যত দোষ নন্দ ঘোষ?

পুরোটা পড়ার সময় নেই? ব্লগটি একবারে শুনে নাও!

 

‘Don’t wish it were easier, wish you were better.’ – Jim Rohn

কোনো কাজে ব্যর্থ হলে কখনোই ভাববেন না, ইশ্‌! কাজটা যদি আরেকটু সহজ হতো। ভাবুন, ইশ্‌! আমি যদি আরেকটু বেশি প্রস্তুতি নিতাম- জিম রন

মর্যাদাপূর্ণ জীবনের জন্য আমরা এরই মধ্যে জেনে গেছি কী করতে হবে এবং কীভাবে করতে হবে। সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা করে ধারাবাহিকভাবে স্বচ্ছ লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া, যেখানে থাকবে গভীর আবেগ আর ভালোবাসা। সেই গতি যেসব মানসিক ভাইরাস মন্থর করে দিতে পারে, তার অধিকাংশই আমাদের শরীরে আক্রমণ করে না। এরা আঘাত হানে আমাদের ব্রেইনের কার্যক্রমে। অর্থাৎ আমাদের চিন্তায়, বিশ্বাসে, বিবেচনায়, আবেগে। একে একে আমরা দেখেছি কীভাবে ব্রেন স্ক্যান করে সেসব নোংরা ভাইরাস শনাক্ত করে ডিলিট করা যায়।

এই অধ্যায়ে ব্যক্তিত্বে আক্রমণ করে এরকম একটি ভাইরাস শনাক্ত করতে শেখাব।

আপনি লক্ষ্য ঠিক করেছেন, স্বপ্ন দেখছেন, কাজের স্মার্ট পরিকল্পনা করছেন, কিন্তু কাজে নামছেন না। কেমন জানি উদ্যম পাচ্ছেন না। হয়তো ভাবছেন, আমার দ্বারা কি হবে?

দুশ্চিন্তা করবেন না। মনোযোগ দিয়ে পড়ুন, পেয়ে যাবেন দিশা।

আপনি যা চাচ্ছেন, তা করছেন না! কেন?

এই প্রশ্নের উত্তরের জন্য কি আপনি আপনার ব্যক্তিত্বের আরও গভীরে যেতে পারবেন? চলেন যাই।

আশা করছি সবকিছু মিলিয়ে আপনি বর্তমানে ভালো আছেন। অথবা না-ও থাকতে পারেন। যে অবস্থানে থাকার কথা সেখানে নেই। যা-ই হোক না কেন, আপনার বর্তমান ভালো বা মন্দ অবস্থার জন্য আপনি সাধারণত কাকে দায়ী করেন? একটু ভাবুন, এরপর বলুন। বাবা, মা, দেশের অস্থিতিশীল রাজনীতি, দুর্নীতি, নিজের অবহেলা, সুযোগের অভাব, অর্থকষ্ট, পরিশ্রম, অধ্যবসায় ইত্যাদি নানা উত্তর আসতে পারে।

এই উত্তরগুলোকে সাধারণত দু’টি ভাগে ভাগ করা যায়। একটি অভ্যন্তরীণ (Internal), অন্যটি বাহ্যিক (External)। অভ্যন্তরীণ কারণগুলোতে আমাদের নিয়ন্ত্রণ থাকে, করার কিছু থাকে। যেমন- পরিশ্রম, অধ্যবসায়, নিজের আচার-ব্যবহার, সময় ইত্যাদি। কিন্তু বাহ্যিক কারণগুলো আমাদের ক্ষমতার বাইরে। যেমন- ভাগ্য, জন্মগত বৈশিষ্ট্য, অন্যের ভূমিকা। অর্থাৎ আমাদের সাফল্য বা ব্যর্থতার জন্য আমরা দায়ী করতে পারি অভ্যন্তরীণ বিষয়কে অথবা বাহ্যিক কোনোকিছুকে।

মনোবিজ্ঞানী জুলিয়ান রোটার (Julian Rotter) এ বিষয়টাকে বলেছেন ব্যক্তিত্বের লোকাস অব কন্ট্রোল (Locus of control) বা নিয়ন্ত্রনের কেন্দ্র। সাধারণত আপনার কোন দিকে ঝোঁক, সেটা দেখে আপনার লোকাস অব কন্ট্রোল নির্ধারণ করা যায়। আপনি হবেন হয় অভ্যন্তরীণ অথবা বাহ্যিক।

বিষয়টা পরিষ্কার করার জন্য নিচের প্রশ্নমালা দেখুন। পাঁচটি প্রশ্নের প্রতিটির জন্য দুটি (ক/খ) করে বাক্য আছে। দুটির মধ্যে কোনোটার সাথে আপনি একমত, সেই বাক্যে টিক চিহ্ন দিন। এখানে কোনো ভুল বা সঠিক উত্তর নেই।

ক) নেতা তৈরি হয় না, নেতা জন্মে।
খ) নেতা তৈরি হয়, জন্মে না।
ক) আমার নিজের ভুলের জন্য আমাকে কষ্ট করতে হয়।
খ) আমি যা-ই করি না কেন, ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আমাকে কষ্ট করতে হয়।
ক) সঠিক সময়ে সঠিক স্থানে জন্মেছে বলেই মানুষ জীবনে সফল হয়।
খ) কে সফল হবে তার পুরোটাই নির্ভর করছে তার পরিশ্রম, অধ্যবসায় আর দক্ষতার ওপর।
ক) যে কেউ পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করতে পারে যদি সে কঠোর পরিশ্রম করে।
খ) যত কঠোর পরিশ্রম করুক না কেন, শিক্ষকের সুদৃষ্টি ছাড়া ভালো রেজাল্ট করা যায় না।
ক) জনপ্রিয় ব্যক্তিদের বিশেষ জন্মগত বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যার জন্য মানুষ তাদের পছন্দ করে।
খ) মানুষ অন্যের কাছে জনপ্রিয় হয় তার আচরণের জন্য।

 

মোট স্কোর:

আপনার উত্তর দেওয়া শেষ, এবার মোট স্কোর যোগ করুন। স্কোর যদি ৫-৬-এর মধ্যে থাকে, আপনার লোকাস অব কন্ট্রোল অভ্যন্তরীণ। আর ৭-১০ হলে আপনি বাহ্যিক। একটু সতর্কতা। এই প্রশ্নমালাটি তৈরি করা হয়েছে, বিষয়টাকে বোঝানোর জন্য। এটি কোনো পূর্ণাঙ্গ স্কেল না। তাই এর ভিত্তিতে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।

অভ্যন্তরীণ আর বাহ্যিক হলাম, তাতে কী আসে যায়?

ব্যক্তিত্বের বিজ্ঞান বলছে, অনেক কিছু আসে যায়। যারা অভ্যন্তরীণ, তারা বিশ্বাস করে তাদের সাফল্য তাদের হাতেই ন্যস্ত। নিজের কর্মের ওপরেই নির্ভর করছে আগামী দিন কেমন হবে। ফলে তারা তাদের কর্মফলের দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেয়। ভালো রেজাল্ট করলে নিজেকে ধন্যবাদ দেয়। পরিশ্রম করেছি তার ফল পেয়েছি। খারাপ করলেও নিজেই দায়িত্ব নেয়। প্রস্তুতি যথাযথ নেইনি, তাই ভালো ফল হয়নি।

অন্যদিকে যারা বাহ্যিক, তারা ভাগ্য, পরিস্থিতি, সময় ইত্যাদি জিনিসের ওপর তাদের সাফল্য ছেড়ে দেয়। ফলে নিজের প্রতি নিয়ন্ত্রণ থাকে না। অন্য কিছু নিয়ন্ত্রণ করে কেমন হবে আমার আগামী দিন। সুতরাং দায়িত্ব নিজের কাঁধে নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। যা কিছু হোক, এতে তো আমার হাত নেই। ভালো ফল হয়নি- প্রশ্ন কঠিন হয়েছে, শিক্ষক পক্ষপাতিত্ব করেছে, শরীর খারাপ ছিল, হরতালের জন্য ক্লাস করতে পারিনি ইত্যাদি। ফলে পরবর্তী সময়ে একই ফল হওয়ার আশঙ্কা। কারণ এই বিষয়গুলোতে তো আমার হাত নেই।

পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, বাহ্যিক লোকাস অব কন্ট্রোল আপনার উন্নতির পথে বিরাট বাঁধা। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা আভ্যন্তরীণ তারা পরিশ্রমী হয়, মনোযোগ ধরে রাখতে পারে। প্রতিনিয়ত এমন কিছু কাজে জড়িত থাকে, যাতে তাদের জ্ঞান, দক্ষতা, কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। ফলে বিরূপ পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। এদের মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকে, ফলে সম্পর্ক, পড়ালেখা, কাজে অনেক উন্নতি লাভ করে।

আপনার লোকাস অব কন্ট্রোল কী, তা নিশ্চয় বের করে ফেলেছেন। এবার সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিন। গভীরভাবে বিশ্লেষণ করুন, আপনার কর্মফলের জন্য কাকে কীভাবে দায়ী করছেন।

ভাগ্য বা কপালের লিখন একটা মিথ্যা অজুহাত। ভীতু আর পরাজিতরাই এই শব্দগুলো ব্যবহার করে। দয়া করে নিজেকে অন্য কিছুর কাছে সঁপে দেবেন না। আপনার স্বপ্ন আপনি ঠিক করবেন। আগামী দিনের সকালটা কেমন হবে তা সম্পূর্ণই আপনার হাতে রয়েছে। সেই দায়িত্বটা বুঝে নিন। ভাগ্য, কপাল, পরিস্থিতি, জন্মগত পরিচয় কখনোই আপনার ইচ্ছাশক্তির থেকে বড় নয়। অযথাই এগুলোকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখার কোনো মানে হয় না। আমি চাই জীবন টিভির রিমোট আপনার হাতেই থাকুক। যখন যে চ্যানেল দেখবেন, নিজের খুশিমতো বদলাবেন। অন্য কিছুর ওপর ছেড়ে দিলেই বিপদ। পাল্টাতে পাল্টাতে আপনাকে বিপন্ন করে ছাড়বে।

আপনি নিশ্চয়ই তা হতে দেবেন না। কেননা, আপনি শক্তিশালী, আপনি সুন্দর। মর্যাদার জীবনযাপন করা আপনার মৌলিক অধিকার।

এই লেখাটি নেয়া হয়েছে লেখকের “মানসিক প্রশান্তি আর মর্যাদাপূর্ণ জীবনের জাদুকাঠি” বইটি থেকে। বিশেষ ছাড়ে বইটি কিনতে চাইলে চলে যান এই লিংকে!

এই লেখাটির অডিওবুকটি পড়েছে মনিরা আক্তার লাবনী


১০ মিনিট স্কুলের লাইভ এডমিশন কোচিং ক্লাসগুলো অনুসরণ করতে সরাসরি চলে যেতে পারো এই লিঙ্কে: www.10minuteschool.com/admissions/live/

১০ মিনিট স্কুলের ব্লগের জন্য কোনো লেখা পাঠাতে চাইলে, সরাসরি তোমার লেখাটি ই-মেইল কর এই ঠিকানায়: write@10minuteschool.com

What are you thinking?