দু’টি ভাগে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে একটি হলো জেনারেল সোশ্যাল ফোবিয়া। এই ফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মনে হয় সবাই তার দিকে তাকিয়ে আছে এবং তার দিকে নজর রাখছে। তারা অপরিচিত ব্যক্তিদের সাথে আলাপ করতে চায় না। নিজের প্রয়োজন হলেও কারো কাছে নিজের সমস্যার কথা বলতে পারে না বা জানাতে দ্বিধাবোধ করে।

আর আরেকটা হলো স্পেসিফিক সোশ্যাল ফোবিয়া। এটা কিছু ক্ষেত্রে জেনারেল সোশ্যাল ফোবিয়ার উল্টো। এখানে ব্যক্তি অপরিচিত কারো সাথে কথা বলতে ভয় না পেলেও সবার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতে গেলে নার্ভাস হয়ে যাও এবং তোতলাতে শুরু করে। অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের মধ্যেও এই উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

ঘুরে আসুন: পরীক্ষার হলে যে ১০টি ভুল এড়িয়ে চলা উচিৎ

স্পেসিফিক ফোবিয়া বেশ কয়েক ধরনের আছে। যেমন নির্দিষ্ট কিছু পশু-পাখিকে ভয়, প্রাকৃতিক কোনো জিনিসের প্রতি ভয় ইত্যাদি।

পুরো পৃথিবীতে ৬%-৮% এবং এশিয়া মহাদেশে ২%-৪% মানুষ স্পেসিফিক ফোবিয়া আক্রান্ত। এবং যুক্তরাষ্ট্রের ৭% মানুষ সোশ্যাল ফোবিয়া আক্রান্ত। ১.৭% মানুষ এগোরাফোবিয়ায় ভোগে। তবে আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি ১০-১৭ বছর বয়সী ছেলে-মেয়েরা ফোবিয়াতে বেশি ভোগে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফোবিয়ায় আক্রান্তের হার কমতে থাকে।

Agorophobia:

কোনো একটা সিচুয়েশনে পড়লে, সেখান থেকে ভয়ে বের হয়ে আসতে পারে না। এরা মূলত সমস্যায় পড়লে তা সমাধান করার থেকে সেখান থেকে পালিয়ে আসাকে ভালো আইডিয়া মনে করে থাকে। এমন করার ফলে সমস্যা কখনোই তাদের পিছু ছাড়ে না। ফলে সবসময় তারা সমস্যায় পড়তেই থাকে এবং তাদের সমস্যা নিয়ে ভয় শুধু বাড়তেই থাকে। তবে প্রোপার কাউন্সেলিং এর মাধ্যমে এই সমস্যা খুব সহজেই সমাধান করা সম্ভব।

এই লেখাটির অডিওবুকটি পড়েছে সাদিকুল্লাহ মাহমুদ


১০ মিনিট স্কুলের লাইভ এডমিশন কোচিং ক্লাসগুলো অনুসরণ করতে সরাসরি চলে যেতে পারো এই লিঙ্কে: www.10minuteschool.com/admissions/live/

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: [email protected]

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?