ডিসটোপিয়া: এক অন্ধকার পৃথিবীর ধারণা (পর্ব-১)

শুরুতেই আমরা বাংলা ভাষার একটি মৌলিক গল্প নিয়ে কথা বলবো। গল্পটি লিখেছেন মুহম্মদ জাফর ইকবাল। প্রায় পুরনোই বলা চলে গল্পটা। কারণ বেশ অনেক বছর আগের লেখা গল্প হলো ‘প্রোগ্রামার’। গল্পটা যখন আমি পড়েছিলাম তখন আমার বয়স খুবই কম। প্রোগ্রামার বিষয়টা যে কী তাও ঠিক বুঝি না তখন। প্রোগ্রামার গল্পের একটা পরিপূর্ণ স্পয়লার দিতে গেলে বলতে হবে, গল্পের একজন চরিত্র একটি আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্ট প্রোগ্রাম তৈরি করে। যা পরিচালনা করতে হলে এক প্রকার বিশেষ হেলমেট মাথায় পরতে হয়৷

অর্থাৎ ধরো তুমি ওই হেলমেটটা মাথায় বসিয়ে সহজেই তোমার বাসায় এখন কী অবস্থা তা দেখতে পারবে। তুমি আসলে দেখবে তোমার বাসার আদলে বানানো বাস্তবের কাছাকাছি তৈরী করা ত্রিমাত্রিক এক প্রকার চিত্র৷ যেটি তোমার কাছে হেলমেট পরিহিত অবস্থায় কিছুটা বাস্তব মনে হবে। একবার এই প্রোগ্রামের প্রস্তুতকারক তার এই অসাধারণ প্রোগ্রামটি একজনকে দেখানোর জন্য হেলমেটটি পরতে দেন। তখনই প্রোগ্রামে বড় ধরণের বাগ ধরা পড়ে।

প্রোগ্রামের বাগ কী তা হয়তো তোমরা সকলেই কম বেশি বোঝো। একদম সহজ ভাষায় প্রোগ্রামের ভুলকেই বাগ বলা হয়। আর এই ভুল ঠিক করে প্রোগ্রামকে সংশোধন করাকে বলা হয় ডিবাগিং। যাদের নলেজ এ সম্পর্কে অপেক্ষাকৃত দুর্বল, তারা কিন্তু খুব সহজেই রবি টেন মিনিট স্কুলের অ্যাপে গিয়ে একাডেমি সেকশনের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির উপর তৈরীকৃত ভিডিও বা স্মার্টবুকগুলো দেখে আসতে পারো। হলফ করে বলতে পারি, এতে করে প্রোগ্রামিং এর বেসিক তোমার আয়ত্তে আসবে সহজেই। শুধু ভিডিও কিংবা স্মার্টবুক নয়; রবি বরং টেন মিনিট স্কুলের ব্লগ সেকশনেও আছে নতুন প্রোগ্রামারদের জন্য লেখা ঝংকার মাহমুদের বিশেষ ব্লগ। পড়ে আসতে পারো কিন্তু!

তো যাইহোক, এরপর থেকে গল্পে দেখা যায় শুধু বাগ আর বাগ। আর বাগগুলোও বেশ বড় বড়৷ একটা উদাহরণ দেই। হেলমেট পরা অবস্থায় দেখা গেলো বাসার বেডরুমের সিলিং এ একটা মাকড়সা ঝুলছে। ঝুলছে তো ঝুলছে। আস্তে আস্তে আশেপাশে মাকড়সার মাকড়সার সংখ্যা আরো বাড়তে থাকবে। তুমি বেডরুম থেকে বের হয়ে বসার ঘরে গিয়েও দেখবে উপরে-নিচে কিংবা দেয়ালজুড়ে শুধুই মাকড়সা। তুমি একটু পর অবাক হয়ে আবিস্কার করবে তোমার জগতে একটু জায়গাও খালি নেই যেখানে মাকড়সা নেই। এটা প্রোগ্রামটির একটি বাগ। বলা চলে বিশাল আকারের বাগ।

প্রোগ্রামার গল্পে এরকম বড় ধরণের বাগ দেখা দেয়। সাধারণত ছোটখাটো বাগ সহজেই ডিবাগিং করা সম্ভব। তবে এরকম জটিল একটি বাগ তার প্রোগ্রামে হতে পারে এটা ভেবেই অস্থির হয়ে যায় প্রোগ্রামটির মালিক। সে চিন্তা চিন্তায় দিন কাটাতে থাকে। তার এটা নিয়েও চিন্তা হয় যে, সে নিজে কিভাবে এত বড় একটি বাগ রাখলো। তার চোখে কেন পড়লো না। এমনকি সে নিজে এতবার প্রোগ্রামটি ব্যবহার করার পরও বাগটি তার চোখে ধরা পড়লো না। আরো ছোটখাটো কিছু সমস্যা থাকে গল্পে সেগুলো নিয়ে কথা না বলাই ভাল।

তবে গল্পের আসল মজাটা থাকে একদম শেষে। এরকম বাগপূর্ণ প্রোগ্রামের কথা বলতে বলতেই গল্পটি শেষ হয়। শেষে আলাদা করে অদৃশ্য দুজনের মাত্র চার বাক্যের একটা কথোপকথন থাকে। কিছুটা এরকম।

: প্রোগ্রামটা আবার নষ্ট করে দিলি?

:  হ্যাঁ।

: কেন?

: বাগ ছিলো। তাই সব নষ্ট করে দিলাম। পুরোটা আবার শুরু করতে হবে।

প্রোগ্রামার গল্পটা পড়তে বসে একদম শেষে এসে এই ছোট্ট কথোপকথন তাও আবার অচেনা দু’জনের। ব্যাপারটা তোমার মাথা ঘুরিয়ে দেবে। তুমি কঠিনভাবে ধাক্কা খাবে। কারণ গল্পের ধারাবাহিকতা অনুযায়ী তুমি যাকে মুল গল্প হিসেবে ভাবছিলে সেটি মুলত একজন দক্ষ প্রোগ্রামারের তৈরি একটি সামান্য প্রোগ্রাম মাত্র। যেটিতে বাগ থাকায় প্রোগ্রামার নিজেই ধ্বংস করে নতুনভাবে সৃষ্টি করতে আগ্রহী। কিন্তু পুরো ব্যাপারটাই যে একটা প্রোগ্রাম তা গল্প শেষের আগে তুমি বুঝতে পারবে না!

এখন এই গল্পটা কেন বললাম সেটা একটু ব্যাখ্যা দেই। তুমি গল্পের মধ্যে ঢুকে গিয়েছিলে। গল্পের চরিত্রগুলোকে নিজের আশেপাশের চরিত্র ভাবা শুরু করে দিয়েছিলে। কিন্তু গল্পের একদম শেষে এসে তুমি বুঝতে পারলে আসলে পুরোটাই একজনের হাতের খেলা। সে যেভাবে কমান্ড করবে গল্পটার গতিপথ সেভাবেই হবে। যেটাকে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাবই বলা যায়। আর পুরো জগতের নেতিবাচক ধারণাকেই বলা যায় ডিসটোপিয়া।

এরকম অনেক বিদেশী গল্পও আছে। তোমরা হয়তো ওই গল্পটা জানো যেখানে গল্পের নায়ক হঠাৎ একদিন আবিষ্কার করে সে আসলে একটি উপন্যাসের চরিত্র। যেই বইটা তখনো লেখা হচ্ছিলো। সে জানে যে সে একজন স্বতন্ত্র ব্যক্তি কিন্তু তার ভাগ্য নির্ভর করছিলো সেই লেখকের উপর যিনি এই গল্পটা লিখছেন। এবং গল্পের নায়ক হিসেবে তার ভাগ্যে হলো লেখকের মর্জি। এটাকেও একটা ডিসটোপিয়ান গল্প বলা চলে।

আরো সহজভাবে ডিসটোপিয়াকে বুঝতে হলে ইউটোপিয়া বুঝলেই হলো। আমরা প্রায়ই দেখি শিশুতোষ কিংবা কিশোরতোষ বইগুলোতে এমন এক জগত বা পৃথিবী দেখানো হয় যা খুব সুন্দর। বাস্তবের মত এখানে কোন অপরাধ নেই, কোন ঝামেলা নেই, সাদা জগতে কোন রকম দাগ যেন নেই। এই যে রূপকথার মত ‘পৃথিবীর সব কিছুই ভালো’ এই ধারণাকে বলা হয় ইউটোপিয়া।

ইউটোপিয়া মানে কী? যেটা স্বপ্নের দেশ। যেখানে সব কিছুই ভালো। তাহলে ডিসটোপিয়া কী? ডিসটোপিয়া হলো ইউটোপিয়ার বিপরীত। অর্থাৎ ডিসটোপিয়া এমন এক পৃথিবী বা জগতের কথা বলে যেখানে সব কিছু কোন না কোনভাবে আমাদের জন্য খারাপ। বলা যায় দুঃখ ও জীর্ণতা কিংবা অভিশাপের দেশ। সুতরাং এক কথায় বলা যায় ইউটোপিয়া-ডিসটোপিয়া: সুখের দেশ-দুঃখের দেশ।

তবে ইউটোপিয়া কিংবা ডিসটোপিয়া কোনটিই ইংরেজি ভাষার কোন বাক্য না। ল্যাটিন থেকে এলেও প্রথমত তার কোন পূর্ণ অর্থ ছিলো না। আমি বোঝাতে চাচ্ছি এরকম কোন পূর্ণ শব্দ কোন ভাষায় ছিলো না। এর ধারণাও কোথাও ছিলো না। ইউটোপিয়া শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন সেন্ট থমাস মুর ১৫১৬ সালে প্রকাশিত তার গ্রন্থে। যেই বইটির নাম ছিলো ‘ইউটোপিয়া’। তিনি এই শব্দটি তখন বুঝাতে চেয়েছিলেন প্রচলিত ভঙ্গুর সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে এমন একটি সমাজের যেখানে কোন বর্ণ বৈষম্য নেই, কোন নিয়ম ভাঙ্গা নেই এবং যেখানে সুশাসন সবার জন্য প্রতিষ্ঠিত।

তবে সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো ল্যাটিন আর গ্রীক থেকে যৌথভাবে আসা ইউটোপিয়া শব্দের অর্থ হলো নো হোয়ার বা ‘কোথাও নেই’। অর্থাৎ ইউটোপিয়া এমন একটি ধারণার কথা বলছে তা পৃথিবীতে কোথাও নেই। থমাস মুর নতুন কোন দ্বীপ কিংবা দেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন যেখানে ইউটোপিয়ান সমাজ ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকবে। তবে একশো বছরের মধ্যেই এই স্বপ্ন ধারণ করে ফেলে সব মানুষ। ইউটোপিয়া হয়ে যায় ইংরেজি ভাষার একটি শব্দ। ডিকশনারি ডট কমের সংজ্ঞায় ইউটোপিয়া মানে হলো: রাজনৈতিক ও সামাজিক উৎকৃষ্টতার রূপক অবস্থা।

অপরদিকে ইউটোপিয়ার ধারণা আসার তিনশো বছরের মাথায় বেরিয়ে আসে তার বিপরীত ধারণাও। অনেকে বলতো এন্টি-ইউটোপিয়া অথবা ক্যাকাটোপিয়া। ডিসটোপিয়া শব্দটি প্রথমে জেরেমি বেনথাম ব্যবহার করেন ১৮১৮ সালে। তিনি ইউটোপিয়ার বিপরীত অবস্থা বুঝাবার জন্য শব্দটির প্রয়োগ করেন। ২০০৫ সালের অক্সফোর্ড অভিধান অনুসারে, ডিসটোপিয়া হলো এমন এক পরিস্থিতি যেখানে সবকিছুই খারাপ এবং বিশৃঙ্খল।

আমার মনে হয় আমরা খুব ভালো করেই বুঝে গেছি ইউটোপিয়া বা ডিসটোপিয়া কী! তবে আমরা শুধু ডিসটোপিয়া নিয়েই কথা বলবো। এখন ডিসটোপিয়া মুলত কী রকম অথবা ডিসটোপিয়ার ধারণা আসলে কেন তা নিয়ে বিতর্ক আছে। আছে চায়ের কাপে সমালোচনা করার বিস্তর রসদপাতিও। সেসব আমাদের কাজ নয়। আমরা বরং কিছু বিখ্যাত ডিসটোপিয়ান গল্প অথবা সিনেমা নিয়ে শুধু ধারণা নেয়ার চেষ্টা করবো মুলত ডিসটোপিয়া আসলে কীরকম! হয়তো ধারণা নিলেই আমরা নিজেরা নিজেরা ভেবে নিতে পারবো ডিসটোপিয়ার ধারণা কেন আমাদের মাঝে ছড়িয়েছিলো। তো চলো শুরু করা যাক।

দেশ-বিদেশে প্রচুর বই আর সিনেমা আছে যেগুলো ডিসটোপিয়াকে ধারণ করে তৈরি করা হয়েছে। আমরা হয়তো সবাই সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত ‘হীরক রাজার দেশে’ সিনেমাটা দেখেছি। মজার ব্যাপার হলো এটাও কিন্তু এক প্রকারের ডিসটোপিয়ান সিনেমা। সবার সুবিধার্থে কিছু ডিসটোপিয়ান উপন্যাস আর বইয়ের নাম এখানে যুক্ত করা হলো। যেমন- City of Lost Children, A Clockwork Orange, হীরক রাজার দেশে, Children of Men, Looper, Mad Max, Mad Max Beyond Thunderdome, Mad Max Fury Road, The Matrix, Metropolis, Minority Report, Wall-E, Akira (Japanese Anime)।

ডিসটোপিয়ান সাহিত্যের অনন্য এক উপন্যাস হলো নাইন্টিন এইট্টি ফোর (1984)। পরে অবশ্য সিনেমাও হয়েছে। সাদাকালো এই সিনেমাটির কাহিনি প্রকাশিত হয়েছিলো ১৯৪৯ সালে। নাইন্টিন এইট্টি ফোর নিয়ে কথা বলার আগে আরেকটি ডিসটোপিয়ান উপন্যাস নিয়ে কথা বলা জরুরি।

বেশিরভাগ মানুষের ধারণা ‘নাইন্টিন এইট্টি ফোর’ সিনেমাটির কাহিনী নেয়া হয়েছে হাক্সলির উপন্যাস থেকে। অনেকের ধারণা সেই উপন্যাসও অন্যদের থেকে প্রভাবিত। তবে প্রভাবিত না হলেও বেশ অনুপ্রাণিত বলা চলে। এইচ.জি.ওয়েলসের কল্পবিজ্ঞান উপন্যাসগুলি দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে অ্যালডাস হাক্সলি রচনা করেন ‘ব্রেভ নিউ ওয়ার্ল্ড’। ১৯৩২ সালে যেটি প্রকাশিত হয়। আধুনিক যুগের জনপ্রিয় ডিসটোপিয়ান উপন্যাসের মধ্যে ‘ব্রেভ নিউ ওয়ার্ল্ড’ অন্যতম।

সমালোচকদের ধারণা ব্রেভ নিউ ওয়ার্ল্ড থেকেই অনুপ্রাণিত হয়ে লেখা হয়েছিলো নাইন্টিন এইট্টি ফোর। যেখানে দেখা যায় এক অভিশপ্ত ভবিষ্যত পৃথিবীর ছবি। Big brother is watching you নামে একটি জনপ্রিয় সংলাপ ছিলো। কেউ কিছু করলেই সবাই বলতো বিগ ব্রাদার ইজ ওয়াচিং ইউ। এই সংলাপটিও নেয়া হয়েছে এই সিনেমা থেকে। নাইন্টিন এইট্টি ফোরে দেখা যায় স্বৈরাচারী শাসক বিগ ব্রাদারের কথা। যিনি কিনা সবসময় সর্ব অবস্থায় সব নাগরিককে দেখছেন। কোন মানুষ বিগ ব্রাদারের বিরুদ্ধে কোন সমালোচনা করলো কিনা বা রাষ্ট্র নিয়ে কোন রকম হতাশামূলক কথা বললো কিনা তার দৃশ্য বিগ ব্রাদারের কাছে থাকে। সবয়েচে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, এখানে সত্য বলতে কিছু নেই। বিগ ব্রাদার যা বলবেন তাই চিরসত্য। বিগ ব্রাদার কখনো ভুল বলেন না। যদিও কোনভাবে ভুল বলে ফেলেন তবে সেটিকে শুরু থেকে এমন ভাবে পরিবর্তন করে দেয়া হয় যেন এটা প্রমাণ করা না যায় যে বিগ ব্রাদার কখনো ভুল বলেছিলেন।

এখন তুমি ভাবতে পারো এটা কীভাবে সম্ভব! সিনেমার বাকি ব্যাপার নিয়ে আমরা পরের পর্বে আলোচনা করবো। কথা বলবো আরো কয়েকটি ডিসটোপিয়ান উপন্যাস বা সিনেমা নিয়ে। মনস্তাত্ত্বিকভাবে আমরা নেতিবাচক মানসিকতার প্রতি আগ্রহী থাকলেও আমরা সেটিকে হজম করতে পারি না। আর এ কারণেই বেশিরভাগ ডিসটোপিয়ান শিল্প-সাহিত্য প্রচুর বিতর্কের মুখে পড়েছিলো৷ এমনকি বিখ্যাত ব্রেভ নিউ ওয়ার্ল্ড বইটি তো প্রকাশিত হবার সাথে সাথে নিষিদ্ধ বইয়ের তালিকাতেও স্থান পেয়েছিলো। তবুও ডিসটোপিয়া মিশে আছে আমাদের মানসিকতা ও পৃথিবীর রন্ধ্রে রন্ধ্রে তা নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না।

লেখাটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করতে ভুলবেন না!
What are you thinking?